তুরিনের ঘোড়া: মানব পরিস্থিতির নিগূঢ় নাট্য

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই, ফ্রেডরিক নিৎশে ও বেলা তারের প্রতিকৃতি অবলম্বনে অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১৮৮৯ সালের ৩ জানুয়ারি। ইতালির তুরিন শহরের রাস্তায় এক কোচোয়ান ভীষণ বেকায়দায় পড়েন। তাঁর ঘোড়াটা হঠাৎ বিদ্রোহ করে বসে; অনেক সাধ্য-সাধনা করেও নড়ানো যাচ্ছে না। কোচোয়ান একসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং ঘোড়াটাকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন। দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎশে তখন তুরিন শহরে থাকেন, ৬ নম্বর, ভিয়া কার্লো আলবের্তোর এক বাড়িতে। সেদিন তিনি হাঁটতে বেরিয়েছেন কিংবা হয়তো পোস্ট অফিসের দিকে যাচ্ছেন। পথে ঘোড়া নিগ্রহের হৃদয়বিদারক দৃশ্যটা তাঁর নজরে পড়ে। ততক্ষণে কোচোয়ান হয়তো ক্লান্ত হয়ে প্রহার থামিয়েছেন এবং একটা ভিড় জমে উঠেছে রাস্তায়। নিৎশে সেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে যান এবং ঘোড়াটার কাঁধ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। তখন তাঁর বাড়িওয়ালা কিংবা কোনো প্রতিবেশী তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান।

ওই ঘটনার পরের দুই দিন নিৎশে বাক্‌রুদ্ধ এবং নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকেন বিছানায়। সেই সময় তাঁর শেষ বাক্যটি ছিল, ‘মা, আমি নির্বোধ।’ তারপর তিনি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে বেঁচে ছিলেন ১০ বছর। স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরে আসতে পারেননি। নিৎশের জীবনের শেষ বছরগুলো কেটেছে তাঁর মা এবং বোনের তত্ত্বাবধানে।

যে প্রজ্ঞাবান কথক নিৎশেকে নিয়ে তুরিনের ঘোড়ার এই গল্প ফেঁদেছেন, কৌশলে তিনি এর সঙ্গে জুড়ে দেন ঘটনার দিন-তারিখ, যাতে মনে হয় এটা গল্প নয়; ইতিহাস এবং নিৎশের শেষ জীবনের অপ্রকৃতিস্থতার এটাই ব্যাখ্যা। কিন্তু আমরা ডাক্তার মোবিয়াসের সাক্ষ্য থেকে জানতে পারি, নিৎশে সিফিলিসজনিত পক্ষাঘাতে ভুগছিলেন এবং তাঁর অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার সেটাই কারণ। তবু তুরিনের ঘোড়ার গল্প নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেমে থাকেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, নিৎশে কেন কোচোয়ানকে জড়িয়ে না ধরে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরলেন? কিংবা যে নিৎশে সারা জীবন দয়ামায়া এবং অনুকম্পা প্রকাশের পুরোনো নৈতিকতার বিরুদ্ধে লিখে গেছেন, সেই তিনি কেন একটা প্রহৃত ঘোড়ার প্রতি এতটা সহৃদয় হয়ে উঠলেন? কেন তিনি এতটা আঘাত পেলেন যে সেটা সহ্য করতে না পেরে অপ্রকৃতিস্থই হয়ে পড়লেন?

হাঙ্গেরীয় লেখক এবং ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই তাঁর দ্য ওয়ার্ল্ড গোজ অন বইয়ের একটি ছোট লেখায় তুরিনের ঘোড়ার এই বৃত্তান্ত উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা জানি ওই ঘটনার পর নিৎশের কী হলো, কিন্তু ঘোড়াটার জীবনে কী ঘটেছে, তা আমরা জানি না।’ যে প্রকৃত মজলুম, ইতিহাস তার কথা মনে রাখে না। তবে লাসলোর এই লেখার সূত্রে চলচ্চিত্রকার বেলা তাঁর তুরিনের ঘোড়াটাকে ফিরিয়ে আনেন তাঁর একটি ছবিতে, লাসলো নিজেই যার চিত্রনাট্য লেখেন।

বেলা তারের ছবিতে তুরিনের ঘোড়া এবং মানুষের পরিস্থিতি একই রকম। ঘোড়াটার মতোই কোচোয়ান এবং তাঁর মেয়ে নিজেদের অস্তিত্বের ভারে ন্যুব্জ, জর্জরিত। তাঁদের সামনে কোনো নৈতিক প্রশ্ন তোলা অর্থহীন।

তুরিন কাহিনি নিয়ে একটা প্রশ্ন তোলা খুবই সংগত যে প্রজ্ঞাবান কথক কেন এমন একটা বৃত্তান্ত ফাঁদলেন? কেন তিনি নিৎশেকে দিয়ে একটা প্রহৃত ঘোড়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরালেন? তিনি কি স্রেফ একটা দৃষ্টান্ত হাজির করছেন যে কাগজে-কলমে কোনো দার্শনিক যতই বাগাড়ম্বর করুন, বাস্তব পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো। এ গল্প কি তাহলে বাস্তব ঘটনার বিপরীতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একরকমের অসারতা তুলে ধরে, নাকি এর অন্য কোনো নিগূঢ় মানে আছে? এই সূত্রে লাসলো তাঁর ছোট লেখাটায় মানুষের অস্তিত্বরহস্যের অন্ধকার একটা দিকে আলো ফেলেন।

তিনি বলেন, তুরিনের নিৎশে নাটক থেকে বোঝা যায়, মানুষের অস্তিত্বের গভীরে আছে এই বিপরীতমুখী টান। নিৎশে জানতেন, নৈতিকতা এবং জীবন পরস্পরবিরুদ্ধ। নৈতিক নিয়মের বাধ্যবাধকতা মেনে যে জীবন কেউ যাপন করে, তার সেই জীবনযাপনে সম্মানের কিছু নেই, কারণ কেউ এর অন্যথা করতে পারে না। কাজেই আমরা নৈতিক বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে স্বাধীন জীবন বেছে নিতে পারি। কিন্তু এই সব বিধিবিধান থেকে কেউই পুরোপুরি মুক্ত হতে পারি না, আমাদের জীবনের গভীরে থেকে যায় অন্তর্গত একটা টান। মানব পরিস্থিতি যে বৃহতের অংশ এবং সেখানে মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের যে বিকাশ ঘটেছে, তার ভেতর থেকে এক অনাম্নী রহস্যময় শক্তি এসে আমাদেরকে টেনে ধরে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে আমরা জর্জরিত হই।

বেলা তারের দ্য তুরিন হর্স (২০১১) চলচ্চিত্রে আমরা তুরিনের ঘোড়ার পাশাপাশি কোচোয়ান এবং তাঁর মেয়ের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখি। উনিশ শতকীয় হাঙ্গেরির বিস্তৃত সমতলভূমির কোনো একটা গ্রামে তাঁরা থাকেন। ছবির শুরু থেকেই দেখা যায়, পুরো অঞ্চলে বয়ে যাচ্ছে তুষার ঝড়, যেন মানুষ যে সমগ্রের অংশ, সেই বৃহতের ভেতর থেকে এসেছে এই দুর্যোগ, ঝড়ের গোঙানি যেন ঈশ্বরের ক্রোধের আওয়াজ। এমন পরিস্থিতিতে ঘোড়া অবাধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু ঝড় থামে না। গৃহবন্দী হয়ে কোচোয়ান এবং তাঁর মেয়ে তাঁদের দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলো করে যান। পৌনঃপুনিকভাবে করে যাওয়া তাঁদের রুটিন জীবন দেখতে দেখতে আমরা মানুষের অস্তিত্বের দুঃসহ ভার টের পাই। একদিন প্রতিবেশী বের্নার্দ ব্র্যান্ডি চাইতে এসে দীর্ঘ স্বগতোক্তি করে। লোকটা এমন সব কথা বলে, যেন সে নিৎশের প্রেতাত্মা। সে জানায়, কাছের একটা শহর ধ্বংস হয়ে গেছে—মানুষ এবং ঈশ্বর মিলে জগৎটাকে ধ্বংস করে ফেলছে। অচিরেই অবাধ্য ঘোড়া আরও অবাধ্য হয়ে ওঠে। সে খড়-বিচালি খাওয়া ছেড়ে দেয়। কুয়োর পানি শুকিয়ে যায়। কোচোয়ান এবং তাঁর মেয়ে তাঁদের ঘোড়া এবং জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, কিন্তু হয়তো বাধ্য হয়েই আবার ফিরে আসেন। আলো নিভে যায়। লন্ঠনের তেলও শেষ হয়। প্রথমে কোচোয়ানের মেয়ে, তারপর কোচোয়ান খাওয়া ছেড়ে দেন।

বেলা তারের ছবিতে তুরিনের ঘোড়া এবং মানুষের পরিস্থিতি একই রকম। ঘোড়াটার মতোই কোচোয়ান এবং তাঁর মেয়ে নিজেদের অস্তিত্বের ভারে ন্যুব্জ, জর্জরিত। তাঁদের সামনে কোনো নৈতিক প্রশ্ন তোলা অর্থহীন।

বেলা তারের ‘দ্য তুরিন হর্স’ (২০১১) চলচ্চিত্রের পোস্টার
সত্য হলো, মানুষের স্বাধীন এবং উন্মুক্ত জীবনের প্রেক্ষাপটেও নিৎশের তুরিন–বৃত্তান্ত একই রকম তাৎপর্যপূর্ণ থাকে—এই কাহিনি একইভাবে মানব পরিস্থিতির নিগূঢ় রহস্য ব্যাখ্যা করে।

দ্য তুরিন হর্স ছবি দেখে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, মানুষের জীবন তো সব সময় ও রকম না, বেলা তার কেন এমন অবরুদ্ধ পরিস্থিতি বেছে নিলেন? ছবির চরিত্রদের মতো অসহনীয় ও করুণ পরিস্থিতিতে আমরা কখনো কখনো পড়ি বটে, কিন্তু এটা সব সময়ের চিত্র নয়, আমাদের সামনে নানা বিকল্প খোলা থাকে, সেই সব বিকল্প থেকে একটা উপায় আমরা বেছে নিই।

কাজেই আমরা বেলা তারের ছবির পরিস্থিতিটাকে বদলে ফেলে নিৎশের তুরিন নাটক নিয়ে ভাবতে পারি। ধরা যাক, মানুষের জীবনে ছবির ওই নিরবচ্ছিন্ন তুষারঝড় নেই, কুয়ার পানি শুকিয়ে যায়নি, আলো নেভেনি কিংবা লন্ঠনের তেলও শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের সামনে খোলা আছে কোথাও চলে যাওয়ার বিকল্প। কেবল তা–ই না, ধরা যাক মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা এবং তার ওপর ইতিহাসের কোনো চাপ নেই, ঈশ্বর তার জন্য কোনো অমোঘ নিয়তি ধার্য করে রাখেনি এবং এমনকি জৈবিক শর্তগুলোও তার নিয়তি ঠিক করে দিচ্ছে না। অর্থাৎ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং সম্ভাবনাই তার অস্তিত্বের দশা, যেখানে সে কোনো কিছু হয়ে উঠবে কি উঠবে না, সেই স্বাধীনতাও তার আছে। এমন পরিস্থিতিতে তুরিন নাটকের ব্যাখ্যা কী?

সত্য হলো, মানুষের স্বাধীন এবং উন্মুক্ত জীবনের প্রেক্ষাপটেও নিৎশের তুরিন–বৃত্তান্ত একই রকম তাৎপর্যপূর্ণ থাকে—এই কাহিনি একইভাবে মানব পরিস্থিতির নিগূঢ় রহস্য ব্যাখ্যা করে। উল্লেখিত স্বাধীন মানব পরিস্থিতির দিকে তাকানো যাক। একজন স্বাধীন মানুষ, যার জীবনের পূর্বনির্ধারিত কোনো নকশা নেই, জীবন যার উন্মুক্ত এবং সে যেহেতু নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় সে কী করবে বা করবে না, সে আদৌ কোনো কিছু হয়ে উঠবে কি উঠবে না, কাজেই যা কিছুই সে করুক, তার দায় তাকে নিতে হয়। এই দায়দায়িত্ব থেকে তার মুক্তি নেই। এবং জীবন উন্মুক্ত হওয়ার মানে অপার সম্ভাবনা। যদি সে এই সম্ভাবনা কাজে না লাগায়, মানবজমিন আবাদ না করে পতিত রাখে, তার জন্যও তাকেই দায় নিতে হবে। দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তাঁর দ্য কামিং কমিউনিটি বইয়ের একটি লেখায় বলেন, মানুষের জীবনের এই সম্ভাবনা মানে একটা অভাব, একটা ঘাটতি। মানুষকে এই ঘাটতি পূরণ করতে হয়। যদি সে তা না করে, তাহলে এটা হবে নিন্দনীয়, যেন মানুষ জন্ম থেকেই ঋণগ্রস্ত, তাকে এই ঋণ শোধ করার দায় নিতে হবে। আগামবেন একেই বলেন মানুষের আদি পাপ, কোনো অপরাধ না করেও সে এই পাপের ভাগীদার।

বাস্তব পরিস্থিতি এমনই যে মানুষের জন্য কোনো সত্যই চূড়ান্ত নয়। তার সামনে ছড়িয়ে থাকবে এক আপেক্ষিক সত্যের জগৎ। সব সময় সাপেক্ষ হয়ে থাকা, কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাই হবে তার নিয়তি। উন্মূল ও উদ্বাস্তু দশা তাকে ক্ষণে ক্ষণে দিশাহারা করে তুলবে। ক্ষণস্থায়িত্ব, ভঙ্গুরতা আর অসম্পূর্ণতা কখনোই তার পিছু ছাড়বে না।

এবং মানুষের জীবনস্রোত এমনভাবে বয়ে চলে যে সে প্রতিনিয়ত নানা রকম আনকোরা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় এবং সেই সব পরিস্থিতির মোকাবিলায় চিরন্তন কোনো নীতি বা উপায় কাজ করে না, এমনকি পুরোনো বিধিবিধান সেখানে একেবারেই অচল। তাকে অন্ধকার গহ্বরে পা ফেলতে হয় এবং সেই সিদ্ধান্তের দায়ও তাকে নিতে হয়। এমন পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তোলে কোনো কোনো দল বা গোষ্ঠী। তারা পবিত্র ও চিরন্তন বিধিমালার নামে আকর্ষণীয় বয়ান কিংবা ফিকশন নিয়ে হাজির হয়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষগুলোর চিন্তার পরিকাঠামোকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তখন ওই সব ফিকশন বহু মানুষের জীবনযাপনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

এবং সে যে উদ্যোগই নিক, সময়ের দেয়াল ফুঁড়ে হাজির হবে আকস্মিকতা। এই আকস্মিকতা সব পরিকল্পনার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং একসময় এক অতল খাদের গভীর শূন্যতায় সবকিছুকে ছুড়ে ফেলবে। মানুষ ধীরে ধীরে টের পাবে, আকস্মিকতাই তার জীবনের শাসক। অথচ সবকিছুর দায় এবং পরিণাম ভোগ করতে হবে তাকেই।

এবং সে যখন ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে, তার মধ্যে কাজ করতে শুরু করবে লুসিফার ইফেক্ট। সে নিজের সমাজের দুর্বল মানুষগুলোর ওপর জুলুম-জবরদস্তি করে এক অদ্ভুত রকমের উল্লাস অনুভব করবে। সে ভাববে, এটাই ক্ষমতাবান হওয়ার মানে এবং তার দৃষ্টিকে ঘিরে ফেলবে এক রকমের কুয়াশা, যার কারণে সে তার নিজের দেখা সত্যকেই একমাত্র সত্য ভাবতে থাকবে, একই সঙ্গে সেই সত্যকে চাপিয়ে দিতে শুরু করবে অন্য সবার ওপর। এই জবরদস্তি খুব শিগগির তার নিজের এবং অন্যদের চরম বিপদ ডেকে আনবে।

এবং বাস্তব পরিস্থিতি এমনই যে মানুষের জন্য কোনো সত্যই চূড়ান্ত নয়। তার সামনে ছড়িয়ে থাকবে এক আপেক্ষিক সত্যের জগৎ। সব সময় সাপেক্ষ হয়ে থাকা, কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাই হবে তার নিয়তি। উন্মূল ও উদ্বাস্তু দশা তাকে ক্ষণে ক্ষণে দিশাহারা করে তুলবে। ক্ষণস্থায়িত্ব, ভঙ্গুরতা আর অসম্পূর্ণতা কখনোই তার পিছু ছাড়বে না।

মানুষকে ঘিরে রেখেছে যে ভীতিকর শূন্য গহ্বর কিংবা সমাজে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে যে বিপজ্জনক ফাঁদ, মহামতি বুদ্ধের করুণা কিংবা ভীষ্মের বলা ধর্মকথা হয়তো তা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু মানুষ কেন বুদ্ধ কিংবা ভীষ্মের কথা শুনবে?

মানুষের অসহায়ত্বের এই নিগূঢ় বাস্তবতা নিৎশে জানতেন। তিনি নিজেও এই শোচনীয় পরিস্থিতির বিষে জর্জরিত ছিলেন। তিনি বুঝতেন, বেঁচে থাকা মানেই অন্যায্যতা—এক নীতিগর্হিত জীবন। তাই তুরিনের পথে নৃশংসতার শিকার ঘোড়াটাকে দেখে তিনি বিহ্বল বোধ করেন, মজলুম প্রাণীটির মধ্যে নিজের অসহায়ত্ব দেখতে পান এবং সহৃদয়তাবশত ঘোড়াটার কাঁধ জড়িয়ে ধরেন।

তুরিন কাহিনির নিৎশে যেন এক বুদ্ধ। তিনি কোচোয়ান এবং রাস্তায় জমে ওঠা ভিড়টাকে করুণাসিক্ত হয়ে উঠতে বলছেন। এই কাহিনি মহাভারতের অনুশাসন পর্বের ভীষ্মের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুধিষ্ঠিরকে যিনি ধর্মের সারকথা বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেন, যে আচরণ তোমার নিজের প্রতি করা হলে তোমার কাছে প্রতিকূল বা যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়, সেই আচরণ তুমি অন্যের প্রতি করবে না। ভীষ্ম আরও বলেন, ধর্মের এই নিয়ম মানুষের জৈব কামনার থেকে আলাদা। অর্থাৎ এই নিয়ম পালন করতে হলে প্রাকৃত মানুষকে তার জৈব কামনা-বাসনা এবং লোভ ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তাকে কিছু মাত্রায় অপ্রাকৃত হয়ে উঠতে হয়।

মানুষকে ঘিরে রেখেছে যে ভীতিকর শূন্য গহ্বর কিংবা সমাজে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে যে বিপজ্জনক ফাঁদ, মহামতি বুদ্ধের করুণা কিংবা ভীষ্মের বলা ধর্মকথা হয়তো তা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু মানুষ কেন বুদ্ধ কিংবা ভীষ্মের কথা শুনবে? বেশির ভাগ মানুষই শুনবে না, তারা বরং ওই শূন্য গহ্বরটাকে আরও গভীরতর করে তুলবে। কাজেই কিছু মানুষকে শূন্যতা ভরাট করার নতুন নতুন সমাজ-সত্য আবিষ্কারের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, কেউ হয়তো রপ্ত করে নেবে শূন্যে সাঁতার কাটার কৌশল, কেউ খাদের কিনারে বসে গাইবে মন ভোলানো গান, কেউ নিজের কাজকে করে তুলবে প্রতিরোধ নৃত্য...সৃষ্টিশীলতার এক মহাযজ্ঞ চলতে থাকবে।

এবং অবশ্যই তুরিন–বৃত্তান্তে নিৎশে দেখিয়েছেন সেই অনৃশংসতার দৃষ্টান্ত, সেই মহাকরুণা, যা মানুষ ও প্রাণিকুলকে রক্ষা করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।