প্রযুক্তি, অনুবাদ ও মানবিকতার নতুন দিগন্ত

এআইয়ের সহযোগিতায় গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বিশ্বসাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হয়। সাহিত্য কোনো শূন্যস্থানে জন্মায় না। সমাজ, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও অনুবাদ থেকে শুরু করে পাঠক, বাজার, ভাষা ও মানুষের অন্তর্জগত—সবকিছুর সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর ও অটুট। তাই বিশ্বসাহিত্যের আগামী দশককে বুঝতে হলে শুধু নতুন প্রযুক্তির দিকে তাকালেই হবে না; ইতিহাসের দীর্ঘ পথ, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

আজকের সাহিত্যজগৎ এক বড় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে মুদ্রণযুগ, আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা ও বিশ্বায়নের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রকাশনা, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ, বৈশ্বিক পাঠকমণ্ডলী ও মনোযোগের নতুন সংকট। এই দুই ধারার টানাপোড়েনেই আগামী দশকের বিশ্বসাহিত্য গড়ে উঠবে।

গ্যেটে বহু আগে বিশ্বসাহিত্যের যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা আজ আরও প্রাসঙ্গিক। তিনি সাহিত্যকে কেবল একটি জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে সাহিত্যের শক্তি ছিল পারস্পরিক আদান-প্রদানে, ভাষা ও সংস্কৃতির সংলাপে। এক কথোপকথনে তিনি বলেছিলেন, ‘দ্য ইপক অব ওয়ার্ল্ড লিটারেচার ইজ অ্যাট হ্যান্ড, অ্যান্ড ইচ অব আস মাস্ট ওয়ার্ক টু হেইস্টেন ইটস অ্যাপ্রোচ’, অর্থাৎ ‘বিশ্বসাহিত্যের যুগ এসে গেছে এবং আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত এই আগমনকে ত্বরান্বিত করা।’ এই উক্তির মর্মবাণী আজ আরও স্পষ্ট। সাহিত্যের ভবিষ্যৎ আর একক জাতিসত্তার ভেতরে আটকে থাকবে না; সে হয়ে উঠবে আরও বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক।

তবে বিশ্বসাহিত্যের এই সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন প্রশ্নও জেগে উঠেছে। সাহিত্য কি এখন কেবল দ্রুত পৌঁছানোর বিষয়, নাকি তার গভীরতা, সংবেদনশীলতা ও ভাষার সূক্ষ্মতা রক্ষা করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এআই এখন লেখালেখি, সম্পাদনা, সারসংক্ষেপ, অনুবাদ, পাঠকরুচি বিশ্লেষণ ও প্রকাশনার কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। এতে সাহিত্যিক কাজের গতি বেড়েছে, অনেক কাজ সহজ হয়েছে। কিন্তু সাহিত্য কেবল গতি বা সুবিধার বিষয় নয়, এটি অভিজ্ঞতার ঘনত্ব, স্মৃতির ভার, সমাজের টানাপোড়েন, নৈতিক দ্বিধা ও ভাষার সুরের শিল্প। একটি যন্ত্র হয়তো খসড়া লিখে দিতে পারে, কিন্তু একটি মানুষের অন্তর্গত যন্ত্রণা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি বা নৈতিক সংকটকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।

অনুবাদের ক্ষেত্রেও এক বড় রূপান্তর ঘটছে। যান্ত্রিক অনুবাদ ও এআইনির্ভর অনুবাদ দ্রুত উন্নত হচ্ছে। ফলে ছোট ভাষার সাহিত্যও এখন বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা। আগে যে সাহিত্য ভাষার সীমাবদ্ধতায় আড়ালে থেকে যেত, এখন তা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সাহিত্যিক অনুবাদ কেবল শব্দ বদলের কাজ নয়, সেখানে রয়েছে সুর, ছন্দ, প্রতীক, সংস্কৃতি ও আবেগের সূক্ষ্ম ভারসাম্য।

এখানেই লেখক-প্রশ্নটি নতুন করে দেখা জরুরি। রোলাঁ বার্তের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ডেথ অব দ্য অথর’ সাহিত্যতত্ত্বে এক যুগান্তকারী আলোচনার সূত্রপাত করেছিল। তাঁর মূল বক্তব্যকে সংক্ষেপে বলা যায়, পাঠ্যের অর্থ লেখকের জীবনীতে স্থির নয়; পাঠকের পাঠের মধ্যেই তা নতুন অর্থ পায়। বার্তের ভাষায়, ‘দ্য বার্থ অব দ্য রিডার মাস্ট বি অ্যাট দ্য কস্ট অব দ্য ডেথ অব দ্য অথর।’ অর্থাৎ ‘পাঠকের জন্ম লেখকের কর্তৃত্বের অবসানের বিনিময়ে।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের ডিজিটাল যুগে আরও শক্তিশালী হয়েছে। পাঠক এখন আর নীরব গ্রাহক নন; তিনি প্রতিক্রিয়াশীল, বিশ্লেষণী, কখনো সৃজনশীলও। অনলাইন আলোচনাচক্র, বই ক্লাব, রিভিউ, ফ্যান-রাইটিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে লেখক, পাঠক ও প্রযুক্তি মিলিয়ে এক নতুন সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগামী দশকের বিশ্বসাহিত্য এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে আরও গভীর করবে।

অনুবাদের ক্ষেত্রেও এক বড় রূপান্তর ঘটছে। যান্ত্রিক অনুবাদ ও এআইনির্ভর অনুবাদ দ্রুত উন্নত হচ্ছে। ফলে ছোট ভাষার সাহিত্যও এখন বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা। আগে যে সাহিত্য ভাষার সীমাবদ্ধতায় আড়ালে থেকে যেত, এখন তা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সাহিত্যিক অনুবাদ কেবল শব্দ বদলের কাজ নয়, সেখানে রয়েছে সুর, ছন্দ, প্রতীক, সংস্কৃতি ও আবেগের সূক্ষ্ম ভারসাম্য। ইউনেসকোও ভাষার বৈচিত্র্য ও অনুবাদের সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তাই আগামী দিনে অনুবাদ যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, মানব অনুবাদকের গুরুত্ব শেষ হবে না; বরং তা হবে আরও অপরিহার্য।

পাঠকের অভ্যাসও বদলে যাচ্ছে। আজকের মানুষ একদিকে দ্রুত তথ্যের স্রোতে অভ্যস্ত, অন্যদিকে ধীর ও গভীর পাঠের প্রয়োজনও অনুভব করছে। সাম্প্রতিক পাঠপ্রবণতা ও গ্রন্থাগারিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘ উপন্যাস, মননশীল প্রবন্ধ, শ্রুতিবই, অনলাইন বই ক্লাব ও সমবেত পাঠচর্চার প্রতি আগ্রহ আবার বাড়ছে। এর মানে এই নয় যে সংক্ষিপ্ত পাঠের গুরুত্ব কমে গেছে। বরং পাঠ আজ দুই মেরুতে ভাগ হয়েছে—একদিকে ক্ষণস্থায়ী, দ্রুত, খণ্ডিত পাঠ; অন্যদিকে দীর্ঘ, মনোযোগী, অন্তর্মুখী পাঠ। ভবিষ্যতের সাহিত্য এই দুই প্রবণতার মাঝখানে তার অবস্থান খুঁজে নেবে। ফলে দীর্ঘ সাহিত্যিক পাঠ বা জটিল উপন্যাস হারিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা যুক্তিসংগত নয়। বরং গভীর পাঠের প্রতি আগ্রহ আরও জরুরি হয়ে উঠবে।

নারী লেখক, প্রান্তিক কণ্ঠ, লিঙ্গপরিচয়ভিত্তিক সাহিত্য এবং বহুস্বরিক অভিব্যক্তি আগামী দশকে আরও শক্তিশালী হবে। সাহিত্যিক পরিসর ক্রমেই বহুবচনধর্মী হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বিস্তৃত হবে। ওলগা তোকারচুকের একটি বক্তব্য এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ‘লিটারেচার, মোস্ট অব অল দ্য নভেল, টিচেস আস এমপ্যাথি অ্যান্ড আপিলস টু আওয়ার এমপ্যাথি।’ অর্থাৎ ‘সাহিত্য, বিশেষ করে উপন্যাস, আমাদের সহমর্মিতা শেখায় এবং আমাদের সহমর্মিতাকে আহ্বান জানায়।’

আগামী দশকের বিশ্বসাহিত্যে বিষয়বস্তুর স্তরেও বড় পরিবর্তন ঘটবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, যুদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য, নগরজীবনের ক্লান্তি ও পরিচয়ের ভাঙন সাহিত্যের কেন্দ্রে দৃঢ়ভাবে স্থান পাবে। জলবায়ুকেন্দ্রিক কল্পকাহিনি (ক্লাইমেট ফিকশন বা সংক্ষেপে ক্লাই-ফাই)—ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ধারা হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রকৃতি আর শুধু পটভূমি নয়, এখন প্রকৃতি মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা, দায় ও অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে শরণার্থীজীবন, বহুভাষিকতা, সীমান্ত পারাপার, নাগরিকত্বের সংকট ও জাতিগত বৈচিত্র্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে থাকবে। বিশ্বসাহিত্য তাই আর একটি কেন্দ্রের সাহিত্য থাকবে না; এটি হবে বহু কেন্দ্রের সংলাপ।

এই পরিবর্তনের মধ্যে একটি নৈতিক প্রশ্নও আছে। প্রযুক্তি দ্রুত, কিন্তু সাহিত্য কি সেই দ্রুততার ভেতরে নিজের মানবিক গভীরতা ধরে রাখতে পারবে? লায়নেল ট্রিলিং বলেছিলেন, ‘দ্য গ্রেট রাইটার ইজ দ্য ওয়ান হু কিপস আস ফ্রম এভার হ্যাভিং টু সেটল ফর দ্য অবভিয়াস।’ অর্থাৎ ‘মহান লেখক সে-ই, যিনি আমাদের সহজ বা সুস্পষ্ট উত্তরে সন্তুষ্ট হতে দেন না।’ আগামী দশকের বড় লেখকদের কাজও হবে প্রযুক্তির গতি অতিক্রম করে ধীর চিন্তার জায়গা তৈরি করা। তাঁরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবেন, কিন্তু প্রযুক্তির দ্বারা গ্রাসিত হবেন না। তাঁরা পাঠককে কেবল তথ্য দেবেন না, বরং প্রশ্নের মধ্যে বাঁচতে শেখাবেন। কারণ, সাহিত্য শেষ পর্যন্ত উত্তর দেওয়ার নয়, বরং প্রশ্ন রক্ষা করার শিল্প।

নারী লেখক, প্রান্তিক কণ্ঠ, লিঙ্গপরিচয়ভিত্তিক সাহিত্য এবং বহুস্বরিক অভিব্যক্তি আগামী দশকে আরও শক্তিশালী হবে। সাহিত্যিক পরিসর ক্রমেই বহুবচনধর্মী হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বিস্তৃত হবে। ওলগা তোকারচুকের একটি বক্তব্য এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ‘লিটারেচার, মোস্ট অব অল দ্য নভেল, টিচেস আস এমপ্যাথি অ্যান্ড আপিলস টু আওয়ার এমপ্যাথি।’ অর্থাৎ ‘সাহিত্য, বিশেষ করে উপন্যাস, আমাদের সহমর্মিতা শেখায় এবং আমাদের সহমর্মিতাকে আহ্বান জানায়।’ তিনি আরও বলেছেন, সাহিত্য আমাদের কিছু সময়ের জন্য অন্য কারও হয়ে উঠতে শেখায় এবং অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতের বিশ্বসাহিত্যে এই সহমর্মিতাই হবে অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। কারণ, প্রযুক্তি মানুষকে সংযুক্ত করলেও অন্তরের দূরত্ব অনেক সময় বাড়িয়ে দেয়। সাহিত্য সেই দূরত্বের বিরুদ্ধে এক মানবিক অনুশীলন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আগামী দশকে বিশ্বসাহিত্য একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে আরও বিস্তৃত ও দ্রুততর হবে, অন্যদিকে মানবিক গভীরতার পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়াবে। অনুবাদ আরও সহজ হবে, কিন্তু অনুবাদের সূক্ষ্মতা হবে আরও মূল্যবান। পাঠক আরও সক্রিয় হবে, কিন্তু মনোযোগের সংকটও বাড়বে। লেখক আরও বেশি সুযোগ পাবেন, কিন্তু নিজস্ব কণ্ঠস্বর রক্ষার দায়ও বাড়বে। বিষয়বস্তু আরও বৈশ্বিক হবে, কিন্তু স্থানীয় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কমবে না। এই দ্বৈততাই হবে আগামী দশকের বিশ্বসাহিত্যের আসল বৈশিষ্ট্য।

প্রকাশনাশিল্পেও পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে। প্রচলিত প্রকাশনা ও স্বপ্রকাশনার সীমারেখা আরও নমনীয় হয়ে উঠবে। লেখকেরা আরও স্বাধীনভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চাইবেন। এতে স্বাধীনতা বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে মানহীন লেখার ভিড়ও বাড়বে। তাই সম্পাদক, সমালোচক ও সাংস্কৃতিক কিউরেটরদের ভূমিকা হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের সাহিত্যিক বাজারে কে কত দ্রুত লিখল, সেটি যেমন গুরুত্ব পাবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে কে কত গভীরভাবে লিখল। পাঠক একসময় ভিড়ের মধ্যেও আলাদা স্বর খুঁজে নেবে। সেখানেই মানসম্পন্ন সাহিত্য টিকে থাকবে।

অতীতের সাহিত্য–ইতিহাস আমাদের শেখায়, বড় পরিবর্তনের সময়েই বড় সাহিত্য জন্ম নেয়। বাস্তববাদ সমাজের দৈনন্দিন জীবনকে সামনে এনেছিল। আধুনিকতাবাদ চেতনার ভাঙন, অস্তিত্বের সংকট ও ভাষার অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্রে এনেছিল। উত্তর-আধুনিকতাবাদ সত্য, পরিচয় ও একক বর্ণনার ধারণাকে প্রশ্ন করেছিল। আগামী দশকের সাহিত্য এই তিন ধারার উত্তরাধিকার বহন করবে, কিন্তু তাদের অনুকরণ করবে না। বরং এটি হবে প্রযুক্তি, স্মৃতি, পরিচয়, নৈতিকতা ও বহুত্বের এক নতুন সংমিশ্রণ। সাহিত্য অতীতের মতোই বাস্তবের মুখোমুখি হবে, তবে নতুন যন্ত্র, নতুন যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে।

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের অনুবাদচিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের কণ্ঠকে শোনা সাহিত্যপাঠের একটি নৈতিক দায়। আবার অমর্ত্য সেনের বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় একমাত্রিক নয়। এই দুটি উপলব্ধি আগামী দশকের সাহিত্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ, বিশ্বসাহিত্য তখনই টিকবে, যখন তা ভিন্ন সমাজ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ইতিহাস ও ভিন্ন স্বপ্নকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করতে পারবে। সাহিত্যকে যদি সত্যিই বিশ্বসাহিত্য হতে হয়, তবে তাকে কেবল বহির্বিশ্বকে দেখলেই চলবে না, অন্যের অভিজ্ঞতার ভেতরে প্রবেশ করার নৈতিকতাও অর্জন করতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আগামী দশকে বিশ্বসাহিত্য একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে আরও বিস্তৃত ও দ্রুততর হবে, অন্যদিকে মানবিক গভীরতার পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়াবে। অনুবাদ আরও সহজ হবে, কিন্তু অনুবাদের সূক্ষ্মতা হবে আরও মূল্যবান। পাঠক আরও সক্রিয় হবে, কিন্তু মনোযোগের সংকটও বাড়বে। লেখক আরও বেশি সুযোগ পাবেন, কিন্তু নিজস্ব কণ্ঠস্বর রক্ষার দায়ও বাড়বে। বিষয়বস্তু আরও বৈশ্বিক হবে, কিন্তু স্থানীয় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কমবে না। এই দ্বৈততাই হবে আগামী দশকের বিশ্বসাহিত্যের আসল বৈশিষ্ট্য।

অতএব বিশ্বসাহিত্যের ভবিষ্যৎ কোনো একক পথে এগোবে না। এটি হবে বহু ভাষার, বহু অভিজ্ঞতার ও বহু কণ্ঠের বিস্তৃত পরিসর। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে মানুষের প্রশ্ন—আমি কে, অন্য মানুষকে কীভাবে বুঝব, সময়ের সঙ্গে কীভাবে বাঁচব, ভয় আর আশা কীভাবে একসঙ্গে ধারণ করব। সাহিত্য এই প্রশ্নগুলোর সরল উত্তর দেয় না। তবে সে প্রশ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। আর প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখাই সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্য করে তোলে।

আরণ্যক শামছ: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক