নিবন্ধ
নজরুলের রাজনীতি
কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন শুধু একজন কবির জন্মস্মরণ নয়, আমাদের রাজনৈতিক ও মানবিক চেতনারও পুনরাবিষ্কারের দিন। সাম্য, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিরোধের যে স্বপ্ন নজরুল দেখেছিলেন, আজকের সময়েও তা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। এই লেখায় উঠে এসেছে সেই রাজনৈতিক নজরুলের বহুমাত্রিক রূপ।
বড় কবি বলেই নির্বাচনে জিতবেন, পুষ্পমাল্যে ভূষিত হবেন—ব্যাপারটা অত সহজ নয়; ইতিহাসের সাক্ষ্য মেনে নজরুল তাই হেরেছিলেন। বলা চলে গো-হারা হেরেছিলেন। জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তাতে কী, রাজনীতি নজরুলকে ছেড়ে যায়নি, নজরুলও রাজনীতি ছাড়েননি। বাঙালি এই কবি আদি-অন্ত রাজনীতিপ্রবণ। কেমন সেই রাজনীতি? ভোটের? ক্ষমতার? জিঘাংসার? বাঙালি ও বাংলাদেশের ঘোরতর কোলাহলের যুগে এই প্রশ্ন জাগে।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ও বিকাশ এমন এক ঐতিহাসিক পর্বে, যখন কবি কেবল কবি হয়ে থাকতে পারেন না, ঔপন্যাসিক কেবল বুনে যেতে পারেন না গল্প-আখ্যানের মনোহর মায়াজাল; সময়ের স্পন্দনে তাঁকেও স্পন্দিত হতে হয়। বাংলার উনিশ শতকের পরাক্রমশালী প্রতিভাবানদের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ—রাজনৈতিক আলোড়নে কে সাড়া দেননি? এমনকি বিদ্যাসাগর-মধুসূদনের মতো শিল্প ও বিদ্যাগ্রস্ত মানুষেরাও গভীর মহলে ‘রাজনৈতিক’। সেকালের সাংস্কৃতিক স্বভাব মেনে মীর মশাররফ হোসেন কিংবা কায়কোবাদও রাজনীতির ময়দানে হাজির।
কাজী নজরুল ইসলাম ইতিহাসের এই পরিপ্রেক্ষিতের সন্তান। অন্য অনেকের মতো তাঁকেও প্রশ্নাতুর করে তোলে আত্মপরিচয়ের রাজনীতি। দল, ভোট কিংবা ক্ষমতার চেয়ে এই রাজনীতি কোনো অংশে কম নয়। যদিও আমাদের সমকালীন প্রবণতা এই যে আমরা রাজনীতি বলতে অনিবার্যভাবে রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতায় আরোহণের সাধারণ তৎপরতাকে বুঝে থাকি।
নজরুলের কাছে রাজনীতি প্রধানত প্রকাশ পায় পরিচয়কেন্দ্রিক প্রশ্ন আকারে: আমি কে? কোথায় নিহিত ‘আমার’ ও ‘আমাদের’ ইতিহাসের সূত্র? কীভাবে রচিত হয় দেশ-কাল ও ব্যক্তির সম্পর্ক? ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই হলো তাঁর আদি জিজ্ঞাসা। গদ্য–পদ্যের তীব্র উচ্চারণে অথবা আড়ালে–আভাসে নজরুল খুঁজে নিতে চান এসব প্রশ্নের চিহ্নময় বিস্তার। পরিচয়ের নানা আবরণ খুলে তিনি দেখান তাঁর বাঙালিত্ব, মুসলমানত্ব, ভারতীয়তা; এসবের কোনোটিকেই তিনি আটকে ফেলেন না একমাত্রিক পরিসরে। মুসলমান হয়েই তিনি বাঙালি, বাঙালি হয়েই তিনি মুসলমান। আবার বঙ্গবাসী হয়েই তিনি সর্বভারতীয়তার অনুষঙ্গী। কোনোটির সঙ্গেই নেই তাঁর অবিকল্প বিরোধিতার বোধ।
ইংরেজ বা ব্রিটিশ পরিচয়ের সামনে নজরুলের ‘পরিচয় রাজনীতি’ জরুরি হয়ে উঠেছিল; কেননা তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়েছে পরিচয়ের বড় এক পরিসর—বহিরাগত ঔপনিবেশিক শাসক, যার কাজ হলো স্থানীয় পরিচয় ধসিয়ে দেওয়া কিংবা অপর করে তোলা। কিন্তু নজরুল এই অপরীকরণকেই প্রশ্ন করেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপরীতে তিনি পরিগঠিত করতে চান নতুন পরিচয়, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, কৃষক, শ্রমিক, জনতার সমবেত সহাবস্থান তৈরি হবে। সেকালের উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদীরাও কমবেশি এ ধরনের রাজনীতির কথা বলেছেন। তরুণ নজরুল প্রবলভাবে এসবের প্রভাব অনুভব করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আজ ভারতে এক অখণ্ড জাতি গড়িয়া তুলিতে চলিতেছি।’ তিনি জাতীয়তাবাদীদের মতো করে দেশকে কল্পনা করেছেন ‘জননী’রূপেই।
লাঙল–এর নামকরণ থেকে শুরু করে বিষয়বিন্যাস প্রমাণ করে নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার ভরকেন্দ্র ঝুঁকেছে সমাজের নিম্নবর্গের দিকে। লেখক হিসেবে ওই নিম্নবর্গের চেতনা রাজনৈতিকভাবে সংহত ও পুনর্গঠিত করা তাঁর কাজ। নজরুল ও তাঁর বন্ধুরা যখন এ ধরনের কাজ করছেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্ট চিন্তা প্রবেশ করতে আরম্ভ করেছে মাত্র।
কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমস্যাও নজরুলের কাছে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, উচ্চশিক্ষিত নেতারা আদতে উচ্চবর্গের স্বার্থই সংরক্ষণ করেছেন। তাঁদের আভিজাত্য এতই গুরুগম্ভীর যে নজরুল সেই ‘অ্যারিস্টোক্রেসি’কে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘আড়ষ্ট-কাক’; কারণ, এঁরা শ্রমিক আর কৃষকের রাজনীতির কথা বললেও সমাজ ও সংস্কৃতির নিম্নতম সোপানে থাকা মানুষের সঙ্গে মেশার ভাষাটিই তাঁরা রপ্ত করেননি। তাই নজরুলের রাজনীতি কথা বলে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কেননা এরা তো প্রকৃতপক্ষে অভিজাততন্ত্রের সম্প্রসারণ। নজরুল তাই উচ্ছ্বসিত হন যখন শ্রমিকেরা ধর্মঘটের তাণ্ডবে দেশকে নাড়িয়ে দেন। শ্রমিকের দুঃখ আর বিষাদকে তিনি পড়তে চান ‘বুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র-শাসিত দেশে’র প্রেক্ষাপটে। বুঝতে বাকি থাকে না যে নজরুলের রাজনীতি চায় গণচেতনার উত্থান।
এরই সূত্রে নজরুলের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক চেতনা। দেখা যায়, ইউরোপ-আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা। নবযুগ পত্রিকার ‘ধর্মঘট’ নামক সম্পাদকীয় নিবন্ধে যেমন লিখেছেন, ‘সেখানে [ইউরোপ-আমেরিকায়] এখন লোকমতের উপরই শাসন প্রতিষ্ঠিত, এই গণতন্ত্র বা ডিমোক্র্যাসিই সে দেশের সর্বেসর্বা।’ নজরুলেরও উদ্দিষ্ট গণতন্ত্র।
নজরুল বৈপ্লবিক রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেন। জাতীয়তাবাদীরা এই রাজনীতিকে বরাবরই ভয় পেয়েছে, জনতার ক্রোধ প্রশমিত করে আচমকা সরে এসেছে। আদতে তারা তো রাষ্ট্রনৈতিকভাবে প্রতিস্থাপিত হতে চায়। অর্থাৎ ব্রিটিশরা যাবে, সেই শূন্যতা পুঁজি করে ক্ষমতায় আরোহণ করবে দেশীয় জাতীয়তাবাদীরা। নজরুল তাই ফাঁপা ভাবালুতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন। ‘ধূমকেতুর পথ’ নির্দিষ্ট করতে গিয়ে যেমন বলেছিলেন ‘ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশিদের অধীন থাকবে না।’
বলেই ক্ষান্ত হননি। নজরুল ও তাঁর বিপ্লবী বন্ধুরা মিলে একটি দলও গঠন করেছেন, নাম দিয়েছেন শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল। দলটি কাজ করেছে কংগ্রেসের উপদল হিসেবে। উপদল হলেও নরমপন্থী কংগ্রেসীদের মতো নয়, আচরণ ও বিশ্বাসে তারা বৈপ্লবিক। এই দলের মুখপত্র হিসেবে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত লাঙল পত্রিকায় প্রতিফলিত হয়েছে এই বিশ্বাসের বার্তা। লাঙল–এর প্রচ্ছদপটে বিষয়বিন্যাসের যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে দেখা যায় বিপ্লবী চেতনাসম্পন্ন লেখার সমাহার: ম্যাক্সিম গোর্কির মার ধারাবাহিক অনুবাদ, কার্ল মার্ক্সের জীবনী, প্রজাস্বত্ব আইনের আলোচনা, গণ-আন্দোলনবিষয়ক বইয়ের আলোচনা ও সংকলন।
লাঙল–এর নামকরণ থেকে শুরু করে বিষয়বিন্যাস প্রমাণ করে নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার ভরকেন্দ্র ঝুঁকেছে সমাজের নিম্নবর্গের দিকে। লেখক হিসেবে ওই নিম্নবর্গের চেতনা রাজনৈতিকভাবে সংহত ও পুনর্গঠিত করা তাঁর কাজ। নজরুল ও তাঁর বন্ধুরা যখন এ ধরনের কাজ করছেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্ট চিন্তা প্রবেশ করতে আরম্ভ করেছে মাত্র। ১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে প্রকাশিত হয় লাঙল। একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পত্রিকা বলেই নামের নিচে যুক্ত করা হয়েছে দলীয় পরিচয় ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপত্র’। এ সংখ্যাতেই ছাপা হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’। কবিতাটি নজরুলের রাজনীতিচিন্তার সারাৎসার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ কবিতায় শোনানো হয়েছে সমতার শ্লোক।
নজরুলের রাজনীতি তাঁর সাহিত্যচিন্তাকেও নিয়ে এসেছে প্রতিরোধের আঙিনায়। এ কারণে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় এক অভিভাষণে তিনি উপস্থাপন করেছেন ‘জনসাহিত্যে’র প্রস্তাব। সেখানেও তাঁর মুখ্য লক্ষ্য জনগণ। নজরুলের ভাষ্যে, ‘জনসাহিত্যের উদ্দেশ্য হল জনগণের জন্য মতবাদ সৃষ্টি করা এবং তাদের জন্য রসের পরিবেশন করা।’
নজরুলের এই বৈষম্যবিরোধী অনুভব, নিম্নবর্গ কিংবা কৃষক-শ্রমিক অভিমুখিনতা হঠাৎ-উদ্ভূত কোনো চেতনা নয়। নবযুগ পত্রিকার সম্পাদকীয়ধর্মী গদ্যগুলোতে স্পষ্ট যে অসমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থকে তিনি বিশেষ তাৎপর্যে বুঝতে চেয়েছেন; এ–ও মনে করেছেন শ্রমিক-জনতার বিদ্রোহের মতো করে ‘গণতন্ত্র ও ডিমোক্র্যাসির জাগরণও এ-দেশে দাবানলের মতো’ ছড়িয়ে পড়বে। দেখতে পাই, শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহারে রাজনৈতিক লক্ষ্য আর নিশানাগুলো আরও স্পষ্ট অবয়ব পেয়েছে; যেখানে লেখা হয়েছে কৃষকের ভূমিস্বত্ব, শ্রমিকের মজুরি, আবাসন, শ্রমিক সংঘ ও শ্রমিক-কৃষকের সংঘবদ্ধতার কথা। তবে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, ‘নারী-পুরুষনির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতাসূচক স্বরাজ্য লাভ।’
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আঘাত হানা হয়েছে আমলাতন্ত্রের ওপর। তার বড় কারণ বিদেশিদের তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা আমলাতন্ত্রই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃতি পেয়েছে, জন্ম দিয়েছে উচ্চবর্গীয় ক্ষমতাকাঠামোর। শুধু তা-ই নয়, জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই আমলাতন্ত্রের কাজ ও লক্ষ্যের কোনো মিল নেই।
শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার ফলে জাতীয় দাবিও অর্জিত হয়নি। তাহলে পথ কী? নজরুলের মতে, অর্থাৎ শ্রমিক-স্বরাজ দলের মতে দরকার তাই ‘গণ–আন্দোলন’; ওই ইশতেহারে লেখা হয়েছে, ‘গণ–আন্দোলনের চলমান শক্তির প্রয়োগ দ্বারাই নিরস্ত্র জাতির পক্ষে স্বাধীনতা লাভের একমাত্র উপায়...।’
বিপ্লব ও প্রতিরোধের এসব উপাদান নজরুল অন্ততপক্ষে দুদিক থেকে পেয়েছিলেন। একদিকে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীদের মারফত, অন্যদিকে মার্ক্সবাদী রাজনীতিকদের মধ্যস্থতায়। আমরা দেখব, বিভিন্ন লেখায় নজরুল স্মরণ করেছেন শ্রী অরবিন্দ ও কার্ল মার্ক্সের নাম। তিনি উপন্যাসের আখ্যানে রুশ বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনেছেন, চরিত্রের ভেতর জুড়ে দিয়েছেন বিপ্লবী স্বভাব। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আনসারের বক্তৃতায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে মার্ক্সবাদীদের উক্তি ও উপলব্ধি। আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, রাশিয়া—যেখানেই গণ–আন্দোলনের জোয়ার বয়েছে, সেখান থেকেই নজরুল আহরণ করেছেন দরকারি শক্তি। তিনি আদতে যে ধরনের জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, সেই চেতনায় মার্ক্সবাদ প্রতিরোধের শক্তি জুগিয়েছে।
নজরুলের রাজনীতি তাঁর সাহিত্যচিন্তাকেও নিয়ে এসেছে প্রতিরোধের আঙিনায়। এ কারণে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় এক অভিভাষণে তিনি উপস্থাপন করেছেন ‘জনসাহিত্যে’র প্রস্তাব। সেখানেও তাঁর মুখ্য লক্ষ্য জনগণ। নজরুলের ভাষ্যে, ‘জনসাহিত্যের উদ্দেশ্য হল জনগণের জন্য মতবাদ সৃষ্টি করা এবং তাদের জন্য রসের পরিবেশন করা।’ কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জনসাহিত্যের জন্য জনগণের সাথে যোগ থাকা চাই।’ জনতা ও সাহিত্যের মিতালি পাতানোর আহ্বান নজরুলের গণমুখী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষারই একটি প্রকাশ।
তবু একালের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, নজরুলের রাজনীতির যে ধরন আমরা দেখি, সে ধারার রাজনীতি কি আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি? বিগত ১০০ বছরে আমরা কি অতখানি প্রস্তুত হয়েছি? ক্ষমতার কুক্ষীকরণ, আমলাতন্ত্র কিংবা অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো প্রস্তুতি কি আমাদের আছে? জবাব খানিকটা হতাশার।
অনেকেই অভিযোগ করেন. নজরুলের রাজনীতি ভাবালুতায় আচ্ছন্ন; আবেগের আতিশয্যে মতাদর্শ পরিচ্ছন্ন কোনো কাঠামো পায়নি। এই অভিযোগের যাঁরা উদ্গাতা তাঁদের প্রত্যাশা অতি উচ্চ। তাঁরা হয়তো কবির কাছে প্রত্যাশা করছেন মতাদর্শ-খচিত ইশতেহার—রাজনৈতিক দল ও নেতারা যেমন দেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাঁরা নজরুলের ভাবালুতা নিয়ে উচ্চকিত হলেও জাতীয়তাবাদীদের ভাবালুতা প্রসঙ্গে প্রায়শই নীরব। সত্যিকার অর্থে, আবেগ ছাড়া রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ও সক্রিয়তা সংগঠিতই হয় না। নজরুলের আবেগ তাই সমস্যাজনক নয়। বাংলা অঞ্চলের জাতীয়তাবাদীরা মোটা দাগে ভাবালুতাকেই রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করেছেন। এর তুলনায় নজরুল-প্রচারিত শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহার অনেক বেশি স্পষ্ট ও লক্ষ্যভেদী।
তবু একালের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, নজরুলের রাজনীতির যে ধরন আমরা দেখি, সে ধারার রাজনীতি কি আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি? বিগত ১০০ বছরে আমরা কি অতখানি প্রস্তুত হয়েছি? ক্ষমতার কুক্ষীকরণ, আমলাতন্ত্র কিংবা অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো প্রস্তুতি কি আমাদের আছে? জবাব খানিকটা হতাশার। কেননা ইতিহাসের উল্টো দিকে হাঁটার প্রবণতা নজরে পড়ছে। যে ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে নজরুল সরব হয়ে উঠেছিলেন সেই ধর্মতন্ত্রের দিকেই ধাবিত হয়েছে বাংলাদেশের কোনো কোনো গোষ্ঠী; যে বিপ্লবী রাজনীতি ছিল নজরুলের মৌল উপাদান, সেই বিপ্লবী রাজনীতিই আজ ‘কমিউনিস্ট’ বলে প্রত্যাখ্যাত; নজরুল যে অন্তর্ভুক্তি ও সহনশীলতার কথা বারবার উচ্চারণ করেছেন সেই মরমিচিহ্নও আজ লোপাটের পথে; নজরুলের অপছন্দের অভিজাততন্ত্র ও আমলাতন্ত্র এখনো ঐতিহাসিকভাবে সমাসীন। অথচ ‘জাতীয় কবি’ বলে নজরুলকে নিয়ে আমাদের অহমিকার অন্ত নেই। কার্যত ভাবাদর্শিকভাবে এক অব্যবহৃত নজরুলকে আমরা দেখতে পাই। নিজেদের রাজনীতির সুবিধার পরিমাপে কাটছাঁট করা নজরুলকে তুলে ধরতেই আমরা বিশেষ আগ্রহী।
হয়তো তাই নজরুলের রচনাবলি তীব্র ঠাট্টা হেনে বলে, ‘চাকুরীর মোহ, পদবির নেশা, টাইটেলের বা টাই ও টেলের মায়া যদি বিসর্জন না করিতে পারি, তবে আমাদের সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার আশা সুদূরপরাহত।’ এসব নেশার ঘোর এ দেশে এখনো অবিচল। তাই আমাদের সংঘচেতনায় বড় ঘাটতি; সংঘ যেখানে অনুপস্থিত, দেশও সেখানে ভগ্নস্তূপে মলিন। চলমান সময়ের এই পরিপ্রেক্ষিত যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নজরুলের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও অনেকখানিই বিরাজমান—হোক তা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সম্পর্ক বিবেচনায় কিংবা দেশ গঠন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।