প্রথমত, বাংলাদেশে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হওয়ার পেছনে তেমন কোনো উদ্দেশ্য দেখা যায় না। কেন একটি পত্রিকা বের করব? কী কী উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটি করব? অনেকের কাছ থেকে এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলে না। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের এই উদ্দেশ্য ছিল। কণ্ঠস্বরের ধারণা অন্য সব পত্রিকার মতো ছিল না। তাঁদের ছিল ‘আধুনিক’ সাহিত্যান্দোলন–সম্পর্কিত একটি নির্দিষ্ট মেনিফেস্টো। সেই মেনিফেস্টোকে ঘিরেই সাহিত্য রচিত হয়েছে। ছাপানো হয়েছে পত্রিকায়। পত্রিকা লোকজনের কাছে বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি এ পত্রিকায় অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা বাতিলও করে দেওয়া হয়েছে সাহিত্যাদর্শের মিল না থাকায়।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ কেবল একটি পত্রিকা নয়, একটি বৃহৎ আন্দোলনের সূতিকাগার। এই পত্রিকার সারথি হিসেবে, পত্রিকার সাহিত্যাদর্শ আর সাহিত্য-উদ্দেশ্যের নির্মাতা হিসেবে, সাংগঠনিক কাজকর্মের সম্পাদক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিষ্ঠার সঙ্গে যে পরিশ্রম করেছেন, তা বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিকভাবে এ আন্দোলনকে বৃহৎ রূপ প্রদানের জন্য বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই তিনি এখন বেশি পরিচিত। কিন্তু এর বাইরে তিনি যে বাংলাদেশের ‘আধুনিক’ সাহিত্যের প্রতিষ্ঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আজকাল একটু কমই প্রচারিত। এই নির্দিষ্ট সাহিত্য-আন্দোলন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এর মেনিফেস্টো তৈরি আর সাংগঠনিক তৎপরতা—এই দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের। আত্মজৈবনিক বই ‘ভালোবাসার সাম্পান’-এ এই বিষয়ে তিনি বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশের ষাটের ‘আধুনিক’ সাহিত্য আন্দোলনকে নানাভাবে নাকচ করে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে নগরায়ণের প্রশ্নে আর উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের পদ্ধতির বিষয়ে। এ আলাপের সঙ্গে একমত পোষণ করলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিতটাই ভেঙে পড়বে। কারণ, কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে আধুনিক সাহিত্য-যুগের সূচনা হয়েছে, এ যুগের পাটাতনটি সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থার সংকটও সাহিত্য-আন্দোলনগুলোতে অহরহ দেখা যায়।

default-image

কলকাতায় উনিশ শতকে ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উদারনৈতিক আর মানবতাবাদী চিন্তাকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারাকে ‘ভারতী’র মতো পত্রিকা প্রকাশের ভেতর দিয়ে করেছিলেন আরও শক্তিশালী। আর এই শক্তিশালী ধারাকে আঘাত করেছিল ‘কল্লোল’, ‘পরিচয়’ কিংবা ‘কবিতা’র মতো পত্রিকাগুলো। এই পত্রিকাগুলো কেবল এক একটি পত্রিকা নয়, এক একটি সাহিত্য-আন্দোলনের সূতিকাগার।

ঠিক একইভাবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ কেবল একটি পত্রিকা নয়, একটি বৃহৎ আন্দোলনের সূতিকাগার। এ পত্রিকার সারথি হিসেবে, পত্রিকার সাহিত্যাদর্শ আর সাহিত্য-উদ্দেশ্যের নির্মাতা হিসেবে, সাংগঠনিক কাজকর্মের সম্পাদক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিষ্ঠার সঙ্গে যে পরিশ্রম করেছেন, তা বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ষাটের দশকের সাহিত্যের ইতিহাস বিবেচনায় হয়ে উঠবেন আরও জরুরি।
আজ তাঁর জন্মদিন।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন