কৃষি সভ্যতার শেষ প্রান্তে শেখ মোহাম্মদ সুলতানের (এস এম সুলতান) সৃজনজগতের জন্ম। শিল্পবিপ্লব ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হওয়ার সময়পর্বে সুলতান উপস্থাপন করলেন এক ঐতিহাসিক সত্যের বয়ান। টেলস অব অ্যান আর্ট লাভার বইয়ের লেখক মারিও পালমা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘শিল্পবিপ্লব–পূর্ব বিশ্ব সম্পর্কে জানতে হলে সুলতানের ছবি দেখতে হবে।’ বাংলাদেশে ইতালির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গভীর আগ্রহে গিয়েছিলেন সুলতানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। বামপন্থী রাজনীতির সাবেক এই কর্মী চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশে থাকা সুলতানের সৃষ্টিকে সামনাসামনি দেখার অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে নিতে। মারিও পালমার উল্লেখ করা ‘শিল্পবিপ্লবে’র কারণে বদলে গেছে বিশ্বব্যবস্থা। এর কারণেই হয়েছে কৃষি সভ্যতার পতন কিংবা রূপান্তর। এ রকম পটভূমিতে সুলতান কৃষজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সমতার সমাজের প্রমাণ রেখেছেন সভ্যতার সর্বোচ্চ মাত্রার নিরিখে।
শিল্পবিপ্লব–পূর্ব বিশ্ব সম্পর্কে জানতে হলে সুলতানের ছবি দেখতে হবে।মারিও পালমা
ব্রিটিশ কলোনির ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক ও পশ্চিমা আধুনিকতার কাঠামোতে স্থানীয় আধুনিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ভারতবর্ষে। এমন এক সময়পর্ব ও পরিস্থিতির মধ্যে সুলতান হয়েছিলেন প্রসারিত। এই সময়পর্বের মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের জেরে তিনি দৃষ্টি দিয়েছেন কৃষি সভ্যতা ও কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতি। তাঁর এই শিল্পভাষার সঙ্গে ‘স্থানীয় আধুনিকতা’ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কৃষজ বাস্তবতার প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকার বাংলাদেশ পর্বে হয়েছে অনেক বেশি প্রকাশিত। এর আগে তিনি তৈরি হচ্ছেন কৃষজ জীবনের সাধারণ ভাষার কথা অসাধারণ করে বলতে।
বাংলায় কৃষিকাজ হচ্ছে তিন হাজার বছর ধরে। এই বাংলাতেই জন্ম নেওয়া সুলতান বিশ্বভ্রমণ শেষে নড়াইলে নিজ গ্রাম মাছিমদিয়ায় ফিরলেন গত শতকের পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝিতে।
১০ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মানুষ জানতে পারল, মাটিতে বীজ রোপণ করে গাছের জন্ম হয়। এই অভিজ্ঞতা চর্চার মধ্য দিয়ে কৃষিকাজ করতে মানুষ থাকতে শুরু করল একটি নির্দিষ্ট স্থানে। বাংলায় কৃষিকাজ হচ্ছে তিন হাজার বছর ধরে। এই বাংলাতেই জন্ম নেওয়া সুলতান বিশ্বভ্রমণ শেষে নড়াইলে নিজ গ্রাম মাছিমদিয়ায় ফিরলেন গত শতকের পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝিতে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় এই সমতল ভূমিতে যে জনপদ গড়ে উঠেছিল দীর্ঘদিনের পরিচর্যায়, তা একান্তভাবেই ছিল কৃষজ। মাটি-জল-মানুষের এমন অপূর্ব সৃজন আয়োজন থেকেই সৃষ্টি হয়েছে সুলতানের এক একটা চিত্রপট। তাঁর এমন অবস্থায় উত্তীর্ণ হতে জীবনে-যাপনে নিজের জন্যই তিনি তৈরি করেছিলেন এক জীবনধারা। সহজিয়া এই জীবনধারা ছিল তাঁর সাধনার পথ। ১৯৫১ সালে জলরঙে আঁকা ‘সাধক’ তাঁর সাধনার যাত্রার প্রাথমিক চিহ্ন। আশপাশের মানুষের চলমান জীবনে বাউল-ফকিরি ধারার একজন মানুষ বসে আছেন দর্শন লাভ করার অভিপ্রায়ে। জীবন থেকে পাওয়া এই উপলব্ধির কথাই আছে সুলতানের এ চিত্রে।
বাংলার কৃষজ বাস্তবতার মাধ্যমে যে জীবন গড়ে উঠেছিল, ব্রিটিশ কলোনিপর্বে ভূমি বণ্টনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাতে ছন্দপতন ঘটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রপাত বইয়ে রণজিৎ গুহ লিখছেন, ‘ভারতীয় কৃষি ও ভূসম্পত্তি সম্পর্কে নিতান্তই অনভিজ্ঞ এক বিদেশি রাষ্ট্রশক্তি রাজস্ব ও বাণিজ্যের স্বার্থে বন্দোবস্তটা বিজিত প্রজার ঘাড়ে চাপিয়েছে। তত্ত্বে ও ধারণায় তার পরিকল্পনা ইউরোপীয় আলোকযুগের আদর্শে গড়া, এতদ্দেশীয় চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই বললেই চলে।’ লেখক আরও জানাচ্ছেন, গত শতকের ত্রিশের দশকের শেষ দিকে মহামন্দায় গ্রামবাংলার কৃষিজীবন ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। ফসলের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের চাপে কৃষকের কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে চাষের জমি। সুলতানের শৈশবকালে এই দুর্দশায় পতিত হয়েছিলেন কৃষকেরা। এমন ঐতিহাসিক ঘটনা সুলতানের জীবনপর্ব ঘটে যাওয়ায় কৃষক ও কৃষজ সমাজে ভবিষ্যৎ বিদ্যমান আছে, সেটা নিশ্চয়ই ছিল তাঁর চেতনায়। বাংলাদেশ জন্মের পর সুলতান এই কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামোতে সভ্যতা সৃষ্টির ধারণা ও কৃষকের শক্তিকে হাজির করেন শিল্পবিপ্লব–পরবর্তী বিশ্বে।
সুলতানের শৈশবকালে গত শতকের ত্রিশের দশকের মহামন্দায় দুর্দশায় পতিত হয়েছিলেন কৃষকেরা। বাংলাদেশ জন্মের পর সুলতান এই কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামোতে সভ্যতা সৃষ্টির ধারণা ও কৃষকের শক্তিকে হাজির করেন শিল্পবিপ্লব–পরবর্তী বিশ্বে।
সুলতান তাঁর অতিবাহিত জীবনে চারপাশে যা দেখেছিলেন, তাই তিনি এঁকেছেন। তাঁর কল্পনার ধারণাটি শিল্পভাষার করণকৌশলে প্রতিভাত হয়। চিত্রপটের মধ্যে দৃশ্যের বিশালত্বের আবেদন তৈরি করাই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য। তবে নিছক ভূদৃশ্য কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আত্মস্থ করার চিত্রপট নয় এগুলো। বরং তাঁর আঁকা চিত্রপট আজকের সময়ে চিন্তার জগতে তৈরি করে এমন সব নিশানা, যা মানবসভ্যতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে নিঃসন্দেহে। সুলতানের কাছে তাঁর আঁকা পেশিবহুল মানুষ কোনো অতিরঞ্জিত করার মতো কোনো বিষয় নয়। তাঁর কাছে এসব মানুষের প্রকৃতিতে শ্রম ও ত্যাগের ফল অর্জন করার এক নিত্যসংগ্রাম। বিশাল পটে মানুষ তাঁর কাছে কোনো ক্ষুদ্রাকায় উপাদানও নয়। মানুষ তাঁর কাছে পরম্পরাময় জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার সূত্র। মানুষকে কেন্দ্র করে অথবা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদান অস্তিত্বের ভাষ্য। এর সঙ্গে প্রবলভাবে আছে সম্পর্ক-সমাজ প্রসঙ্গ। বিচ্ছিন্নতা নয়—সবকিছু নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাঁর সৃষ্টির ভিত্তি। এসবই সুলতানের সৃষ্টির মূলকথা। যদিও তাঁর এমন দর্শনে উপনীত হতে লেগেছে একটা দীর্ঘ সময়। নিজ জন্মস্থানে তাঁকে হতে হয়েছিল থিতু।
বিশ্বভ্রমণ শেষ নিজ গ্রামে ফেরার আগে তিনি দেখেছিলেন দুর্ভিক্ষ। গিয়েছিলেন কাশ্মীরে, মুগ্ধ হয়েছিলেন ভূদৃশ্য দেখে। উজ্জ্বল-বর্ণিল রঙে এঁকেছিলেন সেসব দৃশ্য। তাঁর শিল্পীজীবনের পরবর্তী পর্বে এত উজ্জ্বল রঙে এমন চিত্রপট আঁকেননি। দুর্ভিক্ষ নিয়ে চিত্র এঁকেছেন ১৯৪৪ সালে। যার প্রধান বিষয় মানুষের হাহাকার। মানুষের সঙ্গে মানুষ মিলে গেলেও এই হাহাকার—দুর্দশার শেষ হয় না। মানুষ যে বেঁচে থাকতে চায়—তার অস্তিত্বের কথা বলতে চায় সবাইকে—এই ছিল দুর্ভিক্ষ নিয়ে সুলতানের চিত্রের সারকথা।
এমন সব চিত্র এঁকে নিজ গ্রামে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে দীক্ষা লাভ করলেন সুলতান। বাংলাদেশ পর্বে যার পূর্ণতা লাভ করে। আঁকলেন ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’। নৈবেদ্য নিবেদন বইয়ে ডি ডি মল্লিক লিখলেন এ চিত্রকর্মটি প্রসঙ্গে সুলতান বলেছেন, ‘ছবিতে আমি দেখিয়েছি আদম মাটির কাছে এসেছেন। পেশিবহুল হাতে বৃক্ষরোপণ করছেন। আমি বোঝাতে চেষ্টা করছি আদম পুরো সভ্যতাকে রক্ষা করছেন।’ এভাবেই মাটির নানা রং এল তাঁর চিত্রপটে। মাটির রঙে সভ্যতার ধারণাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জগতের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মিলে গেলেন আজীবনের মতো। পেশিবহুল মানুষ আসলে তাঁর কাছে ছিল প্রতীক—তাঁর শিল্পভাষা তৈরির হাতিয়ার।
ধীরে ধীরে শক্তির রূপ ও পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই হাতিয়ারের কাজ। এই সিদ্ধি অর্জনের কারণে ১৯৮৬ সালে আঁকা ‘হত্যাযজ্ঞ’ ছবিতে চারপাশে মৃত মানুষের দেহগুলোর মাঝে চোখ বন্ধ করে বসে আছে এক ধ্যানমগ্ন মানুষ। এমন করে মানুষ আঁকার ইঙ্গিত বহুমাত্রিক, যা সৃষ্টি নিয়ে চিন্তার তরঙ্গকে করে নানাভাবে প্রবাহিত—অর্থপূর্ণ। হয়তো একদিন এই ধ্যান করা মানুষটি চোখ খুলে উঠে দাঁড়াবে—বিস্ময়ে দেখতে এই জগৎকে। তাই তাঁর কাছে সমতার ধারণা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেকোনো বিবেচনায়। নারী-পুরুষের বিভাজন নয়—মানুষই তাঁর কাছে প্রধান।
নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক ধারণায় শ্রমের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন ধারণা আছে প্রচলিত আছে বিদ্যাচর্চায়। এসব কোনো ধারণাকেই তোয়াক্কা করেননি সুলতান। বরং মানুষের জীবনে নানা শ্রমের অবদান দিয়ে যে জীবন চলে, এটাই সুলতান জানিয়েছেন স্পষ্ট করে। বরং সুলতান চেয়েছেন আরও বড় সত্যের মুখোমুখি হতে—মুখোমুখি করতে। সভ্যতা ছাড়িয়ে জগৎকে রক্ষা করতেই তিনি চেয়েছেন। কৃষি সভ্যতার ভিতই তাঁর কাছে জগৎকে রক্ষার উপায়। সুলতান বুঝেছিলেন, প্রকৃতি ও মানুষ সভ্যতার মাপকাঠি। সময় ও সভ্যতা বদলে গেলেও এই মাপকাঠি বদলায়নি। কৃষি সভ্যতার শেষ উত্তরসূরি এস এম সুলতান এই কথাই বলেছেন পরম মমতায়। সুলতানের দর্শন কখনো পুরোনো হয় না। সুলতানের জগৎ সব সময় বর্তমান—সব সময়ের।