জীবনের একটু আগুন চাই

মতিউর রহমানের একাধিক লেখায় ঘুরেফিরে উঠে এসেছে জহির রায়হানের প্রসঙ্গ। ১৯৭৮ সালের ২৫ জুন প্রকাশিত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সন্ধানীর জহির’, তারপর সাপ্তাহিক একতায় ১৯৮৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘জীবনে একটু আগুন চাই’ শিরোনামে এ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ প্রথমা থেকে ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘জহির রায়হান: অনুসন্ধান ও ভালোবাসা’ বইয়ে এ লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আজ জহির রায়হানের জন্মদিনে লেখাটি পাঠকের সামনে আবারও তুলে ধরা হলো।

জহির রায়হান (১৯ আগস্ট, ১৯৩৫—৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২), কাইয়ুম চৌধুরী, ১৯৮৮

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাস এগিয়ে আসতে থাকলেই লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, লেখক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান এবং গায়ক ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের কথা বড় বেশি করে মনে পড়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি যত এগিয়ে আসতে থাকে, তত বেশি করে তাঁদের কথা, তাঁদের সঙ্গে মেলামেশা এবং নানা সহযোগিতার কথা ভিড় করে মনের গভীরে। আসলে আমাদের মুক্তিসংগ্রামে এই তিন শহীদের জীবন ও তাঁদের সমস্ত কর্মকাণ্ডে মহান একুশে ফেব্রুয়ারির বড় বেশি উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই।

শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। জহির রায়হানের গল্প, উপন্যাস আর সিনেমায় বারবার ফিরে এসেছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। নিজেও ছিলেন এই আন্দোলনের প্রথম সারির বলিষ্ঠ একজন কর্মী। আলতাফ মাহমুদ শুধু ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুর রচয়িতাই নন, একুশের গান আর একুশের চেতনাকে হৃদয়ে লালন করে বছরের পর বছর ধরে তিনি আমাদের উদ্দীপ্ত করেছেন। আর কী আশ্চর্য, একই রকম দুঃখজনক করুণ পরিণতিই যেন অপেক্ষা করছিল মহান এই তিন শহীদের জীবনে। শহীদুল্লা কায়সারকে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের ঠিক আগে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আলবদর বাহিনী হত্যা করেছে। আলতাফ মাহমুদকে পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা নিষ্ঠুর নির্যাতন করে হত্যা করেছে। আর স্বাধীনতার পরপরই জহির রায়হান অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন। বহু বছর পর জানা যায়, মিরপুরে স্বাধীনতাবিরোধীদের গুলিতে তিনি শহীদ হন।

১৯৬৫ থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উপলক্ষে ওই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জন্য জহির রায়হানের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিকসহ নানা সাহায্য পেয়েছি। সত্তরের ডাকসু নির্বাচনের দিন সারা দিনের জন্য তাঁর মরিস অক্সফোর্ড গাড়িটি আমরা পেয়েছিলাম। ১৯৬৮ সালে ঢাকায় কৃষকদের বিরাট সমাবেশ ও মিছিলের জন্যও তিনি ভালো অর্থসাহায্য দিয়েছিলেন। ওই সমাবেশ ও মিছিলের শুটিং করেছিলেন তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ওই নেগেটিভগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ছবিতে ব্যবহার করতে পারেননি বলে কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।

জহির রায়হান

এ সময় জহির রায়হান তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির বিভিন্ন কাজে সাহায্য করেছেন নানাভাবে। তখন ওই সংগঠনের অন্যতম কর্ণধার ছিলেন অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সার। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ ছায়ানৃত্য অংশের ব্যাপারে জহির রায়হান সক্রিয় ছিলেন। তাঁর নির্দেশেই ছায়ানৃত্যের অংশটুকু মঞ্চায়নে সাহায্য করেছিলেন তাঁরই অন্যতম সহযোগী নুরুল হক বাচ্চু। আর এ উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ সংকলন তরঙ্গ-এর জন্য তিনি লিখেছিলেন সোভিয়েত চলচ্চিত্রের ওপর একটা অনবদ্য বড় নিবন্ধ।

১৯৬৮ সালে সোভিয়েত বিপ্লবের (অক্টোবর বিপ্লব) বার্ষিকীতে ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসের নাট্যরূপে সাহায্য ও মঞ্চায়নে ছিল জহির রায়হানের বিশেষ ভূমিকা। তাঁর সহযোগিতায় হাসান ইমামের পরিচালনায় ওই নাটকে অংশ নিয়েছিলেন নায়ক আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল, আলতাফ হোসেনসহ অনেকে। খান আতাউর রহমান ওই নাটকের রিহার্সালে এসেছিলেন দুই দিন। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে।

মনে পড়ে, একাত্তরের সেই ভয়াবহ পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যায় জহির রায়হানের সঙ্গে ওই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলাম। আমাদের পার্টি ওই সময় সশস্ত্র লড়াইয়ের কিছু প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে উত্সাহিত হয়েছিলেন তিনি এবং এর জন্য সব খরচ বহন করতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু ওই বৈঠক হতে পারেনি সংগত কারণেই। সেদিন রাতেই তো পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।

কলকাতায়, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলেন জহির রায়হান। তাঁর জন্য এটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, জহির ভাই তখন প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বহুমুখী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

জহির রায়হানের অতীত, আমাদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কথাগুলো তুলে আনলাম তাঁর সম্পর্কে একটা অন্য পরিচয় দেওয়ার জন্য। প্রথম জীবন থেকেই তিনি একজন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মানুষের কল্যাণের জন্য, মুক্তির লক্ষ্যে তিনি পথ সন্ধান করেছেন নিরন্তর। জহির রায়হানের প্রথমে কবিতায় এবং পরে গল্প, উপন্যাস ও সিনেমাতেও ছিল এই জীবন-অন্বেষা। আর সে জন্য তিনি বারবার ফিরে গেছেন বাংলাদেশের প্রথম সফল গণবিপ্লবের দিনগুলোতে, বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের কাছে। এটা দেখে এখনো অবাক হই যে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তিনি লিখেছিলেন বড় গল্প ‘সংলাপ’, যার পটভূমি ভাষা আন্দোলন। প্রায় একই সময়ে রচিত অনবদ্য তাঁর বড় গল্প বা উপন্যাস ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। সে সময়েই সেটা পড়ে আমরা অভিভূত হয়েছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র করার ইচ্ছা তাঁর ছিল সব সময়ই। এই রচনার উদ্দেশ্যও ছিল সেটা।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ তো আগেই বের হয়েছে। আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে জহির ভাইয়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ আমাদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। আজও মনে পড়ে, জহির ভাইয়ের উত্সাহে সে সময় তেজগাঁওয়ের এফডিসি স্টুডিওতে জীবন থেকে নেয়ার শুটিং দেখতে গিয়েছিলাম একাধিক দিন।

কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩) চলচ্চিত্রের সেরা পরিচালকের পুরস্কার হাতে জহির রায়হান। চলচ্চিত্রটি চারটি বিভাগে শ্রেষ্ঠসহ আটটি পুরস্কারে জয়ী হয়
ছবি: মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘জহির রায়হান অনুসন্ধান ও ভালোবাসা’ বই থেকে

জহির রায়হান শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। জীবনের অভিজ্ঞতার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন ‘আর কত দিন’-এ। আর তাঁর গভীর প্রশ্ন ছিল, সারা বিশ্বে আর কত দিন নির্যাতন, হত্যা আর ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া চলবে? আন্তর্জাতিকতাবাদের আদর্শ আর চিন্তার গভীর প্রতিফলন ছিল এতে। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে আর কত দিন, অর্থাৎ লেট দেয়ার বি লাইট নামে এর চলচ্চিত্রায়ণের প্রাথমিক কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি।

এখনো নতুন করে আর কত দিন পড়ে বিস্ময়ের শেষ হয় না। এই ছোট উপন্যাসটির প্রথম পৃষ্ঠা পড়েই চমকে উঠি। জহির রায়হান লিখেছেন, ‘অন্ধকারের নীচে সমাহিত মৃত নগরী। প্রাণহীন। যেন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত তার অবয়ব। দীর্ঘ প্রশস্ত পথগুলোতে কবরের শূন্যতা। ভাঙ্গা কাচের টুকরো। ইটের টুকরো। আর, মৃতদেহ। কুকুরের, বিড়ালের, পাখির আর মানুষের। একটা, দুটো, তিনটে, অগণিত। জীবনের স্পন্দনহীন নগরী শুধু এক শব্দের তাণ্ডবের হাতে বন্দী।’ এ যেন একাত্তরের ঢাকা শহরেরই দৃশ্য। কী বিস্ময়, একাত্তরের দিনগুলোর অনেক আগেই এ দৃশ্য ভাবতে পেরেছিলেন জহির রায়হান!

জহির রায়হান আরও লিখেছেন সেই একাত্তরের দিনগুলোর আগেই, ‘আর কত দিন’-এর নায়ক ‘তপু মরে পড়ে আছে রাস্তার উপরে উপুড় হয়ে। তপুর মৃতদেহ একটা গাছের সঙ্গে ঝুলছে। ঘরের ভেতরে চিত হয়ে পড়ে আছে তপু। চারপাশে রক্তের স্রোত বইছে। তপুকে ওরা ঘরের কড়িকাঠের সঙ্গে ঝুলিয়ে মেরেছে। তপুর মৃতদেহটা ওরা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। তপু মরে পড়ে আছে একটা নর্দমার ভেতর।’ আমরা তো জানি, একাত্তরের ৯ মাসের স্বাধীনতাসংগ্রামে তপুর মতো করেই আমাদের কত মুক্তিযোদ্ধাকে এ রকম নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে! শহীদ হয়েছেন কত সাধারণ নাগরিক!

‘আর কত দিন’-এর নায়ক তপুকে আমরা দেখতে পাই জহির রায়হানের ‘একুশের গল্প’তেও। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তপু কপালে মিলিটারির গুলিতে নিহত হয়। তপুর মৃত্যুর কয়েক বছর পর মেডিকেল কলেজে তার বন্ধুরা হোস্টেলের ঘরে চৌকির নিচে রাখা ঝুড়ি থেকে যে ‘স্কালটা’ (মাথার খুলি) নিয়ে পড়ছিল, সেটার মাঝখানটায় গর্ত ছিল। বন্ধুরা আবিষ্কার করল, স্কালটাসহ হাড়গোড়গুলো সব তপুর। গল্পটি ১৯৫৪ সালে ডি এ রশিদ সম্পাদিত একুশের সংকলন-এ ছাপা হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে আমরা জহির রায়হানকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও গল্প দিতে না পেরে বলেছিলেন ওই একুশের গল্পটি ছাপাতে। ওই বছরের ছাত্র ইউনিয়নের সংকলন অরণিতে গল্পটি ছাপা হলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। সেই তপু আবার ফিরে আসে ‘আর কত দিন’-এর নায়ক হয়ে। অথচ স্বাধীনতার পর অগ্রজকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হানই তো আরেক তপু হয়ে যান!

জহির রায়হানের জন্ম ১৯৩৫ সালে। ১৯৫০ সালে নোয়াখালীর স্থানীয় আমিরাবাদ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা এবং ১৯৫৩ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। কিছুদিন মেডিকেল কলেজে পড়ে সেটা বাদ দিয়ে ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ অনার্স পাস করেন। এমএতে ভর্তি হলেও শেষ আর করেননি। এর মধ্যেই ১৯৫৬ সালে বিখ্যাত উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সাবেরা’র পরিচালক এ জে কারদারের সঙ্গে পরিচয় হলে ওই ছবির সহপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর কিছুদিন সালাহউদ্দিন ও এহতেশামের সঙ্গে কাজ করে ১৯৬১ সালে জহির রায়হান প্রথম ছবি ‘কখনো আসেনি’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেন।

জহির রায়হান

ষাটের দশকের শুরু থেকে এক দশকের মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক ছবিসহ ১০টি ছবি পরিচালনা করেন তিনি। প্রযোজনা করেন আটটি ছবি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরিচালনা করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’ আর ‘বার্থ অব নেশন’ নামে দুটি প্রামাণ্যচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই আরও দুটি ছবি ‘লিবারেশন ফাইটারস’ ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ প্রযোজনা করেছিলেন।

জহির রায়হানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে, কলকাতার প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা ‘নতুন সাহিত্য’-এ। এর আগেই কমিউনিস্ট পার্টির কাজের সঙ্গে যুক্ত হন অগ্রজের প্রভাবে। পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসেবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলের প্রথম দশজনের মধ্যে একজন হয়ে প্রথম কারাবরণ করেন তিনি। এরপর রাজনৈতিক কারণে আরও তিনবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪৯ সালে জহির রায়হান কবিতা লিখে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলেও পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে গল্প আর উপন্যাস লিখেছেন। ছোট-বড় মিলিয়ে সাতটি উপন্যাস তাঁর। সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’। জহির রায়হানের গল্পসমগ্রসহ গল্পগ্রন্থ দুটি। প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ আর বড় গল্প একুশে ফেব্রুয়ারী (ডানা প্রকাশনী) ছাড়া সব বই প্রথম প্রকাশ করেন তাঁর বিশেষ বন্ধু গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ। এ বইগুলোর গভীর অর্থবহ প্রচ্ছদ ও সমগ্র অঙ্গসজ্জার দায়িত্ব পালন করেছেন জহির রায়হানের আরেক প্রিয় বন্ধু শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। কোনো ব্যবসায়িক বা কমার্শিয়াল কাজ হিসেবে নয়, প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, ভালোবাসার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে ‘থ্রি কমরেডস’-এর এই সব মহৎ উদ্যোগ।

পঞ্চাশের দশকে ‘যাত্রিক’ আর ‘প্রবাহ’ নামে মাসিক ও সাপ্তাহিক দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন জহির রায়হান। আর ১৯৭০ সালে তাঁর সব বন্ধুকে নিয়ে ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘এক্সপ্রেস’ প্রকাশ করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এর আগে, বলা যায় জীবনের শুরুতে, কাইয়ুম চৌধুরীকে নিয়ে আলফাবিটা নামে একটা প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন জহির রায়হান। সেটা এগোয়নি।

জহির রায়হান
ছবি: সংগৃহীত

অগ্রজ ‘কায়সার’-এর মতো কমিউনিস্ট পার্টিতে তাঁর পরিচয় ছিল ‘রায়হান’ বলে। পরে পারিবারিক নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ নয়, জহির রায়হান নামেই তিনি পরিচিত এবং খ্যাতনামা হয়ে ওঠেন। শুধু নামের সূত্রেই নয়, তাঁর সমগ্র জীবনের বহুমুখী বিপুল কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে, তিনি মানবমুক্তির আদর্শে আস্থাশীল ছিলেন আজীবন। শিল্পীর প্রগতিকামী সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। জহির রায়হানের জীবনের কোনো কোনো পর্ব, বিশেষ করে তাঁর কিছু ব্যবসায়িক ছবি বা তাঁর ব্যক্তিজীবনের কোনো কোনো ঘটনা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে চূড়ান্ত বিচার করা যায় না।

আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে যখন দ্বিধা-সংশয়ের শেষ নেই, যখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে অরুচি আর জীবনবিমুখতা, তখন জীবনের একটু আগুনের জন্য জহির রায়হানের কাছেই বারবার ফিরে যেতে হয় আমাদের। সে জন্যই ভাবীকালের মানবকল্যাণমুখী একটা সমাজেই তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন হবে এবং সুকীর্তিগুলো পূর্ণ স্বীকৃতি পাবে। আর নিশ্চয়ই কোনো সাহসী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের পরম আকাঙ্ক্ষানুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারী ও লেট দেয়ার বি লাইট (আর কত দিন) রূপায়ণে এগিয়ে আসবেন, যা আমাদের ‘আরেক ফাল্গুন’-এ পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। জহির ভাইয়ের কথা মনে হলেই তাঁর সেই প্রথম জীবনের কবিতাটির কথা মনে হয়:

ওদের জানিয়ে দাও,

ওরা আমাদের ভাই বোনকে

কুকুর বিড়ালের মত মেরেছে।

ওদের স্টীম রোলারের নীচে...

ওদের জানিয়ে দাও।

ওরা দেখেও যদি না দেখে বুঝেও যদি না বোঝে,

আগুনের গরম শলাকা দুচোখে দিয়ে

ওদের জানিয়ে দাও,

মরা মানুষগুলোতে কেমন জীবন এসেছে!

সত্যি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ‘মরা মানুষগুলো’ও জীবন ফিরে পেয়েছিল। আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম।

আজও তাঁকে স্পষ্ট দেখি, ১৯৭২ সালের জানুয়ারির কোনো এক দিন সকালে পিজি হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে জহির রায়হান নামছেন, আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। তিনি হাত তুলে বললেন, ‘কেমন আছেন, কথা আছে, আসবেন।’ আমি বললাম, আসব, কথা হবে। জহির ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হলো না, তাঁর সঙ্গে আর কোনো কথা হলো না।