প্রতিবছর ১২ জুলাই আমরা উদ্যাপন করি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদার জন্মবার্ষিকী। প্রায় সোয়া শ বছর আগে অত্যন্ত অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে জন্ম নেওয়া নেরুদা রেখে গেছেন এমন এক সাহিত্যিক উত্তরাধিকার, যা আজও অমলিন। তাঁর গভীর আবেগময় ও উচ্ছ্বাসে ভরা কবিতা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাঠকের হৃদয় জয় করেছে। তাঁর বাণী সমকালীন বিশ্বে আজও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে; কারণ, এতে সর্বজনীন মানবিক আবেগ, উজ্জ্বল চিত্রকল্প এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি অটল অঙ্গীকার একত্র হয়েছে। তাঁর সাহিত্য একই সঙ্গে কালজয়ী এবং রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ হাতিয়ারতুল্য। আজ তাঁর ১২২তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেই কিংবদন্তি কবিকে, যাঁর প্রভাব সীমান্ত ও প্রজন্ম অতিক্রম করেছে।
নেরুদা ভালোবাসতেন প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর কবিতা ‘মাটি, বৃষ্টি আর ফলকে ধারণ করে’। তবে তিনি শহরের উদ্দীপনা, ব্যস্ত বাজারের গানবাজনাকেও ভালোবাসতেন। তাঁর দেশ চিলির সরকার তাঁকে নিপীড়ন করেছিল, কিন্তু তারপরও আজীবন তিনি স্বদেশের জনগণের সঙ্গ ছাড়েননি। তাঁর জীবনের আদর্শ নায়ক মার্কিন কথাশিল্পী ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতো নেরুদাও বৈপরীত্যকে আলিঙ্গন করেছিলেন। তাঁর সমৃদ্ধ জীবন শুধু অসংখ্য কবিতা নয়, অনেক সংবাদ প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, একটি উপন্যাস, একটি নাটক আর আত্মজীবনীও উপহার দিয়েছে।
নেরুদার অনুবাদের পরিসর রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতা থেকে শুরু করে শেক্সপিয়ারের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর সর্বদা উন্মুক্ত বাড়ি বিংশ শতাব্দীর বহু শিল্পীকে স্বাগত জানিয়েছে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন অক্তাভিও পাজ, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, নাজিম হিকমত, মেহিকান চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরা ও স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো। নেরুদা ছিলেন এমন এক কবি, যাঁকে হাজারো ছাত্র, শ্রমিক, প্রেমিক-প্রেমিকা, কৃষক, এমনকি সৈনিক আর পুলিশ সদস্যরাও ভালোবাসতেন।
একাডেমিক তত্ত্ব এড়িয়ে গিয়ে নেরুদা নিজের কবিতার সরল ভাষাকে দেখেছিলেন যৌবনের ‘বিশুদ্ধ কবিতা’ থেকে এক বিবর্তন হিসেবে। তিনি উপভোগ করতেন দৈনন্দিন জীবনের কবিতার ‘অশুদ্ধতা’:
‘যেন হাতের শ্রমে অ্যাসিডে ক্ষয় হয়ে গেছে,
ঘাম ও ধোঁয়ায় ভিজে আছে,
লিলি ও প্রস্রাবের গন্ধে মিশে আছে,
আমাদের বৈধ বা অবৈধ কাজের বৈচিত্র্যে ছিটকে পড়েছে।’
নেরুদা কবিতা লিখতেন সবুজ কালি দিয়ে, যেটাকে তিনি বলতেন ‘আশার রং’।
পাবলো নেরুদার জন্ম ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই চিলির পাররাল শহরে। তাঁর আসল নাম রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেয়েস বাসোয়ালতো। জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর মা রোসা নেফতালি বাসোয়ালতো দে রেয়েস মারা যান। তাঁর বাবা হোসে দে কারমেন রেয়েস মোরালেস তাঁকে নিয়ে তেমুকোতে চলে যান এবং সেখানে ত্রিনিদাদ কান্দিয়া নামের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। সৎমা হলেও এই ভদ্রমহিলাই অসুস্থ দুধের শিশু নেফতালিকে লালন করেছিলেন এবং তাঁকেই নেরুদা নিজের প্রথম কবিতা উৎসর্গ করেছিলেন। সৎমার পূর্ববিবাহজাত পুত্র অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হাফ-ব্রাদার’ সেই রোদল্ফো আর প্রিয় সঙ্গিনী ‘লোরিতা’র সঙ্গে নেফতালি বেড়ে ওঠেন উপকূলীয় পর্বতমালার কঠোর অথচ সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে। এ অঞ্চলের শ্রেণিবৈষম্য তাঁর মনে ছাপ ফেলেছিল। রেলওয়ের মালবাহী ট্রেনের কন্ডাক্টর তাঁর বাবা পুত্রের শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে অনুমোদন দেননি।
বৃহত্তর পৃথিবী থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও, নেফতালি আশ্রয় খুঁজে পান গ্রন্থাগারে। ধীরে ধীরে তিনি ভিক্টর হুগো, শার্ল বোদলেয়র, ওয়াল্ট হুইটম্যান এবং আরও অনেক প্রভাবশালী কবি ও কথাসাহিত্যিকের অভিনিবিষ্ট পাঠক হয়ে ওঠেন। কিশোর বয়সে নেফতালি স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখতেন। কবিতা প্রকাশ শুরু করার পর তিনি গ্রহণ করেন নতুন নাম ‘পাবলো নেরুদা’। এটা ছিল বাবার প্রভাববলয় থেকে মুক্তির ঘোষণা। অধিকাংশের বিশ্বাস যে তিনি নামটা বানিয়েছিলেন ইতালীয় কবিতায় জনপ্রিয় চরিত্র ‘পাওলো’ এবং নিজের প্রিয় চেক লেখক জান নেরুদার পদবি মিলিয়ে।
লোরকার সঙ্গে নেরুদার পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ১৯৩৩ সালে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৩৬-৩৯) স্পেনের স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থকদের হাতে লোরকার হত্যাকাণ্ড নেরুদার কমিউনিস্ট অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। রেসিদেন্সিয়ার পরবর্তী সময়ে লেখা ‘কান্সিওন আ স্তালিনগ্রাদো’ (স্তালিনগ্রাদের জন্য গান), ‘তিনা মোদোতি আ ফায়েসিদো’ (তিনা মোদোতি মারা গেছে) প্রভৃতি কবিতা পরিপার্শ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে কবির ক্রমবর্ধমান সচেতনতার প্রতিফলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণের জন্য নেরুদা চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে চলে যান। সেখানে তিনি আরও অনেকের সঙ্গে মিলে বোহেমিয়ান জীবনযাপন শুরু করেন। হাতাহীন কালো কোট আর চওড়া টুপি ছিল তাঁর স্বাতন্ত্র্যজ্ঞাপক পোশাক। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নেরুদা নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে প্রকাশ করেন তাঁর কবিতার প্রথম বই ক্রেপুস্কুলারিও (গোধূলিবেলার কাব্য)। বইটার কবিতাগুলোয় ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়র ও অন্য প্রতীকবাদী কবিদের নান্দনিকতার ছাপ ছিল। প্রথম বইটি আশ্চর্যজনকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও, এটা থেকে কবি-প্রকাশকের খুব বেশি আয় হয়নি। কয়েক বছর ফরাসি ভাষা পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহের সংগ্রামের পর নেরুদা কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে নিয়োগ পান বার্মার (মিয়ানমারের) রেঙ্গুনে (ইয়াঙ্গুনে) অনারারি কনসাল পদে। শুরু হয় তাঁর প্রথম প্রবাসজীবন।
১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয় নেরুদার দ্বিতীয় বই ভেইন্তে পোয়েমাস দে আমর ফেতা উনা কান্সিওন দেসেসপেরাদা (কুড়িটি প্রেমের কবিতা এবং একটি হতাশার গান)। এ বই তাঁকে তৈরি করে দেয় বিপুলায়তন ও উচ্ছ্বসিত এক পাঠকগোষ্ঠী। বইটার ‘আমি চাই তুমি স্থির থাকো’, ‘আজ রাতে আমি লিখতে পারি’ ইত্যাদি কবিতা তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা ও সাহিত্য সমালোচকদের হৃদয়ে নেরুদার আসনকে স্থায়ী করে দেয়। সমালোচকেরা তাঁর স্বরভঙ্গির ভারসাম্যের প্রশংসা করে লিখেছিলেন: ‘এখানে শোকাতুর প্রাপ্তবয়স্কের কণ্ঠস্বর ও মুগ্ধ শিশুর বিস্ময় একত্র হয়েছে।’
পাবলো নেরুদার কবিতার নারীরা সন্তপ্রতিম পুরুষ বক্তা আর প্রাকৃতিক আনন্দময় মহাবিশ্বের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। যখন তাঁকে তাঁর কবিতার প্রেরণাদাত্রীদের নাম জানতে চাওয়া হতো, নেরুদা লাজুক ভঙ্গিতে বলতেন, ‘মারিসোল আর মারিসোম্ব্রা: সাগর আর সূর্য, সাগর আর ছায়া’। মারিসোল হলো মোহময় গ্রামাঞ্চলের প্রেম, তেমুকোর ভেজা আকাশের মতো কালো চোখ। মারিসোম্ব্রা শহরের ছাত্রী—মাথায় ধূসর বেরে টুপি, বড় নরম চাউনি। কবির জীবনে তাঁর কবিতার এসব চরিত্রের বাস্তব প্রতিরূপ ছিল, যাঁদের সঙ্গে তিনি একাধিক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
সিলোন (শ্রীলঙ্কা), জাভা (ইন্দোনেশিয়া) ও সিঙ্গাপুরে কনসাল হিসেবে থাকার সময় নেরুদা লিখেছিলেন রেসিদেন্সিয়া এন লা তিয়েরা (পৃথিবীতে বসবাস)-এর প্রথম কবিতাগুলো। কবির মতে, শিরোনামটি নির্দেশ করে, ভাষায় তাঁর বসতিকে, নিজের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করে তিনি যেন বিদেশেও স্বদেশ চিলির মাটির স্বাদ গ্রহণ করছেন। ইংরেজিভাষী উপনিবেশিকদের পরিবেষ্টনে, কাগুজে কাজকর্মের বোঝায় ক্লান্ত কবি তখন এক বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত হয়েছিলেন। রেসিদেন্সিয়ার তিনটি খণ্ড লেখা হয় ১৯২৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত দুই দশকের বেশি বিস্তৃত সময়কালে। এগুলোতে রয়েছে নেরুদার সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অতিবাস্তব রচনাগুলো যেমন ‘ওয়াকিং অ্যারাউন্ড’ (ঘুরে বেড়ানো), ‘আর্স পোয়েতিকা’ (কাব্যকলা), ‘ওদা কন উন লামেন্তো’ (একটি বিলাপগাথা), ‘আগুয়া সেক্সুয়াল’ (যৌনজল) এবং ‘ওদা আ ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা’ (ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জন্য কাব্যগাথা)। লোরকার সঙ্গে নেরুদার পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ১৯৩৩ সালে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৩৬-৩৯) স্পেনের স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থকদের হাতে লোরকার হত্যাকাণ্ড নেরুদার কমিউনিস্ট অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। রেসিদেন্সিয়ার পরবর্তী সময়ে লেখা ‘কান্সিওন আ স্তালিনগ্রাদো’ (স্তালিনগ্রাদের জন্য গান), ‘তিনা মোদোতি আ ফায়েসিদো’ (তিনা মোদোতি মারা গেছে) প্রভৃতি কবিতা পরিপার্শ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে কবির ক্রমবর্ধমান সচেতনতার প্রতিফলন।
নেরুদার প্রেমজীবন ছিল অস্থির আর কখনো কখনো করুণও বটে। বহু বছর আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার ফোগেলসাং তাঁদের কন্যা মালভা মারিনার জন্ম দেন। শিশুকালেই মেয়েটির হাইড্রোএনসেফালাইটিস রোগ শনাক্ত করা হয়। এ অবস্থাতেই তার মা–বাবা আলাদা হয়ে যান। কারণ, নেরুদা ইতিমধ্যেই তাঁর হবু দ্বিতীয় স্ত্রী দেল কারিলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কবির একমাত্র সন্তান মালভা মারিনা রোগে ভুগে মারা যায় মাত্র আট বছর বয়সে জার্মান অধিকৃত হল্যান্ডে।
১৯৩৯। নেরুদা কনসাল হিসেবে পারিতে (প্যারিসে) বদলি হন। এ সময় তাঁর এক অসাধারণ কূটনৈতিক সাফল্যে প্রায় দুই হাজার স্প্যানিশ শরণার্থীর সমুদ্রপথে চিলিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন ফ্রাঙ্কোবিরোধী প্রজাতন্ত্রী। এ সময় তিনি তাঁদের জন্যই শুরু করেন তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী গ্রন্থ কান্তো হেনেরাল (সাধারণ গান) রচনার কাজ। এতে কবির নিজের ভূমিকে নিবেদিত কবিতা রয়েছে; যেমন ‘আমর আমেরিকা’ (ভালোবাসা আমেরিকা), ‘লাস আলতুরাস দে মাচুপিচু’ (মাচুপিচুর উচ্চতা) প্রভৃতি। শেষোক্ত কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৪৩ সালে পেরুর ইনকা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ মাচুপিচু ভ্রমণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।
১৯৪৫ সালে নেরুদা চিলির জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এবং সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি খনি অঞ্চলের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতেন। কিন্তু শিগগিরই প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল গনসালেস ভিদেলার সঙ্গে তাঁর সংঘাত বেধে যায়। ধর্মঘটরত শ্রমিকদের দমন করতে রাষ্ট্রপতি ভিদেলা বল প্রয়োগ করেছিলেন। এতে নেরুদা তাঁর কান্তোতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোং’, ‘ইউনাইটেড ফ্রুট কোং’ প্রভৃতি কবিতা। ১৯৪৮ সালে চিলির সিনেটে দেওয়া এক জ্বালাময় বক্তৃতায় তাঁর দেশের পিসাগুয়া কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অভিযোগ ছাড়াই আটক ৬২৮ জনের নাম প্রকাশ করেন। বক্তৃতাটি পরে ‘ইয়ো আকুস’ (আমি অভিযোগ করছি) শিরোনামে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। এ বক্তৃতার পর নেরুদার সিনেট সদস্যপদ বাতিল করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ভিদেলা। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য সমর্থকেরা তাঁকে গোপনে আর্জেন্টিনায় নিয়ে যান। এরপর শুরু হয় তাঁর ইউরোপ, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ। ১৯৫০ সালে তাঁর মহাকাব্যিক কাব্যগ্রন্থ কান্তো হেনেরাল প্রকাশিত হলে নেরুদা বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠেন রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত ও উচ্ছ্বসিত স্তালিনপন্থী কবি হিসেবে।
১৯৫২ সালে সীমিত সংস্করণে প্রকাশিত হয় লোস ভের্সেস দেল কাপিতান (অধিনায়কের কাব্য)। বইটিতে কবির নাম গোপন রাখা হয়েছিল, কিন্তু নেরুদার দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাঁর লেখার দীর্ঘদিনের সম্পাদক ও পরিমার্জক দেলিয়া দেল কারিল তাঁর লেখার শৈলী চিনে ফেলেন। নেরুদার সঙ্গে তখন অবশ্য মাতিলদা উররুতিয়া নামের আরেক নারীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এই নারীই ছিলেন ভের্সেস দেল কাপিতান-এর কবিতাগুলো রচনার পেছনকার অনুপ্রেরণা। ১৯৫৯ সালে তিনি মাতিলদার সঙ্গে তাঁর প্রেমের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন সিয়েন সনেতোস দে আমর (প্রেমের শত চতুর্দশপদী) প্রকাশের মাধ্যমে। নেরুদা একসময় তাঁকে বিয়ে করেন তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে।
নেরুদার প্রেমজীবন ছিল অস্থির আর কখনো কখনো করুণও বটে। বহু বছর আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার ফোগেলসাং তাঁদের কন্যা মালভা মারিনার জন্ম দেন। শিশুকালেই মেয়েটির হাইড্রোএনসেফালাইটিস রোগ শনাক্ত করা হয়। এ অবস্থাতেই তার মা–বাবা আলাদা হয়ে যান। কারণ, নেরুদা ইতিমধ্যেই তাঁর হবু দ্বিতীয় স্ত্রী দেল কারিলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কবির একমাত্র সন্তান মালভা মারিনা রোগে ভুগে মারা যায় মাত্র আট বছর বয়সে জার্মান অধিকৃত হল্যান্ডে।
এমন সব দুঃখের সময়েও নেরুদা সান্ত্বনা খুঁজে পেতেন প্রকৃতি ও সাধারণ জিনিসের মধ্যে। তিনি পাথর, শামুকের খোল, জলে ভাসতে থাকা বিভিন্ন জিনিস আর কাঠের জাহাজের অংশ সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এসব জিনিস তিনি তাঁর প্রিয় বাড়িগুলোয় প্রদর্শন করতেন। চিলি থেকে পালানোর সময় তাঁর ছদ্মবেশগুলোর একটা ছিল পক্ষীবিদ হিসেবে। আসলেই তিনি স্থানীয় পাখিদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে নেরুদা প্রকাশ করেন ওদাস এলেমেন্তালেস (মৌলিক গাথাবলি)। সাধারণ জিনিসপত্র নিয়ে, সাধারণ মানুষের ভাষায় রচিত হয়েছে এ বইয়ের কবিতাগুলো। এ বইয়ের ‘ওদা আ উনা কাস্তানিয়া কাইদা’ (ভূলুণ্ঠিত চেস্টনাটের জন্য গাথা) ও ‘ওদা আ লা লাইসিদাদ’ (সাধারণ মানুষের জন্য গাথা)-এর মতো কবিতাগুলোর উষ্ণতা ও রসবোধ পাঠকদের আরও কাছে টেনে নেয়। অন্যদিকে একই বইয়ের ‘ওদা আল আতোমো’ (পরমাণু গাথা), ‘ওদা আল কোব্রে’ (তাম্রগাথা) প্রভৃতি কবিতা তাঁর অব্যাহত রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও প্রতিবাদমুখরতাকে নিশ্চিত করে।
জন্মবার্ষিকীতে আমরা নেরুদাকে স্মরণ করি এক আবেগপ্রবণ কবি, সামাজিক ন্যায়ের রক্ষক এবং চারপাশের বিশ্বের সাক্ষী হিসেবে। তাঁর কণ্ঠ আজও বিশ্বের অসংখ্য কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয় আর তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের আহ্বান জানায় জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে, আরও ন্যায়সঙ্গত পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম করতে এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে কবিতার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে।
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় নেরুদার আরেকটি আকর্ষণীয় কাব্যগ্রন্থ এস্ত্রাভাগারিও। এ বইয়ের কবিতাগুলোয় মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে ‘নির্বাসিত বিদ্রোহী’ ও ‘সাহিত্যের আইকন’—কবির এ দুই পরিচয়কে।
নেরুদা যখন নোবেল পুরস্কার পাননি, তখন তাঁকে প্রায়ই নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী বলে গুজব রটানো হতো। কাজটা শুধু যে তাঁর শত্রুরা করত, তা নয়, তাঁর ভক্তরাও করত। নেরুদার বিরুদ্ধে বহুলপ্রচারিত কিছু অভিযোগ ছিল অবিশ্বাস্য, যেমন তিনি নাকি সচেতনভাবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কির হত্যাচেষ্টাকারীদের একজনকে চিলির ভিসা দিয়েছিলেন। অন্য সমালোচনাগুলো ছিল গুরুতর; যেমন নেরুদা লেখক-শিল্পীদের স্বাধীনতার জন্য প্রচারণা চালালেও, যেসব স্তালিনপন্থী নেতা সোভিয়েত লেখকদের দমন করছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেননি, এমনকি ক্রেমলিন ১৯৫৮ সালে যখন নোবেল বিজয়ী বোরিস পাস্তেরনাকের কাজ নিষিদ্ধ করে, তখনো। অভিযোগগুলোর সত্য-মিথ্যা নিয়ে এ লেখায় কিছু বলার নেই। তবে এসব অভিযোগ সত্য হলে, এগুলো করার পেছনে নেরুদার হয়তো জোরালো যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছিল।
তত দিনে অবশ্য নেরুদা অন্য বহু পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন, যেগুলোর মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কারও ছিল। ১৯৬৫ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট লাভ করেন, যেটা ছিল কোনো লাতিন আমেরিকানকে এ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রথম ডক্টরেট। এর বছরখানেক পর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার ১০০ বুদ্ধিজীবীকে আদেশ দেন ‘কার্তা দে লোস কুবানোস’ (কিউবানদের চিঠি) নামের একটা খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করতে। এ চিঠিতে নেরুদাকে অভিযুক্ত করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও পেরুতে গিয়ে নিজের কমিউনিস্ট আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার দায়ে। নেরুদা এতে গভীর আঘাত পান এবং জীবনে আর কখনো কিউবায় যাননি। অথচ সফল কমিউনিস্ট বিপ্লবের দেশটি একসময় তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে চিলির সরকার কবির সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা গড়ে তোলে। কর্মকর্তারা তাঁর রাজনীতি পছন্দ করতেন না, কিন্তু তিনি এতটাই বিখ্যাত ছিলেন যে তাঁকে দেশ থেকে বিতাড়িত বা নির্বাসিত করাও সম্ভব হয়নি। ১৯৬০-এর দশকে নেরুদার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে। বাতের ব্যথা আর ও ফ্লেবাইটিসের অভিযোগ করতেন তিনি, কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁর স্ত্রীকে গোপনে জানান যে তাঁর প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়েছে। নেরুদা এ সময় মনোযোগ দেন তাঁর বাড়িগুলো সাজানোর কাজে—সান্তিয়াগোতে লা চাস্কোনা, বালপারাইসোতে লা সেবাস্তিয়ানা এবং বিশেষ করে সমুদ্রতীরের ইসলা নেগ্রা। অতিথিদের স্রোত অব্যাহত ছিল। তবে মাতিলদা আগের মতো জাঁকালো পার্টির অনুমতি দিতেন না, যদিও স্বামীর ঘরগেরস্তালি খুব দক্ষতার সঙ্গে সামলাতেন।
১৯৭১ সালের অক্টোবরে নেরুদা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এ সময় তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে সুইডেনের রাজা যখন তাঁর সঙ্গে করমর্দন ও আলাপ করেন, তখন নেরুদা আবিষ্কার করেন যে তাঁদের দুজনেরই খনিজের প্রতি অনুরাগ রয়েছে। তাঁরা ইস্টার দ্বীপ নিয়েও আলাপ করেন। বিষয়টা তাঁর কাব্যগ্রন্থ কান্তো হেনেরাল-এর ‘রাপা নুই’ কবিতায় এসেছে। নেরুদার বাগ্মীতাপূর্ণ বক্তৃতায় ছিল চিলি থেকে আন্দিজ পর্বত অতিক্রম করে ঘোড়ায় পালানোর ভয়াবহ কাহিনি। সেই দুর্ভোগ তাঁকে শিখিয়েছিল যে ‘সেরা কবি তিনি, যিনি আমাদের দৈনন্দিন রুটি প্রস্তুত করেন: নিকটতম বেকার, যিনি নিজেকে দেবতা মনে করেন না’। তিনি সোভিয়েত একনায়ক স্তালিনকে সমর্থন করার জন্য পরোক্ষ ক্ষমা প্রকাশ করেন, যার (স্তালিন) অপরাধ পরে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ প্রকাশ করেছিলেন।
নেরুদার ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া এবং চিলি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও তাঁর জীবনের শেষের বছরগুলো ছিল যথেষ্ট সৃজনশীল। তাঁর কিছু কাজ মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়, যেমন এল্ র্মা ই লাস্ কাম্পানাস্ (সমুদ্র আর ঘণ্টাগুলো) এবং তাঁর আত্মজীবনী কনফিয়েসো কে এ ভিভিদো (স্বীকার করছি যে আমি বেঁচে ছিলাম)। তিনি তাঁর বন্ধু সালভাদর আলেন্দের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বারবারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন। আলেন্দে অবশেষে জয়ী হন, কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জেনারেল অগুস্তো পিনোশের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে আলেন্দের পপুলার ইউনিটি দলের সরকার উৎখাত হয়। প্রেসিডেন্ট আলেন্দে তাঁর দপ্তরে নিহত হন। পিনোশের সৈন্যরা ইসলা নেগ্রায় অভিযান চালায় আর শোকাহত নেরুদা তাঁদের অবজ্ঞার সঙ্গে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন: ‘চারপাশে তাকান। এখানে আপনাদের জন্য বিপজ্জনক একটা জিনিসই আছে; কবিতা।’
২৩ সেপ্টেম্বর নেরুদা সান্তিয়াগোর একটি হাসপাতালে ক্যানসারের জটিলতায় মারা যান। তাঁর বাড়ি লা চাস্কোনা সামরিক বাহিনী লুটপাট করেছিল। তাঁর স্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, নেরুদার শোকসভা এই ধ্বংসস্তূপেই অনুষ্ঠিত হবে, যাতে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ও সংবাদমাধ্যমগুলো পিনোশের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে পারেন। কবির কফিন যখন কবরস্থানের পথে যাত্রা করে, অগণিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল, সৈন্যরা ভিড়ের দিকে অস্ত্র তাক করে ছিল, কিন্তু জনতা ছত্রভঙ্গ হয়নি। তাঁদের সমবেত স্লোগান নেরুদাকে সম্মিলিত করে বিপ্লবের মৃত্যুঞ্জয়ী শহিদদের সঙ্গে:
‘কমরেড পাবলো নেরুদা’-‘উপস্থিত!’
‘কমরেড ভিক্টর জারা’-‘উপস্থিত!’
‘কমরেড সালভাদর আলেন্দে’-‘উপস্থিত!’
এক দ্রোহী কবির জীবনের পরিসমাপ্তি এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! এমন একটা পরিসমাপ্তিই নেরুদার পছন্দসই হতো, যদি তিনি বেঁচে থাকতেন। এ পরিসমাপ্তি তাঁকে তাঁর প্রিয় জনগণের সঙ্গে শেষবারের জন্য একাত্ম করেছিল।
জন্মবার্ষিকীতে আমরা নেরুদাকে স্মরণ করি এক আবেগপ্রবণ কবি, সামাজিক ন্যায়ের রক্ষক এবং চারপাশের বিশ্বের সাক্ষী হিসেবে। তাঁর কণ্ঠ আজও বিশ্বের অসংখ্য কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয় আর তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের আহ্বান জানায় জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে, আরও ন্যায়সঙ্গত পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম করতে এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে কবিতার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে।