বোর্হেস ও তাঁর গোলকধাঁধা

খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের নিবন্ধ ‘অন্ধজনের আলো: বোর্হেস ও তাঁর গোলকধাঁধা’ ১৯৯৯ সালের ৩ আগস্ট প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। লেখাটি এত দিন কাগজের পাতাজুড়েই ছিল, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রথম আলোর পুরোনো সংখ্যা অবলম্বনেপ্রথম আলো গ্রাফিকস

ষাটের দশক থেকেই এ দেশে বোর্হেস একটি পরিচিত নাম। ওই দশকের মাঝামাঝি এনকাউন্টার পত্রিকার কল্যাণে বিদগ্ধ সমাজ বোর্হেসের একটি সাক্ষাত্কার, কিছু কবিতা ও কয়েকটি ছোটগল্পের সঙ্গে পরিচিত হন। এই পরিচিতি নিয়ে আসে বিস্ময় এবং উত্তরোত্তর পাঠককে করে দুর্বার আকর্ষণ। বোর্হেসের রচনাশৈলীই তাঁর প্রতি পাঠকের আকর্ষণের মূল কারণ। এ রকম বাহুল্যবর্জিত বর্ণনা, ভায়োলেন্সের এমন নিরাসক্ত বিবরণ, অন্তর্লোকে এমন মর্মভেদী দৃষ্টিক্ষেপ এর আগে সাহিত্যে কমই দেখা গেছে। ১৮৯৯ সালে বোর্হেস জন্মগ্রহণ করেন বুয়েনস এইরেসের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন আইনজীবী এবং মনস্তত্ত্বের শিক্ষক পিতামহী ছিলেন ইংরেজ। বাসায় প্রধানত ইংরেজিই ব্যবহৃত হতো। বাবার ঘরোয়া লাইব্রেরিতে তিনি ইংরেজি বই পড়েছেন প্রচুর। ছয় বছর বয়সে তিনি স্প্যানিশ ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখতে শুরু করেন। ৯ বছর বয়সে অস্কার ওয়াইল্ডের একটা গল্প স্প্যানিশে অনুবাদ করে বুয়েনস এইরেসের একটা কাগজে ছাপেনও। এরপর স্কুলে যান। বয়স যখন পনেরো, তাঁর পরিবার তখন চলে যায় সুইজারল্যান্ডে। সেখানে বোর্হেস কলেজে পড়েন। ফরাসি ভাষায় সেখানে পড়ানো হতো। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষা ছিল লাতিন। নিজে থেকে শেখেন জার্মান ও ইতালিয়ান। লেখকের প্রতিশ্রুতি নিয়েই যেন জন্মেছিলেন তিনি। ভাষার প্রতি সহজাত আকর্ষণ তাঁকে এই লক্ষ্যে যথার্থই প্রস্তুত করেছিল। ১৯২১ সালে বুয়েনস এইরেসে ফেরেন। তার আগে স্পেনে কিছু সময় কাটান এবং কিছু রাজনৈতিক কবিতা ও নিবন্ধ রচনা করেন। স্পেন ত্যাগের আগে অবশ্য এসব লেখা নষ্ট করে ফেলেন। বুয়েনস এইরেসে ফিরে তিনি সাদামাটা কবিতা ও দর্শনচিন্তাসমৃদ্ধ ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন এবং এতেই ক্রমে বিখ্যাত হন। প্রথম জীবনে বোর্হেস আলব্রাইসমো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হিস্পানিক সাহিত্যের এই আন্দোলন সম্পর্কে বোর্হেস পরবর্তীকালে অবশ্য বিরূপ মন্তব্য করেন। উগ্র আধুনিকতাবাদ এবং হালকা বিষয়—এই দুই নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যই ছিল এই আন্দোলনের মূল। এবং কিছুকাল যে তিনি এতে সম্পৃক্ত ছিলেন, সে জন্য আক্ষেপও করেছেন। একইভাবে আলত্রেইস্ত আন্দোলনের প্রেরণায় রচিত নিজের লেখা সম্পর্কেও রয়েছে তাঁর সমান বিরূপ মন্তব্য। আর্জেন্টিনার একনায়ক শাসক পেরনের সময় (১৯৪৪-৫৫) বোর্হেসের কপালে দুর্ভোগ জোটে। তাঁর মা, এক বোন ও এক ভাইপো জেল খাটেন। পেরন তাঁকে চাকরিচ্যুত করে মুরগির ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করেন। অন্ধত্বপ্রাপ্তি সম্ভবত বোর্হেসের বংশের প্রতি পুরুষে একজনের জন্য ছিল অবধারিত। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে হতে শেষ জীবনে তিনি প্রায় অন্ধই হয়ে যান। এ জন্য তিনি স্মৃতিনির্ভর হয়ে পড়েন। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘বাবার পাঠাগারে আমি বহু সময় ধরে বহু গল্প-উপন্যাস পড়েছি। মনে হয়, আমি যেন আজও সেই পাঠাগারেই রয়ে গেছি। অন্ধত্বপ্রাপ্তির কালে বই থেকে পাওয়া কাহিনি, ফ্যান্টাসি ও রূপকারের জন্য সারা জীবনই আমি খুলেছি, আবার বয়ন করেছি।’ অন্ধ অবস্থায় ছোটগল্প রচনার চেয়ে কাব্য রচনা সহজ। বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কবিতায় তাল, ছন্দ ইত্যাদি রয়েছে বলে কবিতা মনেও রাখা যায় সহজে। এ জন্য আমার কাছে মুক্তছন্দের কবিতার চেয়ে ছন্দোবদ্ধ কবিতা লেখাই সহজ মনে হয়। রাস্তার ধার ঘেঁষে, দেয়াল ধরে হাতড়িয়ে চলতে চলতে সনেটের কয়েকটি লাইন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে যখন তাদের মোটামুটি একটা আকার দাঁড়িয়ে যায়, তখনই বাসায় ফিরে শ্রুতলিখনের কাজটি করাই। এরপর সপ্তাহখানেক বারবার শুনে ঘষামাজা করে তা পাঠাই প্রেসে।’ বোর্হেসের সাহিত্যিকজীবনের শুরু কবিতা রচনা আর পুস্তক সমালোচনা দিয়ে। একটা দুর্ঘটনায় পড়ে তিনি দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকেন এবং তন্দ্রাহীনতায় ভোগেন ও দুঃস্বপ্ন দেখেন। সেরে উঠে লিখতে গেলে তাঁর মনে হলো নতুন ধরনের আঙ্গিকে লিখতে গিয়ে ব্যর্থ হলে তাতে লজ্জার কিছু নেই, কিন্তু কবিতা আর সমালোচনা লিখতে গিয়ে না পারলে তাঁর নৈতিক শক্তিই যাবে ভেঙে। অতএব তিনি ছোটগল্পের আঙ্গিকে লিখতে শুরু করেন এবং শেষে স্প্যানিশ সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বোর্হেসের গল্পের যে বাস্তবতা, তা মোপাসাঁ ও জয়েসের বাস্তবতা থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র। নির্দিষ্ট স্থানকালে প্রতিষ্ঠিত চরিত্রের বদলে তিনি পাঠককে গল্পের আইডিয়া দেন, বিশদ বিবরণ শুদ্ধিকরণ, কাটছাঁট করা ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দেন এবং এভাবে গল্প ছোট হলেও তাতে নানা প্রক্ষিপ্ত প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। কিন্তু প্রক্ষেপণের অন্তরালে মূল গল্পটিও চলতে থাকে। বোর্হেসের সেরা গল্পগুলোর অধিকাংশই মেটাফিকশনের পর্যায়ভুক্ত। গল্প তো আসলে বাস্তবতা নয়, বাস্তবতার ইল্যুশন বা ছায়া। গল্পলেখক এমন শব্দ-জাদুকর, যিনি অনেক শব্দের সন্নিবেশে সৃষ্ট একটি শিল্পকর্মকে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করেন। এভাবে গল্পকার পাঠকের সঙ্গে একধরনের প্রতারণাই করে থাকেন। এই প্রতারণার নৈতিক দায় থেকে মুক্ত হতে আধুনিক গল্পলেখক গল্পের স্থান–কাল–পাত্র ইত্যাদি সম্পর্কে পাঠককে সচেতন করার জন্য তাঁর গল্পে নানা তথ্য ও ব্যাখ্যা দান করেন। এ–জাতীয় গল্পকেই বলা হয় মেটাফিকশন। বোর্হেস, মার্কেস, কোর্তাজার, ফুয়েন্তেস—এই লেখকদের অনেক গল্পই এই ধারার। বোর্হেসই মেটাফিকশনের অন্যতম স্রষ্টা।

হোর্হে লুইস বোর্হেস

বাস্তবতা ও কল্পসাহিত্য সম্পর্কে বোর্হেসের ধারণা চমত্কার। তাঁর মতে, সাহিত্য যতই কাল্পনিক হোক—বাস্তবতা থেকে তা বিচ্যুত নয়। মানুষ তো বাস্তবতারই অংশ এবং তার চিন্তাভাবনা, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন—সবই বাস্তবতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজস্ব মিথের জগতে বসবাসকারী, শিল্পের সামাজিক অঙ্গীকারবিরোধী বোর্হেসকে কেউ কেউ গজদন্তমিনারবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু বোর্হেস মনে করেন, গজদন্তমিনারে বসেও রাজ্যের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে একজন বাস্তবতায় পরিবর্তন আনতে পারে। এ জন্য কাব্য-গল্প ইত্যাদি রচনা অন্য যেকোনো দৈনন্দিন কাজের মতোই বাস্তব। নিত্যদিনের জীবনই যে কেবল বাস্তব, তা বোর্হেস মানতে রাজি নন। ভাবাবেগ, কল্পনা, স্বপ্ন, ধ্যানধারণা ইত্যাদিও শেষ পর্যন্ত প্রতিদিনের ঘটনার মতো বাস্তব এবং এদের দ্বারাও দিনকে দিনের ঘটনা সৃষ্টি হয়। বোর্হেস বিশ্বাস করেন, বিশ্বের সব দার্শনিক, সব স্বপ্নচারীর প্রভাব আমাদের বর্তমান জীবনে কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় রয়েছে। অতীত, ইতিহাসবোধ, বর্তমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে বোর্হেসের ধারণা বহুলাংশে এলিয়টীয়। বোর্হেস যখন বলেন, ফ্লবেয়ার পিউনিক যুদ্ধকালীন কার্থেজ নিয়ে লেখা উপন্যাসটি কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি পরিবেশের বাস্তবতাতেই লিখতে পেরেছেন, কিংবা শেক্‌সপিয়ার ঐতিহাসিক স্কটল্যান্ডের রাজার খুনের কাহিনি লিখতে গিয়ে একজন খুনির অন্তরাত্মায় ঢুকে তার বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন নাটকে। তখন সময়, ইতিহাস, কাল ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারণা এলিয়টের বোধ ও বিশ্বাসের কথাই আমাদের স্মরণ করায়। বোর্হেসের প্রথম বই কাব্যগ্রন্থ, যা প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। বস্তুত এর আগে আরও দুটি বইয়ের মালমসলা তিনি নষ্ট করে ফেলেন। বোর্হেস জানান যে তাঁর বাবা বলেছিলেন, কোনো বই যদি বোর্হেস ছাপার যোগ্য বলে মনে করেন, তাহলে তিনিই ছাপানোর খরচ দেবেন। তৃতীয় বই ‘ফেরভর দে বুয়েনস এইরেস’ ছাপিয়ে তিনি ৫০ কপি নিয়ে যান এক পত্রিকা অফিসে বিতরণের জন্য। এরপর ইউরোপ চলে যান। বছরখানেক পর ফিরে এসে দেখেন, বইয়ের সব কপিই বিক্রি হয়ে গেছে এবং দারুণ প্রশংসা করে সমালোচনা বেরিয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে বইটির আবেদন ছিল প্রচুর। বুয়েনস এইরেস নিয়ে বোর্হেসের যা কিছু আধিবিদ্যক দার্শনিক কল্পনা পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় পরিপক্বতা লাভ করে তার অবিন্যস্ত রূপ দেখতে পাওয়া যায় এই প্রথম বইয়ে। বোর্হেস মনে করতেন, একজন লেখকের রচনার মূল বিষয় প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠাতেই বলা হয়ে যায়। বুয়েনেস এইরেস নিয়ে লেখা বইটি সম্পর্কেও তিনি এমন ধারণাই ব্যক্ত করেছেন, ‘সারা জীবন মনে হয় মাত্র সাত-আটটা কবিতাই লিখেছি। বাকিগুলো সেসবেরই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, নানা রকমফের।’ একটি বই ছাপা হলে তা আগের বইটিকে বাতিল করে দেয়। কারণ, একই বিষয় দ্বিতীয় বইটিতে অন্যভাবে বলা হয়। কিন্তু বোর্হেস এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু দেখেন না। কেননা এতে লেখকের আন্তরিকতাই প্রমাণিত হয়। একই থিমে একই বিষয়বস্তুতে ফিরে ফিরে আসা মানে ওই থিমকে লেখক মৌলিক ও অপরিহার্য বলে মনে করেন এবং সে সম্পর্কে যে তার ভাবনাচিন্তা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, সে কথাই প্রমাণ করেন।

হোর্হে লুইস বোর্হেস

হিস্পানিক সাহিত্যের অনেক লেখককেই বোর্হেস প্রভাবিত করেছেন। বোর্হেসের রচনাশৈলী দ্বারাই সাধারণত তারা প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কিন্তু আরও গভীরভাবে প্রভাবিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মেক্সিকোর লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস। একটি প্রবন্ধে ফুয়েন্তেস লেখেন, কীভাবে বোর্হেসের বই তাঁকে ইংরেজি ভাষায় লেখা থেকে বিরত করে স্প্যানিশে লিখতে শেখায়, কী করে তার ভেতর এই উপলব্ধি সৃষ্টি করে যে আসলে তিনি স্প্যানিশেই স্বপ্ন দেখেন এবং স্প্যানিশই তাঁর আসল ভাষা। ফুয়েন্তেস বলেন, ‘আমার স্প্যানিশে দেখা স্বপ্নগুলোকে বোর্হেস এমন তেজ দিলেন এবং বুয়েনস এইরেসের সঙ্গে, এর রাস্তাঘাট, আশঙ্কাজনক পরিবর্তন, এর তেমাথা-চৌমাথার স্পন্দনের সঙ্গে এমন আন্তরিক সংস্পর্শ সৃষ্টি করলেন যে তখনই আমি স্থির করি, আমাকে স্প্যানিশে লিখতে হবে।’ কল্পকাহিনির লেখক হিসেবে ফুয়েন্তেস বোর্হেসের চারটে থিমের কথা বলেছেন। প্রথম থিম—স্বপ্ন দিয়ে বাস্তবতায় আগ্রাসন। তিনি এমন এক স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি জেগে উঠে বুঝতে পারেন যে অন্য কেউ তাঁকে স্বপ্নে দেখেছে। এ হলো আধিবিদ্যক ও ব্যক্তিগত—অধিবিদ্যার স্রষ্টা বোর্হেস, যার শর্ত হলো এই বিদ্যা কখনো নিয়মে পর্যবসিত হয়ে অবক্ষয়প্রাপ্ত হবে না। বিশ্বের রহস্যে কবিবর বরাবরই বিস্মিত, কিন্তু পরিহাস হলো এই যে তিনি নিজেই এই রহস্যের বিলোমকেন্দ্রে কর্মরত এক রহস্যপুরুষ। দ্বিতীয় থিম—কাজের ভেতর কাজ। যেমন বোর্হেস পিয়ের মেনার্দের লেখক—সে আবার দন কিহোতের লেখক, যে কিনা সার্ভোন্তেসের সৃষ্টি, যিনি বোর্হেসকে সৃষ্টি করছেন, যিনি আবার স্রষ্টা পিয়ের মেনার্দের...এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে মেটাফিকশন। তৃতীয় থিম হলো সময়সমুদ্রে যাত্রা—কেবল একবার নয়, বারবার, রাস্তার শাখা-প্রশাখাবিস্তারী বাগান ‘কেন্দ্রবিমুখ, কেন্দ্রাতিগ, সমান্তরাল সময়ের ক্রমবিস্তারমান হতবিহ্বল করা জটাজাল’। এরপর চতুর্থ থিম দ্বৈতসত্তা—‘বোর্হেস ও আমি’: লেখক বোর্হেস বনাম ব্যক্তি বোর্হেস। কিন্তু এ দুয়েও মিলে যায়: ‘তিনি লেখেন, নাকি আমি? বহু বছর আগে আমি তার হাত থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। এ করতে গিয়ে আমি শহরতলি আর বস্তির মিথ নিয়ে অনেক খেলাই খেলেছি। কিন্তু এই সব লেখা এখন বোর্হেসেরই অংশ। তিনি লেখেন, আমি লিখি, আমরা উভয়েই লিখে চলি অবিরাম। জানি না দুজনের কে লিখছি।’ এই ফাঁকা সাদা পাতায়, এভাবে স্বাপ্নিক, মেটাফিজিশিয়ন, দ্বৈতসত্তাধিকারী কাল-পরিব্রাজক সাহিত্যিক হিসেবে বোর্হেসের পরিচয় অতিশয় সমৃদ্ধ

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে নিজের বাড়ির ছাদে হোর্হে লুইস বোর্হেস
ছবি: সংগৃহীত

লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে বোর্হেসের একটি বড় অবদান হলো সাহিত্যে সাহিত্যে যোগাযোগের যে বাধার প্রাচীর, তা তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সম্ভাব্য যাবতীয় সম্ভার দিয়ে তিনি হিস্পানিক সাহিত্যের ঘর ভরে তুলেছিলেন। বোর্হেস এ ক্ষেত্রে একাধারে আর্জেন্টিনীয় এবং আন্তর্জাতিক। আঞ্চলিক পরিচয় পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে তিনি সাহিত্যিক কল্পনাবলে সম্মিলন ঘটিয়েছেন নানা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের। আরব, ইহুদি, খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের সন্নিবেশ তাঁর গল্পকে করেছে সতেজ ও প্রাণবন্ত। ‘আভেরোর অনুসন্ধান’ ‘জহির’, ‘আলমুতাসিমের প্রবেশপথ’ ইত্যাদি গল্প পাঠককে উদার করে, ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে উদ্ধার করে। এসব বিভিন্ন ঐতিহ্যকে তিনি আত্তীকরণের কথা বলেছেন। আর্জেন্টিনার লেখকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা আর্জেন্টিনার লেখকেরা কাজের কাজ যা-ই করি না কেন, তা আমাদের আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যাবে। নিজ দেশের বৃক্ষহীন বিস্তীর্ণ সমতটের কিনারে বসে বোর্হেসকে আবিষ্কার করতে হয়েছে স্থান বা স্পেস, নির্মাণ করতে হয়েছে তাঁর আলেফ। এই আলেফ ‘পৃথিবীর একমাত্র স্থান, সেখানে সব স্থানের উপস্থিতি—যেকোনো দিক থেকে দেখুন, সেখানে নেই কোনো বিভ্রান্তি, নেই মিশ্রণ। প্রায়ান্ধ বোর্হেসকে নানা শাখাপথকীর্ণ একটি বাগান সৃষ্টি করতে হয়েছে, যেখানে সময় হলো বহু সময়ের এক অসীম, নিরবচ্ছিন্ন পরম্পরা, কেন্দ্রবিমুখ কেন্দ্রাতিগ...জটাজাল। আত্মনিমগ্ন এই শিল্পী ছিলেন বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। এমার্সন, চেস্টারটন, স্টিভেনসন, বার্নার্ড শ, কিপলিং, হুইটম্যান প্রমুখের কাছে তাঁর সাহিত্যিক ঋণের কথা তিনি অকপটে স্বীকার করে গেছেন। এমনকি ম্যাসেডোনিও হার্নান্দেজ, রাফায়েল কানসিনোস অ্যাসেন্স প্রমুখ স্প্যানিশ লেখকের প্রভাবের কথাও স্বীকার করেছেন খোলাখুলিভাবে। ১৯৬৭ সালে নেরুদা ও আস্তুরিয়াসের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের জন্য বোর্হেসের নামও উত্থাপিত হয়। পুরস্কার পান আস্তুরিয়াস। এ সম্পর্কে বোর্হেসের প্রতিক্রিয়া, যখন রাসেল, শ এবং ফকনারের পাওয়ার কথা মনে আসে, তখন আমার পুরস্কারপ্রাপ্তি একেবারেই অসম্ভব মনে হতো। আস্তুরিয়াসের কথা জানি না, তবে তার চেয়ে আমি নেরুদাকেই বেশি সমর্থন করতাম। কেননা পাবলো নেরুদা শ্রেষ্ঠতর, যদিও তার রাজনীতির সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করি।’

তরুণ লেখকদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, ‘ছাপানোর জন্য ব্যগ্র হবেন না, পাঠকের কথা ভুলে যাবেন না এবং যদি গল্পে হাত দেন, তো এমন কিছু বর্ণনা করবেন না, যা সত্ভাবে কল্পনা করতে পারেন না। আর চমকদার বিষয় নিয়ে না লিখে যে বিষয় আপনার সৃজনশীলতা চাগিয়ে তোলে তা নিয়ে লিখুন...অন্ধকার দূর করুন।’ বিশ্বসাহিত্যের অনেক দিকপালই ছিলেন অন্ধ। হোমার, মিল্টন, জয়েস—এদের দৃষ্টিশক্তি ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ মনে প্রায় নিভেই গিয়েছিল। কিন্তু এরা অন্তরে আলো জ্বালিয়ে নিজেরা যেমন মানসলোকে স্বচ্ছন্দে যাত্রা করেছেন, তেমনি চক্ষুষ্মানকেও পথ দেখিয়েছেন। হোর্হে লুইস বোর্হেসও বাহ্যত যতই ন্যাশনাল লাইব্রেরির দেয়াল ধরে, কিনার দিয়ে হাতড়ে পথ হাঁটুন, অন্তর্লোকে ছিলেন স্বচ্ছন্দ পথিক। নানা সাংকেতিক, প্রতীকী, সাংস্কৃতিক চিহ্ন, শব্দ ও রূপকল্প দিয়ে যে নিজস্ব জগৎ তিনি গড়েছেন, আলোকিত হওয়ার জন্য পাঠককে কষ্ট করে গোলকধাঁধার সেই জগতে প্রবেশ করতে হয়। একবার ঢুকে গলি-উপগলির চিহ্নগুলোর সঙ্গে আলেফ, আকবার, টোন ইত্যাদির গূঢ়ার্থের সঙ্গে পরিচিত হলে দেখা যাবে পথ সহজ হয়ে এসেছে এবং পাঠকের যাত্রা ও অনুসন্ধান হয়েছে আনন্দের। তখন পাঠক এসে পৌঁছাবেন সেই জগতের কেন্দ্রে এবং দেখবেন সেখানে চারপাশ আলো করে বসে রয়েছেন অন্ধ বোর্হেস।