ইতিহাস
চার্নক আত্মীয়সভা, ঢাকা দখলের খায়েশ!
এই লেখায় ঔপনিবেশিক বাংলার এক বিতর্কিত চরিত্র জব চার্নককে ঘিরে নির্মিত হয়েছে ক্ষমতা, আত্মীয়তানির্ভর নেটওয়ার্ক ও সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিশ্লেষণ। কলকাতা প্রতিষ্ঠার প্রচলিত আখ্যানের আড়াল থেকে লেখক তুলে আনেন কোম্পানির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ কাঠামো, পারিবারিক প্রভাববলয় এবং বাংলায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সুপরিকল্পিত কৌশল।
ঢাকা দখলের খায়েশ, মোগল কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ, এবং চার্নক-পরিবারের বিস্তৃত আত্মীয়সভা—সব মিলিয়ে লেখাটি শুধু ব্যক্তিচরিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে বাংলাকে বাণিজ্যিক উপনিবেশ থেকে সাম্রাজ্যিক শাসনে রূপান্তরের এক ইতিহাসপাঠ।
দিশি চাল ছেড়ে দিয়ে বিলাতির চাল।
নকলে বাঙালী বাবু হল যে কাঙাল।।
রাতারাতি বড় লোক হইবার তরে।
ঘর ছেড়ে কলিকাতা গিয়ে বাস করে।।
১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ আগস্ট। সেদিন কী বৃষ্টি-কী বৃষ্টি! গঙ্গায় দুকূল হানছে। হুগলির পাট তুলে চার্নক সেদিন কলকাতার গঙ্গাতীরে এসে নৌকো ভেড়ালেন। আজ যেখানে বউবাজার আর লোয়ার সার্কুলার রোডের মোড়, শোনা যায় সেখানে নাকি একটি বিরাট গাছ ছিল। কেউ বলেন বট, কেউ বলেন পিপুল। সে গাছের তলায় হাটুরে লোকেদের বিশ্রামের আস্তানা ছিল, বৈঠকখানা। সেখানে সেই, বটগাছের তলায় বৃষ্টিঝরা দিনে একটু মেজাজ আনার জন্য হুঁকোতে কলকে চড়ালেন সাহেব। তারপর ভুডুক ভুডুক করে টান দিয়ে চললেন। চার্নক জানলেন না—আড়ালে ভাগ্যলক্ষ্মী হাসলেন। লক্ষ্মীর দাক্ষিণ্য প্রসারিত হতে দেরি হলো না। সাহেব এদিকে মৌজ করে টান দিচ্ছেন। নাক মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ওদিকে সে মুহূর্তে স্বপ্নও দেখলেন সাহেব। সুন্দর স্বপ্ন। কোম্পানির সুদিন আসবে (বাবু গৌরবের কলকাতা, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়)। হ্যাঁ, সুদিন এসেছিল বটে! বাংলায় দুর্দিন নামিয়ে সুদিন এসেছিল কোম্পানির ও চার্নক গোষ্ঠীর, ইতিহাস পাঠে তা আমরা সবাই জানি।
কাসিমবাজার ছেড়ে চার্নক এল,
সুতানুটিতে আস্তানা গড়ল।
হুগলি ছেড়ে নদীর পাড়ে,
কলকাতা শহর উঠল বেড়ে।
বিবি তার যে মারিয়া নামে,
কলকাতায় চার্নক লাগল কামে!
পরবর্তী সময় কোম্পানির সুদিনের সাথে কলকাতার নেটিভদের মধ্যে সুদিনের বাবুমশাইরা তৈরি হলো। সাদা বাবুদের ছত্রচ্ছায়ায় বাবুমশাইরা ক্রমেই নবাবি কায়দা–কানুন রপ্ত করতে প্রয়াসী হয়েছে কাতারে কাতারে। তবে আসল নবাবসুলভ কেতাদুরস্ত হয়ে উঠেছিল সাদা বাবুরা।
সাদা ‘মাস্টার’ কালো ‘স্লেভ’ ও নববাবুবিলাস
বিনয় ঘোষ তাঁর কলকাতার মন বইতে জানাচ্ছেন, ‘ইংরেজদের সামাজিক ইতিহাসের একজন পণ্ডিত বলেছেন যে অষ্টাদশ শতকের ইংলণ্ডে প্রধানত দু’রকমের ইংরেজ দেখা যেত। একরকম Robust ও Boorish টাইপ, আর একরকম Thin ও Quizzical টাইপ। এই রৌবাস্ট ও ব্যুরিশ টাইপের ইংরেজদের মধ্যে একদল এদেশে আসেন কোম্পানির অধীনে রাইটার ফ্যাক্টরের চাকরি নিয়ে প্রধানত ভাগ্যের জুয়া খেলা খেলতে। জুয়াখেলায় জিত হয় তাদের যারা প্রচুর ধনসঞ্চয় ক’রে স্বদেশে ফিরে যাবার পর সাধারণেব কাছে “নবাব”(Nobobs) নামে পরিচিত হন। বাস্তবিক এদেশে তারা নবাবই ছিলেন এবং স্বদেশে ফিরে গিয়ে এখানকার নবাবি অভ্যাস ও মেজাজ ছাড়তে পারেননি।’
অন্যত্র বিনয় ঘোষ জানান, কলকাতা শহর সাদা ও কালো রঙের মানুষ হিসেবেও ভাগ করা হলো। সাদা বা হোআইট টাউন ও কালো বা ব্ল্যাক টাউন? ব্ল্যাক টাউনের ফটকগুলির চারিদিকে দেয়াল থাকবে এবং তার উদ্দেশ্য হলো যাতে সাদা-কালোয় না মিশে যায়। সাদা সাদা, কালো কালো! সাদা ‘মাস্টার’ কালো ‘স্লেভ’। সাদা শাসক শোষক অভিজাত ও উচ্চশ্রণীর হোমো সাপীয়েন্স? আর কালো নিগার নেটিভ ও কতকটা যেন ‘অ্যানথ পয়েড এপ’। সাদা ‘হোমো’ও কালো ‘অ্যানথপয়েডরা’ কলকাতা শহরে বিভক্ত হয়ে গেল।
উইলিয়াম হেজেস তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ করেছেন, ‘এই ভদ্রলোক এবং আরও অনেক লোক আমাকে বলেছেন যে যখন চার্নক পাটনায় থাকতেন, তখন নবাবের কাছে এই নালিশ করা হয়েছিল যে তিনি (চার্নক) একজন হিন্দু রমণীকে রক্ষিতা রেখেছেন। সেই নারীর স্বামী তখনো জীবিত ছিলেন কিংবা সবেমাত্র মারা গেছেন।
সাম্রাজ্যলোভী অর্থলোভী বণিকবুদ্ধি ইংরেজ শাসকদের নতুন দম্ভের যুগ আসবে আর তার সঙ্গে আসবে অর্থলোভী নির্জীব শাসিতদের নতুন এক গোলামির যুগ। অপেক্ষা কেবল।
জব চার্নকের পর ১২৯ বছর অতিক্রান্তে টাকার ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে কলকাতার সমাজের যে রূপান্তর হতে থাকল, তার আভা দেন ভবানীচরণ তাঁর নববাবুবিলাস রচনায়, ১৮২২-২৩ সালে। এমন এক শহর পত্তনের জন্য যাকে বাহবা দিতে ছাড়ছি না, সে কালের কালো স্লেভদের উত্তরসূরিরা, তিনি জব চার্নক। বাংলা হয়ে উঠেছিল তাদের দখল শাসনের মৃগয়াভূমি। আমরা তার সেই যে ২৫ বছর বয়সে ভারতে আগমন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তা কত কী ছলচাতুরী দিয়ে সমাধা করতে পারগ হয়েছিল, তা একটু দেখবার চেষ্টা করব।
একনজরে জব চার্নক
জব চার্নকের জন্ম সাল আনুমানিক ১৬৩১। পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের বাসিন্দা। বাবার নাম রিচার্ড চার্নক। জব চার্নক ১৬৫৬ সালে প্রথম ভারতবর্ষে পৌঁছান। ১৬৫৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করেন, যেখানে তিনি হুগলিতে নিযুক্ত ছিলেন। কাসিমবাজারে কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে ১২-১৩ জানুয়ারি তারিখের ১৬৫৮ সালে কোর্ট বুকসে লিপিবদ্ধ নামের তালিকায় উল্লিখিত ছিল কাউন্সিলের জুনিয়র সদস্য ‘জব চার্নক, চতুর্থ, (বেতন) ২০ পাউন্ড’। এরপর আর কখনো তিনি ইংল্যান্ডে ফেরত যাননি। ১৬৭১-এর (২৫ অক্টোবর) এক আদেশনামায় কোর্ট চার্নকের বেতন বাড়িয়ে ৪০ পাউন্ড করে), এর এক মাস পর তাকে আরও জানানো হয় যে যদি তিনি কোম্পানির চাকরিতে থাকেন, তাহলে পূর্বতন কাজের জন্য আরও পুরস্কার বিবেচনাধীন থাকবে (কলকাতার সৃষ্টি ও জব চার্নক)।
চার্নক বিয়ে করেছিলেন এক ভারতীয় হিন্দু নারীকে ১৬৭৮ সালে বা তার কিছু আগে। কর্মজীবনজুড়ে, চার্নক প্রায়শই তাঁর ঊর্ধ্বতনদের সাথে মতবিরোধে লিপ্ত থাকতেন, অব্যবস্থাপনা, চুরি, বর্বরতা এবং পরবর্তী সময় ধর্মীয় উগ্রতার যুগে, তাঁর ভারতীয় স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ‘অনৈতিকতার’ অভিযোগের মুখোমুখি হতে হতো।
উইলিয়াম হেজেস তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ করেছেন, ‘এই ভদ্রলোক এবং আরও অনেক লোক আমাকে বলেছেন যে যখন চার্নক পাটনায় থাকতেন, তখন নবাবের কাছে এই নালিশ করা হয়েছিল যে তিনি (চার্নক) একজন হিন্দু রমণীকে রক্ষিতা রেখেছেন। সেই নারীর স্বামী তখনো জীবিত ছিলেন কিংবা সবেমাত্র মারা গেছেন। সেই নারী তাঁর স্বামীর কাছ থেকে পালিয়ে এসেছেন এবং আসার সময় স্বামীর সব টাকাকড়ি ও অনেক দামি জহরত চুরি করে নিয়ে এসেছেন। এই কথা শুনে নবাব চার্নককে ধরে আনবার জন্য ১২ জন সিপাই পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু চার্নক পালিয়ে যাওয়ায় তাঁরা তাঁর উকিলকে ধরে দুই মাস জেলে আটকে রেখে দেন। আর সিপাইরা দিনরাত কুঠির ফটকের সামনে ধরনা দিয়ে বসে থাকেন। তার ফলে চার্নক নগদ তিন হাজার টাকা, পাঁচ থান খুব উৎকৃষ্ট পশমি কাপড় (Broad cloth) এবং কতকগুলো তলোয়ার নবাবকে উপহার দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলেন। এই রকম ঘটনা তাঁর বাংলার কাসিমবাজারে ঘটেছে—এ কথা আমি বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছি। সে অথবা সেই নারী পরলোকগত হলে কোম্পানির নামে একটা কলঙ্ক রটনা হবে।’
এই নিবন্ধে এক ডজনেরও বেশি ঔপনিবেশিক পরিবার এবং তাদের আত্মীয়তার যোগাযোগের ব্যক্তিগত কাগজপত্র, চিঠিপত্র এবং জীবনীগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা দুই শতাব্দী ধরে শত শত ব্যক্তির বিভিন্ন স্তরে বিশ্লেষণ করেছে। তবে বিশেষ করে ছয়টি পরিবারের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
চার্নক সম্বন্ধে ক্যাপ্টেন হ্যামিন্টনের বক্তব্য এখানে তুলে ধরা যেতে পারে, ‘... মি. চার্নক বর্তমান স্থানটি কলোনির জন্য নির্বাচন করে সেখানে একজন রাজার চেয়েও দোর্দণ্ডপ্রতাপে রাজত্ব করতেন। কেবল রাজাদের মানবিকতার লেশমাত্র তার ছিল না। কারণ, কখনো কোনো হতভাগ্য দেশীয় ব্যক্তি অজ্ঞাতবশত তার আইনের অনুশাসন লঙ্ঘন করলে শাস্তি হিসেবে নির্ঘাত লাভ করত নির্মম বেত্রাঘাত। আর শাস্তিটি সাধারণত চলত তার আহারকক্ষের এত কাছে যে আইন-অমান্যকারীদের কাতরোক্তি ও চিৎকার তার কাছে সংগীতের কাজ করত।’ হুগলির কাউন্সিল থেকে বালাসোরের কাউন্সিলকে লেখা ১৮৮৬ সালের ৩ জুন তারিখের চিঠির পুনশ্চঃ–তে হাতে লেখা অংশটি ইউলের ধারণামতে চার্নকের। সেখানে আছে: ‘পিওনরা যদি পাঁচ দিনের মধ্যে আসে তাহলে তাদের চার আনা বকশিশ দেবে, তার চেয়ে দেরি হলে চাবুক (দ্য ডায়েরি অব উইলিয়াম হেজেস)।’
তিনি বাংলায় কোম্পানির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কর্মচারী ছিলেন। ১৬৯২ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি স্ত্রীকে হিন্দুরীতি অনুযায়ী না পুড়িয়ে কবরস্থ করেন। সেইন্ট জর্জ গোরস্তানের উত্তর দিকের দেয়ালের পাশে তাঁকে তাঁর স্ত্রীর কবরে সমাহিত করা হয়।
ঔপনিবেশিক ‘ষড়-রিপু’, চতুর কোম্পানি এজেন্টদের অভয়ারণ্য
এই নিবন্ধে উপস্থাপিত অনুসন্ধান মূলত এক ডজনেরও বেশি ঔপনিবেশিক পরিবার এবং তাদের আত্মীয়তার যোগাযোগের ব্যক্তিগত কাগজপত্র, চিঠিপত্র এবং জীবনীগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা দুই শতাব্দী ধরে শত শত ব্যক্তির বিভিন্ন স্তরে বিশ্লেষণ করেছে। তবে বিশেষ করে ছয়টি পরিবারের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়: পিটস, চার্নকস, কোলেটস, স্ক্যাটারগুডস, ওয়ালস, ফকস ও ক্লাইভস (গবেষক ডেভিড ভিভার্স)। উল্লেখ্য যে এই পরিবারগুলোর বেশির ভাগই এমন সব ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছিল, যাঁরা কোম্পানির মধ্যে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়কালে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোয় বিশিষ্টভাবে উপস্থিত ছিলেন। যেমন থমাস পিট মাদ্রাজের গভর্নর ছিলেন, যখন তার চাচাতো ভাই জন পিট নিউ কোম্পানির কনসাল ছিলেন; জব চার্নক মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং কলকাতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; জোসেফ কোলেট বেনকুলেনের ডেপুটি গভর্নর এবং তার পরে মাদ্রাজের গভর্নর ছিলেন; জন স্ক্যাটারগুড ছিলেন একজন স্বাধীন ব্যবসায়ী, যিনি এশিয়ার সব প্রধান বাণিজ্যিক বাজারে কাজ করতেন; জোসেফ ওয়ালশ বেনকুলেনের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন যখন তার পুত্র জন ওয়ালশ বাংলা বিজয়ের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন; জোসেফ ফাউক একজন সফল হীরা ব্যবসায়ী ছিলেন; এবং অবশেষে রবার্ট ক্লাইভ দুবার বাংলার গভর্নর ছিলেন। স্বভাবতই এই ধরনের পরিবারগুলোকে সামগ্রিকভাবে অভিজাত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বৃহত্তর আত্মীয়তার সম্পর্কের অংশ হিসেবে তাঁদের সম্পর্কসূত্রে কারও কোনো বিধবা স্ত্রী থেকে শুরু করে দরিদ্র চাচাতো ভাই–বোন পর্যন্ত প্রান্তিক পদায়নে সামাজিক ও রাজনৈতিক জালের তথা চতুর কোম্পানি এজেন্টদের অভয়ারণ্যের একটি পরিকল্পিত বিস্তৃতি বলেই প্রতিভাত হয়।
ভ্রাতৃপ্রতিম কোম্পানি, ইস্ট ইন্ডিয়ায় আমদানি
লক্ষণীয় যে কোম্পানির ‘প্রাথমিক বিকাশের সময় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের অন্তর্নিহিত আস্থা এবং বাধ্যবাধকতা বজায় রাখার জন্য, সদস্যদের তাঁদের নিজস্ব পরিবারের মানুষদের সদস্যপদে নিয়োগের জন্য উন্মুক্ত সুযোগ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অর্ডারে উল্লেখ আছে—‘১৬২১ সালে যখন কোম্পানির আইন বা স্থায়ী আদেশ প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন ঘোষণা করা হয় যে প্রত্যেক “কোম্পানির ভাই” তাদের একুশতম জন্মদিনে “তার পুত্রদের” এই সম্পর্কে যুক্ত করবেন। এভাবে কমিটির সদস্য থমাস স্মিথউইকের পুত্র ফ্রান্সিস স্মিথউইককে ১৬৪১ সালে “পৈতৃক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে এই কোম্পানির ভাই” করা হয় (কোর্ট অব কমিটি নথি)। এই নিয়মগুলো কোম্পানির এককেন্দ্রিকতা বজায় রেখেছিল, যা পরবর্তী সময় এ সদস্যরা লন্ডন বা এশিয়ার, আন্তব্যক্তিক সম্পর্ক, বন্ধন এবং বাধ্যবাধকতার একটি বিশাল জালে আবদ্ধ হয়েছিলেন।’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অর্ডার মতে, ভাষা, অনুশীলন এবং রুটিনের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বন্ধন স্থাপন করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, সদস্যদের অধ্যাদেশ, আদেশ, যোগাযোগ এবং চিঠিপত্রে ‘ভাই’ হিসেবে সম্বোধিত করা হয়েছিল, নিজেদের ‘ভাই’এবং কোম্পানির সাথে সম্পর্ককে ‘ভ্রাতৃত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমন এক আত্মীয়তার বন্ধনকে একে অপরের মধ্যে সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে সদস্যরা ‘জৈবিকভাবে সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের মধ্যে ও সম্পর্ক তৈরি এবং টিকিয়ে রাখতে’ সক্ষম হয়েছিল।
ফলস্বরূপ, ১৬০০ সালে প্রথম সভায় ১৩২ জন সদস্য নিয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠন গড়ে উঠেছিল, কিন্তু ১৬৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তি কোম্পানিতে যোগদান করেছিলেন। যেখানে ‘ভ্রাতৃত্ব’, ‘বন্ধুত্ব’ এবং ‘ভালোবাসা’ চুক্তির প্রতি বাধ্যবাধকতা দ্বারা তাঁদের প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল।
চার্নক আত্মীয়সভা
গবেষক অ্যান্ড্রু ম্যাককিলপ স্কটিশ উইল ও টেস্টামেন্টের প্রমাণমোতাবেক বলেন, লিঙ্গ, জাতি ও ইংরেজদের প্রাচ্যের প্রাচুর্য ভাগ্য গড়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘পারিবারিক প্রোটো-স্টেট’। ভারতে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক রাজত্বের নানা পর্বে ব্রিটিশ প্রশাসক, কর্মচারী যোগসাজশে গড়ে উঠেছিল ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক সাম্রাজ্য। এই নিবন্ধে কেবল একটা বিশেষ সময়ের বাংলার দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছি। ধ্রুব ঘোষ তাঁর কলোনিয়াল ইন্ডিয়া: দ্য মেকিং অব এম্পায়ার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই প্রক্রিয়ার বাইরেও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁদের নিজস্ব বলয় তৈরি করতে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৬৮০-এর দশক থেকে, চার্নক পরিবার একটি বিস্তৃত আত্মীয়তার নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়। বিশেষত চার্নকের সন্তানদের সাথে বিবাহের মাধ্যমে কোম্পানির কর্মচারীদের একটি বিশাল দলকে রীতিমতো পরিবারভুক্ত করেছিল। জব চার্নকের স্ত্রী মারিয়া তাঁর স্বামীর তিন কন্যা এবং এক পুত্রসন্তান জন্ম দেন। চার্নক দম্পতির মিশ্র বর্ণের জ্যেষ্ঠ সন্তান মেরি, তৎকালীন ঢাকার একজন কাউন্সিলর চার্লস আইরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। চার্লস আয়ার, যিনি অবশেষে তার শ্বশুরের উত্তরসূরি হয়ে সদ্য স্বাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রথম গভর্নর হবেন, তিনি নিজেও একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ছিলেন।
১৬২১ সালে যখন কোম্পানির আইন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন ঘোষণা করা হয় যে প্রত্যেক “কোম্পানির ভাই” তাদের একুশতম জন্মদিনে “তার পুত্রদের” এই সম্পর্কে যুক্ত করবেন। এভাবে কমিটির সদস্য থমাস স্মিথউইকের পুত্র ফ্রান্সিস স্মিথউইককে ১৬৪১ সালে “পৈতৃক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে এই কোম্পানির ভাই” করা হয়।
সি আর উইলসন তাঁর লেখায় উদ্ধৃত করেছেন—চার্নকের আরেক কন্যা ক্যাথরিন, জোনাথন হোয়াইটকে বিয়ে করেন, যিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। জোনাথন হোয়াইট প্রথমে কাউন্সিলর এবং পরে তাঁর সচিব হিসেবে তাঁর শ্বশুরের ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন। চার্নকের কন্যাদের মধ্যে কনিষ্ঠ কন্যা এলিজাবেথের বিয়ে হয় একইভাবে বাংলার প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত কলকাতার একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী উইলিয়াম বাউরিজের সাথে। হোয়াইট ও বাউরিজ উভয় পরিবারেরই অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ছিল, যাঁরা বঙ্গোপসাগর তীরজুড়ে স্বাধীন বণিক হিসেবে বাণিজ্য করতেন, যা চার্নক পরিবারকে এশিয়াজুড়ে আরও বিস্তৃত স্বার্থ প্রদান করেছিল। বলাবাহুল্য, এভাবে পরিকল্পিত উপায়ে—আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার ফলে জব চার্নক বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে সক্ষম হন, যা পরবর্তীকালে একটি শক্তিশালী সামাজিক, রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সৃষ্টি করে এবং তা চার্নকের নীতিগুলোকেও সমর্থন করেছিল।
চার্নক সিনড্রোম ও ক্ষমতার অপব্যবহার
এই গোষ্ঠীর ওপর পরবর্তী প্রভাব প্রাথমিকভাবে ‘মারিয়ার’ সাথে তাঁর বিবাহের পরে স্পষ্ট হয়, যার ওপর চার্নকের স্ত্রী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ১৬৯৩ সালে চার্নকের মৃত্যুর পরপরই কলকাতায় আসা এক কোম্পানি কর্মচারীর মতে, কোম্পানির অনেক কর্মচারী চার্নকের উদাহরণ অনুসরণ করেছিলেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গ স্ত্রীদের’ বিয়ে করেছিলেন এবং ‘নিজেদের ধর্মের প্রতি’ খুব কম শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন, যেমনটি তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া হাউসকেও জানিয়েছিলেন (আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, এ নিউ অ্যাকাউন্ট অব দ্য ইস্ট ইন্ডিজ)।
প্রকৃতপক্ষে, বাংলায় প্রভাবশালীদের সাথে অন্যদের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরির জন্য খুব কম সুযোগ ছিল। যাঁরা চার্নক আত্মীয়তার নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলেন অথবা তাঁদের বিষয়ে জব চার্নকের প্রভাব প্রতিরোধ তৈরি করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৬৭৯ সালে যখন রিচার্ড ট্রেঞ্চফিল্ড কাসিমবাজারে পরিবারের বাণিজ্যিক উদ্বেগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। চার্নক কর্তৃক তাঁর বরখাস্তের শাস্তিমূলক প্রকৃতি এজেন্ট ম্যাথিয়াস ভিনসেন্ট এবং মাদ্রাজের গভর্নর স্ট্রেনশাম মাস্টার কর্তৃক অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছিল। তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন যে ট্রেঞ্চফিল্ডের একমাত্র অপরাধ ছিল চার্নক এবং তাঁর সহযোগীদের ‘বিদ্বেষী’ হতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা (Master, Diaries, vol. 2, p. 284.)।
চার্নকদের ঢাকা দখলের খায়েশ
প্রফুল্ল রায় তাঁর জব চার্নকের বিবি ও অন্যান্য গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ঢাকায় নবাবের তোষামোদ করতে কে যাবে ঢাকায়? চার্নক আয়ারকে সুনজরে দেখে। আয়ার এখন কাউন্সিলের সভ্য। তার প্রতিভা লক্ষণীয়, চার্নকের মতলব সে ভালোই বোঝে। সে-ই যাক ঢাকায়, কাউন্সিলের অন্য একজন সভ্যও সঙ্গে যাক। দুজনে মিলে নবাবকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাক, যাতে ইংরেজরা সুতানুটিতে থাকতে পায়, কলিকাতা গ্রামে উপনিবেশ পত্তন করতে পারে।
‘বিবি চার্নক চিন্তিত হলো। শেষে বাঘের গর্তে আয়ারকে ঠেলে পাঠানো হবে? চার্নক বলল, “আয়ারকে আমি বিশ্বাস করি, ওর মধ্যে ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনা দেখি। আমি যখন বেঁচে থাকব না, ও–ই একদিন ক্যালকাটার গভর্নর হবে।” বিবি বলল, “সে তো পরের কথা। কিন্তু ওকে আমার জামাই করার সাধ হয়েছে। ওর যদি কোনো ক্ষতি হয়, আমার দুঃখের সীমা থাকবে না।”
“আমি ঈশ্বরকে ডাকি, আমার নিজের কোনো পরিকল্পনা ছিল না।” চার্নক মাস্টারকে লিখেছিলেন, no doubt tongue-in-cheek’ (Diaries, Job Charnock to Streynsham Master)।’ হেজেস এমন অভিযোগ করেছিলেন। বাংলার মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ওপর কার্যত একচেটিয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পর জব চার্নক মাদ্রাজ এবং বাংলায় মোগল কর্তৃপক্ষ উভয়ের থেকে স্বাধীনভাবে নিজের নেতৃত্বে একটি প্রেসিডেন্সির ভিত্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী পনেরো বছরে, তিনি ঠিক এটিই অর্জন করেছিলেন। চার্নক এবং তাঁর নেটওয়ার্কের অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্য, যার মধ্যে ঢাকায় চার্লস আয়ারও ছিলেন (Dacca dairies)।
চার্নক দম্পতির মিশ্র বর্ণের জ্যেষ্ঠ সন্তান মেরি, তৎকালীন ঢাকার একজন কাউন্সিলর চার্লস আইরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। চার্লস আয়ার, যিনি অবশেষে তার শ্বশুরের উত্তরসূরি হয়ে সদ্য স্বাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রথম গভর্নর হবেন, তিনি নিজেও একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ছিলেন।
সি আর উইলসনের Early annals of the English in Bengal–এ বর্ণিত—‘কোম্পানির ছয়জন প্রতিনিধি চার্লস আয়ার চার্ল ও রজার ব্রাডিল ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস থেকে ঢাকায় অবস্থান করে নবাবের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা চালাচ্ছিলেন এবং সেই জন্য আবার অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ discreet person (স্থবিবেচক ব্যক্তি) পাঠিয়ে আলোচনা জোরালো করার ব্যাপারে ইয়েল মনোযোগ দিলেন না। ৮ নভেম্বর কলকাতা থেকে চার্নকের অপসারণ, ক্যাপ্টেন হিথের বালেশ্বর লুণ্ঠন, চট্টগ্রামে তাঁর ছলচাতুরী এবং আরাকানি রাজা ও তাঁর বিদ্রোহী দলপতির সঙ্গে বন্ধুত্বহীন ব্যবহার—এসব অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপগুলো বাহাদুর খানকে ইংরেজদের প্রতি কঠোর হতে বাধ্য করেছিলেন। বাহাদুর খানের প্রত্যাবর্তনের সংবাদ ঢাকায় পৌঁছাল ১৬৮৯ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। পাটনার নবাব ইব্রাহিম খান ঢাকায় বদলি হলেন। ঢাকার সুবেদারি লাভের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইব্রাহিম খান চার্লস কিংকে তলব করলেন। নতুন নবাব ঢাকায় পদার্পণের পূর্বেই ১৬৮৯ সালের ২৯ জুন, ইংরেজদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য তাঁর দেওয়ানকে আদেশ দিলেন (Dacca dairies)।
কোর্ট অব ডিরেক্টরস টু বেঙ্গল-এর নথিতে উল্লেখিত যে চার্নকের কৌশল ও আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলার নওয়াবের বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত, সীমিত এবং মূলত প্রতীকী সামরিক অভিযান পরিচালনা করা, যাতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে একটি মীমাংসা লাভ করা যায়। আর তার ফলে কোম্পানির একটি নতুন বসতি স্থাপনের জন্য হয়তো কোনো এলাকা বা অঞ্চল অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে। তবে চার্নক পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে প্ররোচনামূলক চিঠির প্রবাহের মাধ্যমে, স্যার জোসিয়াহ চাইল্ডের চেয়েও বেশি কিছু অর্জনের আশা করেছিলেন। তিনি বাংলার বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজনীয়তার জন্য পরিচালকদের সম্মত করার জন্য চাপ দিতে সফল হন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে এটি একটি জোরালো অভিযানের মাধ্যমে করা উচিত, যা মোগল সাম্রাজ্যের ওপর একটি সাঁড়াশি আক্রমণের অংশ হবে এবং এর মধ্যে চট্টগ্রাম এবং এমনকি বাংলায় নওয়াবের রাজধানী ঢাকা দখল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এভাবে যখন চার্নক হিজলিতে একটি ছোট মোগল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং হুগলি এবং বালাসোর উভয়কেই ধ্বংস করার পর আলোচনা শুরু করেন, তখন কোম্পানির পরিচালকদের কমিটি তাকে ‘সব সম্ভাব্য প্রতিশোধ’ নেওয়ার জন্য তার সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে এবং তাকে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবস্থাপনা দিয়ে ঢাকা দখল করার নির্দেশ দেয়। বলাবাহুল্য, ঢাকা দখলের সে খায়েশ পূরণ হয়নি তখন।
সাল ১৬৮৯, জাহাজের প্রধান খবর পেলেন, যেসব ইংরেজ প্রতিনিধি ঢাকার কারাগার থেকে সবেমাত্র মুক্তি পেয়েছিলেন, তাঁরা আবার বন্দী হয়েছেন। ঢাকায় অবস্থানকালে আয়ার, ব্রাডিল এবং অগ্তান্তর আশঙ্কা করেছিলেন যে আওরঙ্গজেবের রাজ্যসীমা থেকে ইংরেজ-উচ্ছেদের আদেশ অমান্যকারীরা হয়তো দ্বিতীয়বার বন্দী হবেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একমত হয়েছিলেন—‘to leave the factory divide and leave obscurely in the citty or places adjacent till an opportunity offers for our departure’ (Dacca diary).
ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ ছক
সি আর উইলসন উল্লেখ করেছেন, পদাধিকার বা ক্ষমতাবলে চার্নক তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে বাংলার অভ্যন্তরে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেন, যাঁর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তাঁর জামাতা চার্লস আয়ার, যাঁকে ঢাকার নতুন প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছিল। এই ক্ষমতায়, আয়ার কলকাতার ওপর কোম্পানির দখল মেনে নেওয়ার জন্য নবাবের সাথে আলোচনা করেন। ঢাকায় আয়ার উৎসাহের সাথে তাঁর শ্বশুরের ‘মহান পরিকল্পনা’–কে এগিয়ে নিয়ে যান। সুতানুটি দখলের জন্য, একটি বিশেষ অনুদানের জন্য অনুরোধ করেন। তিনি চার্নককে নবাবের ‘মহান সৌজন্য’ এবং বাংলায় আমাদের (স্থায়ী) প্রত্যাবর্তন এবং বসতি স্থাপনের জন্য তাঁর আবেগপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবহিত করেন। (WH Diary) সি আর উইলসন উল্লেখ করেছেন, ‘ক্যাথরিন চার্নকের স্বামী, জোনাথন হোয়াইট, কলকাতার কাউন্সিলর হিসেবে উন্নীত হন। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে, আয়ার তাঁর নিজের জামাতা, জন মুসেলকেও কাউন্সিলে নিয়োগ করেন। এই সময়ে চার্নক আত্মীয়তার নেটওয়ার্কের ঘনিষ্ঠতা ১৭০৪ সালে জোনাথন হোয়াইটের উইলে প্রতিফলিত হয়, যেখানে নেটওয়ার্কের অনেক সদস্যই বিশিষ্টভাবে উপস্থিত ছিলেন। যখন চার্নক ১৬৯৩ সালে মারা যান, বাংলার নবাব সুতানুটির ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের বৈধতা প্রদানকারী ফরমান আটকে রাখেন।’
বাংলায় ইংরেজ প্রতিভূ
গবেষক ডেভি ভিভার্সের প্রবন্ধে জব চার্নককে একজন করপোরেট সামরিকবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে, মোগল কর্তৃত্ব এবং ভারতীয় সমাজের প্রতি গভীর শত্রুতার মনোভাবে গঠিত একজন কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৬৮০-এর দশকের চার্নক কোম্পানির কর্মকর্তা হিসেবে বাংলায় ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। চার্নক তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর চট্টগ্রামের মতো মোগল কেন্দ্রগুলোয় আক্রমণের পরিকল্পনা সমর্থন ও প্রতিপালনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো কেবল প্রতিরক্ষামূলক ছিল না; তাঁদের মোগল রাজ্যকে বর্ধিত বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বাধ্য করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ ছিল। এ ধরনের উদ্দেশ্যগুলো মূলত বাণিজ্যিক অভিযোগগুলোকে কার্যত আঞ্চলিক নৌ আগ্রাসনে রূপান্তরিত করেছিল।
এই রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের প্রতি চার্নকের শত্রুতা বুঝতে হবে। প্রবন্ধটি মোগল কর্মকর্তা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কোম্পানির যুদ্ধাত্মক বক্তব্য তুলে ধরে, যাঁদের বাধাদানকারী এবং অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। বাংলায় প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক রীতিনীতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরিবর্তে, চার্নক এবং তাঁর সহকর্মীরা ক্রমবর্ধমানভাবে ভারতীয়দের দমন বা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিপক্ষ হিসেবে তৈরি করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি হিংসাত্মক সংঘর্ষে অবদান রেখেছিল, যার মধ্যে ছিল মোগল জাহাজ চলাচল এবং বসতিগুলোয় আক্রমণ, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং প্রতিশোধের প্ররোচনা দেয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম আক্রমণের প্রতি তাঁর সমর্থন দেখায় যে কীভাবে করপোরেট স্বার্থের প্রতিরক্ষা সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিকশিত হওয়ার ফলে বাংলার জনগণের উল্লেখযোগ্য মানবিক এবং রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছিল।
পরবর্তী সময় ক্লাইভ পরিবার ও আঠারো শতকে বাংলার রাজনৈতিক বসতি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, প্রদেশের অধিবাসীদের পরবর্তী পরাধীনতার ব্যবস্থাপত্র কোম্পানির কর্মচারীদের এবং তাঁদের পারিবারিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। ফোর্ট সেন্ট ডেভিডের ডেপুটি গভর্নর এবং ভারতে কোম্পানির বাহিনীর কমান্ডার এবং প্রধান হিসেবে, রবার্ট ক্লাইভ এবং তাঁর অধস্তনরা, যাঁদের অনেকেই তাঁর পরিবারের সদস্য ছিলেন, এক প্রজন্ম আগে চার্নকদের নীতিগুলোকে পুঁজি করে সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেবল বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করাই নয়, প্রধানত বাংলার সামরিক ক্ষমতা এবং সম্পদ সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে তাঁরা সব অঞ্চলের ওপর একক কর্তৃত্ব এবং অধিকার প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন।
জব চার্নকের কলকাতা–পরবর্তী ৬৫ বছরের ব্যবধানে ক্লাইভময় হয়ে ওঠে। উভয় ব্যক্তিকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের মূল স্থপতি হিসেবে দেখা হয়। কথিত যে চার্নক কলকাতা শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (চার্নক যে কলকাতার স্রষ্টা নন, এবং কলকাতা অনেক পুরোনো, এই মর্মে কলকাতা হাইকোর্টের রায় আছে), যা বাণিজ্য ও ক্ষমতার জন্য পরবর্তী সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে; অন্যদিকে ক্লাইভের সামরিক অভিযানগুলো রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছিল, যা কোম্পানিকে একটি বাণিজ্যিক সত্তা থেকে একটি শাসক শক্তিতে রূপান্তরিত করার সুযোগ দেয়। জব চার্নক মৃত্যুবরণ করেন ১৬৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি, কলকাতায়। সমাধি প্রস্তরে উৎকীর্ণ—‘জব চার্নক, ইংরেজ নাইট এবং সম্প্রতি এই বাংলা রাজ্যে ইংরেজদের সবচেয়ে যোগ্য প্রতিনিধি’। জব চার্নকের ৬১ বছরের জীবনকালের মধ্যে ৩৬ বছরের ভারত জীবন ও ৩৪ বছর কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে তাঁর সমাধি প্রস্তরে উৎকীর্ণ এই বাক্যের সাথে মতভিন্নতা থাকার সুযোগ কোথায়!