রোকেয়ার বিশ্বযাত্রা

বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্য অনূদিত না হওয়ার অনুযোগ পুরোনো, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা তেমন নেই। এই লেখায় অনুসন্ধান করা হয়েছে কেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আজ বিশ্বজুড়ে পঠিত ও স্বীকৃত। উত্তর-ঔপনিবেশিকতা ও বৈশ্বিক নারীবাদচর্চার প্রেক্ষাপটে রোকেয়ার এই নীরব বিশ্বযাত্রার পাঠই লেখাটির কেন্দ্র।

মাসুক হেলালের আঁকা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিকৃতি অবলম্বনে অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

বাংলা সাহিত্য, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বাংলাদেশের সাহিত্য বিদেশি ভাষায় অনূদিত হচ্ছে না, অনুযোগটি বহুদিনের পুরোনো। উন্নতমানের অনুবাদের অভাবের কথা বারবার বলা হয়। অন্য ভাষা থেকে বেশি অনুবাদ হচ্ছে, সেটাও উল্লেখ করা হয়। অনুযোগের পেছনে অভিমানের সুর স্পষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের সৃষ্টিশীল লেখা বিশ্বদরবারে কেন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না, তার বাস্তব কার্যকারণ অনুসন্ধান করা হয় খুব কম। অভিজাত ও প্রতাপশালী ইউরোপীয় ভাষাগুলোর আন্তভাষা অনুবাদের হার বেশ দ্রুত, কথাটি সত্যি। পূর্বইউরোপীয় ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও কথাটি খাটে, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে দাবিটি প্রযোজ্য নয়। মনে রাখা দরকার, ইউরোপীয় ভাষায় অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রতীচ্যের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে সাহিত্যিক মানই যথেষ্ট নয়। ভাষাগুলো ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অনুবাদের ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা রাখে। অনুবাদের সম্ভাব্যতা নির্ধারণে জনগোষ্ঠীর হার্ড ও সফট পাওয়ার অতি গুরুত্বপূর্ণ।

সহজ ভাষায়, অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব বড় এক নিয়ামক। ভাষার গুরুত্ব আবার বিশ্বরাজনীতিতে জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক প্রভাবের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। অনুবাদের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে। প্রতীচ্য একাডেমিতে শক্তিমান জাতিরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি উদীয়মান শক্তির ভাষা ও সাহিত্যই চর্চিত হয়। এর ব্যতিক্রম আশা করা আকাশকুসুম কল্পনা। বিশ্বরাজনীতির ময়দানে বাংলাভাষী ও বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর নিম্ন অবস্থানের কারণেই বাংলা সাহিত্য অনূদিত হয় না। কিন্তু জনগোষ্ঠীর গুরুত্বগত অবস্থানের কারণে আরবি, ফারসি ও তুর্কির পাশাপাশি ম্যান্ডারিন, জাপানি ও কোরীয় সাহিত্য ব্যাপকভাবে অনূদিত হয়ে থাকে। অথচ উন্নত সাহিত্যের আধার হওয়া সত্ত্বেও উর্দু ও বাংলা ভাষা প্রতীচ্য একাডেমিতে আজও ব্রাত্য। ফলে অনুবাদও অনুপস্থিত।

গত চল্লিশ বছরে প্রতীচ্য একাডেমিতে উত্তর-উপনিবেশবাদ ও নারীবাদচর্চার উত্থানের সূত্রে বেগম রোকেয়ার পরিচিতি ঘটেছে। ১৯৯০–এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন একাডেমিতে দক্ষিণ বলয় অর্থাৎ দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোয় নারীবাদ চর্চা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

বাঙালি মুসলমান কিংবা বাংলা অঞ্চলের মুসলমান লেখকদের মধ্যে ঘটনাচক্রে একমাত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)। রোকেয়ার স্বীকৃতি অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে আসেনি। তাঁর স্বীকৃতি এসেছে বেশ ধীরে, অনেক পরে। প্রতীচ্য বিশ্বে একাডেমিক নজরের পরিবর্তনের কারণে। বিষয়টি সম্যকভাবে বোঝা দরকার। গত চল্লিশ বছরে প্রতীচ্য একাডেমিতে উত্তর-উপনিবেশবাদ ও নারীবাদচর্চার উত্থানের সূত্রে বেগম রোকেয়ার পরিচিতি ঘটেছে। ১৯৯০–এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন একাডেমিতে দক্ষিণ বলয় অর্থাৎ দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোয় নারীবাদ চর্চা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিবাসী ও ডায়াস্পোরা নারী একাডেমিশিয়ানের উত্থান এর বড় কারণ। মার্কিন নারীবাদচর্চায় বড় এক বদল ঘটে একই কালপর্বে। মার্কিন নারীবাদ হয়ে ওঠে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিশ্বপরিমণ্ডলের ভাবনায় জারিত।

১৯৯০–এর দশকের উপান্তেও নারীবাদ বলতে বোঝাত মূলত ইউরো-আমেরিকান ও শ্বেতাঙ্গ নারীদের বিষয়-আশয়, তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনা। সাদা নারীদের জীবন ও সংগ্রাম, সাদা নারীদের সাহিত্য ও সমাজ–ভাবনা এবং সাদা নারীদের লড়াই ও তৎপরতায় সীমাবদ্ধ ছিল প্রতীচ্যের নারীবাদচর্চা। ১৯৬০–এর দশকে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের নারীবাদ আন্দোলন প্রজননের অধিকার, লিঙ্গ ও আইনি বৈষম্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। ১৯৮০–এর দশকে জন্ম নেওয়া নেতৃত্বের হাতে গড়ে ওঠে তৃতীয় প্রজন্মের নারীবাদ। মধ্য নব্বইয়ের দশকে তাত্ত্বিক বেল হুকসের (১৯৫২-২০২১) উত্থান। ফেমিনিস্ট থিওরি: ফ্রম মার্জিন টু সেন্টার (১৯৮৪) গ্রন্থ এবং অন্যান্য লেখায় বেল হুকস প্রথমবারের মতো নারীবাদচর্চায় শ্বেতাঙ্গ নারীর সুবিধাজনক অবস্থান লক্ষ্য করে আলোচনা শুরু করেন। হুকসের লেখায় উঠে আসে কৃষ্ণাঙ্গ নারীর যাপিত জীবনের দ্বৈত বিপদ। হুকস দেখান, কৃষ্ণাঙ্গ নারী বঞ্চিত ও প্রান্তিকতায় পর্যবসিত হয় দুই ধাপে—প্রথমত, নারী হিসেবে; এবং আরও বিশেষভাবে কৃষ্ণ গাত্রবর্ণের নারী হয়ে জন্মে। দ্বিতীয়ত, শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত নারীবাদচর্চায় তার প্রান্তিক অবস্থানের কারণে। মধ্যবিত্ত ঘরের সাদা মেয়ে কালো মেয়ের বঞ্চনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা বোঝে না। হুকসের ভাষায় বোঝার কথাও নয়। বুঝবে কী করে, সাদা মেয়েরা তো আর কালো মেয়ের জীবন যাপন করেনি। আর শত বঞ্চনা সত্ত্বেও সাদা হয়ে জন্মে শ্বেতাঙ্গ পুরুষের মতো শ্বেতাঙ্গ নারীও সামাজিক জীবনে কৃষ্ণাঙ্গ নারীর চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাভোগী।

হুকসের কথা রাষ্ট্র হতে দেরি হয়নি। তাঁর যুক্তি অগ্রাহ্য করার উপায়ও ছিল না। হুকসের সূত্র ধরেই মার্কিন একাডেমিতে তৃতীয় বিশ্বের নারীবাদচর্চার উত্থান ঘটে। কান টানলে মাথা আসার মতো হাজির হয় ঔপনিবেশিক সমাজে নারীর অবস্থানগত প্রশ্ন। নারী ও উপনিবেশিত সত্তা, দুই অর্থেই, হুকস–কথিত কৃষ্ণাঙ্গ নারীর মতো তাদেরও অবস্থান প্রান্তিকতায় পর্যবসিত। মার্কিন মুলুকে অভিবাসী অশ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের হাতে উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকতা আর ব্ল্যাক ফেমিনিজমের উত্থান ঘটে প্রায় হাত ধরাধরি করে। ডায়াস্পোরা, বহুসংস্কৃতিবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বহু কণ্ঠস্বরের ভাবনায় বদলে যায় প্রতীচ্যের নারীবাদী ভাবনা। মার্কিন (এবং ইউরোপীয়) বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে তৃতীয় বিশ্বের তাত্ত্বিকদের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে ভারতীয় পণ্ডিতদের বরাবরই একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ প্রাধান্য। সঙ্গে জোটে কিছু অভিবাসী পাকিস্তানি ও আরব দুনিয়ার নারী অধ্যাপক। ব্রাউন স্কিনের নারীবাদী পণ্ডিতদের দল বেঁধে তত্ত্বচর্চা ওঠে তুঙ্গে।

রোকেয়া পাঠের পেছনে ভিন্ন আরেকটি মাত্রাও বিদ্যমান ছিল। বিশুদ্ধ নারীবাদ ছাড়াও মুসলিম নারী প্রসঙ্গ সে সময়ে হয়ে ওঠে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম নারীমাত্রই চিন্তাশক্তিরহিত, একশিলাধর্মী ও অবশ্যম্ভাবীরূপে অপরিবর্তনীয়—এই ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবাদী ধারণাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

রোকেয়ার রচনাবলি হয়ে ওঠে এঁদের আলোচনার অন্যতম টেক্সট। রোকেয়া পাঠের পেছনে ভিন্ন আরেকটি মাত্রাও বিদ্যমান ছিল। বিশুদ্ধ নারীবাদ ছাড়াও মুসলিম নারী প্রসঙ্গ সে সময়ে হয়ে ওঠে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম নারীমাত্রই চিন্তাশক্তিরহিত, একশিলাধর্মী ও অবশ্যম্ভাবীরূপে অপরিবর্তনীয়—এই ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবাদী ধারণাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। নিজস্ব কর্তাসত্তা–রহিত ও দুর্বল মুসলিম নারীর রক্ষাকর্তারূপে শ্বেতাঙ্গ পুরুষের অনিবার্যতার ধারণাও খারিজের প্রবণতা দেখা যায়। ভায়োলেন্স–প্রবণ মুসলমান পুরুষ ও নির্যাতিত মুসলিম নারী বাইনারির পেছনে প্রাচ্যবাদী অভিসন্ধি চিহ্নিত করা হয়।

রোকেয়ার বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধ ও সৃষ্টিশীল রচনা প্রাচ্যবাদী ভাবনার বিপক্ষে দারুণ অস্ত্রের মতো কাজ করেছিল। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য লেখকের পাশাপাশি রোকেয়ার রচনাবলি পাঠ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মার্কিন একাডেমিক জগতে তিনজন সৃষ্টিশীল ও অশ্বেতাঙ্গ মুসলিম নারী লেখকের তখন দারুণ কদর। বাংলার রোকেয়া ছাড়া উর্দুর ইসমত চুগতাই (১৯১১-১৯৯১) আর মরক্কোর ফাতেমা মারনিসি (১৯৪০-২০১৫) সে কালপর্বের তারকা লেখক। এ ছাড়া মিসরের নাওয়াল এস সাদাওয়ি (১৯৩১-২০২১) তো ছিলেনই। নাওয়ালের পাশাপাশি ফাতিমা মারনিসির আত্মজৈবনিক লেখাগুলোও তখন অনেক জনপ্রিয়। একাডেমির বাইরেও মারনিসি বেস্টসেলার লেখক। মারনিসির ড্রিম অব ট্রেসপাস শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষও গভীর আগ্রহে পড়েছেন।

এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম বইটি স্থান পেতে শুরু করে। সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের দ্য ফেমিনিস্ট প্রেসও রওশন জাহানের সম্পাদনায় বইটি (১৯৯৩) প্রকাশ করে। নিউইয়র্ক, কুইন্স ও ব্রুকলিনের পাবলিক লাইব্রেরিতে বইটি সাধারণ পাঠকের জন্য লভ্য হয়। কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির স্টাইনওয়ে শাখায় তাহেরা নকভী অনূদিত চুগতাইয়ের দ্য কুইল্ট অ্যান্ড আদার স্টোরিজ বইটির পাশাপাশি রোকেয়ার বইটিও আমি দেখেছি। রোকেয়ার লেখা যে ভালোভাবে প্রতীচ্য পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, রোকেয়ার রচনাবলির পরবর্তী গতিপথ তার প্রমাণ। বর্ণিতা বাগচীর অনুবাদে পেঙ্গুইন ক্ল্যাসিক সিরিজ ইতিমধ্যে বের করেছে সুলতানা’স ড্রিম আর পদ্মরাগ (২০২২)। শুধু নারীবাদী ভাবনার কারণে নয়, কল্পনা ও সৃষ্টিশক্তির কারণেও রোকেয়ার আবেদন ব্যাপক। ভাবা যায়, সেই ১৯০৫ সালের লেখায় বিজ্ঞান কল্পগল্প আর নারীবাদী ইউটোপিয়ার মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন রোকেয়া!

জেন্ডার স্টাডিজ, উইমেন স্টাডিজ, ফেমিনিজম, ফেমিনিস্ট লিটারেচার, থার্ড ওয়ার্ল্ড লিটারেচার, নৃবিজ্ঞান, এরিয়া স্টাডিজ, সোশিওলজির মতো জ্ঞানকাণ্ডের বিচিত্র শাখার পাঠ্যসূচিতে রোকেয়ার রচনা এখন অন্তর্ভুক্ত। আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়, মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ে রোকেয়ার বিশ্বজয় ঘটেছে।

চুইয়ে পড়া অর্থনীতির মতো আজ বিচিত্র শাস্ত্রে রোকেয়ার রচনা পঠিত হয়। জেন্ডার স্টাডিজ, উইমেন স্টাডিজ, ফেমিনিজম, ফেমিনিস্ট লিটারেচার, থার্ড ওয়ার্ল্ড লিটারেচার, নৃবিজ্ঞান, এরিয়া স্টাডিজ, সোশিওলজির মতো জ্ঞানকাণ্ডের বিচিত্র শাখার পাঠ্যসূচিতে রোকেয়ার রচনা এখন অন্তর্ভুক্ত। আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়, মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ে রোকেয়ার বিশ্বজয় ঘটেছে। মার্কিনের অনুসরণে ইউরোপীয় বিদ্যায়তনেও রোকেয়ার রচনা এখন অন্তর্ভুক্ত। রোকেয়াহীন দক্ষিণ এশীয় মানবীবিদ্যাচর্চা আজ কল্পনা করাও কঠিন। মোদ্দাকথা, রোকেয়ার রচনা ক্যাননের মর্যাদা লাভ করেছে।

ছাত্র ও কর্মজীবনে আমি ভিনদেশি অনেক বন্ধু ও সহকর্মী পেয়েছি। দেখে অবাক হয়েছিলাম যে উচ্চতর ডিগ্রিপ্রার্থী আরব ছাত্রছাত্রীরা রোকেয়ার নামের সঙ্গে বেশ পরিচিত। অন্তত আমি যাঁদের পেয়েছি, তাঁরা শুধু জানেনই না, অনেকে পড়েছেনও তাঁর লেখা। বিখ্যাত ফিলিস্তিনি চিত্র পরিচালক ঘাসান ফাওজি তো রোকেয়ার আধুনিকতায় বিস্মিত। রোকেয়ার নাম বলতে ঘাসান অজ্ঞান। বাংলা অঞ্চলের মতো পশ্চাৎপদ এলাকায় সেই সেকালে রোকেয়ার মতো লেখক কী করে জন্মেছেন, একালের কায়রো-দামেস্ক, বাগদাদ-আলেপ্পো, আম্মান-বৈরুত আর ফেজ-তুনিশের ছাত্রীরা ভেবে কূল পান না। উঠতি আরব পণ্ডিতকুলের মধ্যে রোকেয়ার প্রতি সম্ভ্রম এবং আরবের সংস্কৃতিচর্চায় রোকেয়ার নামের উল্লেখ আমার কাছেও ছিল বিস্ময়কর।

কিছুদিন আগের কথা বলি। আরবি সায়েন্স-ফিকশনের জন্মবৃত্তান্ত আর হালহকিকত নিয়ে অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি লেখা হাতে এল। লেখক (একজন আরব নারী) আরবি সায়েন্স ফিকশনের উৎপত্তির আলোচনা প্রসঙ্গে ইসলাম ও মুসলিম সমাজে ফ্যান্টাসি ও ইউটোপীয় সাহিত্য নিয়ে আলোচনার অবতারণা করেছেন। বলা বাহুল্য, আলোচনার বিরাট অংশ জুড়ে রোকেয়ার কথা। অথচ আমরা এখনো জানিই না রোকেয়াই বিশ্বজুড়ে এমন বিপুলভাবে পঠিত, আলোচিত এবং প্রশংসিত একমাত্র বাঙালি মুসলমান লেখক। সবার অলক্ষ্যে, বলতে গেলে প্রায় নীরবে, রোকেয়ার বিশ্বজয়ের এই কাহিনি বিস্ময়কর। কিন্তু ইন্দো-ফারসি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী আর খানদানি উর্দুভাষী জমিদার পরিবারের কন্যা ও বধূ রোকেয়া পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে কেন যে বাংলা শিখলেন, আর কেনই–বা বাংলায় লিখলেন, এটা আরও বিস্ময়কর!