জাদুকরের ইঁচড়ে পাকা শিষ্য

জোসেফ কার্ল স্টিলারের ১৮২৮ সালে আঁকা গ্যোতের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। গ্রাফিকস প্রথম আলো

জার্মানির কবি ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোতের আজ ২৮ আগস্ট ২৭৭তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর ডের জাউবারলেয়ারলিং কবিতাটি মূল জার্মান থেকে ‘জাদুকরের ইচড়ে পাকা শিষ্য’ নামে বাংলায় অনুবাদ করা হলো। এআইসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই সময়ে কবিতাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। তাই কবিতার শেষে একটি আলোচনা যুক্ত করা হলো। অনুবাদ ও আলোচনা: মুহাম্মদ তাসনীম আলম।

বৃদ্ধ ওস্তাদ জাদুকর

অবশেষে গেলেন চলে!

এখন তাঁর জাদুর মন্ত্র

চলবে আমার ছলেবলে।

তাঁর মন্ত্র আর কাজের মর্ম

রেখেছি মনে রীতিনীতি যত,

দিলের তলে হিম্মত-ধর্ম

দেখাব তেলেসমাতি শত।

ঢেউ খেলিয়ে বয়ে চল! বয়ে চল!

পাড়ি দিয়ে খানিক পথ,

আমার মর্জির কায়দা মেনে

পানির নহর আসুক ছুটে,

তেজালো আর জোরালো স্রোতে

চৌবাচ্চা ভরুক টইটম্বুর।

আয়রে ওরে বুড়ো ঝাড়ু

সামনে এসে দাঁড়া!

জীর্ণ ন্যাকড়া জড়িয়ে নে তোর

হাড়-জিরজিরে গা,

ঢের হয়েছে গোলামি তোর

খাটলি বহুকাল

এবার আমার মর্জিমতো

খাটবি চিরকাল।

দাঁড়া এবার দুই পায়েতে

মাথায় গজাক খুলি,

পানির কলসি বাগিয়ে নিয়ে

যা জলদি পা দুটি তুলি!

ঢেউ খেলিয়ে বয়ে চল! বয়ে চল!

পাড়ি দিয়ে খানিক পথ,

আমার মর্জির কায়দা মেনে

পানির নহর আসুক ছুটে,

তেজালো আর জোরালো স্রোতে

চৌবাচ্চা ভরুক টইটম্বুর।

দেখ, সে যাচ্ছে ছুটে নদীর তীরে

সত্যি, পৌঁছে গেছে দরিয়ার কিনারে

বজ্রবেগে ফিরল আবার

জল ঢালে সে প্রবল স্রোতে।

এই নিয়ে তো দুবার এল

উপচে পড়ে চৌবাচ্চা!

কীভাবে সব পেয়ালা-বাসন

ভরে ওঠে জলে ঠাসা!

থাম! থাম!

তোর কাজ তো হলো সারা!

সয়লাব হলো চৌবাচ্চা!

আহা, বুঝেছি! হায় রে হায়!

থামাব যে মন্ত্র বলে

সে মন্ত্রই গেছি ভুলে!

আহা, সেই মন্ত্রটা

থাকত যদি মনে

যা আওড়ালে ঝাড়ুখানা

যেত আগের মতো হয়ে!

হায়, সে তো ছুটছে আর

জল এনে চলেছে!

ইশ্‌! তুই যদি আগের সেই

বুড়া ঝাড়ুই হতি!

হায়! শয়ে শয়ে নদীর স্রোত

আছড়ে পড়ছে আমার ওপর!

না! আর নয়!

এভাবে চলবে না আর!

ধরতে হবে এবার তাকে!

একি ফেরেব্বাজি! একি শয়তানি!

হায়! আতঙ্ক যে বাড়ছে ক্রমে!

কী সর্বনাশা সুরত!

ওগো, কী খতরনাক নজর!

ওরে, নরকের কীট!

আস্ত বাড়িটাই কি ডুবিয়ে মারবি?

দেখছি, সব চৌকাঠ পেরিয়ে

পানির স্রোত ঢুকছে ঘরে!

ওরে, কমবখত একরোখা ঝাড়ু,

কথা কি তোর যায় না কানে?

ছিলি তো স্রেফ একটুকরো লাঠি

আবার সেই লাঠি হয়ে

থাম শালা তুই

থাম না রে!

থামবি না তুই

জেদ ধরেছিস?

ধরব তোকে

কষে জাপটে!

পুরোনো এই কাঠটাকে

ধারালো কুঠারের ঘায়ে

দু-টুকরো করে ছাড়ব!

ওই দেখ, সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরছে আবার!

এই তো সুযোগ—ঝাঁপিয়ে পড়ার!

ওরে শয়তান! পালাবি কোথায়?

কুঠারের ধারালো ফলায়

মড়মড়িয়ে পড়বি লুটে

একনিমেষে মাটির বুকে!

শাবাশ! কী এক দারুণ আঘাত!

দেখ, বিলকুল দুই টুকরো হলো!

এবার তবে আশা জাগে

বাঁচি বুঝি হাঁপ ছেড়ে!

হায়! হায়!

দুই টুকরোই দেখি

ধুম করে

দাঁড়িয়ে গেছে,

দুই চাকর যেন

কাজ করতে মরিয়া!

হায়, বাঁচাও আমায়!

ওগো, বাঁচাও, বাঁচাও!

তারা ছুটছে! ছুটছে তো ছুটছেই!

ঘরে আর সিঁড়িতে বাড়ছে জল

সবকিছু ভিজে একাকার!

কী ভয়ংকর এই জলস্রোত!

ওস্তাদ, ও হে গুরু, শুনতে

কি পাও আমার ডাক?

আহা, ওই তো আসছেন গুরু!

গুরু আমার, বড্ড বিপদ!

ডেকেছিলাম যে আত্মাদের

পারছি না এখন তাড়াতে তাদের!

‘ঝাড়ু! ওরে ঝাড়ু!

কোনায় গিয়ে থাম!

যা কিছু করার ছিল

সবই তো হলো সারা।

তোরা তো প্রেতাত্মা

জাগাতে তোদের ফের

ডাক দেবেন সেই মহাত্মা!’

ইতালির রোমের ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোতে। ১৭৮৭ সালে জার্মান নিওক্ল্যাসিক্যাল চিত্রশিল্পী ইয়োহান হাইনরিশ ভিলহেল্ম টিশবাইন ছবিটি আঁকেন। বর্তমানে ছবিটি ফ্রাঙ্কফুর্টের স্ট্যাডেল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত
ছবি: উইকিপিডিয়া

১.

গ্যোতের এই কবিতা প্রকাশিত হয় ১৭৯৭ সালে। এর কয়েক বছর আগে ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা ফরাসি বিপ্লব ঘটে গেছে। ইংলিশ চ্যানেলের ওপারের শিল্পবিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ইউরোপের দেশে দেশে।

‘ডেয়ার-ৎসাউবারলেয়ারলিং’ প্রকাশের এক যুগের কিছু বেশি সময় পর ১৮১১ সালে শিল্পবিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারে শ্রমিকেরা যন্ত্র ভাঙতে শুরু করেন। পরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ইয়র্কশায়ার ও ল্যাঙ্কাশায়ারে, যা লুডাইট আন্দোলন নামে পরিচিত। এর সঙ্গে এই কবিতার সম্ভবত সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও এমন একটা ‘ঝানু-ভাঙা’ সময়ে মধ্যবয়সী গ্যোতে ভাইমারের রাজদরবারে বসে কেন এমন একটি কবিতা লিখছেন, তা বুঝতে এসব ঘটনা মনে রাখা ভালো।

আখ্যানধর্মী এই কবিতার কাহিনি খুব সরল। বৃদ্ধ জাদুকর আস্তানা ছেড়ে বাইরে গেছেন। এ ফাঁকে শিষ্যকে ডেরা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করতে হবে। ইঁচড়ে পাকা শাগরেদ ভাবল, কষ্ট করব কেন? আমি তো মন্ত্র জানি!

গ্যোতের ‘জাদুকরের ইচড়ে পাকা শিষ্য’ কবিতা অবলম্বনে তৈরি একটি দৃশ্য
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

শিষ্য ঘরের কোনায় থাকা ঝাড়ুকে অদূরের কূপ থেকে পানি আনার নির্দেশ দেয়। মন্ত্র পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়ু বালতি নিয়ে পানি আনতে শুরু করে। অবিরাম পানি আনতে থাকে। পানিতে চৌবাচ্চা উপচে ঘর ভেসে যাওয়ার দশা। নানা চেষ্টা করেও ঝাড়ুকে থামানো যায় না। কারণ, শিষ্যের তো প্রতিমন্ত্র বা নির্দেশ বাতিল করার মন্ত্র জানা নেই।

একপর্যায়ে একটি লাঠি নিয়ে ঝাড়ুকে আঘাত করে বেচারা শিষ্য। সজোর আঘাতে ঝাড়ু দুই টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু ওই দুই টুকরো ঝাড়ু দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। তারা দ্বিগুণ গতিতে পানি আনতে শুরু করে। এতে শিষ্যের চোখ কপালে ওঠে। হায়! হায়! একি হলো!—ভাবে বাচাল শিষ্য।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে শিষ্য কেঁদেকেটে একাকার। ঝাড়ুর পানি আনা থামাতে সে গুরু, ওস্তাদসহ নানা মহাশক্তির দোহাই পাড়ে। কিছুতে কিছু হয় না। একসময় ওস্তাদ ফেরেন। তাঁর মন্ত্রে ঝাড়ু থেমে যায়।

রূপক এই কবিতার অর্থ হলো ক্ষমতা, সৃষ্টিশীলতা, স্বাধীনতা বা কর্তৃত্বের মতো বিষয়ের সীমাজ্ঞান থাকা জরুরি। তা না হলে শক্তিই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২.

কবিতাটির কাহিনি গ্যোতের নিজের নয়। প্রাচীন গ্রিক লেখক সামোসাতার লুকিয়ানুস থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন।

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের লুকিয়ানুস ফিলোপ্সয়ুডেস (Philopseudes) নামের একটি ব্যঙ্গগদ্য লেখেন। এতে ঢেঁকি বা মসলা ভাঙার কল ছিল একটি প্রধান চরিত্র। জাদুর মাধ্যমে এই উখলি বা ঢেঁকিকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছিল। মানুষের কুসংস্কার, ভূত-প্রেমের গল্প, অন্ধবিশ্বাস বা অলৌকিক শক্তির প্রতি বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করাই ছিল লুকিয়ানুসের গল্পের মূল লক্ষ্য।

গ্যোতে এই লক্ষ্য বা মঞ্জিলে মাকসুদে মোচড় দিয়েছেন। এ কারণে লুকিয়ানুস ও গ্যোতের গল্পের ছাঁচ এক হলেও মর্ম ভিন্ন। সাইট গাইজট বা যুগযন্ত্রণা গ্যোতের কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা ও মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

‘ডেয়ার-ৎসাউবারলেয়ারলিং’য়ের গল্পের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে কেউ কেউ প্রাগের গোলেমের কিংবদন্তির কথাও বলে থাকেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, প্রাগের ইহুদি ধর্মগুরু রাব্বি ইয়েহুদা লেও মাটি দিয়ে এক মানবসদৃশ প্রাণী তৈরি করে তাতে জাদুমন্ত্রের মাধ্যমে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। গোলেম ছিল তার নাম। এই নির্বাক শক্তিশালী প্রাণী তার স্রষ্টার নির্দেশ পালন করত। পানি আনা, কাঠ কাটা, ঘরের কাজের মতো নানা কাজ সে করে দিত। কিন্তু একপর্যায়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সে তাণ্ডব শুরু করে। শেষ পর্যন্ত রাব্বি লেও তাকে নিষ্ক্রিয় করতে বাধ্য হন। এই ‘নিজের সৃষ্টি করা শক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া’র মোটিফটির সঙ্গে গ্যোতের কবিতার মিল লক্ষ করা যায়।

বাংলার কোনো পুরাণ বা লোককথায় এ ধরনের চরিত্র আছে কি না, এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পুরাণ ও রূপকথাতেও এর কাছাকাছি মোটিফ থাকা অসম্ভব নয়। মুসার লাঠি, আলিফ লায়লার জাদুর জায়নামাজ, কিংবা সিন্দবাদের জাদুর প্রদীপ ও জাদুর আংটির জিনের কথা মনে পড়ে। এসব মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী করতে পারে, সেটা আমাদের জানা না থাকলেও ইশারাটা স্পষ্ট।

৩.

গ্যোতের পরবর্তী জীবনের চিন্তাভাবনাতেও আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় দেখা যায়। তিনি ‘ভেলোৎসিফেরিশ’(veloziferisch) শব্দটি ব্যবহার করতেন। এর দ্বারা তিনি আধুনিকতার এমন এক উন্মত্ত গতিকে বোঝাতেন, যেখানে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের গতি মানুষের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্বাভাবিক বিকাশকে ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষ যত দ্রুত নতুন যন্ত্র ও প্রযুক্তি তৈরি করছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনযাপন বদলানোর সুযোগ সব সময় তৈরি হচ্ছে না। এসব কিছুর কারণে আধুনিক ‘যন্ত্রযুগ’ নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ও সংশয়ী ছিলেন গ্যোতে।

ফরাসি বিপ্লব নিয়ে গ্যোতের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। ঘনিষ্ঠ সহচর ও ব্যক্তিগত সচিব ইয়োহান পিটার একেরমানের সঙ্গে আলাপে ১৮২৪ সালের ৪ জানুয়ারি গ্যোতে জানিয়েছিলেন, তিনি ফরাসি বিপ্লবের ‘বন্ধু’ হতে পারেননি। কারণ, এর নৃশংসতা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ-ও বলেছিলেন, বড় কোনো বিপ্লবের জন্য জনগণকে এককভাবে ‘দায়ী’ করা যায় না। তার জন্য সরকারের ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী। তাঁর যুক্তি ছিল, সরকার যদি ন্যায়সংগত ও সতর্ক থাকে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার করে, তাহলে বড় বিপ্লবের প্রয়োজনই হয় না।

এখানে গ্যোতের অবস্থানটা সূক্ষ্ম। তিনি বলছেন না, ‘পরিবর্তন খারাপ।’ তবে হঠাৎ, সহিংস, নিয়ন্ত্রণহীন সামাজিক বিস্ফোরণ বা উল্লম্ফন নিয়ে তাঁর আপত্তি রয়েছে। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সময়মতো সংস্কারের মাধ্যমে করা উচিত। তাই বলে তাঁকে ‘স্থিতাবস্থার বন্ধুও’ বলা যায় না। কারণ, তিনি মনে করতেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে অন্যায় ও অসংগতি থাকলে তা রক্ষা করার কোনো কারণ নেই। তা ছুড়ে ফেলাই কর্তব্য।

ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোতের প্রতিকৃতি। ১৮০৬ সালে জার্মান চিত্রশিল্পী হাইনরিশ ক্রিস্টফ কোলবে ছবিটি আঁকেন
ছবি: দ্য আর্ট নিউজপেপার থেকে নেওয়া

৪.

গ্যোতের এই কবিতার দুটি লাইন জার্মানিতে প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এখনো তা মানুষের মুখে মুখে ফেরে—‘Die ich rief, die Geister, Werd' ich nun nicht los’, অর্থাৎ ‘ডেকেছিলাম যে আত্মাদের, পারছি না এখন তাড়াতে তাদের!’ এমন এক পরিস্থিতি বোঝাতে এটি ব্যবহার করা হয়, যখন কেউ নিজের প্রয়োজনে কোনো শক্তি, সহযোগী বা ব্যবস্থার শরণাপন্ন হন; কিন্তু পরে সেটি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

অনেকে ‘ডেয়ার-ৎসাউবারলেয়ারলিং’কে গ্যোতের ‘প্রমিথিউস’ কবিতার একধরনের প্রতিরূপ মনে করেন। প্রমিথিউস যেখানে মানুষের ক্ষমতা অর্জনের প্রতীক, জাদুকরের শিষ্য সেখানে নিজের সৃষ্ট শক্তির নিয়ন্ত্রণ হারানোর করুণ চিত্র।

‘ডের জাউবারলেয়ারলিং’য়ের ভিজ্যুয়াল রূপান্তরও বেশ সমৃদ্ধ। গ্যোতের কবিতাটি পরে চিত্রকলা, অলংকরণ, অ্যানিমেশন ও চলচ্চিত্রে নানাভাবে রূপ পেয়েছে। বিশেষ করে ওয়াল্ট ডিজনির ১৯৪০ সালের ‘ফ্যানটাসিয়া’য় মিকি মাউসের চরিত্রে কবিতার জাদুকরের শিষ্যকে দেখানো হয়, যেখানে ঝাড়ুগুলো জাদুর বলে জীবন্ত হয়ে একের পর এক পানি বহন করতে থাকে এবং শেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

‘ডেয়ার-ৎসাউবারলেয়ারলিং’ প্রকাশের ৫১ বছর পর ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে ওই কাহিনির ছায়া লক্ষ করা যায়। ম্যানিফেস্টোর শুরু কয়েক পাতার মধ্যে তাঁরা লিখেছেন, ‘বুর্জোয়া উৎপাদন ও বিনিময়ব্যবস্থা, বুর্জোয়া সম্পত্তিব্যবস্থা ও আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের দিকে তাকালে মনে হয়, তারা জাদুর বলে বিপুল উৎপাদন ও বিনিময়ের শক্তি তৈরি করেছে। কিন্তু এই সমাজের দশা এখন সেই জাদুকরের মতো, যে নিজের ডেকে আনা অশুভ শক্তিকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’

৫.

ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, ডিপসিক বা আলিবাবার মতো মার্কিন ও চৈনিক কোম্পানিগুলো ব্যাপক শক্তিধর ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরি করছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব এআই মডেলের ক্ষমতা একসময় পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এরই মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা এই আশঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে। এ পরিস্থিতিতে এআই নিয়ে আলোচনায় ‘ডেয়ার-ৎসাউবারলেয়ারলিং’ কবিতাটির প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসছে।

এআইয়ের পাশাপাশি সিন্থেটিক বায়োলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও রোবটিকসেরও দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারও দিনে দিনে বড় হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ও শক্তি যদি একসঙ্গে মিলেমিশে এগোয়, তাহলে আগামীতে কোনো একসময় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার জন্য মানুষ হয়তো এখনো প্রস্তুত নয়। তখন মানুষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, কাজ করা বা চিন্তা করার ক্ষমতা মেশিনের তুলনায় দুর্বল ও অনুন্নত হয়ে পড়তে পারে।

গ্যোতের কবিতায় শেষ পর্যন্ত গুরু এসে পরিস্থিতি সামাল দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের কিছু দেশ যেসব প্রযুক্তি তৈরি করছে, আর আমাদের মতো দেশগুলো কোনো ধরনের বাছবিচার ছাড়াই যেভাবে তা গোগ্রাসে গিলছে, তাতে আগামীতে রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হতে পারে, মানবজাতির ভবিষ্যৎ পরিণতিই কী হতে যাচ্ছে, তা ভাবলে সত্যিই ভয় লাগে।

৬.

আমাদের মতো গরিব দেশ জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রথম-দ্বিতীয় তো দূরের কথা, তৃতীয়-চতুর্থ কাতারেও নেই, তা ঠিক। তারপরও কথা থাকে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের মতো প্রযুক্তির নাজুক ভোক্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রযুক্তি জায়ান্টদের সর্বাত্মকভাবে সহায়তাকারী কোনো দেশের সরকার ও নাগরিক সমাজের কিছুই কি করার নেই? সরকারের নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের জন্য এটি একটি খোলা প্রশ্ন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যেসব নতুন ঢেউ আমাদের ওপর আছড়ে পড়ছে, তার সঙ্গে আগের অনেক পরিবর্তনের তেমন একটা মিল নেই। এবারের পরিবর্তনগুলো নজিরবিহীন, সর্বগ্রাসী। এসব ঢেউ ব্যক্তি মানুষের জীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র কিংবা পরিবেশ-প্রকৃতি—সবকিছুকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এখনই এসব নিয়ে গভীরভাবে ভাবা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।