সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ

সাঈদ আহমদের নিবন্ধ ‘বাংলাদেশের সুরস্রস্টারা– সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ’ ২০০১ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রথম আলোর সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এত দিন লেখাটি শুধু কাগজের পাতাজুড়ে ছিল, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রথম আলোর পুরনো পত্রিকা ও আলাউদ্দিন খাঁ’র প্রতিকৃতি অবলম্বনেপ্রথম আলো গ্রাফিকস

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুর গ্রামে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই গ্রামে গানবাজনার চল ছিল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বংশেও এই ধারা বয়ে এসেছে। তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ সফদর হোসেন খাঁ বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল মাদাই হোসেন। সফদর হোসেন খাঁর ডাকনাম ছিল সদুখাঁ। তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিবেশেই মানুষ হয়েছিলেন। সফদর হোসেন খাঁ বিখ্যাত ‘রবাব’ বাদক ওস্তাদ কাশেম আলী খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং রবাববাদক হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ওস্তাদ কাশেম আলী খান ত্রিপুরার রাজার সভাবাদক ছিলেন। সফদর হোসেন খাঁও ত্রিপুরার রাজার সভাবাদক হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন।

সফদর হোসেন খাঁর ছিল পাঁচ ছেলে—সোনাউদ্দিন খাঁ, আফতাব উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ এবং আয়েত আলী খাঁ। এই পাঁচ ছেলের মধ্যে তিন ছেলে শাস্ত্রীয় সংগীতে বিশেষ খ্যাতিমান হয়েছিলেন। আফতাবউদ্দিন খাঁ আধ্যাত্মিক সাধকপুরুষ ছিলেন। কখনো হয়তো তাঁকে কোনো সুদূর গ্রামে দেখা যেত, আবার হয়তো হঠাৎ তাঁকে কুমিল্লা বা কলকাতা শহরে দেখা যেত। আফতাব উদ্দিন খাঁ বাঁশি, তবলা, হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন।

একটা সুন্দর গল্প শোনা যায় যে একদিন সকালে আফতাবউদ্দিন খাঁ কলকাতার ভবানীপুরে নাটোরের মহারাজা যোগীন্দ্রনাথের প্রাসাদে বেড়াতে যান। মহারাজা জলসাঘরেই আফতাবউদ্দিন খাঁ সাহেবকে অভ্যর্থনা জানান। খাঁ সাহেব তাঁর আলখাল্লার পকেট থেকে বাঁশি বের করে এক বিশেষ সুর বাজাতে শুরু করেন। দেখা গেল, ধীরে ধীরে পাখিরা ওই ঘরে ঢুকতে আরম্ভ করেছে। কেউ থামের ওপর, কেউ জানালার তাকের ওপর চুপচাপ বসে থাকল। একটা টুঁ-শব্দও করল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তারা বাজনা শুনল। বাজনা শেষ হওয়ার পর ওরা ধীরে ধীরে উড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মহারাজা যোগীন্দ্রনাথ নিজ চোখে দেখা এ ঘটনার কথা জানিয়ে গেছেন। তিনি আফতাবউদ্দিন খাঁকে সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার সিদ্ধপুরুষ বলে বর্ণনা করেছেন।

এই সাধকপুরুষের হাতেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতশিক্ষার হাতেখড়ি হয়। আলাউদ্দিন খাঁকে তাঁর বাবা আদর করে ডাকতেন ‘আলম’—যার অর্থ পৃথিবী। সংগীত দিয়ে আলাউদ্দিন খাঁ পৃথিবী জয় করেছিলেন।

একদিন আলাউদ্দিন খাঁ কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঢাকায় এসে যাত্রাদলে ভিড়ে গেলেন। তিনি লায়ন থিয়েটারেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ জীবন তাঁর বেশি দিন ভালো লাগল না। কলকাতার সংগীতজগৎ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কলকাতার নলু গোপাল নামে এক বিখ্যাত গায়ক, যাঁর আসল নাম ছিল গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, তাঁর আস্তানায় গিয়ে উঠলেন। নলু গোপালের ওই সময় অনেক শাগরেদ ছিল। আলাউদ্দিন খাঁ নলু গোপালের শাগরেদ হওয়ার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করে তাঁর শিষ্য হলেন। গুরু তাঁকে এক বিশেষ শর্তে শিষ্য বানাতে রাজি হলেন। শর্ত ছিল—তিনি ১২ বছর গুরুকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আলাউদ্দিন খাঁ তা-ই মেনে নিয়ে গুরুর সেবা এবং তাঁর সমস্ত নির্দেশ মেনে চললেন। এভাবে সাত বছর কাটানোর পর হঠাৎ গুরুর মৃত্যু হলো। এ ঘটনা আলাউদ্দিন খাঁকে ভীষণভাবে আঘাত করল। তিনি গান গাওয়াই ছেড়ে দিলেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করলেন। সেই যুগে সংগীতশিক্ষার জন্য গুরুর সাধনা করাটাই একমাত্র পথ ছিল। গুরুর দয়া হলেই শিষ্য সংগীতের মর্মে গিয়ে পৌঁছাতে পারতেন।

আলাউদ্দিন খাঁ গান ছেড়ে বাজনা বাজাতে শুরু করলেন। কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে একটা চাকরি জুটে গেল। সংগীতপাগল আলাউদ্দিন খাঁ এই সুযোগে ‘মিস্টার লোবো’ নামের এক বিখ্যাত বেহালাবাদকের কাছে পাশ্চাত্য ঢঙে এবং অমর দাস বাবুর কাছে ভারতীয় ঢঙে বেহালা বাজানো শিখতে আরম্ভ করেন। এ সময় তিনি নন্দলাল নামের এক মৃদঙ্গবাদকের কাছে পাখোয়াজ বাজানো শিখলেন। এভাবে কিছুদিনেই হাবু দত্তের কাছে ক্লারিনেট এবং হাজারী ওস্তাদের কাছে সানাই বাজানো শিখলেন। মোটকথা, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী হয়ে উঠলেন। এ সময় একদিন তিনি রাজা জগৎকিশোরের রাজসভায় বাজনা শোনানোর সুযোগ পেলেন। রাজা জগৎকিশোরও তাঁকে যথেষ্ট সম্মান দেখালেন।

এই সভাতেই আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ আহমাদ আলী খানের সরোদ বাদন শুনলেন। মুগ্ধ আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ আহমাদ আলীর কাছে সরোদ শেখার জন্য অনেক অনুরোধ জানালেন। রাজা জগৎকিশোর আলাউদ্দিন খাঁর যোগ্যতা ও আগ্রহ দেখে ওস্তাদকে তাঁকে শীর্ষত্ব বরণ করার জন্য অনুরোধ করলেন। এরপর চার বছর ওস্তাদ আহমাদ আলী খানের পায়ের কাছে বসে আলাউদ্দিন খাঁ সরোদ বাজনা শিখেছিলেন।

আলাউদ্দিন খাঁর গভীর বাসনা ছিল রামপুর নবাব দরবারে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের কাছে আরও সংগীত শেখার। রামপুরে তিনি গেলেন, কিন্তু দিনের পর দিন চেষ্টা করেও ওস্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলেন না। প্রাসাদের দারোয়ানেরা তাঁকে ঢুকতেই দিল না। ক্রমে তাঁর অবস্থা এতই খারাপ হলো যে তিনি আত্মহত্যা করার জন্য প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেলেন। দুই তোলা আফিমও কিনে নিয়ে এলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি যে বাসায় থাকতেন সেখানে এক মৌলভি সাহেবও থাকতেন। তিনি আলাউদ্দিন খাঁকে অনেক বুঝিয়ে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত করলেন। তিনি রামপুরের নবাবের বরাবরে একটি আরজি লিখে দিলেন যেন নবাব সাহেব দয়া করে আলাউদ্দিন খাঁকে ওয়াজির আলী খান সাহেবের কাছে সরোদ শেখার সুযোগ করে দেন।

এর পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ। রামপুরের নবাব গাড়িতে বসে থিয়েটার দেখতে যাচ্ছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ পথের মধ্যেই নবাব সাহেবের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। নবাব গাড়ি থামাতে বাধ্য হলেন। আলাউদ্দিন খাঁ কোনোমতে উর্দু-বাংলা মিশিয়ে আর অঙ্গভঙ্গি করে নবাব সাহেবকে তাঁর মনের ইচ্ছার কথা বলে গেলেন। নবাবের হুকুমে লোকজন তাঁকে সরিয়ে দিলেন। নবাব গাড়ি চালাতে হুকুম দিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ মরিয়া হয়ে পকেট থেকে আফিমের গুলি বের করে নবাবের সামনে ধরে বলতে লাগলেন, ‘আপনি যদি আমাকে না সাহায্য করেন আমি এখানে এই আফিম খেয়ে নিজের জান দিয়ে দেব। আপনি মেহেরবানি করে আমার আরজিটা পড়ুন।’ এই বলে আরজিটি নবাবের হাতে দিলেন। নবাব বাধ্য হয়ে আরজিটি পড়লেন এবং বললেন, ‘ঠিক আছে আগামীকাল আমার সভায় এসো এবং তোমার বাজনা পরিবেশন কোরো। আমরা তোমার বাজনা শুনব।’

 পরের দিন নবাবের দরবারে আলাউদ্দিন খাঁ হাজির হলেন। যত ধরনের বাদ্যযন্ত্র তিনি বাজাতে শিখেছিলেন, সবগুলোই একে একে নিপুণতার সঙ্গে পরিবেশন করলেন। উপস্থিত শ্রোতারা সবাই তাঁর প্রতিভা দেখে চমৎকৃত হলেন। নবাব বেশ খুশি হলেন এবং ওস্তাদ ওয়াজির খানকে অনুরোধ করলেন আলাউদ্দিন খাঁকে শিষ্যত্বে বরণ করে নিতে। ওয়াজির খান সাহেব আলাউদ্দিন খাঁর হাতে শিষ্যত্বের ‘নাড়া’ বেঁধে দিলেন। শুরু হলো আলাউদ্দিন খাঁর আর এক সাধনার পর্ব। একটানা ১২ বছর তিনি ওয়াজির খান সাহেবের কাছে তাঁর ঘরানার বাজনা শিখে যেতে লাগলেন। তাঁর এই একাগ্রতা ও ভক্তি প্রবাদে পরিণত হলো।

১৯১৮ সালে রামপুরের নবাব আলাউদ্দিন খাঁকে মাইহারে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মাইহারের রাজা তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করে সভাবাদক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। মাইহার যদিও একটা ছোট রাজ্য ছিল কিন্তু মহারাজা তাঁর বদান্যতা ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তখন ভারতবর্ষে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং মহারাজার মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এই সম্পর্ক আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল। সরোদবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাজনার পাশাপাশি তিনি নিজেও অনেক নতুন রাগ ও রাগিণী সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি রাগের মধ্যে রয়েছে—হেমন্ত, প্রভাত কেলী, হেম বেহাগ এবং মদন মঞ্জরী।

 ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট তাঁকে খাঁ সাহেব উপাধি প্রদান করে। তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধি পান। তিনি কোনো ‘ঘরানা’ থেকে আসেননি কিন্তু তিনি নিজে এক ঘরানা তৈরি করে দিয়ে যান। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে তিমিরবরণ, পান্না লাল ঘোষ, আলী আকবর খাঁ, রবি শঙ্কর, কন্যা রোশেনারা বেগম উল্লেখযোগ্য।

১৯৫২ সালের কথা। আমার ইচ্ছা হলো ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের কাছে সেতার শেখার। বাহাদুর হোসেন খাঁ ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁর ভাইপো। তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। একদিন সুযোগ এল। বাহাদুর হোসেন খাঁ ঢাকা রেডিও থেকে চাকরি ছেড়ে দিলেন। তিনি যাবেন মাইহারে চাচা আলাউদ্দিন খাঁর কাছে। আমাকে বললেন যাব কি না। আমি যেতে সম্মত হলাম। তবে আমরা আলাদা গেলাম। বাহাদুর হোসেন খাঁ প্রথমে কলকাতায় গেলেন তাঁর মামা সেতারবাদক ওস্তাদ আলী আহমদ খানের বাড়িতে।

সেখানে তাঁর সঙ্গে আমি মিলিত হলাম। আমরা কলকাতায় দুদিন থেকে মাইহারে গেলাম। সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর কাছে দীক্ষা নেওয়ার আমার ইচ্ছার কথা বললাম। বাবা বললেন, তুমি ফিরে যাও। আমি কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরে যাব মায়ের কবর জিয়ারত করতে। সেখান থেকে ঢাকায় যাব। আমার ভাইপো খাদেম হোসেন খাঁ আছে ঢাকায়। তুমি তার কাছে চলে যাও এবং দীক্ষা নাও। আমি তো বছরে দুবার ঢাকায় যাই। দেখা হবে। তাঁর নির্দেশে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। তিনি ঢাকায় আমাকে ওস্তাদ খাদেম হোসেন খাঁর হাতে তুলে দিলেন। ওস্তাদ খাদেম হোসেন খাঁ তাঁর ভাইপোই নয়, প্রিয় শিষ্যও ছিলেন। বহুদিন ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে বিশেষ করে আমার বাবা ও চাচার সঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর হৃদ্যতা থাকায় কয়েকবারই ওস্তাদের পায়ের কাছে বসার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমার চাচা মির্জা আব্দুল কাদেরের বাড়িতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহার করা একটা বেহালা সযত্নে রাখা ছিল।

আমার মনে পড়ে একবার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কুমিল্লা এসেছিলেন পারিবারিক প্রয়োজনে। আমি এবং আমার কয়েকজন সংগীতপাগল বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ড. ওসমান গনি সাহেবকে অনুরোধ করে সলিমুল্লাহ হলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বাজনা শোনার ব্যবস্থা করলাম। বিকেলের মধ্যেই সলিমুল্লাহ হলে ছাত্রদের অসম্ভব ভিড় জমে উঠল। কিন্তু হলের ভেতর দারুণ হৈ-হট্টগোল, গালগপ্প, সিগারেট খাওয়া চলছিল। তখনো উচ্চাঙ্গ সংগীত শোনা ও উপভোগ করার মতো পরিবেশ ছাত্রসমাজের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম হয়তো শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে করাই যাবে না। হয়তো ওস্তাদজি রেগে উঠে যাবেন।

কিন্তু এত বিখ্যাত রাগী ওস্তাদজি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ধীরে ধীরে সরোদে আলাপ শুরু করলেন। তাঁর জাদুকরি হাতের ছোঁয়ায় হলজুড়ে সুরের মূর্ছনা এমন এক মায়াজাল সৃষ্টি করে চলল, মুহূর্তে গোটা হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে সরোদে ছিলেন ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ। প্রায় দুঘণ্টা ধরে তিনি সরোদ বাজিয়ে শোনালেন। বাজনা শেষ হলে সমস্ত হল আনন্দে ফেটে পড়ল। এরপর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর বেহালা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ‘কন্ডাক্টর’-এর কায়দায় তাঁর সহবাদকদের নিয়ে তিনি ‘তিলক কামোদ’ রাগ পরিবেশন করলেন। এটা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় রাগ ছিল। সেদিনের বাজনার পর আর এ ধরনের বাজনা ঢাকায় শোনা যায়নি। গোটা হলের দর্শক-শ্রোতারা মুখর করতালি আর হর্ষধ্বনির মাধ্যমে ওস্তাদজিকে সম্মান জানাল।

অনুষ্ঠান শেষে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আমাদের ইসলামপুরের বাড়িতে খানার দাওয়াতে এলেন। তিনি নামাজ শেষ করে মজলিসে এসে বসলেন। বললেন, ‘এবারে আমি তোমাদের সঙ্গে ঢাকার বিখ্যাত কুবলি পোলাও  প্রাণ ভরে খাব।’ তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আমার কাছে কোনো সম্বল নেই। তবুও আমার যা আছে তা থেকে তোমাদের কিছু দিতে চাই। বলেই ওস্তাদজি তাঁর বিখ্যাত রাগ ‘হেমন্ত’ বাজিয়ে আমাদের আনন্দ দিলেন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারা তাঁর বাজনা শুনলেন।

 পরের দিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে ঢাকার বলধা গার্ডেনে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হলো। সাজানো বাগানে দেওয়া সংবর্ধনায় অতিথিদের মধ্যে মঞ্চে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সংগীতজ্ঞ আব্দুল আহাদ, বিশিষ্ট সমাজসেবক নাসির আহমদ ও পৌর করপোরেশনের চেয়ারম্যান কাজী বশির। ওস্তাদজির হাতে ফুলের তোড়া, টাকার তোড়া তুলে দেওয়া হয়।

আলাউদ্দিন খাঁর উদারতার কথা বলছি। ১৯৫২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে দুই গুণী ব্যক্তি আলাউদ্দিন খাঁ ও মুস্তাক হোসেন রামপুরীকে পদ্মভূষণ খেতাব দেওয়া হলো। আলাউদ্দিন খাঁ পেলেন যন্ত্রসংগীতের ওপর ও মুস্তাক হোসেন রামপুরী পেলেন গানের জন্য। অনুষ্ঠান শেষে স্যার শ্রীরামের বাড়িতে রাতের খাবার দাওয়াত ছিল। আমার বন্ধু স্যার শ্রীরামের দৌহিত্র অরুণ রাম। তার বাবার নাম ছিল ভারত রাম।

ভারত রামের স্ত্রী অরুণের মাতা আলাউদ্দিন খাঁর শাগরেদ ছিলেন। আর রবিশঙ্কর সেতার শেখাতেন অরুণ রামকে। স্যার শ্রীরাম কোটিপতি ছিলেন। কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁ সুরের জগতে পুরো ভারতবর্ষের শিরোমণি। কিছু খোশগপ্প হলে গুণগ্রাহীদের কিছু বাজিয়েও শোনালেন। এবার খাবার পালা। আলাউদ্দিন খাঁ সুখটানে চুরুট উপভোগ করছেন। তাঁর সামনে রয়েছে একটা চুরুটের বাক্স। এতক্ষণ অরুণ চুরুটের বাক্সটা লক্ষ করছিল, সে ওটাকে নেওয়ার জন্য গোঁ ধরল। ছেলের অবস্থা দেখে বাবা বিব্রত আর খাঁ সাহেব লজ্জিত। অরুণ একেবারে নাছোড়বান্দা। কত ছলচাতুরী করে বাবা ওর মন ফেরাতে চাইলেন। কিন্তু ছেলের চুরুটের বাক্সটা চাই।

আলাউদ্দিন খাঁ পকেট থেকে একটা পকেট ঘড়ি বের করে ওকে দেখালেন। ‘এটা রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এখনই উপহার পেয়েছি’, আলাউদ্দিন খাঁ বললেন। ‘এই চুরুটটি আমি বড় ভালোবাসি, বড় দামি চুরুট, রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এনেছি। এই ঘড়িটাও রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে পেয়েছি। এটাই বাবা তুমি নাও। এটা তোমার পুরস্কার।’ অরুণ আমাকে ছেলেবেলার এই গল্পটা শোনাল। এখনো অরুণের কাছে গচ্ছিত আছে ঘড়িটা। ভালোবাসার নিদর্শন এখনো তার কাছে আছে। আলাউদ্দিন খাঁর উদারতার কথা সর্বজনবিদিত। তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের বড় ভালোবাসতেন।

তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি কয়েক বছর পক্ষাঘাতে বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১০৩ বছর বয়সে এই মহান শিল্পীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। তাঁর গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের ঘরানার সংগীত বাংলার পল্লীগ্রামে এক গ্রাম্য বালকের অকল্পনীয় সাধনা ও প্রতিভার ফলে চিরজীবী হয়ে আছে এবং থাকবেও। কুমিল্লা থেকে সুদূর মাইহার পর্যন্ত তাঁর সংগীত সাধনা ও আত্মত্যাগ তাঁকে সংগীতজগতের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।