ঠুমরি: বিস্মৃতির অতল থেকে হৃদয়ের আর্তি

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

ঠুমরির উৎপত্তিকে সাধারণভাবে ওয়াজিদ আলী শাহর দরবারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, স্বয়ং লক্ষ্ণৌয়ের নবাবকেই অথবা তাঁর দরবারের কিছু সংগীতশিল্পীসহ। ওয়াজিদ আলী শাহ ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত লক্ষ্ণৌ শাসন করেন। তিনি প্রশাসনিক ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তবে শিল্পকলার এক মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর শাসনামলে সংগীত, নৃত্য, কবিতা, নাটক ও স্থাপত্য বিপুলভাবে বিকশিত হয়, আংশিকভাবে তাঁর ঐশ্বর্যশালী পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। ওয়াজিদ আলী শাহ নিজেও শিল্পকলায় বহু অবদান রেখেছেন। তিনি একজন উৎকৃষ্ট উর্দু কবি ছিলেন, এমনকি উর্দু নাটকের জনক হিসেবেও তাঁকে অনেকে ধরে থাকেন। এ ছাড়া তিনি একজন দক্ষ কত্থক নৃত্যশিল্পী, নাট্যকার, সর্বোপরি ঠুমরির গায়ক ও সুরকার ছিলেন। তাঁর কিছু রচনা আজও বহুল গাওয়া হয়। ওয়াজিদ আলী শাহর ঠুমরির প্রতি বিশেষ অনুরাগ ও প্রতিভা ছিল; তাঁর রাজত্বকালে এবং কিছুটা আগেই, ঠুমরি একপ্রকার লঘু শাস্ত্রীয় সংগীতে পরিণত হয় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাই আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু নেই যে ঠুমরির উৎপত্তির সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

আবার সাদিক আলী খান (১৮০০–১৯১০), যিনি কাওয়াল বাচ্চে ঘরানার একজন প্রসিদ্ধ ঠুমরি গায়ক ছিলেন, তাঁকেও অনেকে ঠুমরির উদ্ভাবক মনে করে থাকেন। নিঃসন্দেহে তিনি ঠুমরি গানের বিকাশে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কেননা প্রায় প্রত্যেক খ্যাতনামা ঠুমরি গায়ক তাঁর শিষ্য ছিলেন। ওয়াজিদ আলী শাহর সঙ্গে মিলে তিনি ঠুমরিকে জনপ্রিয় ও পরিশীলিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে কোনো সংগীতধারার উদ্ভাবন একেবারেই আলাদা মাত্রার বিষয়, এ কথা আমরা সংগীত রসিকজনেরা জানি। একজন বা দুজন মানুষ এ ধরনের এক বিশাল সংগীত রূপ সৃষ্টি করতে পারেন না। তবে ঠুমরি নামের একটি স্বীকৃত ধারার অস্তিত্ব এ দুই ব্যক্তির প্রায় দুই শতাব্দী আগেই ছিল। শুধু তা–ই নয়, ঠুমরি এক দীর্ঘ, ধীর এবং ধারাবাহিক বিবর্তনপ্রক্রিয়ার ফল, যা গুপ্ত যুগ (খ্রিষ্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতক) পর্যন্ত প্রসারিত, তারও আগে হতে পারে।

ঠুমরির অস্তিত্বের সবচেয়ে নিশ্চিত প্রমাণ ১৮৫০ সালের আগেকার নানা রচনায় পাওয়া যায়। তা ছাড়া ১৮৪৮ সালের রাগ কল্পদ্রুমে কয়েক ডজন হালকা রাগে রচিত ঠুমরি রয়েছে এবং সেই রাগগুলো বর্তমানে ঠুমরিতেও ব্যবহৃত হয়।

একজন বা দুজন মানুষ এ ধরনের এক বিশাল সংগীত রূপ সৃষ্টি করতে পারেন না। ঠুমরি নামের একটি স্বীকৃত ধারার অস্তিত্ব এ দুই ব্যক্তির প্রায় দুই শতাব্দী আগেই ছিল। শুধু তা–ই নয়, ঠুমরি এক দীর্ঘ, ধীর এবং ধারাবাহিক বিবর্তনপ্রক্রিয়ার ফল, যা গুপ্ত যুগ (খ্রিষ্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতক) পর্যন্ত প্রসারিত, তারও আগে হতে পারে।

১৮০৩ সালে জয়পুরের মহারাজা প্রতাপ সিংহ কর্তৃক প্রদত্ত একটি সংগীতগ্রন্থ ‘রাধাগোবিন্দ সঙ্গীতসার’-এ ঠুমরির উল্লেখ রয়েছে। এখানে ঠুমরিকে একটি রাগ হিসেবে বর্ণনা করে, একটি ধারা হিসেবে নয়। এই বিভ্রান্তি সম্ভবত এই ধারার সঙ্গে গাওয়া স্বতন্ত্র ধরনগুলোর সংযোগ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, যা মূলত হেপাটোনিক তৃতীয় এবং সপ্তম স্কেলের উত্থিত এবং নিম্ন উভয় রূপ ব্যবহার করত (যেমন রাগ কাফি, পিলু, জাংলা, পাহাড়ি, জিলাফ ইত্যাদি)।

উনিশ শতকের ঠুমরি স্পষ্টভাবেই আধুনিক বোল বানাও ঠুমরির সঙ্গে খুব একটা স্টাইলিস্টিক সাদৃশ্য রাখেনি, যেটা ধীরগতিতে গাওয়া হতো, অবসর বিশদ বিবরণের মাধ্যমে পাঠের আবেগপূর্ণ চিত্রায়ণের ওপর জোর দিত। কিন্তু ঠুমরি রচনা হিসেবে ছোট খেয়ালের সঙ্গে অভিন্ন হওয়ার যে প্রবণতা ছিল, তা স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় যে দুটি ধারার বিবর্তন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। ঠুমরির দুটি পূর্ববর্তী উল্লেখ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দোয়াবে, অর্থাৎ গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে, ব্রজভাষী জনগণকে ঘিরে এ ধারাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। উল্লেখ্য, ‘করি রাগ দর্পণ’ হলো ১৬৬৫ সালে একজন কাশ্মীরি সুবেদার ফকিরুল্লাহ কর্তৃক রচিত একটি সংগীতগ্রন্থ, মানকুতুহালের একটি মুক্ত ফারসি অনুবাদ, যা কয়েক দশক আগে লেখা হয়েছিল। ফকিরুল্লাহ বলেছেন, ‘বারওয়া ধুন’কে কিছু লোক ‘ঠুমরি’ বলে। যেটি বর্তমানে কিছুটা অস্বাভাবিক রাগ, যা কাফি সেই (স্কেল গ্রুপ)–এর অধীন শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে তৃতীয় এবং সপ্তম স্তরের উত্থিত এবং নিম্ন উভয় স্তর ব্যবহার করা হয়। ফলত ঠুমরি আর রাগ বরওয়ায় গাওয়া হয় না, এ কথা বলা ভুল, তবে দুর্লভ। একই সঙ্গে এটি বারওয়ার অনুরূপ রাগগুলোতে গাওয়া হয়। যেমন ঘর, কাফি ও পিলু। এখানে ঠুমরিকে বিশেষভাবে একটি ধারা হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং একটি ধুন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ একটি লোক-উদ্ভূত সুর বা রাগের ধরন। অনুমান করতে পারি যে ঠুমরি শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ধরনের নৃত্যগীতি বোঝাতে সাধারণ ব্যবহারে আসেনি; বরং এটি দোয়াবে গণিকাদের দ্বারা ব্যবহৃত স্বতন্ত্র রাগগুলোর ক্ষেত্রে ঢিলেঢালাভাবে প্রয়োগ করা, স্রেফ ব্যাখ্যামূলক ব্রজ নৃত্যগীতির জন্য বারওয়া এবং জাংলার মতো রাগের ধরনগুলো, যা ওই অঞ্চলগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ফারসি গ্রন্থ ‘তুহফাত-উল-হিন্দ’–এ ঠুমরির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ১৬৭৫ সালে মির্জা খান ইবনে-ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ কর্তৃক লেখা। এই গ্রন্থে ঠুমরিকে আবার একটি রাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঠুমরি এখানে ভারত ‘শাস্ত্র’ বা শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থার একটি রাগিণী। এই শাস্ত্র অনুসারে, রাগ–রাগিণীগুলোকে ছয়টি প্রধান রাগের মধ্যে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে: ভৈরব, মালকোষ, হিন্দোল, দীপক, শ্রী ও মেঘ। ঠুমরিকে শ্রী রাগের তৃতীয় রাগিণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা বেশির ভাগ দোয়াবে গাওয়া হয়। এটি শঙ্করভরণ এবং মারু রাগের উপাদান ধারণকারী সংকীর্ণ বা মিশ্র রাগগুলোর মধ্যে একটি। ঠুমরির উৎপত্তি নিয়ে এই অবধি আলাপ জরুরি ছিল, দাবি ছিল। এখন অনায়াসে আসা যায় পরবর্তী আলাপে।

‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’, ‘তোর নেইনো জাদু কিয়া’, ‘সাইয়া বেদারদি সে জিয়া মোরা লাগা রে’, ‘বাবুল মোরা নেইহার ছুটো হি যায়’, ‘সাঁইয়া বিনা ঘর সুনা’—ঠুমরি-পঙ্‌ক্তি ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে সেগুলো আর লঘু ধ্রুপদি সংগীতের উদাহরণ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ উপাখ্যান। বিশেষ করে আকুতি বোঝানোর জন্য ‘হায় রাম’ বলার যে প্রবণতা, এখানেই আমরা দেখি, একটি ধর্মীয় চরিত্র, কেমন করে সবার আকুতি প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে বারবার, অর্থাৎ চরিত্রকে স্রেফ ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই রিড করার যে চর্চা, সেই ক্ষেত্রে এ উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ, ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে ধর্ম-অধর্ম বাইনারির বাইরে থেকেছেন সেই গাইয়ে ও গায়িকারা। উপনিবেশকালের মাঝামাঝি সময় বা শুরুতেই কুর্তিজান বা তবায়েফদের সংগীতচর্চা, সমাজের প্রান্তিক অথচ শক্তিশালী এক সাংস্কৃতিক পরিসর; অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসন, ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং দেশীয় ভদ্রলোক শ্রেণির ‘শুদ্ধ সংস্কৃতি’র ধারণার দ্বন্দ্ব।

নৃত্য, কবিতা, গীত—সবকিছুতেই তাঁদের প্রতিভা ছিল। ঠুমরির মাধ্যমে তাঁরা ব্যক্তিগত আবেগ, প্রেম, অভিমান ও কামনার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন। কিন্তু এই নারীরা সমাজে প্রান্তিক। তাঁরা ‘সম্মানীয় স্ত্রীলোক’ না হলেও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অপরিহার্য—একদিকে প্রান্তিকতার কণ্ঠ, অন্যদিকে রাজসভার মর্যাদাপূর্ণ সংগীত।
ঠুমরি গানের আসরে ওয়াজিদ আলী শাহ
সংগৃহীত

কুর্তিজানরা বিনোদনকারিণী নন, তাঁরা ছিলেন শিক্ষিতা, সংস্কৃতিমান ও সংগীতে দক্ষ। নৃত্য, কবিতা, গীত—সবকিছুতেই তাঁদের প্রতিভা ছিল। ঠুমরির মাধ্যমে তাঁরা ব্যক্তিগত আবেগ, প্রেম, অভিমান ও কামনার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন। কিন্তু এই নারীরা সমাজে প্রান্তিক ছিলেন। তাঁরা ‘সম্মানীয় স্ত্রীলোক’ না হলেও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অপরিহার্য—একদিকে প্রান্তিকতার কণ্ঠ, অন্যদিকে রাজসভার মর্যাদাপূর্ণ সংগীত।

উনিশ শতকে ব্রিটিশরা যখন উত্তর ভারতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, তখন তারা কুর্তিজান সংস্কৃতিকে ‘অধঃপতিত’ বলে আখ্যা দেয়। ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা অনুযায়ী যৌনতার সঙ্গে যুক্ত যেকোনো শিল্পকেই কলঙ্কজনক মনে করা হতো। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় ভদ্রলোক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি নবজাগরণের সময়কার মধ্যবিত্ত, পশ্চিমা নৈতিকতা গ্রহণ করতে শুরু করে। তারা কুর্তিজান সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে গিয়ে শুদ্ধ সংগীতের দাবি তোলে। ধ্রুপদ, খেয়াল, কীর্তন, ধামার—এসবকে মর্যাদা দেওয়া হয়।

ঠুমরির পোস্ট মডার্নাইজেশনে, ঠুমরিকে কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তর্মুখী আখ্যান ভেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ; বরং এর জন্মলগ্ন থেকেই তা হয়ে উঠেছে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও নন্দনতত্ত্বের এক চমকপ্রদ লড়াইয়ের ক্ষেত্র।

ঠুমরির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নারীকণ্ঠ। তবলার ঝংকার আর নৃত্যের মাধুর্যে গাওয়া ঠুমরি ঔপনিবেশিক যুগের ‘কামুক ও উপভোগ্য নারী-শিল্পে’রই প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ প্রশাসন ও ভারতীয় উচ্চবিত্ত—উভয়ের কাছেই এটি ছিল ‘বাজারি শিল্প’। ফলে ঠুমরির সঙ্গে জড়িয়ে গেল নীচতা, বাঈজিদের দেহ-বাজারের প্রতীকী রূপ। এই রাজনীতিকে উল্টে দিলেন, বড় গোলাম আলী, সালামত আলী। তাঁদেরই পরিবেশনায় ঠুমরি হয়ে উঠল রিফাইন্ড—‘ক্ল্যাসিক্যাল’।

ঠুমরি ভারতীয় আধুনিকতারও প্রতীক। একদিকে এর ভেতরে আছে গ্রামীণ লোকসংগীতের ভাঙচুর, অন্যদিকে আছে খেয়ালের জটিল রাগদারিত্ব। এর ভেতরে যেমন লোকায়ত ভাষা—অওধি, ব্রজ, হিন্দি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি আবার রাজদরবারের অভিজাত রুচিও মিশেছে। অর্থাৎ ঠুমরি দাঁড়িয়ে আছে সংস্কৃতির দুই প্রান্তে—গ্রামীণ-লোকায়ত ও অভিজাত-আভিজাত্য। এর মধ্য দিয়েই ভারতীয় সংগীতচর্চায় গড়ে ওঠে হাইব্রিড মডার্নিটি।

খানসাহেবের কণ্ঠে ঠুমরি যেমন এক নন্দনতাত্ত্বিক সৌন্দর্য অর্জন করল, তেমনি পেল রাজনৈতিক ক্ষমতা। তাঁর গাওয়া ঠুমরি ভারতীয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘জাতীয় সম্পদ’-এ রূপান্তরিত হলো। রাষ্ট্রীয় মঞ্চে, বেতার কেন্দ্রে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঠুমরিকে দেখা হলো সংশোধিত শিল্পরূপ হিসেবে। ফলে এটি আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার আর্তি নয়, বরং হয়ে উঠল ভারতীয় সংস্কৃতির ‘সফট পাওয়ার’ এবং আরেক ন্যাশনালিস্ট প্রজেক্টও বটে।

খান সাহেবের গাওয়া ঠুমরি ভারতীয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘জাতীয় সম্পদ’-এ রূপান্তরিত হলো। রাষ্ট্রীয় মঞ্চে, বেতার কেন্দ্রে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঠুমরিকে দেখা হলো সংশোধিত শিল্পরূপ হিসেবে। ফলে এটি আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার আর্তি নয়, বরং হয়ে উঠল ভারতীয় সংস্কৃতির ‘সফট পাওয়ার’।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, বেশ কিছু মৌলিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটেছিল, যার ফলে ভারতের বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক ও শৈল্পিক জীবনের রূপান্তর ঘটে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ মূলত ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধকে হুমকি ও অবমূল্যায়ন করে এবং পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষার মাধ্যমে (ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা না হোক) পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়েই এ পরিবর্তনগুলোকে উৎসাহিত করেছিল। ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা এবং বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের নৃশংস দমন ভারতীয়দের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ছিল। তা ছাড়া তাদের সংস্কৃতির সহজাত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী আস্থাকে নাড়া দেয়। ভারতীয় সংস্কৃতি পশ্চিমা মতাদর্শের দ্বারা বশীভূত ও অভিভূত হওয়ার ভয় তো ছিলই।

বিংশ শতাব্দীতে এই ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণিই ধ্রুপদি সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতার নতুন উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯২০-এর দশক পর্যন্ত, স্পষ্টতই তাঁরা ভারতীয় চারুকলাকে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে, এ কথা বলা বাহুল্য। কারণ, সংগীত ও নৃত্য পতিতাবৃত্তির সঙ্গে এবং সামন্ততন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু চিহ্নের সঙ্গে, অর্থাৎ নবাব, রাজপুত্র ও জমিদারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক স্তরে, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতা এবং এর অপ্রয়োজনীয়, প্রতিক্রিয়াশীল লক্ষ্যগুলোর দ্বারা এই পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণির মর্যাদাহানি ঘটেছিল এবং পরবর্তী সময়েও এই মর্যাদাহানি ঘটে, জীবিত রাজপুত্রদের তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের প্রতি চাটুকারিতার কারণে। সামাজিকভাবে, নতুন বুর্জোয়া শ্রেণি, যারা পিউরিটান ভিক্টোরিয়ানবাদ দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিল, তারা পুরোনো ভদ্রলোকদের অনুভূত অশ্লীলতা দেখে বিব্রত হয়েছিল। ঠুমরি ও কত্থককে বিশেষভাবে অবৈধ এবং ক্ষয়িষ্ণু বিনোদন হিসেবে নিন্দা করা শুরু হলো। বিশেষত এর কারণ বেশির ভাগ ঠুমরি গায়িকা গণিকা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গীদের দালাল এবং পরজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সুতরাং উত্তর ভারতীয় সমাজে সংগীতজ্ঞদের ইতিমধ্যে নিম্ন মর্যাদা ক্রমবর্ধমান অসম্মানজনক গণিকা ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে আরও খারাপ হয়েছিল। পশ্চিমা বুর্জোয়া শ্রেণি চকলা বা লাল আলোর এলাকা এড়িয়ে চলত, যা ছিল ঠুমরি ও কত্থকের আবাসস্থল।

এভাবে সামন্ততন্ত্র থেকে বুর্জোয়া পৃষ্ঠপোষকতায় রূপান্তরের সময়, ভারতীয় সংগীত মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করত, যেমন কয়েকজন অবশিষ্ট রাজপুত্র (যেমন রামপুর, বরোদা ও হায়দরাবাদে), জমিদার এবং প্রতিষ্ঠিত হিন্দু বণিক পরিবার, যারা তাদের সামন্ততান্ত্রিক পূর্বসূরিদের অনুকরণে সংগীতকে পৃষ্ঠপোষকতা করত। এই গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা শিক্ষার দ্বারা কম প্রভাবিত, একই ভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যদের প্রতি পিউরিটান ঘৃণার দ্বারা কম বাধাপ্রাপ্ত ছিল।

ঠুমরির ইতিহাস আসলে এক দ্বন্দ্বের ইতিহাস—অশ্লীলতার অভিযোগ বনাম উচ্চাঙ্গ মর্যাদা, নারী শিল্পীর কণ্ঠ বনাম পুরুষ শিল্পীর যাথার্থ্য, লোকধারা বনাম অভিজাত রুচি।

এবার নিজের চর্চার কথা বলি, গোয়ালিয়র-জয়পুর-আগ্রা ঘরানায় তালিম নিতে নিতে, ঠুমরি গাওয়া হলো হৃদয়ে প্রলেপ লাগানো। এবার সেই প্রলেপ মধুর প্রলেপ কখনো, কখনো তীব্র ব্যথার প্রলেপ।

মনে পড়ে একটা লাইন, ‘সাম ভাই শ্যাম না আয়ে, বালমা মে কেয়া হো গেয়া, ইয়ে হি জাগাত কি রিত’। যেবার আমি ‘সাঁইয়া বিনা ঘর সুনা’ শিখছিলাম, তখন সালামত আলী খান সাহেবের গায়কি আমাকে এক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতো বিস্মিত করেছিল। তিনি যখন গাইলেন, ‘সাম ভাই মোর শ্যাম না আয়ে’—এতখানি আবেদন, ভঙ্গি আর সঞ্চারণ নিয়ে, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। এমন এক অর্চনা, যেন হঠাৎই অতীতের কিছু দৃশ্য ভেসে উঠেছিল সময়ের মধ্যে। বেহেলভার ব্যবহার, নিখুঁত তালের সঙ্গে আর তাঁর তানগুলো যেন কবুতরের ডানার মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল...এই সময়ে, বেগম আখতারকেও মনে পড়ে।

ঠুমরি বয়ে চলুক নিজের মতো, সবার হৃদয়ে গেয়ে উঠুক নিজেকেই। বিস্মৃতির অতল থেকে হৃদয়ের আর্তি—ঠুমরি।