রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সন্ধান
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার স্ফূর্তি যখন ঘটছে, তখন বাংলার আধুনিক রাজনৈতিক ভাষার আঁতুড়ঘর না হলেও বাড়ন্ত বয়স। তরুণ রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘শব্দপ্রিয়তার’ যুগ (১৪০৭, ৩৮৯)। ১৮৮০–এর দশকে রবীন্দ্রনাথের যখন উঠতি যুবা আর শহর কলকাতা যখন তার মধ্যাহ্নে, নৈমিত্তিক রাজনৈতিক তর্কে রবীন্দ্রনাথের অংশগ্রহণ দুর্লভ কিছু ছিল না। পরের দশকেও এই জনপরিসরে রবীন্দ্রনাথ সর্বত্র।
রাজনীতির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ সর্বগ্রাসী ছিল না। তথাকথিত রাজনীতিশাস্ত্র তাঁকে সমূলে টেনেছে, তা বলার অবকাশ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ মূল চরিত্রদের মধ্যে একজন। এর আদি কারণ হচ্ছে রাজনীতির ভাষার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সবিশেষ আগ্রহ। আধুনিক রাজনৈতিক ভাষার আকরস্বরূপ ধারণাগুলোর আর্থিক গোলমাল তাঁকে আবিষ্ট করেছিল। স্বাধীনতা, রাষ্ট্র, জাতি, রাজনীতি, (জন)সাধারণ কিংবা সমাজ—এই ধারণাগুলোর ব্যবহার ও অর্থের মধ্যকার গোলমাল চিহ্নিত করে রাখা ছিল তরুণ রবীন্দ্রনাথের এক বিশেষ আগ্রহের জায়গা।
আজকাল জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সন্দিগ্ধ ভাব নিয়ে অনেকেই আগ্রহী। তবে গোড়ার কথা হলো রবীন্দ্রনাথ শুধু জাতি নয়, আধুনিক রাষ্ট্রপ্রকল্প নিয়েই দ্বিধাসংকুল ছিলেন। সমকালীন বাংলার ‘স্বাধীনতা’-দর্শন নিয়ে বলেছিলেন যে তা হচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া শব্দ (১৪০৭, ৩৬৯)। আধুনিক ‘পলিটিকস’–এর সঙ্গে রাজনীতির সেকেলে অর্থের অমিল তাঁকে ভাবিয়েছে (১৪০৭, ৭০৭)। আজকালকার সর্বগামী তরল বি–উপনিবেশায়নের যুগে অনেকের কাছেই এ কথাগুলো একদম সহজে (ও ভুলভাবে) বোধগম্য হতে পারে। তাই আরেকটু পরিষ্কার করা উচিত।
ঔপনিবেশিক বঙ্গের স্বদেশসন্ধান রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে শুরু হয়নি। এই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি উনিশ শতকীয় বাংলার ভাবাকাশে কান পাতলেই শোনা যেত, বিশেষত শতাব্দীর শেষ সিকিতে। তখন বিদ্রোহের সময় ছিল না। ভিক্টোরিয়া–রাজের আর আধুনিক যুগের প্রতিশ্রুতি তখনো মিলেমিশে একাকার। তবু সাম্রাজ্যের ছায়াতলে বসে বাংলার সুধীসমাজ তখন স্বদেশপ্রেম বা স্বদেশ-বাৎসল্যবোধের ছন্দে মশগুল।
রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার এক সূত্র ছিল ভাব ও বস্তুর অসামঞ্জস্য। ধরা যাক, স্বাধীনতা নাম্নী ধারণার কথা। উনিশ শতকে স্বাধীনতার অর্থ একান্তভাবেই অস্থিতিশীল। কারও কাছে তা আইনি সমানাধিকার, কারও কাছে স্বজাতির শাসন, আবার কারও কাছে সামাজিক প্রগতি। এই বহুবিধ অর্থায়নের পেছনে রবীন্দ্রনাথ শনাক্ত করেন বিশেষ নামকেই অর্থ ভেবে বসার বিপত্তি। তার এক পরিণাম ছিল বিলেতের সঙ্গে কেবল দেনদরবার করে স্বাধীনতা পাওয়া যাবে, এ রকম একটি বিশ্বাস। আর তার থেকেও গভীর পরিণাম ছিল আত্মশক্তি, তথা নিজের জ্ঞান ও স্বকীয়তার সূত্র ধরে চিন্তার অনুপস্থিতি। জাতি বা রাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি, সে ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সংশয়ের চরিত্রও ছিল একই ধাঁচের।
তারও পেছনে ছিল আধুনিক জ্ঞানকাণ্ডের একান্তই মৌলিক এক সমস্যা। নানা মানবসমাজ নিয়ে যে বিশ্ব রচিত, সেই সমাজগুলো সব একই বস্তুর রকমফের কি না, তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের জিজ্ঞাসা ছিল। আধুনিক সমাজতত্ত্ব বা রাজনীতিতত্ত্বের এক অনতিক্রম্য দিগন্ত হচ্ছে ভিন্ন মানবসমাজকে একই প্রক্রিয়ার নানারূপ আকারে দেখা। রাষ্ট্র বা জাতিকে কেন্দ্র করে ভাবার মধ্যে একই দোষ শনাক্ত করেন রবীন্দ্রনাথ: এই ধারণাগুলো বঙ্গদেশকে বৈশ্বিক আয়নায় বোধগম্য করে তুলেছিল, কিন্তু আদতে বঙ্গের বিশেষত্ব ধরতে পারেনি।
রবীন্দ্রনাথ তাই জাতি, রাষ্ট্র, জনসাধারণ বা পাবলিক—ঠিক কোনো নামেই নিজের রাজনৈতিক সমষ্টিকে সম্বোধন করে ওঠার ব্যাপারে সায় দিতে পারছিলেন না। এসব সন্দিগ্ধ শব্দরাশির মধ্যে একমাত্র দেশীয় শব্দটিকেই অস্থায়ী নাম আকারে গ্রহণের কিছু নমুনা দেখা যায় (১৪০৭, ৩৯৭)। অস্থায়ী কেননা, রবীন্দ্রনাথের বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল স্বদেশ কী বস্তু, আর তার চরিত্রই–বা কী—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। এই খোঁজাখুঁজির একধরনের নিষ্পত্তি হয় স্বদেশি আন্দোলনের যুগে। এই একই ইতিহাস থেকে বের হয়ে আসে ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং বাংলাভাষীদের স্বদেশপ্রেমের নতুন এক ভাষা। আজকাল জনপরিসরে যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে জাতীয়তাবাদী বলে ধিক্কার দেন এবং যাঁরা তাঁকে একুশ শতকীয় উঠতি সংস্কারের জোরে জাতীয়তাবাদবিরোধী হিসেবে বরণ করতে চান—দুই পক্ষই রবীন্দ্রনাথের আপন বিশ্বের বিশেষ খবর রাখেন না। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ আরেকটু অচেনা। তবে তার এই মানে নয় যে বিশ শতকের চেনা ইতিহাসে তা কোনো ছাপ রেখে যায়নি।
২.
ঔপনিবেশিক বঙ্গের স্বদেশসন্ধান রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে শুরু হয়নি। এই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি উনিশ শতকীয় বাংলার ভাবাকাশে কান পাতলেই শোনা যেত, বিশেষত শতাব্দীর শেষ সিকিতে। তখন বিদ্রোহের সময় ছিল না। ভিক্টোরিয়া–রাজের আর আধুনিক যুগের প্রতিশ্রুতি তখনো মিলেমিশে একাকার। তবু সাম্রাজ্যের ছায়াতলে বসে বাংলার সুধীসমাজ তখন স্বদেশপ্রেম বা স্বদেশ-বাৎসল্যবোধের ছন্দে মশগুল।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখন আপন ক্ষমতার তুঙ্গে। দেশপ্রীতির প্রশ্নে চিন্তামগ্ন। সে যুগের আরেক মহারথী, আজকাল স্বল্পপঠিত ভূদেব মুখোপাধ্যায়ও একই প্রশ্নে উদ্গ্রীব। স্বদেশ কী বস্তু—এই প্রশ্ন বঙ্কিম সরাসরি উত্থাপন করেননি; কিন্তু ‘স্বদেশপ্রীতির’ চরিত্র উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করেছেন একাধিকবার। ইংরেজি শব্দ প্যাট্রিয়টিজমের সমার্থক হিসেবে স্বদেশপ্রীতিকে দেখতে বঙ্কিম নারাজ ছিলেন। তার একটি কারণ হলো, প্যাট্রিয়টিজমের পরনির্ভরশীলতা, অপরকে দমন করে নিজেকে সিদ্ধ করার প্রবৃত্তি। বঙ্কিমের ভাষায়, ‘ইউরোপীয় Patriotism ধর্ম্মের তাৎপর্য্য এই যে, পর-সমাজের কাড়িয়া ঘরের সমাজে আনিব। স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধি করিব, কিন্তু অন্য সমস্ত জাতির সর্ব্বনাশ করিয়া তাহা করিতে হইবে। এই দুরন্ত Patriotism প্রভাবে আমেরিকার আদিম জাতিসকল পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইল।’ (১৩৬১, ৬৬১)
স্বদেশপ্রীতি প্রসঙ্গে বঙ্কিমের সবচেয়ে পরিষ্কার বর্ণনা দেখা যায় ধর্মতত্ত্বে। স্বদেশপ্রীতিকে ‘জাগতিক প্রীতির’ উচ্চ শিখর ঠাওরে হারবার্ট স্পেন্সারের বরাতে বঙ্কিম বলেন, ‘সমাজধ্বংস’ হলে আত্মপ্রেম, মনুষ্য মঙ্গল তদুপরি ধর্ম বিলীন হবে। তাই এসবেরই ওপরে হচ্ছে ‘দেশরক্ষা’ ও স্বদেশপ্রীতি’ (১৩৬১, ৬৬০)। লক্ষণীয়, ‘সমাজ’ ও ‘দেশ’ বঙ্কিমের বর্ণনায় একাকার হয়ে যায়। এই জটলার মধ্যে আরও এসে ঢোকে ‘লোকহিত’—জনসাধারণের উপকার করার ধর্ম। এই জট খুলতে গিয়ে বঙ্কিম লিখেছিলেন, ‘যেখানে লোকহিতার্থে মিথ্যা নিতান্ত প্রয়োজনীয়—অর্থাৎ যেখানে মিথ্যাই সত্য হয়, সেইখানেই মিথ্যা কথা কহিয়া থাকেন।’ (১৩৬১, ৭৭৬)
রবীন্দ্রনাথের মতে ভারতবর্ষের মামলাটা আলাদা। সমাজের এখানে নিজস্ব এক গতি আছে। যৌথ জীবনের প্রয়োজনগুলো সামাজিকভাবে সাধিত হয়, তাঁর ভাষায়, এক ‘আশ্চর্য্যরূপে, বিচিত্ররূপে’ (১৩১২, ২০)। সমাজ যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ, রাষ্ট্র সেখানে এক বহিরঙ্গের ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের সমাজ–দর্শনের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে বলাই বাহুল্য, এই তর্কের মূল সমকালীন কাণ্ডারি ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ভূদেবের মতো রবীন্দ্রনাথও বলেন যে ভারতবর্ষে যুগযুগান্ত নানা শাসকের বদল হলেও সমাজের নিজস্ব স্বাধীনতা কখনো খর্ব হয়নি।
এই পর্যবেক্ষণ রবীন্দ্রনাথকে আহত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ বাদানুবাদ বাংলার চিন্তা-ইতিহাসের স্মরণীয় এক অধ্যায়। ১৮৮৪ সালের এই তর্কের আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ ‘লোকহিত’ বা ‘পাবলিক’ নামক নানা বিমূর্ত ধারণা কী করে চিন্তার শিথিলতার লক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে নানা জায়গায় লিখেছেন। তাই বঙ্কিমের এই উচ্চারণ শোনার পর তাঁর নতুন করে ভাবার প্রয়োজন হয়নি। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘লোকহিত তুমিই বা কী জান, আমিই বা কী জানি! লোকের শেষ কোথায়! লোক বলিতে বর্তমানের বিপুল লোক ও ভবিষ্যতের অগণ্য লোক বুঝায়। এত লোকের হিত কখনোই মিথ্যার দ্বারা হইতে পারে না। কারণ মিথ্যা সীমাবদ্ধ, এত লোককে আশ্রয় সে কখনোই দিতে পারে না।’ (১৪০৭, ৪৩৩)
বঙ্কিমের ধর্মতত্ত্বের ভেতর থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পাঠ করেছেন কি না, তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে; তবে রবীন্দ্র-বঙ্কিম তর্কের আগাপাছতলা আপাতত আমরা বন্ধনীর বাইরেই রাখি। কেননা, এই তর্কের সমান্তরালে রবীন্দ্রনাথ উত্থাপন করছিলেন আরেকটি প্রশ্ন। স্বদেশ মানে কি জাতি, জনসাধারণ, রাষ্ট্র, ভূগোল? নাকি কালের আকরে জমে থাকা নীতিরাশি? এই তর্কের শিকড় থেকেই রবীন্দ্রনাথ গঠন করেন তাঁর স্বদেশ, যার কলকবজা আমাদের কাছে যতটা পরিচিত মনে হয়, মোটেও তা নয়।
৩.
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক লেখাজোখার মধ্যে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের নাম হচ্ছে ‘স্বদেশী সমাজ’ নামক প্রবন্ধ। ১৯০৪ সাল, তথা ১৩১১ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ছাপা হওয়ার আগে তা পঠিত হয় জনসমক্ষে, স্বদেশি আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যে। এই প্রবন্ধপাঠের মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ কিছুদিনের জন্য সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন—যার পুনরাবৃত্তি স্বদেশি আন্দোলনের আগে বা পরে আর হয়নি। প্রবন্ধ পাঠমাত্রই নানা বিতর্ক লেখাটিকে ঘিরে ধরে, যে বিতর্কের রেশ বহুদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল।
‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধের মূল কথা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক। বিজ্ঞ পাঠক জানবেন, তবু মনে করিয়ে দেওয়া সমীচীন যে সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্ক ছিল ঊনবিংশ শতকের মৌলিক প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি। সমাজ আপন নিয়মে কীভাবে পরিচালিত হয়, তার সুলুকসন্ধান করতে গিয়ে বেড়ে ওঠে অর্থশাস্ত্র থেকে সমাজতত্ত্ব নানা জ্ঞানকাণ্ড। একই শতকে রাজনীতিরও নতুন ভিত্তি তৈরি হয়—সমাজগঠন ও চালনার নতুন কর্তারূপে। এই ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকলেও রবীন্দ্রনাথের কাছে মূল হয়ে দাঁড়িয়েছিল সমকালীন পশ্চিমা রাজনীতির দৃঢ় আত্মবিশ্বাস যে রাষ্ট্রকেই সর্বেসর্বা হতে হবে—সমাজের নিজস্ব কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। উনিশ শতকীয় সভ্যতাশাস্ত্রের ভাষায় তা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ উপসংহার টানেন এই মর্মে যে রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতাই পশ্চিমের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
রবীন্দ্রনাথের মতে ভারতবর্ষের মামলাটা আলাদা। সমাজের এখানে নিজস্ব এক গতি আছে। যৌথ জীবনের প্রয়োজনগুলো সামাজিকভাবে সাধিত হয়, তাঁর ভাষায়, এক ‘আশ্চর্য্যরূপে, বিচিত্ররূপে’ (১৩১২, ২০)। সমাজ যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ, রাষ্ট্র সেখানে এক বহিরঙ্গের ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের সমাজ–দর্শনের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে বলাই বাহুল্য, এই তর্কের মূল সমকালীন কাণ্ডারি ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ভূদেবের মতো রবীন্দ্রনাথও বলেন যে ভারতবর্ষে যুগযুগান্ত নানা শাসকের বদল হলেও সমাজের নিজস্ব স্বাধীনতা কখনো খর্ব হয়নি। উনিশ শতকীয় সমাজবিজ্ঞানের জন্য যৌথ জীবনমাত্রই পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল, অলিখিত নিয়মে চালিত নৈর্ব্যক্তিক এক ক্ষেত্র। রাজনীতি সমাজের সূত্র মেনেই চালিত হয়। পক্ষান্তরে, রাজনীতি পরজীবী। রবীন্দ্রভাষ্যে সমাজই বরং বাংলার প্রাণশক্তি, যা এক অচেতন সাংগঠনিক ক্ষমতার ওপর ভর করে ব্রিটিশরাজের অধীনেও টিকে আছে।
সহজিয়াভাবে সচরাচর সিক্ত হলেও স্বদেশ সহজ কোনো সত্তা নয়। জাতি, সম্প্রদায়, লোক—নানারূপে তা বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে। সমকালের চলতি কোনো উত্তরে রবীন্দ্রনাথ তুষ্ট ছিলেন না। রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণকে এক পাশে সরিয়ে তাঁর স্বদেশসন্ধান সূচিত হয়। সেই জিজ্ঞাসার এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ হয় স্বদেশিযুগের গান ও সাহিত্যে, যা স্বদেশ নামক বস্তুকে প্রেম ও সাধনার নতুন এক ভাষায় বোধগম্য করে তোলে।
এর সঙ্গে মিলে ছিল আরেকটি ব্যাপার। পূর্বদেশের সমাজ আর পশ্চিমা রাষ্ট্র যদি আপন বৈপরীত্য বজায় রেখে মিলতে পারে, তবে গোটা বিশ্বকে একই সামাজিক প্রক্রিয়ার রকমফের হিসেবে দেখার প্রয়োজন পড়বে না। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুস্থানীয় ব্রজেন্দ্রনাথ শীল এ রকমই একটি দাবির একটি দার্শনিক ভিত্তি দেন পশ্চিমা দর্শনের ভাষায়। ব্রজেন্দ্রনাথের ভাষায়, বিশেষ দেশের বিশেষ ‘ব্যক্তিত্বকে’ প্রাধান্য দিয়ে যে বিশ্বসমাজ রচিত, কেবল তাকেই বলা যায় ‘Universal Humanity’ (১৯১১, ১২)। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যস্থাপন।’ (১৩১২, ৫০)
এভাবে স্বদেশের অবয়ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে পুরোনো দ্বিধা ছিল, তার সাময়িক এক সমাধান মিলল। স্বদেশের আরেক নাম হয়ে দাঁড়াল সমাজ। যে সমাজ যৌথ, আপন নিয়মে চালিত, তবু আধুনিক জ্ঞানকাণ্ডের সোসাইটি নয়। আর স্বদেশ-সংশয়ের এই অবসান সম্ভব করে তুলল স্বদেশপ্রেমের নতুন এক ভাষা।
৪.
ভারতবর্ষের রাজনীতিকেই রাষ্ট্রের পরিসর থেকে মুক্ত করে কেবল সমাজের মধ্যে আবদ্ধ রাখাটা সমসাময়িক রাজনৈতিক চেতনার ধারকেরা সদয়ভাবে দেখেননি। রাষ্ট্রচিন্তা কীভাবে নকলবৃত্তিতে পর্যবসিত হয়, সেটা দেখাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ সমাজের ওপর যেভাবে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তা যারপরনাই আধুনিক গণতন্ত্রের মন্ত্রে উজ্জীবিত উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে তুষ্ট করতে পারেনি। স্বদেশি সমাজের প্রায় এক যুগ পর—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিগর্ভে বসে—রবীন্দ্রনাথ যখন জাপান ও মার্কিন মুল্লুকে তাঁর জগদ্বিখ্যাত ন্যাশনালিজম নামক বক্তৃতা দিলেন, ঠিক একই সমালোচনার শেল বর্ষিত হলো পশ্চিমের যুদ্ধ-অক্লান্ত বুদ্ধিজীবী মহল থেকে। বহুদিন তাঁর নামের সঙ্গে ‘অ্যান্টি-পলিটিক্যাল’ তকমা লেগে রইল। আধুনিক রাজনীতির ব্যাকরণের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সন্দিগ্ধ মনোভাব নিয়ে আমরা নানা প্রশ্ন তুলতেই পারি, তবে এটাও অনস্বীকার্য যে রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নগুলো বনিয়াদি, চিন্তার প্রাথমিক অনুমানগুলো নিয়ে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশসন্ধানের মর্ম আরও বৃহৎ। পাঠক জানবেন যে ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ রচনার যুগে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপর্বের গানের এক বিশেষ স্ফূর্তি ঘটে। ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখিত হয় ওই সময়ে; হয় ‘ও আমার দেশের মাটি,’ ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং আরও নানা বিখ্যাত গান। স্বদেশি আন্দোলনের যুগ হয়ে ক্রমে সেই সব গান রাজনৈতিক ভাষার অবয়বে মিশে যায়।
অভাব ও অপূর্ণতার আক্ষেপ এক পিঠে, আরেক পিঠে আত্মগরিমা—এই দুইয়ে মিলে স্বদেশপ্রেমের যে পরিচিত ভাষা, তার চিহ্ন স্বদেশি রবীন্দ্রনাথে পাওয়া যায় না। সমাজের অভাবী পূর্ণতা আর ঐক্যগুণ এই স্বদেশপর্বের গানে ‘মা’ ডাকে ভূষিত হয়। এই স্বদেশপ্রেমের ভাষায় গৌরবের বাহুল্য নেই; আছে পূর্ণতা, প্রকৃতির রূপকে। তাতে রূপান্তরের বাসনা নেই, নেই কোথাও পৌঁছানোর তাড়না। ‘গরিবের ধন যা আছে, তাই দিব চরণতলে’—এই সংকল্প আছে। সমাজ-দর্শন দিয়ে স্বদেশের যে মানে তিনি দৃশ্যমান করে তুলতে চাচ্ছিলেন, তারই আরেক রূপ ধরা পড়ে এই গানগুলোতে।
তাই এসব গানের গূঢ়ার্থ ধরতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনার জানালা দিয়ে দেখতে হবে। রবীন্দ্রনাথের সমাজদর্শনের উপযোগিতা আমরা যেভাবেই বিচার করি না কেন, সেই দর্শনের ফলে স্বদেশজ্ঞানের যে ভাষা তৈরি হয়, তা পরাক্রমী গর্বে নয়; বরং আত্মজ্ঞান ও আত্মশক্তির প্রতিশ্রুতিতে তাড়িত ছিল। আর তাই আধুনিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে সংশয়ী থেকেও রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার ছায়াতল একেবারে ছেড়ে যাননি।
৫.
সহজিয়াভাবে সচরাচর সিক্ত হলেও স্বদেশ সহজ কোনো সত্তা নয়। জাতি, সম্প্রদায়, লোক—নানারূপে তা বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে। সমকালের চলতি কোনো উত্তরে রবীন্দ্রনাথ তুষ্ট ছিলেন না। রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণকে এক পাশে সরিয়ে তাঁর স্বদেশসন্ধান সূচিত হয়। সেই জিজ্ঞাসার এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ হয় স্বদেশিযুগের গান ও সাহিত্যে, যা স্বদেশ নামক বস্তুকে প্রেম ও সাধনার নতুন এক ভাষায় বোধগম্য করে তোলে। এই নতুন স্বদেশপ্রেমের ভাষা একদা বাংলার জাতীয়তাবাদে মিশে গিয়ে তাকেও রূপান্তরিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশসন্ধান ও প্রাপ্তির ফল—এই হিসাবে সুদূরপ্রসারী।
সূত্র
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আত্মশক্তি; কলকাতা: মজুমদার লাইব্রেরি, ১৩১২ বঙ্গাব্দ।
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবীন্দ্র-রচনাবলি (সুলভ সংস্করণ), সপ্তদশ খণ্ড; কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ।
৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; বঙ্কিম রচনাবলি, দ্বিতীয় খণ্ড; কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৩৬১ বঙ্গাব্দ।
৪. ব্রজেন্দ্রনাথ শীল; ‘মিনিং অব রেস, ট্রাইব’, পেপারস অন ইন্টার–রেশিয়াল প্রব্লেমস: কমিউনিকেটেড টু দ্য ফার্স্ট ইউনিভার্সাল রেসেস কংগ্রেস অ্যাট দ্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, জুলাই ২৬–২৯, ১৯১১; গুস্তাভ স্পিলার সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ১–১২; লন্ডন: পি এস কিং অ্যান্ড সন, ১৯১১।
নাজমুল সুলতান: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র