আর্তুস: লোককথা থেকে জার্মান উপন্যাসে

চের্তোরিস্কি জাদুঘরে সংরক্ষিত শিল্পী জিওভান্নি দাল পন্তের’ দুই যুগল—প্যারিস ও হেলেন, ট্রিস্টান ও ইজোল্ড’ অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

রাজা আর্তুস একজন আদর্শ দরবারি শাসক। ধারণা করা হয়, প্রথম জার্মান আর্তুস-উপন্যাস ‘এরেক’-এ হার্টমান ফন আউয়ে শুরুতে সেভাবেই রাজাকে উপস্থাপন করেছিল। হয়তো কোনো রাজকীয় দরবারি উৎসব চলছে, আর রাজা বসে আছে জমকালো তাঁবুর নিচে, তার চারপাশ সাহসী নাইট এবং সুন্দরী অভিজাত রমণীতে পরিবেষ্টিত। কিন্তু যেহেতু হার্টমানের রচনার শুরুর অংশটি হারিয়ে গেছে, তাই আমাদের এই ‘আর্তুসবিষয়ক প্রস্তাবনা’ বা ওপেনিংয়ের জন্য ‘এরেক’ উপন্যাসের মূল আদর্শ, বিখ্যাত ফরাসি লেখক ক্রিতিয়েঁ দে তোয়ার ‘এরেক এ এনিদে’র দিকে তাকাতে হয়। ‘এরেক এ এনিদে’-ই হলো প্রথম ফরাসি আর্তুস-উপন্যাস। সেখানে আমরা দেখি, আর্তুসের দরবারের ওই উৎসবের মূল ভিত্তি প্রাচীন একটি রাজকীয় প্রথা। মূলত এই উৎসবের মধ্য দিয়েই রাজা প্রথাটির পুনঃপ্রচলন ঘটায়। প্রথাটি হলো, একটি শ্বেতহরিণ শিকারের প্রতিযোগিতা হবে। সেই প্রতিযোগিতার বিজয়ীর জন্য বিশেষ পুরস্কার হিসেবে থাকবে রাজদরবারের সুন্দরীতম কুমারীর চুম্বন, পরে তা গড়াবে বিয়েতে। এর মাধ্যমেই রাজা রাজদরবারের সামাজিক আদর্শকে বজায় রাখে, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ নাইট ও সুন্দরীতম নারীর ভেতর বন্ধন তৈরি করে তাদের ঔরসে রাজদরবারের জন্য উপযুক্ত প্রজন্ম তৈরি করা। কিন্তু রাজদরবারের গোলটেবিলের প্রথম নাইট গুভা এই পুরো ধারণার মধ্যে একটি ‘কিন্তু’ খুঁজে বের করে। সে বলে, ‘কিন্তু এ রকম হলে বিবাদ তৈরি হতে পারে। কারণ, উপস্থিত পাঁচ শ নারীর মধ্যে কাকে সুন্দরীতম বলা হবে? তার মাপকাঠিই-বা কী?’ এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আর্তুস তাঁর রাজকীয় অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করেন—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজার হাতে। আর তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না।

ফ্রান্সে ১১৭০ সালের দিকে যখন ক্রিতিয়েঁ দে তোয়া ‘এরেক এ এনিদে’ রচনা করছেন, তখন আর্তুসকে নিয়ে ইতিমধ্যেই মৌখিক গল্প প্রচলিত ছিল। ক্রিতিয়েঁ তাঁর ভূমিকাংশে নিজেই এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু জার্মানিতে সম্ভবত দরবারি সমাজের গল্পগুলো কেবল তাঁরাই জানতেন, যাঁরা ফরাসি রাজদরবারে যাতায়াত করতেন অথবা ক্রিতিয়েঁর উপন্যাসগুলো পড়েছিলেন। যে কারণে হার্টমান ফন আউয়েকে সম্ভবত ক্রিতিয়েঁর চেয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা শুরু করতে হয়েছিল, যাতে রাজা আর্তুসের ভূমিকা এবং গুভার-এর অবস্থান পাঠকের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়।

ফন আউয়ের ভূমিকাংশ হারিয়ে গেলেও পরবর্তী বর্ণিত দৃশ্যের মধ্যেই স্পষ্ট দেখা যায়, আর্তুসই এই মহিমান্বিত উৎসবের আয়োজনকারী এবং তাঁর দরবারে নাইট ও অভিজাত নারীদের দরবারি জীবন একে অপরের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিধির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। জীবনসঙ্গী হিসেবে সুন্দরীতম নারী অর্জন করা নাইটদের জন্য বিশেষ সম্মানের বলেও পরিগণিত। আর একদম শেষে রাজা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেও তিনি ইচ্ছেমতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, বরং তাঁর সিদ্ধান্তগুলো দরবারের গোলটেবিলে আলোচিত হয়।

ফন আউয়ের ভূমিকাংশ হারিয়ে গেলেও পরবর্তী বর্ণিত দৃশ্যের মধ্যেই স্পষ্ট দেখা যায়, আর্তুসই এই মহিমান্বিত উৎসবের আয়োজনকারী এবং তাঁর দরবারে নাইট ও অভিজাত নারীদের দরবারি জীবন একে অপরের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিধির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। জীবনসঙ্গী হিসেবে সুন্দরীতম নারী অর্জন করা নাইটদের জন্য বিশেষ সম্মানের বলেও পরিগণিত। আর একদম শেষে রাজা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেও তিনি ইচ্ছেমতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, বরং তাঁর সিদ্ধান্তগুলো দরবারের গোলটেবিলে আলোচিত হয়। অর্থাৎ তিনি কোনো স্বৈরশাসক নন, বরং তাঁর দরবারের সমমানের মানুষদের মধ্যে প্রথম—প্রাইমাস ইন্টার প্যারেস। আর গোলটেবিলের ধারণার মাধ্যমেই তা প্রকাশ পায়। টেবিলটি গোল তার অর্থ এখানে সবার মর্যাদাই সমান, এখানে সবারই সমালোচনা এবং মতামত দেওয়ার সমান অধিকার আছে। তবে রাজার মূল কাজ হলো তাঁর ঐতিহ্য এবং তাঁর পিতা উথার পেনড্রাগনের প্রথা রক্ষা করা।

দুই যুগল—প্যারিস ও হেলেন, ট্রিস্টান ও ইজোল্ড, শিল্পী জিওভান্নি দাল পন্তে (১৩৮৫–১৪৩৮ খ্রিষ্টাব্দ)
ছবি: চের্তোরিস্কি জাদুঘর

হার্টমান কেন ক্রিতিয়েঁ দে তোয়ার উপন্যাসের স্বাধীন অনুবাদ করেছিল, তার কারণ আমরা ঠিক যেমন জানি না, তেমনি এর পৃষ্ঠপোষক কে ছিল (হয়তো ‘এরেক’-এর ভূমিকাংশে এ সম্পর্কে কিছু ছিল), তা-ও আমরা স্পষ্ট জানতে পারি না। তবে এই কাজের আকার-আকৃতি দেখে নির্দ্বিধায় বলা যায়, এটি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী উচ্চ অভিজাত বংশের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। কারণ, এ ধরনের কাজ করার আগে বা উদ্যোগ গ্রহণের আগে কিছু প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত পূরণ করা প্রয়োজন। যেমন মূল ফরাসি কপির ব্যবস্থা করা, কবিকে অন্য কাজ থেকে ছুটি দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী রাজদরবারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কবিকে পুরস্কৃত করা। এবং পরে এমন একটি দরবারি পরিবেশ বা শ্রোতা তৈরি করা, যারা অত্যন্ত খোলামনে এই নতুন ধরনের সাহিত্য গ্রহণে প্রস্তুত। আর এ ধরনের বিষয়ের দিকে তাকালে দেখা যাবে, দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ ২৫ বছরে সাহিত্যবিষয়ক রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আয়োজনে জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমের অভিজাত বংশগুলো সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে ছেহরিঙ্গেনের ডিউকরা—হেরৎসোগে ফন জেয়ারিঙ্গেন। কারণ, রাজনৈতিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ফরাসি আভিজাত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তাঁরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। একই সঙ্গে আধুনিক সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও সাহিত্যচর্চায় তাঁরাই সে সময়ে অগ্রগামী ছিলেন। ফলে তাঁরাই ক্রিতিয়েঁর মতো ফরাসি সাহিত্যকে গ্রহণ করে হার্টমানের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন, এই ধারণা অত্যন্ত যুক্তিসংগত।

ফ্রান্সের মতো জার্মানিতেও ভার্জিলের ‘ইনিড’ আর্তুস-উপন্যাসের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। ‘ইনিড’-এর ওপর ভিত্তি করে লেখা হাইনরিশ ফন ফেল্ডেকের ‘এনেয়াসউপন্যাস’/ হার্টমানের ‘এরেক’-এর আগেই রচিত। ফেল্ডেকে ভার্জিলের লাতিন ‘ইনিড’ ছাড়াও এর ফরাসি রূপান্তরটি ভালোভাবে জানতেন। ফলে তাঁর উপন্যাসে গল্পটি নিজের মতো করে বলতে পেরেছেন। সম্ভবত হার্টমান সেটা দেখেই ‘এরেক’-এ একই কাজ করেছেন। কিন্তু আর্তুস-উপন্যাসের উপাদান গ্রিক থেকে নয়, এসেছে মূলত ব্রেটন বা কেল্টিক ঐতিহ্য থেকে। আর এই উপাদান কেল্টিক ঐতিহ্য থেকে এলেও এর মূল উপজীব্য কখনোই ঐতিহ্য বা ইতিহাস নয়। ফলে এই ধরনটি যেমন তৎকালীন জার্মান ‘রোলান্ডস্লিড’-এর (ফাফে কনরাডের অনুবাদে জার্মানে অনূদিত বা লিখিত ফরাসি বীরত্বগাথা ‘লা শঁসোঁ দ্য রোলাঁ’) সঙ্গে মেলে না, তেমনি মেলে না জার্মান প্রাক্-ইতিহাসের লোককাহিনি (পরে মহাকাব্য আকারে লিখিত) ‘নিবেলুঙ্গেনলিড’-এর ধরনের সঙ্গেও। যে কারণে সে সময়ে আর্তুস-উপন্যাসের ধরনটি ছিল একেবারেই নতুন এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কোনো বোঝা বা বাধ্যবাধকতা থেকে একেবারেই মুক্ত। ফলে সমসাময়িক আধুনিক বিষয়বস্তু দিয়ে একে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে তোলা গেছে। এ ধরনের উপন্যাস দরবারি সংস্কৃতির মূল ভাব সহজে ধারণ করতে পেরেছে যেমন নিখুঁত মহৎ প্রেম এবং সঠিক লড়াই কাকে বলে, তা আর্তুস-উপন্যাসে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখানো গেছে।

এই দরবারি সাহিত্যের বাহ্যিক কার্যকারিতার পাশাপাশি আর্তুস-উপন্যাসে একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ বা বিষয়বস্তুগত দিক যুক্ত হয়। উপন্যাসে রাজা আর্তুস নিজে আদর্শ কাহিনির প্রধান নায়ক নয়, বরং সে জামিনদার। গোলটেবিলের কোনো একজন নাইট উপন্যাসের আসল চালিকা শক্তি কিংবা নায়ক। রাজাকে আদর্শ হিসেবে দেখা হলেও সে নিজে সরাসরি কিছু করে না। রাজা আর্তুসের ওই সীমিত কিংবা নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে কেউ ঐতিহাসিক রাজা হিসেবে গ্রহণ করেনি। এমনকি ক্রিতিয়েঁ নিজেও আর্তুসকে কোনো ঐতিহাসিক রাজা হিসেবে গ্রহণ করেননি।

একই সঙ্গে আর্তুস-উপন্যাসের কিছু বিষয় জার্মান সংস্কৃতিতে আগে থেকেই ছিল, ফলে জার্মান লেখকেরা কল্পনার সংকটেও ভোগেননি। যেমন রাজা আর্তুসের সেই মহোৎসবের সঙ্গে তৎকালীন সম্রাট ফ্রেডরিক প্রথম-এর বিখ্যাত মাইন্স উৎসবের কথা স্মরণ বা তুলনা করা যেতে পারে। এমনকি হাইনরিশ ফন ফেল্ডেকে ‘এনেয়াসউপন্যাস’-এ এই উৎসবকে ইনিডের বিয়ের উৎসবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, মাইন্স উৎসব ছাড়া ইনিডের বিয়ের উৎসবের মতো এত বড় জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের কথা কখনো কল্পনা করতে পারেননি। ওই উৎসবে বিভিন্ন জার্মান রাজা-রাজপুত্রদের পাশাপাশি উচ্চ আভিজাত্যের প্রতিনিধিরা, বারগুন্ডি ও ফ্রান্সের রাজারা অংশ নিতেন। ১১৮৪ সালের মহোৎসবে কবি ফন হাউজেন এবং গিইয়ো দে প্রোভা উপস্থিত ছিলেন এবং সম্ভবত লিরিক কবিতা বা মিনেস্যাং এবং আখ্যানধর্মী কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছিল। ওই উৎসবে থুরিঙ্গিয়ার মহিপাল লুডভিগ তৃতীয়র সঙ্গে হাইনরিশ ফন ফেল্ডেকেও তাঁর দরবারি কবি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ফন ফেল্ডেকে নিজেই জোর দিয়ে বলেছেন, মাইন্স উৎসবে তিনি হার্টমান ফন আউয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এবং ফন আউয়ে সম্ভবত বারথোল্ড চতুর্থ ফন ছেহরিঙ্গেনের সঙ্গে উৎসবে এসেছিলেন। এ অনুমানের ভিত্তিতে বলা যায়, ১১৮৪ সালের ওই উৎসবই হয়তো হার্টমানকে তাঁর ‘এরেক’ রচনার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সম্ভবত ফেল্ডেকের উপন্যাস এবং তার মাধ্যমে উৎসবে সৃষ্ট প্রভাব তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। দরবার বা উৎসবে এ ধরনের বিনোদনমূলক আবৃত্তি বা উপস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও অন্তত বলা যায়, উচ্চ অভিজাতদের কাছে এ ধরনের সাহিত্যের সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল।

উনিশ শতকের আর্থুস-কল্পনা, হেনরি ক্ল্যারেন্স হোয়েটের তৈলচিত্র, ব্যক্তিগত সংগ্রহ
ছবি: ব্রিজম্যান ইমেজেস

এই দরবারি সাহিত্যের বাহ্যিক কার্যকারিতার পাশাপাশি আর্তুস-উপন্যাসে একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ বা বিষয়বস্তুগত দিক যুক্ত হয়। উপন্যাসে রাজা আর্তুস নিজে আদর্শ কাহিনির প্রধান নায়ক নয়, বরং সে জামিনদার। গোলটেবিলের কোনো একজন নাইট উপন্যাসের আসল চালিকা শক্তি কিংবা নায়ক। রাজাকে আদর্শ হিসেবে দেখা হলেও সে নিজে সরাসরি কিছু করে না। রাজা আর্তুসের ওই সীমিত কিংবা নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে কেউ ঐতিহাসিক রাজা হিসেবে গ্রহণ করেনি। এমনকি ক্রিতিয়েঁ নিজেও আর্তুসকে কোনো ঐতিহাসিক রাজা হিসেবে গ্রহণ করেননি।

যদিও ক্রিতিয়েঁর সমসাময়িক ইতিহাসনির্ভর লেখায় আর্তুসকে ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবেও দেখা গেছে। বিশেষ করে ওই সময়ের বেশ আগে (প্রকাশিত ১১৩৬) রচিত জিওফ্রে অব মনমাউথ-এর ‘ব্রিটেনের রাজাদের ইতিহাস’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন হাত ঘুরে অভিজাত নরমান এবং রাজা স্টিফেন অব ইংল্যান্ডের কাছে এসেছিল। জিওফ্রের এই গ্রন্থের সঙ্গে নরমানদের শাসনের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গভীর সম্পর্ক ছিল। যেহেতু নরমান রাজারা ছিল বিদেশি, ফলে ব্রিটেনের প্রাচীন ঐতিহ্য তাদের অচেনা। তাই জিওফ্রে এমন একটি ইতিহাসের ধারণা তৈরি করেছিলেন যেটা নরমানদের ব্রিটিশ রাজাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখায়। এবং সেটা কোনো বংশগত উপায়ে নয়, বরং তাদের শাসন পরিচালনার রীতির মাধ্যমে। এই গ্রন্থে দেখা যায় আর্তুস একই সঙ্গে প্রাচীন ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্বকারী আদর্শ রাজা। তার জীবন অ্যাংলো-নরমান রাজাদের বিলাসবহুল দরবারি জীবনযাত্রার আদলে তৈরি, আয়োজন করে জমকালো রাজকীয় উৎসবের, সেখানে স্থান পায় নাইটদের খেলা ও টুর্নামেন্ট, সে সংগীত ও কলাকে উৎসাহিত করে, লাতিন বিজ্ঞানকে সমর্থন করে। জিওফ্রে তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে একজন কেল্টিক জাতীয় বীরকে ব্রিটিশদের জাতীয় আইডেনটিটি বা ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে এতটাই সফল হয়েছিল যে আজও ব্রিটেনের যুবরাজরা তাদের নামের মধ্যে কোথাও না কোথাও ‘আর্তুস’ শব্দটি বহন করে।

‘ব্রিটেন, দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সেরা… এভাবেই জিওফ্রে তাঁর গ্রন্থে রাজাদের ইতিহাস শুরু করেন। কাহিনি শুরু হয় ব্রুটুস/ব্রুটোনস নামক এক পৌরাণিক চরিত্রের মাধ্যমে—ব্রুটুস ছিল ইনিডের নাতি। এই বংশলতিকাটি মধ্যযুগ থেকেই গ্রিকদের মতোই মর্যাদাপূর্ণ বলে গণ্য হয় বলে ব্রুটোনস/ব্রিটোনসদের রোমান রাজাদের সমকক্ষ করে তোলে। কারণ, রোমানরাও নিজেদের ইনিড-এর রক্ত থেকে উদ্ভূত বলে দাবি করত। গ্রন্থে দেখানো হয়, ব্রুটাস ট্রয় নগরী ধ্বংসের পর বেঁচে যাওয়া ট্রোজানদের একত্র করে গ্রিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যুদ্ধ শেষে কিছু লোক নিয়ে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করে অ্যালবিয়ন দ্বীপে পৌঁছায় এবং নিজ নামানুসারে নাম রাখে ব্রিটেন।

দ্বাদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইংল্যান্ডে আর্তুসকে নিয়ে গল্পগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এটি অসম্ভব নয় যে ব্রেটনরা (যারা ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে বাস করত), ১০৬৬ সালের পর নরমান বিজয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে এসে জাতীয় আইডেনটিটি গড়তে আর্তুসের কাহিনিকে বীজ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জিওফ্রে যে ব্রেটন-বান্ধব এবং সম্ভবত নিজেও ব্রেটন বা ওয়েলশ বংশোদ্ভূত ছিল, তা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়। তবে ক্রিতিয়েঁ তার এই আর্তুস জগতের জ্ঞান কেবল জিওফ্রে এবং ওয়েসের গ্রন্থ থেকে পায়নি, বরং তার সমসাময়িক ফরাসি মৌখিক ঐতিহ্য থেকেও পেয়েছিল, যার উল্লেখ সে তার এরেক দে এনিদের ভূমিকাংশে (চরণ ২০-২২) করেছেন।

পরে তাঁর ছেলেদের মধ্যে তাঁর রাজ্য ভাগ হয়ে যায়। প্রথম ছেলে লোগরিনাস যে অংশটি পায়, তার নাম হয় লোগরিয়েন, আজকের ইংল্যান্ড, দ্বিতীয় ছেলে ক্যাম্বার যে অংশটি পায়, তার নাম হয় ক্যামব্রিয়া, আজকের ওয়েলস। জিওফ্রে এরপর পরবর্তী ১৫০০ বছরের ইতিহাস বর্ণনা করেন—রোমানদের আক্রমণ এবং জুলিয়াস সিজারের আগমন ও স্যাক্সনদের আক্রমণের কথা তার গ্রন্থে বলেন। কনস্ট্যান্টিনের অধীনে কেল্টিকরা লড়াই করে। তিনি লেখেন, এই লড়াই পরিচালনা করেছিল ব্রিটেন থেকে আসা একজন সেনাপতি, যে পরে ব্রিটেনের একটি অংশের রাজা হয়েছিল। তার দুই ছেলে ছিল—অরেলিয়াস অ্যামব্রোসিয়াস এবং উথার পেনড্রাগন। প্রথমজন আগে এবং পরে দ্বিতীয়জন রাজা হয়। উথার কর্নওয়ালের ডিউকের স্ত্রী ইগার্নাকে প্রথম দেখার পর প্রেমে পড়ে, যে কারণে সে ডিউকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, কিন্তু যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়ার কারণে ইগার্নার কাছে পৌঁছানোর জন্য সে জাদুকর মার্লিনের সাহায্য নেয়, এবং জাদুর মাধ্যমে ডিউকের রূপ ধরে উথার ইগার্নাকে প্রতারিত করে। ইগার্নার গর্ভেই আর্তুসের জন্ম। আর্তুস যে রাতে জন্মগ্রহণ করে সেই একই রাতে যুদ্ধে ডিউকের মৃত্যু হলে উথার ইগার্নাকে বিয়ে করে আর্তুসকে তার বৈধ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৫ বছর বয়সে আর্তুস তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হয় এবং বহু যুদ্ধে স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। পরে রোমান বংশের গুইনেভিয়ারকে বিয়ে করে আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে এবং গ্যালিয়ায় বিজয় অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের শেষ দিকে রোমান রাজা ট্রিবুন ফ্রোলোকে পরাজিত করে প্যারিসে নিজের দরবার স্থাপন করে এবং দরবারের কাছেই পুরো ইউরোপের জন্য একটি বড় রাজকীয় উৎসবের আয়োজন করে। কিছু দিন যেতে না যেতেই, রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অপরাধের জবাব দেওয়ার জন্য তাকে রোমে তলব করা হয়। সেখানে যাওয়ার পথে সে মন্ট সেন্ট মিশেলের রাক্ষসকে হত্যা করে এবং সসিতে রোমানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। যখন আর্তুস রোমে পৌঁছানোর জন্য যাত্রা শুরু করবে, তখনই খবর আসে যে তাঁর ভাগনে মরড্রেড বিদ্রোহ করেছে এবং রাজ্য ও রানিকে দখলে নিয়েছে। আর্তুস রোমে না গিয়ে ফিরে আসে। মরড্রেড দুবার আর্তুসের কাছে পরাজিত হয় এবং তৃতীয় যুদ্ধে (ক্যামব্লামের যুদ্ধ) নিহত হয়। আর্তুস নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য তাকে ৫৪২ সালে অ্যাভালন দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাজা সুস্থ হলে সেখানে বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হয়। ওই উৎসবের দেখা আর্তুস-উপন্যাসেও পাওয়া যায়। জিওফ্রের উৎসবের বর্ণনায় দেখা যায়, রাজা ও রানি তাদের দরবারি নারীদের সঙ্গে হেঁটে গির্জার দিকে যাচ্ছে, চারদিকে চমৎকার সংগীত পরিবেশিত হচ্ছে। উৎসবের শেষ দিকে থাকে ভোজসভা। ভোজসভাটি প্রাচীন ট্রোজান প্রথা অনুযায়ীই উদ্যাপিত হয়। নারীরা তাদের নাইটদের পোশাকের রঙের সঙ্গে পোশাক পরে। তারা তাদের ভালোবাসা কেবল সেসব যোদ্ধাদেরই দেয় যারা যুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করেছে। এভাবে জিওফ্রের মতে, আর্তুসের দরবারে নারীরা আরও চমৎকার এবং নাইটরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। খাওয়ার পর বিভিন্ন খেলার আয়োজন করা হয়। নাইটরা বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করে, নারীরা প্রাচীর থেকে তা দেখে এবং উৎসাহ দেয়। এর পাশাপাশি তির-ধনুক ও বল্লমের খেলা, পাথরনিক্ষেপ এবং পাশা খেলার আয়োজনও থাকে। প্রত্যেক বিজয়ীকে আর্তুস পুরস্কৃত করেন। কিন্তু জিওফ্রের রচনায় গোলটেবিলের কথা পাওয়া যায়নি। গোলটেবিলের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় ১১৫৫ সালের দিকে মাইস্ত্রে ওয়েস (Maistre Wace) রচিত, পরে ফরাসিতে রূপান্তরিত রোমাঁ দে ব্রুট কাব্যে। প্রায় ১৫ হাজার লাইনের এই কাব্যে ওয়েস জিওফ্রের ইতিহাসকে আরও বিস্তারিত করেন এবং আর্তুসকে দরবারি ভাবাদর্শের একজন উত্তম রাজা হিসেবে গড়ে তোলেন। রাজার অন্যতম প্রধান যোদ্ধা গুভা এখানে একজন আদর্শ নাইটের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং দরবারের নারীদের কাছে একজন আদর্শ প্রিয় বন্ধু হিসেবে গণ্য হয়। ওয়েস পেন্টেকোস্ট (জার্মান ফিংস্টেন) উৎসবকে বড় ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু করেন তোলে। তার বর্ণনায় এসবের আগেই আর্তুস গোলটেবিলের ধারণাটি তৈরি করেছিল যাতে ক্ষমতার নিয়ে কোন্দল বা দ্বন্দ্ব এড়ানো যায় এবং তার শাসনকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়। ওয়াস তাঁর কাব্যেই উল্লেখ করেছেন, ব্রেটনদের মুখে প্রচলিত গল্পগুলো থেকেই তার কাব্যের জন্ম। তার কাব্যে আর্তুস একজন যোদ্ধা ও বিজয়ী, একজন জাতীয় আইডেনটিটি হিসেবে দেখানো হয়, দেখানো হয় তার কাহিনি মূলত ব্রিটিশ শাসনের এক রাজকীয় ইতিহাস। কিন্তু এই সবকিছুই পরে ক্রিতিয়েঁ দে তোয়ার হাত ধরে ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করে রূপকথার জগতে—শুরু হয় এক দেশে আর্তুস নামে ছিল এক রাজা…।

পঞ্চদশ শতকে রাজা আর্থুস ও তাঁর গোলটেবিলের সভাসদদের চিত্রায়ণ, ফরাসি জাতীয় গ্রন্থাগার, প্যারিস

জিওফ্রে এবং ওয়েস তাদের বিখ্যাত আর্তুস-কাহিনি কোথা থেকে পেয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রাচীন লাতিন ইতিহাসগ্রন্থ থেকে এ বিষয়ে খুব কমই তথ্য পাওয়া যায়। আর্তুসের আদিমতম উল্লেখ পাওয়া যায় বেনামি ‘ব্রিটেনের ইতিহাস’, ‘Historia Britonum’ গ্রন্থে। ধারণা করা হয় গ্রন্থটি ৮২৯-৮৩০ সালের দিকে ওয়েলসে রচিত হয়েছিল। আজ এটি ৯টি ভিন্ন সংস্করণে টিকে আছে। তবে এই সংস্করণগুলো স্থানীয় লোকগাথা ও রূপকথা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এই গ্রন্থে দেখা যায় আর্তুস ৫ম শতাব্দীতে স্যাক্সন আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ১২টি যুদ্ধ করেছিল, যার শেষ যুদ্ধটি হয়েছিল ব্যাডন পাহাড়ে। আর্তুসবিষয়ক প্রাচীনতম লিখিত উৎসগুলো তাকে রাজা হিসেবে পরিচয় করায় না বরং তাকে কেবল খ্রিষ্টান কেল্টদের একজন বীর সেনাপতি হিসেবেই পরিচয় করায়, যে পৌত্তলিক স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এবং একাই ৯৬০ জনকে পরাজিত করেছিল। মূলত এই ধরনের যুদ্ধ স্থানীয় কেল্টিক ধর্মযাজকদের জাতীয়তাবাদী ভাবনার একটি প্রতিফলন। যেহেতু আর্তুস নামটি লাতিনের মতো শোনায়, তাই হতে পারে এটি কোনো ওয়েলশ নামের রূপান্তর, যেটি কেবল লোকগাথার চরিত্র হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ লোকগাথার চরিত্র না হলে, একজনের পক্ষে ৯৬০ জনকে যুদ্ধে হারানো অলীক। আর্তুসবিষয়ক ঐতিহ্যের প্রাচীনতম রূপটি কতটা প্রাচীন, তা নির্ধারণ করা কঠিন।

দ্বাদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইংল্যান্ডে আর্তুসকে নিয়ে গল্পগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এটি অসম্ভব নয় যে ব্রেটনরা (যারা ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে বাস করত), ১০৬৬ সালের পর নরমান বিজয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে এসে জাতীয় আইডেনটিটি গড়তে আর্তুসের কাহিনিকে বীজ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জিওফ্রে যে ব্রেটন-বান্ধব এবং সম্ভবত নিজেও ব্রেটন বা ওয়েলশ বংশোদ্ভূত ছিল, তা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়। তবে ক্রিতিয়েঁ তার এই আর্তুস জগতের জ্ঞান কেবল জিওফ্রে এবং ওয়েসের গ্রন্থ থেকে পায়নি, বরং তার সমসাময়িক ফরাসি মৌখিক ঐতিহ্য থেকেও পেয়েছিল, যার উল্লেখ সে তার এরেক দে এনিদের ভূমিকাংশে (চরণ ২০-২২) করেছেন। এই গল্পগুলো মূলত ব্রেটন চারণকবিদের মাধ্যমে ফ্রান্সে এসেছিল, যারা মূলত ওয়েলশ ঐতিহ্য থেকে তার উপাদান গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে অ্যাংলো-নরমান, ব্রেটন, ফ্লেমিংস এবং ফরাসিদের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ছিল, তার কারণে এই সাহিত্যকে কোনো একক উৎসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। বলা যায়, এটি বহু-সংস্কৃতি এবং মিশ্র ঐতিহ্যর প্রতিফলন। এবং ক্রিতিয়েঁ জিওফ্রে বা ওয়াসের মতো কোনো জাতীয় ইতিহাস-পুরাণ তৈরি করতে চাননি, বরং চারণকবিদের সেই চটকদার বিনোদনের উপাদানকে রূপান্তর করে তিনি এমন এক নতুন ধরনের শিল্পে যেটা একই সঙ্গে সুন্দর ও শিক্ষণীয় এবং দরবারি সমাজের আদর্শকে প্রতিফলিত করে।

মূল উৎস: ফলক্যার, ম্যারটেন্স: ডেয়ার ডয়চে আর্তুস রোমান, স্টুটগার্ট, রেক্লাম ২০১২। সহায়ক গ্রন্থ: ১. শানসে, ক্রিস্টফ ও ভল্ফসেটেল, ফ্রিডরিশ: আর্তুসরোমান উন্ড বিল্ডলিশকাইট, বার্লিন ২০২২। ২. রোসবাখার, রোলান্ড ফ্রান্স: আর্তুসরোমান উন্ড হ্যারশাফফ্টনাখফলগে, ১৯৯৮