ঐতিহ্যমণ্ডিত চলমল সাধুর গান

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

উত্তরবঙ্গের বিলুপ্তপ্রায়, অথচ ঐতিহ্যমণ্ডিত চলমল সাধুর গান শুধু লোকগান নয়। এ অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, লোকস্মৃতি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক অমরগাথা। এই গানের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনদর্শন, পুরাণচেতনা ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা। প্রাগৈতিহাসিক যুগে রংপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার প্রভৃতি অঞ্চল ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। তখন রাজত্ব করতেন জল্পেশ নামের এক রাজা। তাঁর নামানুসারে জলপাইগুড়ির পূর্বে অবস্থিত জল্পেশ গ্রামে প্রতিষ্ঠা পায় জল্পেশ্বর শিবলিঙ্গ, যেখানে প্রতিবছর শিব চতুর্দশীতে বসে বড় মেলা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, জল্পেশ্বর শিব ভৈরবের একটি বিশেষ রূপ। তা ছাড়া এই জল্পেশ রাজাকে পরশুরামের প্রতীকী রূপ বলে মনে করা হয়।

অন্যদিকে জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জের সাতকুড়া গ্রামে ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নদীতীরবর্তী শালবনের ভেতর রয়েছে বোদেশ্বরী দেবীর মন্দির, যাকে অনেকেই ভ্রামরী দেবী বলে চেনেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, দেবীর ৫২ শক্তিপীঠের এক পীঠ। যদিও ভৈরব মূর্তির অবস্থান বোদেশ্বরীতেই হওয়ার কথা, অনেকেই মনে করেন, সেটি জল্পেশেই স্থাপিত।

এ ছাড়া লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় একসময় শাঁখ রাজার বাড়ি ছিল বলেও ধারণা করা হয়। এসব কাহিনি ও কিংবদন্তি চলমল সাধুর গানে মিশে আছে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের ছায়াপটে।

এই গান উত্তরবঙ্গবাসীর কল্পনায় শুধু ইতিহাস নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা। এখানেই গান, পুরাণ আর ইতিহাস একত্র হয়ে রচনা করে এক অলৌকিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। ইতিহাস ও লোককথার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই চরিত্র চলমল সাধুর গানে বিশেষভাবে বন্দিত হয়েছে। গানের কথায় উঠে আসে—‘চানদামা শহরের লক্ষ্মীমাতার পুত্র চলমল সাধুর সঙ্গে পাটগ্রামের শঙ্খরাজার কন্যা দুবুল সুন্দরীর বিবাহ হয়। বিয়ের পরই আর্থিক সংকটে পড়ে নববধূর আবদার উপেক্ষা করে মায়ের আদেশে সাধু বাণিজ্য করতে বিদেশে যায়। নিঃসঙ্গ দুবুলা রাজ্যের কোটালের প্ররোচনায় মোহিত হন। বাণিজ্য শেষে ১২ বছর পর সাধু ফিরে এলে দুবুলা “পাণির তেজের ছুরি” দিয়ে স্বামী হত্যা করে নীল নদীর মাঝে ভাসিয়ে দেয়। লক্ষ্মীমাতা পুত্রের প্রাণ ফেরাতে নারদের কাছে মন্ত্র শেখেন এবং পুত্রের লাশ উদ্ধার করে মন্ত্রযোগে তাকে প্রাণদান করেন। দুবুলা কোটালের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে একটি “কাঙ্গালখানা” খুলে অতিথি সেবা করেন। ফিরতি পথে সাধু দুবুলার সেবায় সন্তুষ্ট ও পরিচয় জেনে তাকে নিয়ে দেশে ফেরেন এবং চণ্ডীপূজার আয়োজন করেন। সেই পূজায় কোটাল আসলে দুবুলা খড়্গাঘাতে তার মাথা ছিন্ন করেন।’

রংপুর অঞ্চলের লোকসাহিত্যে চলমল সাধুর গান একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এর ভাষা, ছন্দ এবং গীতিধারা যেমন স্থানীয়, তেমনি তাতে কৃষ্ণধামালী রসগীতি ও ভক্তিমূলক গানধারার প্রভাব পরিলক্ষিত। বিশেষ করে গানের ভেতর দশের চরণ বন্দনার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বৈষ্ণব যুগ থেকে প্রচলিত। একই সঙ্গে এ গানের মধ্যে ব্রজবুলির ভাব-ভাষা ও কৃষ্ণধামালীর প্রভাব বিস্তার আছে। কৃষ্ণধামালী সাধারণত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার লীলাভিত্তিক গান, যা বাংলার নানা অঞ্চলে প্রচলিত। এই ধারার সঙ্গে রংপুরি আবেগ ও ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক ও কাব্যিক অভিব্যক্তি। বিশেষ করে যমুনার তীরে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার মিলনগীতি চলমল সাধু ও দুবুলা কন্যার মিলনের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে।

চলমল সাধুর গানেও রাধা-কৃষ্ণ মিলনের ছায়াপাত স্পষ্ট। এখানে দেখা যায়, বাণিজ্যফেরত সাধুর সঙ্গে ঘাটে দুবলা সুন্দরী কন্যার হঠাৎ দেখা। পরিচয় না জেনেও তারা গান করতে করতে রসপূর্ণ কথোপকথনে মেতে ওঠে। এ যেন অলৌকিক প্রেম, যেখানে চেনা-অচেনার খেলা চলে।

এই গানের ভাষা, কাঠামো ও অন্তর্নিহিত প্রেমভাবনা শুধু রোমান্টিকতা নয়, বরং রংপুর অঞ্চলের লোকজ কল্পনার শিকড় স্পর্শ করে। নিচে গানের অংশ তুলে ধরা হলো:

‘জল ভর সুন্দরী কইনা জলে দিয়া ঢেউ।
একেলা ঘাটে এইসাছ কন্যা, সঙ্গে নাই তোর কেউ॥
—তুমি ত রাজার ছাইলা, বিভাও করতে পারো।
পরার রমণীক দেখি, জ্বলে পুড়ে মর।
—আমি ত রাজার ছাইলা বিভাও করতে পারি
তোমার মতো রূপের কইনা মিলাইতে না পারি॥
—আমার মতো রূপের কইনা যদি মিলাইতে চাও,
গলায় কলসী বেঁধে জলে ঝম্প দেও,
—কোথায় পাব কলসী কন্যা কোথায় পাব দড়ী।
তোমরা হও যমুনার জল, আমরা ডুইবা মরি॥’

এই অংশে যেমন প্রেম, ছদ্মপরিচয়ের খেলা এবং রাধা-কৃষ্ণের ধাঁচে সম্পর্ক গড়া হয়েছে, তেমনি রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার স্বাদ।

‘তারপর বন্দিয়া যাও দেওয়ান মরার কথা।
শূন্যকারে আইসে দেওয়ান নৈরাকারে যায়
মরিলে যমের বান্দা উত্তর শিওর হয়।...’

এই চরণে গানের ভেতর শ্লোকের মধ্য দিয়ে আকাশের তারা ও পাতালের বালাকে উদ্দেশ করে দেওয়ান মরার কথা উল্লেখ করা হয়।

‘মাগো আদিগুরু বন্দি যাও শিক্ষাগুরুর পাওঁ
শিক্ষার গুরুর পাওঁ বন্দি, বন্দো জলনী বাপ মাও॥
মাও বন্দোঁ কোল ধরণী বাপ জন্ম দাতা।
শ্বশুর শাশুড়ী বন্দো তিন কুলের দেবতা॥
গাওনার গুরুর চরণ বন্দো হইয়া হরষিত।
তান্ চহর দিয়া গুরু শিক্ষা করার গীত॥
মাগো, বন্দনা করিতে মাগো আর নাই শকতি।
প্রণাম করি বন্দি যাও মা ভগবতী॥’

এই অংশ বাংলা গীতিধারার এক বিশুদ্ধ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ প্রতিফলন করে। সাধক-মনের আত্মসমর্পণ, গুরুপ্রেম ও মাতৃবন্দনার সম্মিলন এখানে ঘটেছে।

ঐতিহ্যবাহী এ গানের শেষাংশে আর একটি বন্দনামূলক অংশ রয়েছে, যা মধ্যযুগীয় সাধক কবি হেয়াত মামুদের ‘আম্বিয়া বাণী’ পুঁথির সঙ্গে তুলনাযোগ্য। এতে গুরু, মাতাপিতা, ঈশ্বর ও শিক্ষককে বন্দনা করা হয়েছে। এমন স্নিগ্ধ, ধার্মিক ও আত্মদায়ী ভাব বাংলা পুঁথি সাহিত্যেও দেখা যায়:

‘গরীব হুসেন বন্দো পীর ধোকড় পাশ্।
ছাড়িয়া উত্তর বস্ত্র ধোকড়া খোস্।’

চলমল সাধুর গান কেবল শ্রুতিগীতি নয়, এর মধ্যে রয়েছে নাট্যধর্মিতা, চরিত্রের মুখোমুখি সংলাপ, ছদ্মপরিচয় ও আত্মবিকাশ। একে সহজেই লোকনাট্য বা গীতিনাট্যরূপে কল্পনা করা যায়। রাধা-কৃষ্ণের রসায়নে ভরা এই কাহিনি লোকনাট্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ—মুখোমুখি আলাপ, প্রতিক্রিয়া, অনুরাগ ও পরিহাস ধারণ করে।

এই গানের কাঠামোতেও ভাওয়াইয়া ধারার কিছু গুণাগুণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন বিরহ, নদীপথ, যাত্রাপথের দৃষ্টান্ত এবং নারীর একাকিত্ব ও প্রার্থনা। ‘জল ভর সুন্দরী কইনা জলে দিয়া ঢেউ’ এই পঙ্‌ক্তিতে ভাওয়াইয়ার মতো করুণ ধ্বনি ও ঢেউখেলানো ছন্দ মেলে। এভাবে চলমল সাধুর গান হয়ে ওঠে একটি বহুমাত্রিক শিল্পকর্ম, যা কাব্য, সংগীত ও নাটকের সম্মিলনে রচিত।

বাংলার লোকসংগীত নিয়ে শিকড়সন্ধানী গবেষণার অভাবে এই সব লোকসংগীতকে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে কেউ কেউ। যেমনটা প্রায়ই ঘটেছে ভাওয়াইয়া গানের ক্ষেত্রে। অনেক লোকগবেষক এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন। আরেক পক্ষের মত, লোকগানের আবার কপিরাইট হয় কী করে? অবশ্য তা বলে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াও সংগত নয়। চলমল সাধুর এই গান তারই এক প্রাসঙ্গিক উদাহরণ, যা হাজার বছরের লোকস্মৃতি, ধর্মীয় আখ্যান এবং কাব্যিক সৌন্দর্য মিলে এক জাতীয় ঐতিহ্যে রূপান্তরিত হয়েছে।