নিবন্ধ
কবিতায় মেহনতি মানুষের মুখ
মেহনতি মানুষের শ্রম, ঘাম, বঞ্চনা ও স্বপ্ন—কবিতার ভেতরে খুঁজে পায় গভীর অনুরণন। কবিতায় প্রতিভাত হয়ে ওঠে সেসব মুখ, যারা ইতিহাস গড়ে, অথচ ইতিহাসে প্রায়ই অনুল্লিখিত থেকে যায়। মহান মে দিবসের প্রেক্ষাপটে এ রচনা
আদিম সমাজে মানুষের মধ্যে কোনো শ্রেণিভেদ ছিল না। মানবকুল তার অস্তিত্ব রক্ষার দুর্নিবার সংগ্রামে রত ছিল। গায়ে–গতরে বিরাজ করত জল-জঙ্গলের অগাধ গন্ধ আর প্রগাঢ় চিহ্নসকল। কপালে শোভা পেত জীবনসংশয়ে উদ্বিগ্ন গভীর চিন্তারেখা। ওই সমাজকে ইতিহাসে বলা হয় আদিম সাম্যবাদী সমাজ।
ক্রমে মানুষ সভ্য হয়েছে। প্রকৃতি ও চারপাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনেছে। বিয়েশাদি করতে শুরু করেছে। পরিবারপ্রথার পত্তন ঘটিয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা তৈরি হয়েছে। একপর্যায়ে মানুষ তৈরি করেছে গোত্র-সমাজ-রাষ্ট্রসহ বিচিত্র সব সংগঠন-সংস্থা-প্রতিষ্ঠান। এসবের ভেতর দিয়ে নাবালেগ মানবসম্প্রদায় বালেগ হয়েছে। এরই উপজাত হিসেবে আদিম সাম্যাবস্থা থেকে নানা অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক রূপান্তরের পথঘাট পেরিয়ে বর্তমানের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। মানবকুলে দেখা দিয়েছে বিচিত্র ভাগ-উপভাগ-বর্গ। এখন মানুষ বিভিন্ন রকম; ধনী-গরিব, সাদা-কালো, পূর্বি-পশ্চিমি, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-সাঁওতাল-ভিল-গারো; আরও হাজারে হাজার ফ্যাঁকড়া। আধুনিক যুগে মানুষকে যে বিচিত্র কিসিমে ভাগ করা হয় তারই এক কিসিমের নাম ‘মেহনতি মানুষ’। এই মানুষের প্রধান পরিচয় তারা মেহনত করে খায়।
কিন্তু একুশ শতকের পৃথিবীতে ‘মেহনতি মানুষ’ বললে শুধু পরিশ্রম করে খাওয়া মানুষকে বোঝায় না। এই নামবর্গের মধ্যে একটা ‘নিরীহ নিরীহ’ ব্যাপার আছে। আছে একটা ‘অবহেলা অবহেলা’ ব্যাপার। আর মেহনতি মানুষ বললেই পিলসুজের কথা মাথায় আসে, যে সভ্যতাকে আলোকিত করে নিজের গায়ে মেখে রাখে যত বর্জ্য আর কালিঝুলি।
কোনো কোনো তাত্ত্বিকের মতে ‘মেহনতি মানুষ’ একটি রাজনৈতিক বর্গ। কারণ, তারা একত্র হয়ে অনেক সময় অভাবিত সব কাণ্ডবাণ্ড ঘটিয়ে বসে। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের কথা বা এ রকম আরও নানা বিদ্রোহের কথা আমাদের জানা আছে। জানা আছে এসব ‘অঘটন’ নিয়ে রচিত নানা ইতিহাস ও সাহিত্যকর্মের কথা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই বর্গের মানুষেরা শিল্পসাহিত্যের চরিত্র, ইতিহাসের চরিত্র বটে; কিন্তু রচয়িতা খুব কমই। তাঁরা বর্ণিত ও চিত্রিত হন। বর্ণনা ও চিত্রিত করেন না।
আধুনিক বাংলা কবিতা উনিশ শতকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কবিতায় মেহনতি মানুষের মুখ উঠে আসতে সময় লাগে প্রায় এক শ বছর। কারণ, উনিশ শতকে বাংলায় যে ‘রেনেসাঁস’ ও ‘আলোকায়ন’ ঘটেছিল, তা মূলত বর্ণহিন্দু ও জমিদার শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। তাঁদের শ্রেণিচেতন কলমে শ্রমজীবী মানুষ সংগত কারণেই দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া খুব একটা উঠে আসেনি।
কিন্তু বিশ শতকের গোড়ার দিকে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী এই শ্রেণিটি অনেকটা যেন দল বেঁধে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল বাংলাসহ সারা পৃথিবীর সাহিত্যকর্মের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায়। এই শ্রেণিকে নিয়ে রচিত হতে থাকল অসংখ্য কাব্য-কবিতা। বাংলা কবিতায় বিশেষ গুরুত্বসহকারে মেহনতি মানুষের মুখ দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত। সেটা বিশ শতকের বিশের দশকের কথা।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মেহনতি মানুষ বেশ বড় জায়গা করে নিয়েছে। একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে খেটে খাওয়াদের তিনি উপস্থাপন করেছেন। মেহনতি মানুষদের নিয়ে লিখে উঠলেন প্রায় পুরো একটি কাব্যগ্রন্থ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মেহনতি মানুষের গুরুত্বের কথা নানা রচনায় নানাভাবে বলেছেন। তিনি জানতেন, ‘চাষি খেতে চালাইছে হাল/ তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল—/ বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার/তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।’ তিনি বলছেন, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,/ ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’ তবু তাঁর পক্ষে মেহনতি মানুষ নিয়ে লেখাটা খুব একটা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি তা চাননি। কারণ, ‘জীবনে জীবন যোগ করা/ না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।’ নিজে প্রয়োজনীয়ভাবে মেহনতি মানুষদের কবিতায় বিশেষভাবে স্থান দিতে না পারলেও তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ‘এইসব মূঢ়-মূক-ম্লান-মুখে দিতে হবে ভাষা’, এদের ‘বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা।’ এ জন্য তিনি আহ্বান করেছেন সেই কবির যিনি কৃষক-শ্রমিক-তাঁতি-জেলে ইত্যাদি মেহনতি মানুষের কথা বলবেন তাঁর কবিতায়। ঠাকুর বলছেন, ‘এসো কবি অখ্যাতজনের/নির্বাক মনের।’ তিনি ‘কৃষকের জীবনের শরিক যে জন’ সেই কবির বাণীর জন্য কান পেতে থাকার কথা বলেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মেহনতি মানুষ বেশ বড় জায়গা করে নিয়েছে। একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে খেটে খাওয়াদের তিনি উপস্থাপন করেছেন। মেহনতি মানুষদের নিয়ে লিখে উঠলেন প্রায় পুরো একটি কাব্যগ্রন্থ। সর্বহারা কাব্যের ‘কুলি-মজুর’, ‘কৃষাণের গান’, ‘ধীবরের গান’, ‘শ্রমিকের গান’, ‘সর্বহারা’ ইত্যাদি কবিতা এই শ্রেণির প্রতি তাঁর বিশেষ মনোযোগের স্মারক হয়ে আছে। এসব কবিতায় তিনি মেহনতি মানুষকে শুধু সহানুভূতির পাত্র করে তুলেছেন তা না—শোষকদের, আধিপত্যবাদীদের, পুঁজিদাসদের রুখে দিতে মেহনতি মানুষদের এক হতেও বলেছেন। বললেন, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা/ শুধিতে হইবে ঋণ।’ নজরুলের হিসাব খুব স্পষ্ট। শ্রমিকশ্রেণি ফাঁকির শিকার হয়; শ্রমশোষণের শিকার হয়। মেহনতি মানুষকে বেতন দেওয়াটাই শেষ কথা নয়। ন্যায্যতা বা ইনসাফটা আসল কথা। বলছেন, ‘বেতন দিয়াছ?—চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!/কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্?’ একই ধরনের প্রশ্ন আমরা আরও পরে সুকান্ত ভট্টাচার্যকেও তুলতে দেখব ‘রানার’ কবিতায়। সেখানে তিনি বলবেন, ‘জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।’ ফলে নজরুলের কবিতায় যে মেহনতি মানুষের রূপায়ণ ঘটেছে, তা নিছক মানবিক অনুভূতির উৎসারণ থেকে রূপায়িত হয়নি। এর সঙ্গে ওই সময় বাংলা অঞ্চলসহ সারা পৃথিবীতে সাধারণ মানুষের উত্থানের রাজনীতির একটা ঘনিষ্ঠ যোগ আছে বলে মনে হয়। মনে রাখতে হবে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বিপ্লব হচ্ছে আর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হচ্ছে ১৯২০ সালে।
বাংলাদেশের কবিতায় মেহনতি মানুষ সুভাষ-সুকান্তদের মেহনতি মানুষের মতো শ্রেণিরাজনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি বললেই চলে। এমনকি নজরুলের সঙ্গেও তুলনা করা যায় না। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাস আসলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাস।
নজরুলের পর সমর সেন, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কবির কবিতায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষদের স্থান ও অবস্থা আরও বেড়েছে ও স্পষ্ট হয়েছে। অন্তত শেষোক্ত দুই কবির আজীবনের যাবতীয় কাব্য-কবিতায় মেহনতি মানুষই মুখ্য হয়ে উঠেছে। বঞ্চিত ভাগ্যহত শ্রমজীবী মানুষেরা এঁদের কবিতায় শ্রেণিসংগ্রামের দুই পক্ষের একটা রাজনৈতিক শ্রেণিপক্ষ হয়ে উঠেছে। ‘মে-দিনের কবিতা’য় শ্রমজীবী মানুষদের উদ্দেশে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না/ প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;/ মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা আর না/পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।’ প্রায় একই ধরনের কথা বলছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘১লা মে-র কবিতা’য়। বলছেন, ‘কী হবে আর কুকুরের মতো বেঁচে থাকায়?/ কতদিন তুষ্ট থাকবে আর/ অপরের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট হাড়ে?/ মনের কথা ব্যক্ত করবে/ক্ষীণ অস্পষ্ট কেঁউ-কেঁউ শব্দে?/ ক্ষুধিত পেটে ধুঁকে ধুঁকে চলবে কতদিন?’ কবি বলেছেন, মেহনতি অথচ ক্ষুধিত মানুষদের ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এবং এখনই এর মোক্ষম সময়। মেহনতি মানুষকে কবি আর করুণ ও নিরীহ মুখাবয়বে যেন আঁকতে চাচ্ছেন না। কারণ, ‘লাল আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে’। আসলে বাংলা কবিতার চল্লিশের দশকটাই মূলত মেহনতি মানুষের দশক।
বাংলাদেশের কবিতায় মেহনতি মানুষ সুভাষ-সুকান্তদের মেহনতি মানুষের মতো শ্রেণিরাজনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি বললেই চলে। এমনকি নজরুলের সঙ্গেও তুলনা করা যায় না। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাস আসলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাস। এমনকি আজতক বাংলাদেশের রাজনীতি জাতীয়তাবাদী ভাবনার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্য কোনো রাজনীতি এখানে খুব একটা হালে পানি পায়নি।
জাতীয়তাবাদী তোলপাড়ের একটা প্রধান প্রবণতা এই যে তা বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণিকে বিশেষভাবে দেখতে পারে না। জাতীয়তাবাদী চেতনার চোখ সব সময় কিছুটা ঘোলাটে থাকে; ঘোরগ্রস্ত থাকে; অন্ধ থাকে; সার্বিকতায় ধাতস্থ থাকে। সবাইকে এক করে দেখার প্রবণতা এর মধ্যে এত তীব্র থাকে যে আলাদা করে মেহনতি মানুষকে সে দেখতে পায় না; দেখতে চায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ কবি গভীরভাবে এখানকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন এবং উদ্দীপিত হয়ে কবিতার পর কবিতা রচনা করেছেন। ফলে অধিকাংশ কবির কবিতায় মেহনতি মানুষকে রূপায়ণের প্রশ্নে বিশেষ কোনো শ্রেণিচরিত্র ধরা পড়ে না। কারণ, কবিদের কবিতায় আমরা দেখতে পাই যে, মেহনতি মানুষ মধ্যবিত্ত ও অন্যদের সঙ্গে একই অভীষ্টের দিকে ছোটে। তাদের কোনো শ্রেণি-অভিলক্ষ্য নেই। শামসুর রাহমান যখন ‘সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক’, ‘কেষ্টদাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা’, ‘মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি’, ‘রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা’র কথা বলেন তখন এদের শ্রেণিটা বোঝা যায়; কিন্তু আর কিছুই জানা-বোঝা যায় না। শ্রেণি-স্বরূপ তো নয়ই।
অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান অভিলক্ষ্যই ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তি ঘটানো। এ কারণে প্রতিটি মে দিবস আমাদের একটা বড় আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই জিজ্ঞাসার পুরোটায় থাকে এই কথা যে মেহনতি মানুষের দেশে মেহনতি মানুষ কত দূর এগোল! কেমন আছে তারা!
শ্রেণি-উত্তরণের কোনো বাসনা কবি বা এসব মেহনতি মানুষের কারও মধ্যেই দেখা যায় না। নিজের শ্রেণি নিয়ে যেন এদের বা কবির কোনো উদ্বেগ নেই। অনেকের সঙ্গে মিশে একাকার হতে পারার মধ্যেই যেন এসব মেহনতি মানুষের জন্য একটা শ্লাঘার ব্যাপার। আর কবির জন্য সফলতা যেন এই যে, তিনি এসব মেহনতি মানুষকে অন্য সবার সঙ্গে এক কাতারে এনে দাঁড় করাতে পেরেছেন। এ কারণে বাংলাদেশের কবিতায় একজনের বুকে গুলি লাগলে তা পুরো বাংলাদেশের বুককে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়।
তবু বাংলাদেশের কিছু কবির কবিতায় মেহনতি মানুষের কোলাহল লক্ষ করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজবাদী মনোভঙ্গি, উদার মানবতাবাদী মনোভাব আর নিজেদের কৃষক চৈতন্যের স্মৃতি কোনো কোনো কবির কবিতাকে মেহনতি মানুষের দিকে কখনো কখনো অন্যদের তুলনায় একটু বেশি হেলিয়ে রেখেছে। এই তালিকায় আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, দিলওয়ার, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহসহ আরও কেউ কেউ পড়বেন। তবে এ কথা বলতেই হবে, এঁদের কেউই মেহনতি মানুষকে কেন্দ্রে রেখে কাব্যচর্চা করেননি। মেহনতি মানুষকে তাঁদের সব কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে নেননি। এই শ্রেণিকে নিয়ে যাও-বা কবিতা রচনা করেছেন, সেসব কবিতার মধ্যেও তাঁদের সামগ্রিকতার দিকে ঝোঁক বেশি। সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার এই অংশ লক্ষ করা যাক— কুণ্ঠিত কৃষকের লুণ্ঠিত মজুরের/ লাঞ্ছিত শ্রমিকের বাঙলা/ জরামারীজীর্ণ ভাগ্য-বিদীর্ণ/ জেলে তাঁতি মাঝিদের বাঙলা।/ শোষিতের বাঙলা পতিতের বাঙলা/ পীড়িতের জননী বাঙলা/ ভিখারীর বাঙলা ভুখারীর বাঙলা/ অনাথের জননী বাঙলা।’ কবিতায় মেহনতি মানুষ আছে কিন্তু আছে সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে; বিশেষ হয়ে ওঠেনি। একই ব্যাপার স্বাধীনতার আগের বা পরের বাংলাদেশের অধিকাংশ কবির কবিতায়ও লক্ষ করা যাবে। তবে মেহনতি মানুষকে রাজনৈতিক বর্গ হিসেবে নিয়ে কবিতা লেখার প্রয়াস নির্মলেন্দু গুণের মধ্যে কিছুটা লক্ষ করা যায়। ‘বুঝি মজুরের কিষাণের হাতে/ ঝলমল করা খড়্গের,/ দিন আসে ঐ মাভৈঃ মাভৈঃ/ কাঁপে ঈশ্বর স্বর্গের।’ তার আগে চাই সমাজতন্ত্র, চাষাভূষার কাব্য–এর মতো কাব্য লিখলেও মনে রাখতে হবে এটি নির্মলেন্দু গুণের প্রধান কাব্যপ্রবণতা নয়।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে মূলত মেহনতি মানুষে সান্দ্র একটি ভূখণ্ড। এখানকার জনমানুষের এই কিছুকাল আগের ইতিহাসও কৃষক, জেলে, তাঁতি, কুমার-কামারের ইতিহাস। ঢাকার অধিকাংশ মানুষের পায়ের গোড়ালিতে এখনো নদী-বিল-ঝিলের কাদা লেগে আছে। দারিদ্র্য ও কম শিক্ষার কারণে এখানকার মানুষদের না পুঁছেছে কলকাতা না মর্যাদা দিয়েছে লাহোর-পিন্ডি। কিন্তু এখানকার এই মেহনতি মানুষেরাই মূলত আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকটে আজও সাধারণ মেহনতি মানুষই আত্মাহুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু এই মানুষের যথাযথ রূপায়ণ-মূল্যায়ন হয়নি। কাব্য-কবিতায়ও হয়নি, রাষ্ট্রের দর্শন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও খুব একটা মূল্যায়ন হয়নি। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান অভিলক্ষ্যই ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তি ঘটানো। এ কারণে প্রতিটি মে দিবস আমাদের একটা বড় আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই জিজ্ঞাসার পুরোটায় থাকে এই কথা যে মেহনতি মানুষের দেশে মেহনতি মানুষ কত দূর এগোল! কেমন আছে তারা!
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক