রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি ও নবাব সলিমউল্লাহ

২০০৫ সালের ৬ মে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত এই নিবন্ধ এত দিন শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে ছিল, আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো

প্রথম আলোর পুরোনো সংখ্যা অবলম্বনে গ্রাফিকস

শ্রেণিগত সামাজিক অবস্থানের কারণে ঢাকার নবাবদের সঙ্গে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের হৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল উনিশ শতক থেকেই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) ও নবাব আহসানউল্লাহর (১৮৪৬-১৯০১) জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ যখন ১৮৯৮–তে ঢাকায় আসেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগ দিতে, তখন নবাবদের আতিথ্য গ্রহণ করলেও খাজা সলিমউল্লাহর (১৮৭১-১৯১৫) সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় ছিলেন অল্প সময়, মাত্র দু-তিন দিন। রবীন্দ্রনাথ ও সলিমউল্লাহ উভয়েই তখন উপমহাদেশব্যাপী বিখ্যাত নন: রবীন্দ্রনাথ কবি ও গল্প উপন্যাসের লেখক হিসেবে খ্যাতিমান সাহিত্যসমাজে, সাধারণের মধ্যে তত নন; সলিমউল্লাহ সরকারি চাকুরে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ময়মনসিংহে পোস্টিং। সারা দেশে তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল না।

১৮৯৮ সালে কংগ্রেসও কোনো বিরাট গণসংগঠন নয়—রাজা-মহারাজা, উকিল-ব্যারিস্টার, বিত্তশালী-অভিজাত শ্রেণির এক সমিতি মাত্র। মুসলিম লীগের জন্মই হয়নি। উচ্চ শ্রেণির মুসলমানরাও কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকার নবাব পরিবারের কেউ কেউ কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। কংগ্রেস, রবীন্দ্রনাথ ও সলিমউল্লাহ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের মধ্যে। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই মুসলিম লীগেরও জন্ম।

বঙ্গভঙ্গের সময়ই রবীন্দ্রনাথ ও সলিমউল্লাহ উভয়েই জনজীবনে বিশেষ করে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঘটনা একটি, পরিস্থিতি একই কিন্তু দুজনের অবস্থান দুই দিকে। একজন বঙ্গভঙ্গের পক্ষের প্রধান নেতা, অন্যজন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে রাজপথের মিছিলে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নতুন প্রদেশ গঠনের বিরোধিতা করে কবি বক্তৃতা করছেন, প্রবন্ধ লিখছেন, মিছিল করছেন, প্রতিবাদ সমাবেশে গাইছেন গান: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ যাঁরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছেন, তাঁরাও তাঁদের সোনার বাংলাকে ভালোবেসেছেন। উভয় দিকের ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না; কিন্তু তাঁদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন।

বঙ্গভঙ্গের সময়ই রবীন্দ্রনাথ ও সলিমউল্লাহ উভয়েই জনজীবনে, বিশেষ করে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঘটনা একটি, পরিস্থিতি একই; কিন্তু দুজনের অবস্থান দুই দিকে। একজন বঙ্গভঙ্গের পক্ষের প্রধান নেতা, অন্যজন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে রাজপথের মিছিলে।

প্রশাসনিক প্রয়োজনে বঙ্গ বিভক্ত করায় ‘বাঙালিত্ব গেল’ বলে ধনী হিন্দুদের ভেতর থেকে যে ধ্বনি ওঠে, তার পেছনে কোনো যুক্তি ছিল না। কোনো এলাকা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা, জেলা ও বিভাগে যদি ভাগ করা যায়, তাহলে প্রদেশে—এক বা একাধিক প্রদেশে ভাগ করলে অন্যায় কোথায় এবং সেই ভাগের পক্ষে যদি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন থাকে? গোটা উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশের অধীন, তাদের জবরদখল থেকে দেশ উদ্ধারের কথা না বলে, একটি বিশাল প্রদেশকে দুটি প্রদেশে ভাগ করা হলো; আর তা নিয়ে জীবন-মরণ আন্দোলন শুরু করার পেছনে শক্ত কোনো যুক্তি নেই, ভাবাবেগ থাকতে পারে; আর থাকতে পারে বিশেষ স্বার্থচিন্তা। পূর্ববঙ্গ ও আসামকে গভর্নর জেনারেল কার্জন ভারত থেকে আলাদা করে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দেননি, পূর্ববঙ্গের মানুষ স্বাধীনতা চায়ওনি, একটি নতুন প্রদেশে রূপান্তরিত হয়েছিল মাত্র।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ সেই বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে অনেক খ্যাতিমান হিন্দু নেতার সঙ্গে পুরোভাগে ছিলেন মাত্র বছর তিনেক, তারপর তিনি হিংসাত্মক রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, কিন্তু থেকে যান বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষেই। তবে একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে তাঁরা থাকলেও জমিদার ও অভিজাত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জমিদার ও নবাব খাজা সলিমউল্লাহর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক শুধু নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ। তার কারণ আগেই বলেছি, তাঁদের শ্রেণিগত অবস্থান ও অভিন্ন সামাজিক মর্যাদা। অর্থনৈতিক বিন্যাসে ও আভিজাত্যে তাঁরা ছিলেন প্রায় সমান্তরাল; কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন দুই সংস্কৃতির প্রতিনিধি। তা সত্ত্বেও তাঁদের আদর্শগত ও সাংস্কৃতিক অবস্থান যা-ই হোক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল চমত্কার।

প্রশাসনিক প্রয়োজনে বঙ্গ বিভক্ত করায় ‘বাঙালিত্ব গেল’ বলে ধনী হিন্দুদের ভেতর থেকে যে ধ্বনি ওঠে, তার পেছনে কোনো যুক্তি ছিল না। কোনো এলাকা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা, জেলা ও বিভাগে যদি ভাগ করা যায়, তাহলে এক বা একাধিক প্রদেশে ভাগ করলে অন্যায় কোথায় এবং সেই ভাগের পক্ষে যদি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন থাকে?

ঠাকুরদের সঙ্গে খাজাদের ব্যক্তিগত ভালো সম্পর্কের একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের কয়েকটি জেলা সফর করেন। ঢাকায় রবীন্দ্রনাথকে আতিথেয়তা দেওয়ার জন্য বিশিষ্ট ও বিত্তশালী হিন্দুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, কিন্তু কবি বঙ্গভঙ্গবিরোধী নবাবদেরই আতিথ্য গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, নবাবদের চেয়ে বড় ও অভিজাত ঢাকায় আর কেউ নেই, বলধার জমিদারও নয়। কোনো হিন্দু জমিদারের বাসভবন কিংবা সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলোতে অবস্থান করার চেয়ে নবাবদের, সলিমউল্লাহর বংশধরদের বজরায়, বুড়িগঙ্গায় থাকাই তিনি পছন্দ করেন। তা নিয়ে ঢাকার ধনী হিন্দুদের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ পায়; কিন্তু কবি তাতে কর্ণপাত করেননি।

বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১-তে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মনে তখনো ঘা দগদগ করছে। সলিমউল্লাহর মন ভেঙে যাওয়ায় গভীর হতাশায় তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তখন তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য কাজ করছিলেন। বঙ্গভঙ্গ বাতিলের দুই বছরের মধ্যে ১৯১৩-তে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। কলকাতার মূলধারার হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেই তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়: এক দল আনন্দিত, আরেক দল অসন্তুষ্ট, কেউ উল্লসিত, কেউবা বিরক্ত। এর কয়েক মাস আগে সলিমউল্লাহর এক পুত্র মারা যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। ডায়াবেটিসের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল আগেই। আক্ষরিক অর্থেই তখন তিনি শয্যাশায়ী; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সংবাদ শুনে তিনি খুবই খুশি হন। নবাব কবিকে অভিনন্দন জানিয়ে শুধু যে তারবার্তা পাঠান, তা–ই নয়, কবির অনুপস্থিতিতেই এক অভিনন্দন সভারও আয়োজন করেন এবং সেই অনুষ্ঠানের আংশিক ব্যয়ও তিনি বহন করেন।

যে সংগঠনের নামে অভিনন্দন সভার আয়োজন করা হয়, সেটি হলো ‘ঢাকা সাহিত্য পরিষদ’, যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নবাব সলিমউল্লাহ। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের অনুকরণে ‘ঢাকা সাহিত্য পরিষদ’ গঠিত হয় ১৯১২ সালে ‘মাতৃভাষার সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধন করার’ উদ্দেশ্যে। ‘মাতৃভাষানুরক্ত শিক্ষিত ব্যক্তিদের দ্বারা’ প্রতিষ্ঠিত হলেও উর্দুভাষী নবাব সলিমউল্লাহ হলেন এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সংগঠনের ঘোষণায় বলা হয়েছিল: ‘নানা উপায়ে বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যের অনুশীলন ও উন্নতির জন্য প্রযত্নই এই সভার উদ্দেশ্য।’ পরিষদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘ঢাকাবাসীর সাহিত্যানুরক্তি’ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা।

রবীন্দ্রনাথকে কলকাতার কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের একটি দল শান্তিনিকেতনে এসে সংবর্ধনা দেন ২৩ নভেম্বর। সেই সংবর্ধনায় কবির ঝাঁজালো বক্তব্য নিয়ে কিছুদিন খুব হইচই হয়। ঢাকার অভিনন্দন সভাটি ঢাকা জজকোর্ট প্রাঙ্গণে বার লাইব্রেরির সামনে অনুষ্ঠিত হয় ২৬ নভেম্বর সলিমউল্লাহর সভাপতিত্বে। তখন তিনি এতটাই অসুস্থ যে দাঁড়িয়ে কথা বলার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ইংরেজিতে, মাঝেমধ্যে উর্দু মিশিয়ে সভাপতির ভাষণ তিনি বসে বসেই দেন।

ঢাকা সাহিত্য পরিষদের প্রথম সভাপতি ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যাপক বিধুভূষণ গোস্বামী এবং প্রথম সহসভাপতিত্রয় হলেন ঢাকার পাবলিক প্রসিকিউটর শরত্চন্দ্র ঘোষ, ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ভূপতিনাথ দাস ও অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্পাদক ছিলেন ভূপালকুমার দত্ত এবং সহসম্পাদক নলিনীকান্ত ভট্টশালী। উর্দু লেখক হাকিম হাবিবুর রহমানও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রায় ৪০০ সাধারণ সদস্যের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর, ফরিদউদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, আবদুল হাকিম বিক্রমপুরী প্রমুখ। আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে পরিষদের পৃষ্ঠপোষক যাঁদের করা হয়েছিল, তাঁরা হলেন নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়, দিঘাপতিয়ার মহারাজা গিরিজানাথ রায়, সন্তোষের মহারাজা প্রমথনাথ রায়, ভাওয়ালের রাজকুমার রবীন্দ্রনারায়ণ রায় ও কাসিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী। জীবনসদস্যদের মধ্যে ছিলেন মুড়াপাড়ার জমিদার কেশবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মুক্তাগাছার জমিদার গোপালচন্দ্র আচার্য্য ও ধানকোড়ার জমিদার হেমচন্দ্র রায়। এসব বিখ্যাত ‘মহারাজা’ ও বড় বড় ভূস্বামী অতি সামান্যই চাঁদা দিয়েছেন, পরিষদের সিংহভাগ ব্যয় বহন করতেন সলিমউল্লাহ। পরিষদের মাসিক মুখপত্র ‘প্রতিভা’র প্রথম সম্পাদক ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ সেন।

নবাব খাজা স্যার সলিমুল্লাহ (১৮৭১–১৯১৫)
ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথকে কলকাতার কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের একটি দল শান্তিনিকেতনে এসে সংবর্ধনা দেন ২৩ নভেম্বর। সেই সংবর্ধনায় কবির ঝাঁজালো বক্তব্য নিয়ে কিছুদিন খুব হইচই হয়। ঢাকার অভিনন্দন সভাটি ঢাকা জজকোর্ট প্রাঙ্গণে বার লাইব্রেরির সামনে অনুষ্ঠিত হয় ২৬ নভেম্বর সলিমউল্লাহর সভাপতিত্বে। তখন তিনি এতটাই অসুস্থ যে দাঁড়িয়ে কথা বলার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ইংরেজিতে, মাঝেমধ্যে উর্দু মিশিয়ে সভাপতির ভাষণ তিনি বসে বসেই দেন।

বিধুভূষণ গোস্বামী বাংলায় মানপত্র পাঠ করেন। তারপর ঢাকা কলেজের অধ্যাপক এবং সেকালের ঢাকার সবচেয়ে খ্যাতিমান সাহিত্যসমালোচক কামিনীকুমার সেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। স্থানীয় পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী কামিনী সেন ‘রবিবাবুর প্রতিভা সম্বন্ধে এক সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ’ করেন। প্রবন্ধটি পরে ‘প্রতিভা’য় প্রকাশিত হয়।

এই অনুষ্ঠানের কয়েক মাস আগে রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যাপক হয়ে আসেন। এসেই তিনি ঢাকা সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন, এর মাসিক অধিবেশনগুলোতে যোগদান করতেন। তাঁর মতো ইতিহাসবিদ এই পরিষদে আরও কয়েকজন ছিলেন, তাঁরা হলেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী, সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর, পুরাতত্ত্ববিদ বীরেন্দ্রনাথ বসু ঠাকুর, হাকিম হাবিবুর রহমান, প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার অনুকূলচন্দ্র সরকার, পুরাতত্ত্ববিদ উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ প্রমুখ। রবীন্দ্র-অভিনন্দন সভায় রমেশচন্দ্র মজুমদার ‘কবির প্রতিভার বিশ্লেষণ করতঃ এক সারগর্ভ বক্তৃতা প্রদান’ করেছিলেন। বিস্ময়ের ব্যাপার, ওই স্মরণীয় অনুষ্ঠান ও সভা সম্পর্কে ড. মজুমদার কখনো কিছু লেখেননি।

সলিমউল্লাহ তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি-প্রতিভার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, ‘পেইড রিচ ট্রিবিউটস টু দ্য গ্রেটেস্ট পোয়েটিক্যাল জিনিয়াস অভ মডার্ন ইন্ডিয়া।’ রবীন্দ্রনাথকে তিনি হিন্দু কবি হিসেবে না দেখে বাংলাভাষী সবার ও ভারতবর্ষের মানুষের কবি হিসেবেই আখ্যায়িত করেন। সলিমউল্লাহ নিজেকে বলতেন ‘রক্ষণশীল মুসলমান’, মুসলমানদের উন্নতির জন্য চেষ্টা করতেন, পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক অধিকারের কথা বলতেন; কিন্তু তিনি পরবর্তীকালের মুসলিম লীগারদের মতো একেবারেই হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন না। তাই তাঁকে বলতে শুনি: ‘…দ্য মুসলমানস অব ইস্ট বেঙ্গল সাপোর্টেড দ্য পার্টিশন, নট আউট অব এনমিটি টু আওয়ার হিন্দু ব্রাদারেন অর অ্যাট দ্য বিডিং অব গভর্নমেন্ট, বাট বিকজ উই ফেল্ট শিওর দ্যাট দ্য নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যারেঞ্জমেন্টস ইন ইস্ট বেঙ্গল উড অ্যাফোর্ড আস অ্যাম্পল অপরচুনিটিজ ফর সেলফ ইমপ্রুভমেন্ট।’ অর্থাৎ মুসলমানরা পার্টিশন সমর্থন করেছিল আমাদের হিন্দু ভাইদের প্রতি বৈরিতাবশত নয় অথবা সরকারের নির্দেশেও নয়; বরং আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা পূর্ববঙ্গের আত্মোন্নতিতে পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এক শ বছর আগে হিন্দু-মুসলমান স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে মতপার্থক্য ছিল, তা নিয়ে পৃথকভাবে দুই সম্প্রদায়ের নেতারা সংগ্রাম করেছেন, স্বসম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা অথবা আন্দোলন করেছেন; কিন্তু তারা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেননি। সেকালের রাজনীতিক ও সমাজসংস্কারকদের কেউ-ই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ছিলেন না। তাঁরা প্রায় সবাই প্রথমে স্বসম্প্রদায়ের স্বার্থের কথা আগে বিবেচনা করেছেন; কিন্তু অনেকেই অন্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিলেন না। তাঁর সমসাময়িক হিন্দু নেতাদের মতো সলিমউল্লাহ তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের যাঁরা শিক্ষা ও সম্পদসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে ছিল পিছিয়ে, উন্নতির ব্যাপারে ভেবেছেন এবং কাজ করেছেন। তিনি সম্ভ্রান্ত অথচ দরিদ্র হিন্দুদের গোপনে অর্থ দান করেছেন, মসজিদ-দরগার জন্য যেমন অর্থ দিয়েছেন, তেমনি মন্দির ও আশ্রমের জন্য নিয়মিত অনুদান দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পর সলিমউল্লাহ যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা থেকে আজকের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতাদের একটি বড় শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপার রয়েছে। তা হলো ভিন্ন মতাবলম্বী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আনন্দের ও বেদনার সংবাদে আন্তরিকভাবে এগিয়ে যাওয়াই সংস্কৃতিমান ও উঁচু স্তরের মানুষের কর্তব্য।