কালের কণ্ঠস্বর কালোত্তীর্ণ কবি

নিজের সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছিলেন। মার্ক্সবাদী চেতনা, মানবিক সংবেদনা ও নিজস্ব কাব্যভাষায় তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক অনন্য নন্দন। জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর কালের কবিতা কীভাবে কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫ আগস্ট ১৯২৬—১৩ মে ১৯৪৭)। প্রতিকৃতি: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সুকান্ত ভট্টাচার্য হঠাৎ আবির্ভূত কোনো কবি নন। বাংলা কবিতার স্বাভাবিক বিকাশের ধারায় তাঁর আবির্ভাব ঘটেছে। তিনি অভিনব নন, কিন্তু সাধারণও নন। সুকান্ত অসাধারণ এই অর্থে যে তিনি তাঁর কালের কণ্ঠস্বরকে অভিনব ভাষায় গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন। জনগোষ্ঠীর ভেতরে গুমরে ওঠা বাণী ও নন্দনকে কবিতায় অব্যর্থভাবে ধারণ করে তিনি অনন্য হয়ে উঠেছিলেন। বড় কবির কাজ আসলে তা–ই। এই লেখায় আমরা বুঝতে চাইব সুকান্ত ভট্টাচার্য কোন প্রেক্ষাপটে বাংলা কবিতায় কোন বিশেষ অবদান রেখে বড় কবির তকমা অর্জন করলেন।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলা কবিতার মেজাজ দ্রুত বদলাতে থাকে। বদলে যেতে থাকে জীবনকে দেখার ভঙ্গি, উচ্চারণ, ভাষা—সবকিছু। গত শতাব্দীর সঙ্গে নতুন কবিতার সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। নতুন শতাব্দীর নতুন যুগের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নন্দনতাত্ত্বিক বাহাসগুলোর দিকে চোখ রাখলে ব্যাপারটা সহজেই বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ তিরিশের দশকের কবিদের নন্দনকে খুব ভালোভাবে নিতে পারেননি। কারণ, বাংলা কবিতার নন্দন ইতিমধ্যে রবীন্দ্রযুগ পার হয়ে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে; পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে জীবনকে দেখার চোখ ও মনোভাব। ব্যাপারটা ভালো বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের ওই সময়ের কাব্য-কবিতাকে পাশাপাশি রাখলে। এটা আসলে যুগান্তরের ভিন্নতা বৈ অন্য কিছু নয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতার রবীন্দ্র-পরবর্তী এই রূপান্তরশীলতার দ্বিতীয় প্রজন্মের কবি। প্রথম প্রজন্মের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তিরিশের কবিরা।

বাংলা কবিতার রবীন্দ্রোত্তর যুগের পরিবর্তন বুঝতে হলে বিশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক রূপান্তরটা বোঝা খুব জরুরি। কারণ, বাংলা অঞ্চলের রাজনীতি বিশ শতকে লাফিয়ে লাফিয়ে বদলাতে থাকে। এ সময় থেকেই বাংলার রাজনীতি পুরোপুরি না হলেও ক্রমে ইংরেজের হাত ফসকাতে শুরু করে। আগের ‘সরলতায়’ বাংলা শাসনের জায়গা থেকে ইংরেজ শাসকেরা ক্রমাগত সরে আসতে বাধ্য হয়। গ্রামবাংলায় কোনো মানুষ বেশি জটিল হলে তাকে ‘ব্রিটিশ’ বলা হয়। বাংলা অঞ্চলে এই ‘ব্রিটিশ’ রাজনীতির দেখা মিলতে থাকে বিশ শতক থেকেই।

জটিল ‘ব্রিটিশ’ রাজনীতির পাশাপাশি বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধিতার সূত্র ধরে ‘পিপলের’ উত্থান ঘটতে থাকে। স্বদেশি আন্দোলন, অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের তৎপরতা শুরু হয় বিশ শতকের গোড়ার দিকেই। দ্বিতীয় দশকের একেবারে গোড়ার অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন এই অঞ্চলে ‘পিপলের’ উত্থান আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এসব দেশীয় ব্যাপার। ভিনদেশি ব্যাপারও আছে। এর মধ্যে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ঘটে যায় সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘বলশেভিক বিপ্লব’। এই বিপ্লব পৃথিবীর আনাচে–কানাচে গণমানুষের উত্থানের পথকে আরও ত্বরান্বিত করে। বাংলা অঞ্চল এর বাইরে থাকেনি। বিশের দশকের গোড়া থেকেই বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা দেখা দিতে থাকে। এই দশকের মাঝামাঝিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুকান্ত ভট্টাচার্য
ছবি: সংগৃহীত
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠ সদস্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতা নজরুলের মতো গরিবের জন্য সহানুভূতি বা উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সব মিলিয়ে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে বাংলার মানুষের, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মনস্তত্ত্বে, রুচিতে ও চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সংগত কারণেই এই সময়ের মানুষ আর উনিশ শতকের মানুষের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য সূচিত হয়।

জাতীয় জীবনের পরিবর্তন কবিতায় অনূদিত হবে না তা হতেই পারে না। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এই পরিবর্তনকে প্রথম সার্থকভাবে ধারণ করে। নজরুল মূলত বাংলা কবিতার নতুন যুগের নতুন মানুষের নতুন নন্দনরুচির নকিব। তাঁর মূল ধারার কবিতায় যে বহু মানুষের শোরগোল, নৈরাজ্য, স্বাধীনতার তীব্র স্পৃহা—এই সবকিছুর মূলে আছে ওই যুগের মনস্তত্ত্ব। এই সময়ে সাম্যের ব্যাপারটা এত বেশি আলোচিত হতে থাকে যে ১৯২৫ সালেই নজরুল লিখে ফেলেন সাম্যবাদী নামে একটি পুরো কাব্যগ্রন্থ। মেহনতি মানুষদের নিয়ে ১৯২৬ সালে লেখেন সর্বহারা নামে আরেকটি পুরো কাব্যগ্রন্থ।

তবু নজরুলকে আমরা মার্ক্সিস্ট কবি বলি না। তিনি আসলে রুশ বিপ্লব, ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন এবং উদার মানবতাবাদী চেতনার এক দুর্লভ সংঘট্ট। তবে বাংলা কবিতার নজরুল-পরবর্তী প্রজন্মের মার্ক্সিস্ট অধিকাংশ কবিই নানাভাবে নজরুলের কাছে ঋণী এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলা কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য নজরুলের পথরেখা ধরেই আবির্ভূত হয়েছেন। নজরুলের কাছে তাঁর ঋণ আছে। তবে নজরুল ও সুকান্তের মধ্যে পার্থক্যও আছে। প্রথম পার্থক্য রাজনৈতিক মতাদর্শের। দ্বিতীয় পার্থক্য নন্দনের। রাজনৈতিক মতাদর্শই সুকান্ত ও নজরুলের কবিতার মধ্যকার নন্দনতাত্ত্বিক পার্থক্য সূচিত করেছে। নজরুলের কাব্যজীবনের শুরুতে যে কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তার বিকাশ ও মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেড়ে ওঠার সময়ে। ফলে সুকান্ত ও নজরুল ভিন্ন হতে বাধ্য।

সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠ সদস্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতা নজরুলের মতো গরিবের জন্য সহানুভূতি বা উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সুকান্তের কবিতা খুবই শ্রেণিসচেতন এবং সেই মোতাবেক নন্দনসচেতন। তিনি কবিতা শুরুই করেছেন অঙ্গীকার দিয়ে। বলেছেন, ‘চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/ এ-বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

সুকান্তের কবিতা খুব সুস্পষ্টভাবে শ্রেণিসচেতন। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতায় শোষক-শোষিত, শত্রু-মিত্র খুবই স্পষ্ট। এই সম্পর্কের ভেদরেখা ও কার্যকারণ তাঁর প্রতিটি কবিতায় প্রখরভাবে জারি থাকে। তিনি মানবতাবাদী। কিন্তু পশ্চিমি অর্থে ‘উদার মানবতাবাদী’ নন। তাঁর কবিতায় ছোপ ছোপ রক্ত থাকে; বিপ্লবী রক্ত। হাহাকার থাকে; বঞ্চিত মানুষের হাহাকার।

সুকান্ত কবিতায় শুধু অঙ্গীকার করেননি। তিনি পুরোনো নন্দনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি অল্প বয়সে টের পেয়েছিলেন যে পুরোনো যুগের জীবনদৃষ্টি ও কাব্যভাষা নতুন যুগের সমস্যাকে ধারণ করতে পারবে না। ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সুকান্তের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের প্রতি সুকান্তের মুগ্ধতা কম নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,/ প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,/ এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি...।’ কিন্তু সুকান্ত খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাঁর ও তাঁর যুগের বাস্তবতা এবং রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের যুগের বাস্তবতা এক নয়। সুকান্ত বলেছেন, ‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,/ প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।/ আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,/ আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,/ আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে,/ আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।/ তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/ “শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।”/ তাই আমি চেয়ে থাকি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/ দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।’

সুকান্ত রবীন্দ্রনাথকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর পুনরায় আবির্ভাবও প্রত্যাশা করেন। কিন্তু আগের রবীন্দ্রনাথকে তিনি চান না। দেখতে চান নতুন রবীন্দ্রনাথকে। কবির ভাষায়, ‘এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে, কণ্ঠে গণসংগীতের সুর;/ জনতার পাশে পাশে উজ্জ্বল পতাকা নিয়ে হাতে/ চলুক নিন্দাকে ঠেলে, গ্লানি মুছে আঘাতে আঘাতে।’

সুকান্তের কবিতা খুব সুস্পষ্টভাবে শ্রেণিসচেতন। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতায় শোষক-শোষিত, শত্রু-মিত্র খুবই স্পষ্ট। এই সম্পর্কের ভেদরেখা ও কার্যকারণ তাঁর প্রতিটি কবিতায় প্রখরভাবে জারি থাকে। তিনি মানবতাবাদী। কিন্তু পশ্চিমি অর্থে ‘উদার মানবতাবাদী’ নন। তাঁর কবিতায় ছোপ ছোপ রক্ত থাকে; বিপ্লবী রক্ত। হাহাকার থাকে; বঞ্চিত মানুষের হাহাকার। কিন্তু এই বঞ্চিত মানুষ অসহায় নয়। তারা প্রতিরোধে দীপ্তিমান, যূথবদ্ধ ও সংগ্রামী। এত স্পষ্ট শ্রেণিসচেতন কবিতা সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কেউ তখনো রচনা করে উঠতে পারেননি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মার্ক্সিস্ট কবিতা হিসেবে বাংলা কবিতাকে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। জীবনবোধে আর কাব্যিক উচ্চারণে তিনি সার্বক্ষণিক মার্ক্সিস্ট কবি। কিন্তু এ কথাও সত্য যে তাঁর কবিতা যথেষ্ট ‘যান্ত্রিক এবং তত্ত্বশাসিত’ বলে অনেকে মনে করেন। কবিতায় মানবিক আবেগ সঞ্চারের প্রতি সুভাষের ঝোঁক খুবই কম। তিনি চিত্র ও চিত্রকল্প তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত অভিনিবেশ তাঁর মধ্যে কম।

কবিতা লিখতেন, কিন্তু কম বয়সে মারা গিয়েছেন এমন কবির সংখ্যা বিশ্বসাহিত্যে ও বাংলা সাহিত্যে কম নেই। মহাকালের রীতি এই—সে কাউকে ছাড় দেয় না। সে করুণা-বেদনাহীন, নির্মম। প্রকৃত অবদান ছাড়া ইতিহাসে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু টিকে নেই, তাঁকে ছাড়া বাংলা কবিতার ইতিহাস পূর্ণতা পায় না।

কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগ-সংরাগ নিয়ে উপস্থিত থাকেন। আহত হন, রক্তাক্ত হন, ক্ষুব্ধ হন, প্রতিবাদী হন। কবিতার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন খুবই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তিনি বিপ্লবে এবং শোষিত মানুষের কাতরানির মধ্যে সমানভাবে উপস্থিত থাকেন। কবিতায় সুকান্তের সহৃদয় মানবিক উপস্থিতির সঙ্গে নজরুলের একটা উত্তরাধিকার কাজ করেছে বলে মনে হয়। আর শ্রেণিসংগ্রামের মনোভাবের রূপায়ণের প্রশ্নে তিনি পূর্ববর্তী মার্ক্সবাদী কবিদেরই সগোত্র। কিন্তু এই দুয়ের মিশেলে যে সুকান্ত, তিনি বাংলা কবিতায় অনন্য।

সুকান্ত কেবল ব্যক্তিগত সংরাগ আর মার্ক্সীয় চিন্তারীতির অপূর্ব সংঘট্টের কারণে বাংলা কবিতায় বিশেষ হয়ে আছেন তা নয়। মার্ক্সীয় কবিতাধারায় তাঁর নিজস্ব একটা অবদানের কারণেও বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অবদানটি হচ্ছে, তিনি মার্ক্সীয় কবিতার ধারায় বেশ কিছু নতুন ও নিজস্ব প্রতীক নির্মাণ করেছেন। এই অভিনব প্রতীক নির্মাণের ব্যাপারটা এত খাঁটি যে বাংলা কবিতায় তাঁর পরে আর কোনো কবি এই মৌলিকত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। ‘চারাগাছ’, ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’, ‘আগ্নেয়গিরি’, ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘চিল’, ‘অঙ্কুরিত বীজ’ ইত্যাদি বহু মৌলিক প্রতীক নির্মাণ করেছেন। এসব শব্দের মধ্যে এত কাব্যসম্ভাবনা আর মার্ক্সীয় চিন্তা আকরিত হয়ে ছিল তা সুকান্তই প্রথম উদ্ঘাটন করেন। এই প্রতীকগুলোর কাব্যিক নির্মাণপ্রক্রিয়া লক্ষ করা যাক ‘দেশলাই কাঠি’ নামের একটি কবিতা থেকে— ‘আমি একটি ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি/ এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না:/ তবু জেনো/ মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—/ বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস:/ আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।’

সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যকীর্তি এ জন্যও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে মনে করেন, তিনি অকালমৃত্যুর কারণে এক ধরনের ছাড় পান। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। কবিতা লিখতেন, কিন্তু কম বয়সে মারা গিয়েছেন এমন কবির সংখ্যা বিশ্বসাহিত্যে ও বাংলা সাহিত্যে কম নেই। মহাকালের রীতি এই—সে কাউকে ছাড় দেয় না। সে করুণা-বেদনাহীন, নির্মম। প্রকৃত অবদান ছাড়া ইতিহাসে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু টিকে নেই, তাঁকে ছাড়া বাংলা কবিতার ইতিহাস পূর্ণতা পায় না। কারণ, তিনি একটা কালের কণ্ঠস্বরকে অনুবাদ করেছিলেন ওই সময়ের আধুনিক একটা কাব্যভাষায়। বাংলা কবিতার বাঁকবদলে অন্যতম প্রধান হিসেবেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে মানুষ যত দিন অসহায় হতে থাকবে, শোষিত হতে থাকবে, সুকান্ত তত দিন বহাল ও প্রাসঙ্গিক থাকবেন বলে মনে করি।