কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) মূলত প্রাবন্ধিক না হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা লিখেছিলেন, যার প্রতিটি অত্যন্ত মৌলিক চিন্তাভাবনার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর প্রবন্ধের সংকলন কবিতার কথা প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৫৬ সালে। এতে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত ১৫টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধগুলো বহুল পঠিত। এই বিখ্যাত ১৫টি প্রবন্ধের বাইরেও জীবনানন্দের আরও কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সমালোচনা রয়েছে, যার কিছু প্রকাশিত, কিছু অপ্রকাশিত—কিছু খসড়াপর্যায়ী। এই রচনাসমষ্টির সংখ্যা সর্বসাকল্যে কত, তা নিশ্চিত জানা নেই। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনাক্রমে প্রতীয়মান হয় ইতিমধ্যে অধিকাংশেরই হদিস করা গেছে।
১৯৫৪ সালের অক্টোবরে কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় জীবনানন্দর অকালমৃত্যু হয়। মৃত্যু–পরবর্তীকালে জীবনানন্দর বোন সুচরিতা দাশ (১৯১৫-১৯৮০) ও জীবনানন্দর বিশেষ অনুরক্ত তরুণ কবি ভূমেন্দ্র গুহ (১৯৩৩-২০১৫) কবিতার কথা গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন। গ্রন্থের প্রচ্ছদনাম নির্বাচন করেছিলেন জীবনানন্দর অনুজ অশোকানন্দ দাশ (১৯০১-২০০৩)। তৎকালীন কলকাতার সবচেয়ে অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা সিগনেট প্রেস গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল। কবিতার কথা গ্রন্থটিতে তাঁর জীবদ্দশায়, ১৩৪৫ (১৯৪৩ সার) থেকে ১৩৬০ বঙ্গাব্দ (১৯৫৩ সাল) এই কালপরিসরে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত ১৫টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছিল। গ্রন্থটির জন্য কেবল কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধগুলো নির্বাচন করা হয়েছিল, অন্যান্য প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা পরবর্তীকালের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, কবির মৃত্যুর পর কলকাতার ময়ূখ পত্রিকা ‘জীবনানন্দ স্মৃতি সংখ্যায়’ (১৩৬১-৬২ বঙ্গাব্দ) প্রথম কবির অগ্রন্থিত প্রবন্ধাদির একটি তালিকা প্রকাশ করে। এতে ময়ূখ পত্রিকার অন্যতম কান্ডারি, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, কবিযশঃপ্রার্থী ভূমেন্দ্র গুহর বিশেষ অবদান ছিল। বোধগম্য কারণেই তালিকাটি ছিল অসম্পূর্ণ। এ ছাড়া জীবনানন্দ-গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ তাঁর সমালোচনা সমগ্র: জীবনানন্দ দাশ (২য় সংস্করণ, ১৯৮৬) বইটির ‘প্রবেশক’ অংশে কবির ৫০টি প্রবন্ধ-নিবন্ধের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছিলেন। তবে তালিকাটি নিঃশেষ বা নির্ভুল ছিল না। বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে এ তালিকায় বসুমতী পত্রিকার আশ্বিন ১৩৬০ সংখ্যায় ‘সাহেবিয়ানা’ নামে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের উল্লেখ আছে, যদিও সে নামে জীবনানন্দর কোনো প্রবন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়নি, বসুমতী পত্রিকার সেই সংখ্যায় জীবনানন্দর অন্য কোনো প্রবন্ধও ছাপা হয়নি। দৈনিক বসুমতী পত্রিকার ১৩৬০ বঙ্গাব্দের শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’ শিরোনামীয় প্রবন্ধটি ভুলক্রমে ‘সাহেবিয়ানা’ নামে উল্লিখিত হয়ে থাকবে।
বিখ্যাত ১৫টি প্রবন্ধের বাইরেও জীবনানন্দের আরও কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সমালোচনা রয়েছে, যার কিছু প্রকাশিত, কিছু অপ্রকাশিত—কিছু খসড়াপর্যায়ী। এই রচনাসমষ্টির সংখ্যা সর্বসাকল্যে কত, তা নিশ্চিত জানা নেই। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনাক্রমে প্রতীয়মান হয় ইতিমধ্যে অধিকাংশেরই হদিস করা গেছে।
কবিতার কথা গ্রন্থটির বাইরে কয়েকটি প্রকাশিত-অপ্রকাশিত প্রবন্ধ ছাড়াও প্রবন্ধধর্মী রচনার নিদর্শনস্বরূপ জীবনানন্দ-লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থের ভূমিকা, পুস্তক সমালোচনা এবং কয়েকটি চিঠিপত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। এসব মিলিয়ে ১৯৯০ সালে ঢাকার দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র। এতে পত্রস্থ কবিতার কথা–বহির্ভূত রচনার সংখ্যা ২৯। কবিতার কথাসহ প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা সর্বমোট ৪৪। পরে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এ গ্রন্থেরই দ্বিতীয় সংস্করণে কবিতার কথা–বহির্ভূত রচনার সংখ্যা উন্নীত হয় বত্রিশে। ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে ঢাকার মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত প্রবন্ধাবলি, যাতে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে কবিতার কথা–বহির্ভূত নানাবিধ ৪৮টি রচনা সংকলিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, কবিতার কথা এবং জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত প্রবন্ধাবলি গ্রন্থদ্বয়ে সংকলিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে ২০০০ সালে ঢাকার গতিধারা প্রকাশ করে প্রবন্ধসমগ্র, এতে সম্পাদক হিসেবে কলকাতাবাসী জীবনানন্দ-গবেষক দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ ছিল। স্বয়ং কবি ভূমেন্দ্র গুহ ২০০৯ সালে প্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের সমগ্র প্রবন্ধ। এতে লেখার খাতা থেকে উদ্ধার করা জীবনানন্দর আরও কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধের খসড়া সংযোজিত হয় এবং সব মিলিয়ে গ্রন্থিত রচনার সংখ্যা ১১৮-তে উন্নীত হয়, যার মধ্যে অনেকগুলো জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত, বেশ কিছু প্রকৃতই খসড়াস্বরূপ।
পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবেচনায় অনুমান করা চলে জীবনানন্দ দাশের অপুনরুদ্ধারকৃত প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর তেমন একটা নেই। তবে জীবনানন্দ ১৯৪৬-৪৭ সাল পর্বে কলকাতায় যে পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন সেই দৈনিক স্বরাজ, এবং যে কলেজে তিনি দীর্ঘকাল পড়িয়েছিলেন—বরিশালের সেই ব্রজমোহন কলেজের বার্ষিক পত্রিকায় তাঁর আরও দু–একটি লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে—এমত অনুমান করা অসংগত হবে না। অধিকন্তু কবির মৃত্যুর পর তাঁর কিছু কবিতা-গল্প-উপন্যাস ইত্যাদির পাণ্ডুলিপির খাতা হারিয়ে গিয়েছিল, যার মধ্যে কোনো প্রবন্ধ-নিবন্ধের খসড়া থাকা অসম্ভব নয়।
সংগ্রন্থিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের উৎস প্রসঙ্গে দুটি কথা উল্লেখ করা দরকার। প্রথমত উল্লেখ করা দরকার যে কবিতার কথা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘কবিতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামীয় প্রবন্ধটি মূলত একটি চিঠি। ১৯৪৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর (বাংলা ১৩৫৩) বরিশালে অবস্থানকালে কলকাতা নিবাসী ভক্ত তরুণ কবি প্রভাকর সেনকে লিখিত চিঠিটিই কিছুটা সম্পাদনাক্রমে প্রবন্ধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে জানা যায়, সঞ্জয় ভট্টচার্য কর্তৃক সম্পাদিত পূর্বাশা পত্রিকার কার্তিক ১৩৫৩ সংখ্যায় আলোচ্য ‘কবিতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামীয় প্রবন্ধটি ‘কবিতা প্রসঙ্গে জীবননান্দ’ শিরোনামে মুদ্রিত হয়েছিল। অনুমিত হয়, চিঠি হিসেবে লিখিত হলেও এর তাত্ত্বিক মূল্য বিবেচনা করে জীবনানন্দ দাশ তা পত্রিকায় ছাপতে দিয়েছিলেন। এ চিঠিটি ময়ূখ পত্রিকার ‘জীবনানন্দ স্মৃতি-সংখ্যা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, জীবনানন্দ দাশের আরও একটি চিঠি উপর্যুক্ত জীবনানন্দের প্রবন্ধ সমগ্র (১৯৯০) গ্রন্থে ‘আমার কথা’ শিরোনামে গ্রন্থস্থ হয়েছে।
জীবনানন্দর ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা ২১। এর মধ্যে দুটি—যথা ইন ফর দ্য ডেলিউজ এবং লিটারেচার অ্যান্ড কন্ট্রিবিউটিভস বিশেষভাবে খ্যাত। ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধগুলো ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার শিরোনামে জীবনানন্দর ইংরেজি রচনার সংকলন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে জীবনানন্দর দিনলিপি থেকে উদ্ধারকৃত তিনটি ইংরেজি লেখাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তিনটি ধরে খসড়াসহ জীবনানন্দর প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা সর্বমোট ১২১।
এ সূত্রে উল্লেখ করা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। এ সংকলনে জীবনানন্দ দাশের বাংলায় লিখিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ থেকে বাছাই করে ২৯টি গদ্য রচনা গৃহীত হয়েছে।
২.
জীবনানন্দ দাশের প্রাবন্ধিক পরিচয় বিশেষ কোনো মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত—এ রকম দাবি করার সময় এখনো আসেনি। প্রথম গদ্য রচনাটি জীবনানন্দ একটি শ্রাদ্ধসভার জন্য লিখেছিলেন, প্রথম সাহিত্যিক রচনা বুদ্ধদেব বসুর কংকাবতী কাব্যগ্রন্থের আলোচনা, যা কবিতা পত্রিকায় ১৩৪৪-এ মুদ্রিত হয়েছিল।
কবিতার নানা দিক নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করলেও জীবনানন্দ ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোচনা করেননি, তা নয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে তিনি পৃথক প্রবন্ধ লিখেছেন। অধিকন্তু অন্যান্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং চিঠিপত্রে বিভিন্ন কবি ও তাঁদের কবিতা নিয়ে তিনি নিঃসংকোচ মন্তব্য করেছেন। পাঠক জানেন, এই মন্তব্য সর্বদাই বস্তুনিষ্ঠ, কখনো কখনো কঠিন।
অন্যদিকে সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র বিষয়েও তিনি লিখেছেন যথেষ্ট। সমকালীন সমস্যা নিয়ে তিনি বিশেষ ভাবিত ছিলেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে কয়েকটি প্রবন্ধে। শিক্ষাবিষয়ক পাঁচটি প্রবন্ধ জীবনানন্দর গভীর সমাজমনস্কতার বিশিষ্ট অভিজ্ঞান। লক্ষ এড়ায় না যে, সাহিত্যতত্ত্বীয় প্রবন্ধগুলোর তুলনায় এগুলোর ভাষা সহজতর, যুক্তিপারম্পর্য ও বিন্যাস স্বচ্ছতর—ফলে পাঠকের জন্য সহজপাচ্য।
প্রাবন্ধিক জীবনানন্দর দৃষ্টি কোন কোন বিষয়ে আকৃষ্ট হয়েছিল, তা প্রণিধানযোগ্য। তাঁর বিশিষ্ট প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম এ রকম: ‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কি হিসাবে কবিতা শ্বাশত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরৎচন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ইন ফর দ্য ডিলিউজ এবং লিটারেচার অ্যান্ড কনট্রিবিউটিভস, দ্য বেঙ্গলি পোয়েট্রি টুডে, দ্য বেঙ্গলি নভেল টুডে, দ্য ফিউচার অব নভেল, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্য ইংরেজী’ এবং ‘শিক্ষা-দীক্ষা’।
জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের মধ্যে রয়েছে সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলি, শিক্ষাবিষয়ক কয়েকটি নিবন্ধ, বিভিন্ন গ্রন্থের ভূমিকা, জীবনানন্দকৃত বিভিন্ন গ্রন্থের সমালোচনা, আত্মপ্রাসঙ্গিক কিছু রচনা এবং নিজ কবিতা নিয়ে দুটি লেখা এবং বেশ কয়েকটি খসড়া প্রবন্ধ-নিবন্ধ। হিসাব করে দেখা যায় তাঁর সাহিত্য-সমাজ-শিক্ষাবিষয়ক রচনার সংখ্যা ৩০, গ্রন্থভূমিকা ও গ্রন্থালোচনা জাতীয় রচনার সংখ্যা নয়, স্মৃতিতর্পণমূলক রচনার সংখ্যা ৩ এবং বিবিধ বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা ১৬।
জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের মধ্যে রয়েছে সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলি, শিক্ষাবিষয়ক কয়েকটি নিবন্ধ, বিভিন্ন গ্রন্থের ভূমিকা, জীবনানন্দকৃত বিভিন্ন গ্রন্থের সমালোচনা, আত্মপ্রাসঙ্গিক কিছু রচনা এবং নিজ কবিতা নিয়ে দুটি লেখা এবং বেশ কয়েকটি খসড়া প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তাঁর সাহিত্য-সমাজ-শিক্ষাবিষয়ক রচনার সংখ্যা ৩০।
জীবনানন্দর সমসাময়িক আধুনিক কবিরা প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে কোন কোন বিষয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন, তা কৌতূহলের বিষয় হতে পারে। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (১৯০১-১৯৬০) প্রবন্ধের তালিকায় রয়েছে: ‘কাব্যের মুক্তি’, ‘ধ্রুপদ-খেয়াল’, ‘ডি.এইচ.লরেন্স ও ভার্জিনিয়া উল্ফ’, ‘উপন্যাসে তত্ত্ব ও তথ্য’, ‘ফরাসীর হার্দ্য পরিবর্তন’, ‘মাক্সিম্ গর্কি’, ‘বর্নার্ড শ’, ‘উইন্ডাম্ ল্যুইস ও এজ্রা পাউণ্ড’, ‘ঐতিহ্য ও টি.এস.এলিয়ট’, ‘ডব্লু.বি.য়েট্স’ ও ‘কলাকৈবল্য’, ‘রবীন্দ্রপ্রতিভার উপক্রমণিকা’, ‘রবিশস্য’, ‘ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ’, ‘সূর্যাবর্ত’, ‘দিনান্ত’, ‘উক্তি ও উপলব্ধি’, ‘চোরাবালি’, ‘শিল্প ও স্বাধীনতা’, ‘প্রগতি ও পরিবর্তন’, ‘বিজ্ঞানের আদর্শ’, ‘অনার্য সভ্যতা’ ইত্যাদি।
কবি অমিয় চক্রবর্তীর (১৯০১-১৯৮৭) প্রবন্ধাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির শিরোনাম এ রকম: ‘শিল্পদৃষ্টি’, ‘কাব্যে ধারণা শক্তি’, ‘কাব্যের টেকনিক’, ‘কাব্যাদর্শ’, ‘এজরা পাউণ্ড—কবিতা’র দরবারে পত্রাঘাত’, ‘এলিয়টের নতুন কবিতা’, ‘কবি য়েট্স্’, ‘জয়েস্ প্রাসঙ্গিক’, ‘প্রমথ চৌধুরীর গল্প’, ‘যুগ সংকটের কবি ইকবাল’, ‘ইকবাল-কাব্যের নতুন প্রসঙ্গ’, ‘নতুন কবিতা’, ‘কবিতার চেয়ে বেশি’, ‘গানের গান’, ‘গীতাঞ্জলি ও সত্য কবিতা’, ‘শেষ লেখা’ ইত্যাদি।
জীবনানন্দের সতীর্থ ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) প্রবন্ধ সংকলনে রয়েছে: ‘রবীন্দ্রনাথ : বিশ্ব কবি ও বাঙালি’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও গদ্যশিল্প’, ‘কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’, ‘নজরুল ইসলাম’, ‘জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে’, ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: কবি’, ‘অমিয় চক্রবর্তীর পালা বদল’, ‘রামায়ণ’, ‘বাংলা শিশুসাহিত্য’, ‘সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ’, ‘শার্ল বোদলেয়ার ও আধুনিক কবিতা’, ‘ভাষা, কবিতা ও মনুষ্যত্ব’, ‘চার্লস চ্যাপলিন’, ‘এক গ্রীষ্মে দুই কবি’ ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, বুদ্ধদেব বসু, যিনি বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার অন্যতম পুরোধা, তিনি লিখেছেন প্রচুর, সাহিত্যে বিষয়ে তাঁর মূল্যবান লেখালেখি অতুলনীয়।
কবি বিষ্ণু দের (১৯০৯-১৯৮২) কয়েকটি প্রবন্ধের শিরোনাম এ রকম: ‘জনসাধারণের রুচি’, ‘বাংলা সাহিত্যে প্রগতি’, ‘বাংলায় শিল্পচর্চা’, ‘বাংলা সাহিত্যের ধারা’, ‘সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘বীরবল থেকে পরশুরাম’, ‘রাজায়-রাজায়’, ‘আঁরাগ’, ‘পরিবর্তমান এই বিশ্বে’, ‘পিকাসো’, ‘সোভিয়েট শিল্প-প্রদর্শনী’, ‘লোকসংগীত’, ‘বুদ্ধিবাদী উপন্যাস’, ‘বাংলা গদ্য কবিতা’, ‘হাল্কা কবিতা’, ‘এলিয়টের মহাপ্রস্থান’, ‘এলিয়ট প্রসঙ্গে’, ‘বাংলা সহিত্যে প্রগতি’, ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’, এবং ‘রিচার্ডসের কল্পনা’।
মোহিতলাল মজুমদার, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ জীবনানন্দের অগ্রজগণ্য। এঁদের মধ্যে কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের (১৮৮৮-১৯৫২) প্রবন্ধের তালিকায় রয়েছে: ‘মেঘনাদবধ-কাব্যের নারী-চরিত্র’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও “কবি-উপন্যাস”’, ‘বঙ্কিমচন্দ্র’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ট্র্যাজেডী-তত্ত্ব’, ‘বিহারীলাল চক্রবর্তী’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘মৃত্যুর আলোকে শরৎচন্দ্র’, ‘সাহিত্য-বিচার’, ‘কাব্য ও জীবন’, ‘সাহিত্যের ষ্টাইল’, ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য’, ‘নবযুগ ও স্বামী বিবেকানন্দ’ ইত্যাদি।
প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের স্থপতিদের অন্যতম, যিনি প্রবন্ধ সাহিত্যে নতুন গদ্যরীতির প্রচলন করে বিখ্যাত হয়ে আছেন। বিষয়-আশয়েও তিনি প্রবন্ধের পরিধিকে অনেক বিস্তৃত করে দিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধের তালিকায় রয়েছে ‘জয়দেব’, ‘সনেট কেন চতুর্দশপদী’, ‘বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ’, ‘সাহিত্যে খেলা’, ‘বই পড়া’, ‘রামমোহন রায়’, ‘কাব্যে অশ্লীলতা—আলংকারিক মত’, ‘বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা’, ‘ভারতবর্ষের ঐক্য’, ‘বাঙ্গালি-পেট্রিওটিজম’, ‘মলাট-সমালোচনা’, ‘প্রত্নতত্ত্বের পারশ্য-উপন্যাস’ ইত্যাদি শিরোনামে বিচিত্র বিষয়ের প্রবন্ধ।
জীবনানন্দ মূলত কবি, কবিতা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল। প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে তাঁর দৃষ্টি অনেকখানি প্রসারিত করেছেন কবিতার তাত্ত্বিক আলোচনায়। কিন্তু তিনি একা নন, তিরিশের সতীর্থদের অনেকেই কবিতা সম্পর্কে ভেবেছিলেন, অল্পবিস্তর লিখেছিলেন। সতীর্থদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আর সে কারণেই বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে তাদের স্বাভাবিক অবহিতি ছিল, অধিগত ছিল ইউরোপ-আমেরিকার সমকালীন সাহিত্য–ভাবনা। ফলে তাঁদের সাহিত্যভাবনায় আন্তর্জাতিকতার মুদ্রাঙ্কন পরিলক্ষিত হয়। তবে জীবনানন্দ দাশ তার এক-তৃতীয়াংশ প্রবন্ধে কবিতার নানা আঙ্গিক ও তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মৌলিক আলোচনা করেছেন।
৩.
কবিতার কথা গ্রন্থে সংকলিত জীবনানন্দ দাশের ১৫টি প্রবন্ধের শিরোনাম ও প্রথম প্রকাশকাল নিম্নরূপ:
‘কবিতার কথা’ : কবিতা, বৈশাখ, ১৩৪৫ (১৯৩৮ সাল)
‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’ : ব্রজমোহন কলেজ পত্রিকা, (১৯৪১ সাল)
‘মাত্রাচেতনা’ : প্রভাতী, পৌষ, ১৩৫১ (১৯৪৪ সাল)
‘উত্তর-রৈবিক বাংলা কাব্য’ : ব্রজমোহন কলেজ পত্রিকা, (১৯৪৬)
‘কবিতা প্রসঙ্গে’ : পূর্বাশা, কার্তিক, ১৩৫১ (১৯৪৬ সাল)
‘কবিতার আত্মা ও শরীর’ : বসুমতী, শারদীয়, ১৩৫৪ (১৯৪৭ সাল)
‘কি হিসেবে শাশ্বত’ : আনন্দবাজার পত্রিকা (বার্ষিক সংখ্যা), ১৩৫৫ (১৯৪৮ সাল)
‘কবিতার আলোচনা’ : পূর্বাশা, বৈশাখ, ১৩৫৬ (১৯৪৯ সাল)
‘কবিতাপাঠ’ : পূর্বাশা, আষাঢ়, ১৩৫৬ (১৯৪৯ সাল)
‘দেশ কাল ও কবিতা’ : পূর্বাশা, আশ্বিন, ১৩৫৬ (১৯৪৯ সাল)
‘সত্য বিশ্বাস ও কবিতা’ : পূর্বাশা, মাঘ, ১৩৫৬ (১৯৫০ সাল)
‘রুচি বিচার ও অন্যান্য কথা’ : পূর্বাশা, চৈত্র, ১৩৫৬ (১৯৫০ সাল)
‘আধুনিক কবিতা’ : দ্বন্দ্ব, শারদীয়, ১৩৫৭ (১৯৫০ সাল)
‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’ : চতুরঙ্গ, আশ্বিন, ১৩৫৭ (১৯৫০ সাল)
‘অসমাপ্ত আলোচনা’ : চতুরঙ্গ, কার্তিক-পৌষ, ১৩৬০ (১৯৫৩ সাল)
৪.
বহু আগেই আমরা বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে একমত হয়েছি যে জীবনানন্দ দাশ নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর গদ্য ভাষারীতিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর প্রবন্ধগুলোর বাক্যগঠনরীতি সমসাময়িককালে সুপরিচিত ছিল না, এমনকি আধুনিক মনোযোগী পাঠকের কাছেও তা জটিল প্রতীয়মান হতে পারে।
বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এই সূত্রে আদিষ্ট হয়ে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন যার নাম ‘কবিতার কথা’। এ প্রবন্ধের শুরু এভাবে:
‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি , কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না, যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়, নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’
জটিল ভাষায় সুগভীর বক্তব্য নিয়ে প্রথম থেকেই প্রবন্ধ লেখক জীবনানন্দ দাশ স্বতন্ত্র হয়ে গেছেন। এরপর পরম বিশ্বাসে ও নির্ভীক সততায় বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ-নিবন্ধে তিনি সৎ ও শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার শর্ত নিরূপণ করেছেন, আধুনিকতার সঠিক পরিচয় নির্ণয় করেছেন স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এবং কখনো কখনো সমসাময়িক কবিতার মূল্যমান নির্ণয় করেছেন।
বিদ্যাসাগর যে গদ্যভাষার শিলান্যাস করেছিলেন, অদূরবর্তী ভবিষ্যতে তা নানা হাতে নানা রূপ লাভ করতে শুরু করেছিল। ...জীবনানন্দর গদ্য এ ঘরানারই উচ্চতর বিকাশ। ...অত্যুক্তি হবে না বলা যে এভাবেই বাংলায় প্রবন্ধের যথোপযুক্ত একটি শক্তিধর গদ্যভাষার প্রবর্তনা হয়েছিল।
প্রারম্ভিক বাক্যটি হ্রস্ব হলেও অব্যবহিত পরেই তিনি দীর্ঘ বাক্যের ঘন বুনট গড়ে তুলেছেন। ‘এবং’, ‘ও’ ইত্যাদি অন্বয়মূলক পদ এবং ‘কমা’, ‘সেমিকোলন’, ‘ড্যাশ’ প্রভৃতি যতিচিহ্নের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এমন একটি গদ্যভঙ্গি, যার সঙ্গে সমকালীন বাঙালি পাঠকের দীর্ঘ পরিচয় ছিল না। আঠারো শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশ সূচিত হয়েছিল একটি সরল কাঠামো নিয়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বাল্মীকির জয়-এর আলোচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন এভাবে:
‘বঙ্গদর্শনে যে-সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, পুনর্মুদ্রিত হইলে তাহা বঙ্গদর্শনে সমালোচিত হইয়া থাকে না। ‘বাল্মীকির জয়’ কিয়দংশে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল কিন্তু গ্রন্থের অধিকাংশই বঙ্গদর্শনে বাহির হয় নাই। উহার যে-অংশ প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহাও বিশেষরূপে পরিবর্তিত হইয়া পুনর্মুদ্রিত হইয়াছে। এ অবস্থায় আমরা সমালোচ্য গ্রন্থ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। অতএব পাঠক যদি অনুমতি করেন, তবে ইহার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হই। সম্পাদকের অনুমতি পাইয়াছি।’
যৌগিক বাক্যের উপর্যুপরি ব্যবহার সত্ত্বেও দৃষ্টি এড়ায় না যে বঙ্কিমচন্দ্রের বাক্যগঠনরীতি জীবনানন্দর তুলনায় বহুলাংশে সরলতর। বাক্যপ্রকরণের এই অবক্র চারিত্র্য প্রমথ চৌধুরীর রচনাতেও অব্যাহত থেকেছে। প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরোয়ার আলোচনা থেকে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যরীতির সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে। তিনি লিখেছেন:
‘শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ঘরোয়া” পড়লুম। চমৎকার বই। ঘরোয়া মানে ঠাকুর পরিবারের ঘরের কথা। ...অবনীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র, এবং স্বগুণে স্বনামধন্য, সুতরাং তাঁর কোনও পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তিনি চিত্রবিদ্যায় একজন আর্টিস্ট ব’লে দেশে বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জ্জন করেছেন। কিন্তু এ পুস্তকে তিনি নিজের কৃতিত্ব বিষয়ে কোনও কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ঠাকুর পরিবারের ঘরোয়া কথা বলেছেন। পূর্বে বলেছি এ-পুস্তক ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস নয়, তাই ব’লে উপন্যাসও নয়।’
বঙ্কিমচন্দ্রের তুলনায় প্রমথ চৌধুরীর বাক্য-দৈর্ঘ্য হ্রস্বতর এবং যৌগিক বাক্য গঠনের প্রবণতা অনুপস্থিত। এককথায় প্রমথ চৌধুরীর গদ্যকাঠামো সরল, অনতিদীর্ঘ বাক্য ধারণ করেছে এক-একটি সাধারণ বক্তব্য। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য সুললিত। বাস্তবের সত্য এবং সাহিত্যের সত্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন:
‘প্রকৃতিতে যাহা দেখি তাহা আমার কাছে প্রত্যক্ষ, আমার ইন্দ্রিয় তাহার সাক্ষ্য দেয়। সাহিত্যে যাহা দেখায় তাহা প্রাকৃতিক হইলেও তাহা প্রত্যক্ষ নহে। সুতরাং সাহিত্যে সেই প্রত্যক্ষতার অভাব পূরণ করিতে হয়। প্রাকৃত-সত্যে এবং সাহিত্য-সত্যে এইখানেই তফাত আরম্ভ হয়। সাহিত্যের মা যেমন করিয়া কাঁদে প্রাকৃত মা তেমন করিয়া কাঁদে না। তাই বলিয়া সাহিত্যের মা’র কান্না মিথ্যা নহে। প্রথমত, প্রাকৃত রোদন এমন প্রত্যক্ষ যে তাহার বেদনা আকারে ইঙ্গিতে কণ্ঠস্বরে চারি দিকের দৃশ্যে এবং শোকঘটনার নিশ্চয় প্রমাণে আমাদের প্রতীতি ও সমবেদনা উদ্রেক করিয়া দিতে বিলম্ব করে না। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃত মা আপনার শোক সম্পূর্ণ ব্যক্ত করিতে পারে না, সে ক্ষমতা তাহার নাই, সে অবস্থাও তাহার নয়। এইজন্যই সাহিত্য ঠিক প্রকৃতির আরশি নহে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে রবীন্দ্রগদ্য মননশীলতায় ঋদ্ধ, তথাপি তাঁর ভাষার গাঁথুনিতে তেমন কোনো জটিলতা পরিদৃষ্ট হয় না। স্বীয় চিন্তাচেতনাকে বোধগম্য করে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ধীর লয়ের সুললিত একটি ভঙ্গি বেছে নিয়েছিলেন।
পত্রপত্রিকার পাতা ঘেঁটে দেখা যায়, সমসাময়িককালে যেসব লেখক গদ্যে জটিল বাক্যরীতি অবলম্বন করেছিলেন, মোহিতলাল মজুমদার তাঁদের অন্যতম। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসটির আলোচনা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এর সপক্ষে দীর্ঘ উদ্ধৃতির বিকল্প নেই। উক্ত আলোচনায় মোহিতলাল লিখেছিলেন:
‘এই যে তারাশঙ্কর, ইনিই যখন জীবনের শিল্পরূপ নির্মাণ করেন, যেমন তাঁহার গল্পগুলিতে করিয়াছেন, তখন যে তাহাতে একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরনের রস সৃষ্টি হইবে, ইহাই তো স্বাভাবিক। সে রস বাস্তবের রসই বটে, কিন্তু তাহার অন্তরালে একটা নির্মম অনাসক্ত তান্ত্রিক-দৃষ্টি আছে, সেই দৃষ্টি যখন নর-নারীর হৃদয়ের মধ্যেও উঁকি দিয়াছে, তখন তাহা খাঁটি আর্টিস্টের নির্মমতায় পরিণত হইয়া, সর্বসংস্কারমুক্তির যে-আনন্দ সেই আনন্দের রস সৃষ্টি করিয়াছে। ইহাই তারাশঙ্করের আর্ট, আমি তাহাকে একরূপ তান্ত্রিক রস-প্রেরণা বলিয়াছি; ইহার স্থূল দৃষ্টান্ত হিসাবে, তাঁহার গল্পে নর-নারীর প্রেম ও প্রেম-বিকারগুলি স্মরণ করিয়া বলি সেই প্রেমে নীতি-দুর্নীতির সংস্কার নাই, আছে কেবল প্রত্যেক চরিত্রে সেই প্রবৃত্তির রক্তগত সংস্কার।’
লক্ষ করা যেতে পারে যে মোহিতলাল একটি বাক্যের ভেতরে একাধিক অনুবাক্যকে ধারণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে বাক্য কেবল দীর্ঘায়িত হয়নি, এর গঠনে জটিলতা অনুপ্রবেশ করেছে। তিনি বিশেষ করে মূল বাক্যের জরায়ুতে যতিচিহ্নিত নতুন বাক্য জুড়ে দিয়ে দীর্ঘ বক্তব্যকে সংহত রূপ দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন; একটি বাক্যের শর্ত সাপেক্ষে কমা বা সেমিকোলন দিয়ে আরেকটি বাক্য জুড়ে দিয়েছেন। সেখানেই শেষ নয়, পূর্ণরূপ বাক্য শেষে সেমিকোলন দিয়ে নতুন বাক্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে; এতে পরবর্তী বাক্য পূর্ববর্তী বাক্যের বিশেষণ হিসেবে কাজ করেছে। ফলে বাক্য দীর্ঘ ও জটিল রূপ লাভ করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো একটি বাক্যের সমর্থনে আরেকটি বাক্য অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া, যার উদাহরণ প্রথম বাক্যের ‘যেমন তাঁহার গল্পগুলোতে করিয়াছেন’ অংশটি। উদ্ধৃতাংশে প্রথম বাক্যটিই জটিলতম।
ঊনবিংশ শতকের শেষ পাদে বা বিংশ শতকের প্রথমাংশে কার হাতে বাংলা গদ্যসাহিত্যে প্রথম উপর্যুক্তরূপ বাক্যকাঠামো প্রবর্তিত হয়েছিল, তা গবেষণাসাপেক্ষ। বিদ্যাসাগর যে গদ্যভাষার শিলান্যাস করেছিলেন, অদূরবর্তী ভবিষ্যতে তা নানা হাতে নানা রূপ লাভ করতে শুরু করেছিল। কার্যত এ ছিল মৌখিক ভাষা থেকে ভিন্ন ও জটিলতর একটি লেখ্যরীতির প্রবর্তনা। নিঃসংকোচে বলা চলে, এর ফলে বাংলা গদ্যের প্রচ্ছদ ও অন্তর্নিহিত স্বাদ বহুলাংশে বদলে গিয়েছিল।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এর ফলে বাংলা গদ্য লাভ করেছিল বক্তব্য প্রকাশের বিস্তৃতিতর অবকাশ ও গভীরতর শক্তি। জীবনানন্দর গদ্য এ ঘরানারই উচ্চতর বিকাশ। এ প্রবন্ধের শুরুতেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তাঁর গদ্যভাষায় অনুরূপ দীর্ঘ ও জটিল বাক্যে বহুতর বক্তব্য ধারণের প্রয়াস। অত্যুক্তি হবে না বলা যে এভাবেই বাংলায় প্রবন্ধের যথোপযুক্ত একটি শক্তিধর গদ্যভাষার প্রবর্তনা হয়েছিল।
প্রবন্ধ কী? প্রবন্ধ সেই গদ্য, যা মানুষের গভীর চিন্তনকে নিবিড় গাঁথুনিতে ধারণ ও প্রকাশ করতে সক্ষম। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে পরবর্তী ৫০ বছরে প্রবন্ধোপযোগী উপযুক্ত ভাষার বিকাশের সঙ্গে গদ্যের লালিত্য, সৌন্দর্য ও প্রাঞ্জলতা বিকশিত হয়েছিল বিভিন্ন আঙ্গিকে। এরই সূত্র ধরে গত ১০০ বছরে ক্রমশ সৃষ্টি হয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু গদ্যশৈলী বা প্রকরণ, যার সাংজ্ঞার্থিক বর্ণনা দুরূহ হলেও বিভেদক পার্থক্য নিরূপণ সজাগ পাঠকের জন্য জটিল কোনো কাজ নয়। রসজ্ঞ পাঠক অভিনব বা বিশিষ্ট রূপ কোনো গদ্যশৈলী চিনতে ভুল করে না। যেমন সম্প্রতিকালে জীবনানন্দ-গবেষক কবি ভূমেন্দ্র গুহর সদৃঢ় ও সরস বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গি দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।
ভাষা—চিন্তা ও উপলব্ধির বাহন। এ কারণে চিন্তা ও উপলব্ধির গভীরতার ওপর নির্ভর করে ভাষার চারিত্র্য। বক্তব্য যে ক্ষেত্রে সরল, সে ক্ষেত্রে সরল ভাষাভঙ্গিই লেখকের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে জটিল, দৃঢ় ও দীর্ঘ বাক্যের সমর্থন ব্যতিরেকে গভীর ও জটিল বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। নির্দ্বিধায় বলা চলে যে জীবনানন্দ স্বীয় গভীর মননশীলতা এবং নিবিড় অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র গদ্যভাষা প্রণয়নে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর গদ্যকাঠামো কেবল জটিল বাক্য গঠনরীতির ওপর স্থিত নয়, বক্তব্য সংস্থাপনার ক্রমও এর নিয়ামক। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশিষ্ট শব্দচয়ন রীতি। এই সূত্রে জীবনানন্দ থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে—উদ্ধৃটি দীর্ঘ তবে জীবনানন্দীয় গদ্যভঙ্গীর অনেক বৈশিষ্ট্যই এতে অবধৃত:
‘আমি বলতে চাই না যে কাব্যের সঙ্গে জীবনের কোনো সম্বন্ধ নেই; সম্বন্ধ রয়েছে—কিন্তু প্রসিদ্ধ প্রকটভাবে নেই। কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুই রকম উৎসারণ; জীবন বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তার ভিতর বাস্তব নামে আমরা সাধারণত যা জানি তা রয়েছে, কিন্তু এই অসংলগ্ন অব্যবস্থিত জীবনের দিকে তাকিয়ে কবির কল্পনা-প্রতিভা কিংবা মানুষের ইমাজিনেশন সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত হয় না; কিন্তু কবিতা সৃষ্টি করে কবির বিবেক সান্ত্বনা পায়, তার কল্পনামনীষা শান্তি বোধ করে, পাঠকের ইমাজিনেশন তৃপ্তি পায়। কিন্তু সাধারণত বাস্তব বলতে আমরা যা বুঝি, তার সম্পূর্ণ পুনর্গঠন তবুও কাব্যের ভিতর থাকে না; আমরা এক নতুন প্রদেশে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা করা যায় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায়—তাহ’লে পৃথিবীর এই দিন, রাত্রি, মানুষ ও তার আকাঙ্ক্ষা এবং সৃষ্টির সমস্ত ধূলো সমস্ত কঙ্কাল ও সমস্ত নক্ষত্রকে ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ব্যবহারের কল্পনা করা যেতে পারে যা কাব্য;—অথচ জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গলালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ; সম্বন্ধের ধূসরতা ও নূতনতা। সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ শোনা যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা এমন অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায়—কিংবা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয়, যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেক দিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে কোথায় যেন ছিল; এবং ভঙ্গুর হ’য়ে নয়, সংহত হয়ে, আরো অনেক দিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রালোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে; এই সবের অপরূপ উদ্গীরণের ভিতরে এসে হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তুসঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে; এবং সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ ক’রে ওঠে যেন, সুরের জন্ম হয় এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনা-মনীষার ভিতর তাদের একাত্মতা ঘটে—জন্ম লাভ করে।’ (সূত্র: কবিতার কথা, কবিতা, বৈশাখ, ১৩৪৫, পৃ. ১৩-১৪)
উদ্ধৃতাংশ ব্যবচ্ছেদ করে দেখলে পাওয়া যায়—এক দিকে জীবনানন্দ দাশ একই বাক্যে ধারণ করেছেন বক্তব্যের নিহিতার্থ ও এর শর্ত; অন্যত্র একই বাক্যে রয়েছে বক্তব্য ও এর তাৎপর্য। আবার কোনো বাক্যে একটি বক্তব্য শেষে জুড়ে দেওয়া হয়েছে তার বিশেষায়িত টীকা; অর্থাৎ একটি বাক্যের এক প্রান্তে রয়েছে মূল বক্তব্য, অন্য প্রান্তে রয়েছে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। পূর্ণ বাক্য শেষে পূর্ণযতির পরিবর্তে জীবনানন্দ দাশ অর্ধযতি, বিশেষ করে সেমিকোলন ব্যবহার করে যুক্ত করেছেন আরেকটি পূর্ণ বাক্য। ফলে বাক্যের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অনুপ্রবেশ করেছে জটিলতা। সন্দেহ নেই, এর ফলে ভাষার অর্থনির্মলতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে তাঁর গদ্যভঙ্গিতে প্রোথিত হয়েছে নিবিড় গভীরতা ও দার্ঢ্য, যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তাসূত্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এই গদ্যরীতির সঙ্গে ইয়োরোপীয় বিশেষ করে ইংরেজি প্রবন্ধ সাহিত্যের গদ্যরীতির সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়।
বক্তব্য যে ক্ষেত্রে সরল, সে ক্ষেত্রে সরল ভাষাভঙ্গিই লেখকের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে জটিল, দৃঢ় ও দীর্ঘ বাক্যের সমর্থন ব্যতিরেকে গভীর ও জটিল বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। নির্দ্বিধায় বলা চলে যে জীবনানন্দ স্বীয় গভীর মননশীলতা এবং নিবিড় অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র গদ্যভাষা প্রণয়নে সমর্থ হয়েছিলেন।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জীবনানন্দ তাঁর গদ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বাক্যে পদ-স্থাপনার মৌলিক রীতিই অনুসরণ করেছেন। বস্তুত তাঁর মূল অবদান একই বাক্যের কাঠামোতে যুক্তিসম্মত বিবিধ বাক্য, অনুবাক্য ও বাক্যাংশের সমাবেশ। ফলে ভাষার লৌকিক রীতি সর্বাংশে পরিত্যক্ত হয়েছে; প্রণীত হয়েছে এমন একটি বাক্যকাঠামো, যাতে একই বাক্যে একটি জটিল অথচ পূর্ণাঙ্গ চিন্তাসূত্র ধারণ করা সম্ভবপর। লৌকিক ভাষায় বক্তব্য প্রকাশের যে পরম্পরা আমরা লক্ষ করি, জীবনানন্দর গদ্যভাষা প্রবাহিত হয়েছে তার বিপরীত মুখে। লৌকিক ভাষার স্বভাবী শিথিলতা দূরীভূত করে জীবনানন্দ দাশ বাংলা গদ্যকে দিয়েছেন গভীর মননশীল বক্তব্য প্রকাশের ঘনীভূত শক্তি।
দীর্ঘ-জটিল বাক্য গঠনের যে প্রবণতা কবিতার কথার প্রবন্ধগুলোতে পরিদৃষ্ট হয়, তা জীবনানন্দর ইংরেজি রচনাগুলোতেও সমুপস্থিত। উদাহরণ হিসেবে ইন ফর দ্য ডেলিউজ প্রবন্ধ থেকে নিম্নোদ্ধৃত অনুচ্ছেদটি পাঠের আবেদন করি:
‘ইন দ্য অ্যাবাভ টরচুয়াস সেনটেন্স অব মাইন, আই অ্যাম অ্যাফ্রেড, আই হ্যাভ নট বিন এবল টু ব্রিং হোম টু দ্য মাইন্ডস অব রিডার্স দ্যাট পোয়েট্রি ইজ রিটেন নো লেস ফর পোয়েট্রিজ সেক দ্যান ফর লাইফস (সোসাইটিজ)। ইফ ইট ইজ রিটেন মোর ফর পোয়েট্রিজ—দেয়ারবাই মিনিং আর্টস—সেক দ্যান ফর লাইফস, ইট উইল বি সিন দ্যাট ইট হ্যাজ, টু অল ইনটেন্টস অ্যান্ড পারপাসেস, ডিসরিগার্ডেড দ্য ইনসেইন ইকোনমিক অ্যান্ড আদার ইন্টার-রিলেশনস বিটুইন নেশনস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস, অ্যান্ড দ্য কোয়েশ্চন অব রিহ্যাবিলিটেশন অর ক্রিয়েশন অব আ নিউ, হোলসম সোসাইটি ইন প্লেস অব দ্য হার্টলেস ডেকাডেন্স (টু সে দ্য লিস্ট) দ্যাট হ্যাজ হেল্ড দ্য ফিল্ড ফর আ লং টাইম, ইজ আউট অব ইটস কেন। টেগোরস পোয়েম অব হুইচ আই হ্যাভ স্পোকেন হ্যাজ রিয়ালাইজড দিস উইল এনাফ।’ (অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার)
যেকোনো বিবেচনায় এই অনুচ্ছেদের বাক্য জটিল, এবং এর অর্থ গভীর মনোনিবেশ ব্যতিরেকে উপলব্ধ হয়ে ওঠে না। কিন্তু এই অনুচ্ছেদের শুরুতে যে পূর্বোক্ত ‘টরচুয়াস সেনটেন্স’-এর কথা জীবনানন্দ উল্লেখ করেছেন, সেটি কেমন ছিল তা যেকোনো পাঠকের জন্যই কৌতূহলের বিষয়। সেই দীর্ঘ, অতি জটিল, জীবনানন্দর নিজেরই ভাষায় ‘উৎপীড়ক’, বাক্যটি নিম্নরূপ:
‘ইভেন টুডে আই বিলিভ দ্যাট পোয়েট্রি—লিটারেচার, ফর দ্য ম্যাটার অব দ্যাট—ইজ রাইটিং, দ্যাট মেকস আ পারসন (সেন্সিবল অব দ্য ট্র্যাডিশন অব পোয়েট্রি) অ্যাওয়ার, হোয়েন হি রিডস আ নিউ পোয়েম, নট নেসেসারিলি অব আ ফারদার ডেভেলপমেন্ট অব, বাট অলওয়েজ ইনেভিটেবলি অব আ স্যাটিসফ্যাকশন অব, দ্য সেন্স অব ট্র্যাডিশন টু হুইচ দ্য পোয়েম, অ্যাজ ইট ইজ রিড অ্যান্ড এনজয়েড অ্যান্ড অ্যাপ্রেইজড, ইজ কনফাইডেড অ্যান্ড অ্যাসাইন্ড, সাচ আ রিডার্স ফিলিং অ্যান্ড জাজমেন্ট টেলস হিম দ্যাট অল ইজ ওয়েল উইথ দ্য পোয়েট ইন সো ফার অ্যাজ হি হ্যাজ ক্রিয়েটেড দিস পোয়েম অ্যান্ড অল ইজ ওয়েল উইথ দ্য ট্র্যাডিশন ইনঅ্যাজমাচ অ্যাজ ইট হ্যাজ বর্ন দিস ফ্রুট; (হি নোজ, থো, দ্যাট ইন দ্য অ্যাপ্রিসিয়েশন অব সাম আদার পোয়েমস অব ওয়ান্ডারফুল পারফেকশন আ ফ্যাসাড সিমস টু বি বিল্ট অ্যানিউ, মে বি, অব ওয়ান অব দ্য রেবেলিয়াস উইংস অব দ্য ম্যানশন অব ট্র্যাডিশন লুমিং ইন দ্য ডিম ব্যাকগ্রাউন্ড) ইয়েস, অল ইজ ওয়েল উইথ দ্য পোয়েট অ্যান্ড উইথ দ্য ট্র্যাডিশন অ্যাজ ইট হ্যাজ বর্ন দিস ফ্রুট; অল ইজ ওয়েল, নটউইথস্ট্যান্ডিং দ্য প্রাইভেট অ্যান্ড পাবলিক লাইফ অব দ্য পোয়েট অ্যান্ড দ্য সোসাইটি অ্যারাউন্ড হিম হোয়্যার দেয়ার ইজ অলওয়েজ আ গ্রাইন্ডিং সেন্স অব ফলস ইকোনমিক অ্যান্ড মিসলিডিং সোশ্যাল ফোর্সেস হ্যাভিং দেয়ার টেরিবল ওয়েজ।’
পরস্পর সম্বন্ধী অনেকগুলো বিবৃতিকে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে উপস্থাপনার তাগিদেই জীবনানন্দ ১৯৪টি শব্দের সমবায়ে তৈরি একটি সুদীর্ঘ বাক্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ রকম জটিল গদ্যভাষা কেবল একটি রীতি-ই নয়—স্বীকার করে নেওয়া ন্যায্য যে লেখকের পক্ষে একটি সক্ষমতাও বটে। প্রতীয়মান হয়, কবি জীবনানন্দ দাশ দীর্ঘ বাক্যটি অক্লেশেই রচনা করেছেন অনেকগুলো অনুবাক্যের সমবায়ে—সেই ধারাবাহিকক্রমে, যে ধারাবাহিকতায় তাঁর চিন্তাসূত্রাবলির ক্রমান্বয়ী উদ্ভব ঘটেছিল। বাংলার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ হয়, কেবল বাক্যগঠনে এই জটিলতা অবলম্বনের স্বাধীনতা গ্রহণ করেননি জীবনানন্দ, তিনি প্রচুর শব্দ গঠন করেছেন যা তাঁর চিন্তাপ্রসূত বক্তব্য স্বীয় ধারণা ও উপলব্ধিকে সঠিকভাবে ধারণ ও প্রকাশ করবার জন্য আবশ্যক ছিল। প্রণিধানযোগ্য যে প্রকাশের জন্য জীবনানন্দ প্রায়ই সমাসবদ্ধ শব্দ গঠন করেছেন, গঠন করেছেন নতুন শব্দ। এ ধরনের সমাসবদ্ধ শব্দ ও নতুন শব্দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলা অভিধানে এসব শব্দ সংগৃহীত হওয়ার দাবি রাখে।
৫.
জীবনানন্দর প্রবন্ধের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধগুলো। কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে জীবনানন্দর কবিতাবিষয়ক ধ্যানধারণা প্রতিফলিত হয়েছে নিরেট পরিসরে। সমসাময়িককালে ইউরোপীয় ধাঁচে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার প্রবর্তন হয়েছিল, সে সম্পর্কে জীবনানন্দর পর্যবেক্ষণ খুবই লক্ষ্যভেদী। কবিতাবিষয়ক চিন্তায় জীবনানন্দর দৃষ্টিভঙ্গি অভিনব বললে অত্যুক্তি হবে না। যুগ যুগ ধরে কবিতাবিষয়ক বিতর্কের কেন্দ্র হলো কবিতা কী, কী গুণে একটি রচনা কবিতা হয়ে উঠতে পারে। পরিবর্তে জীবনানন্দ সর্বাগ্রে কবির সংজ্ঞার্থ নিরূপণ করাই শিরোধার্য করেছিলেন। প্রথমেই তিনি লিখেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি’—এই উক্তি বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয়তা অর্জন করেছে।
কে কবি? জীবনানন্দ জানালেন, ‘কবির হৃদয়ে থাকবে কল্পনা, সে কল্পনার ভিতরে থাকবে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা।’ অধিকন্তু জীবনানন্দর মতে, ‘একজন কবির পশ্চাৎপটে ক্রিয়াশীল থাকবে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক কবিদের বিভিন্ন কাব্যপ্রয়াস।’ এ কারণে যার হৃদয়ে কল্পনার প্রতিভা নেই—আর কল্পনা যদিওবা থাকে, যদি না থাকে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বাতন্ত্রিক নির্যাস; তবে জীবনানন্দ দাশ তাঁকে—হতে পারেন তিনি বহুলপ্রজ এমনকি খ্যাতিমান কবিতালেখক—‘কবি’ বলতে অসম্মত। কবি কে? এ প্রশ্নের উত্তরে অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘কবি তো সেই মানুষই, যিনি সত্যকে অনুভব করতে পারেন এবং ভাষার আবেগ-প্রদীপ্তির সাহায্যে আমাদের হৃদয়ের ভিতর পৌঁছিয়ে দিতে পারেন।’ (সূত্র: ‘কবিতা ও কঙ্কাবতী’, জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত প্রবন্ধাবলী, ২য় সংস্করণ, ২০১৩; পৃষ্ঠা ৪১।)
তিনি প্রচুর শব্দ গঠন করেছেন যা তাঁর চিন্তাপ্রসূত বক্তব্য স্বীয় ধারণা ও উপলব্ধিকে সঠিকভাবে ধারণ ও প্রকাশ করবার জন্য আবশ্যক ছিল। ...প্রায়ই সমাসবদ্ধ শব্দ গঠন করেছেন, গঠন করেছেন নতুন শব্দ। এ ধরনের সমাসবদ্ধ শব্দ ও নতুন শব্দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলা অভিধানে এসব শব্দ সংগৃহীত হওয়ার দাবি রাখে।
‘কল্পনার প্রতিভা’ কী—তা স্পষ্ট করেননি জীবনানন্দ। ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪) সময় থেকেই শিল্পসৃষ্টিতে ইমাজিনেশন বা কল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কান্ট যেমন ইঙ্গিত করেছেন, কল্পনার প্রতিভা হলো যা দৃশ্যমান নয়, তা প্রত্যক্ষ করার এবং একজন শিল্পীর জন্য চিত্রায়নের ক্ষমতা; কবির জন্য ‘বোধ’ সৃষ্টির; তা হতে পারে স্মৃতিসঞ্জাত বা অভিজ্ঞতাপ্রসূত; এমনকি হতে পারে, আলেকজান্ডার বমগার্টেনের (১৭১৪-১৭৬২) ভাষ্যে—অভূতপূর্ব, অর্থাৎ অনদৃষ্ট যা—এমনও হতে পারে কেবল কবিতার মধ্য দিয়েই উপলব্ধ হবে। স্বীয় অভিজ্ঞতার গহন থেকেই উঠে আসে কল্পনালব্ধ বোধ, কবি সে সব ধারণ করেন শব্দপুঞ্জে।
অন্য দিকে প্রতিভা কী, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পল গাইয়ারের (জন্ম: ১৯৪৮) উক্তি স্মরণ করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘...দ্যা জিনিয়াস ইজ প্রেইজড ফর হিজ অর হার ক্যাপাসিটি ফর ইনভেনশন অ্যান্ড অরিজিনালিটি, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ফর দ্য ক্যাপাসিটি ফর কমিউনিকেশন’—এ ব্যাখ্যায় জীবনানন্দর আপত্তি থাকবার কথা নয়। তাহলে—জীবনানন্দর ভাষ্য ব্যাখ্যা করে বলা যেতে পারে—কবি তিনিই, যিনি অনুপলব্ধ অভিজ্ঞতার জন্ম দিতে পারেন এবং পাঠককে নিয়ে যেতে পারেন এই অনুপলব্ধ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
কবির কাজ কবিতা সৃষ্টি করা, কিন্তু কবি ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখে ফেলবেন—বিষয়টি এমন নয়। কেননা জীবনানন্দ বিশ্বাস করেন কবিতা ‘চিন্তার ব্যায়াম’ মাত্র নয়। বস্তুত কবিতার জন্মরহস্য বর্ণনাতীত একটি ঘটনা। কোনো প্রকৃত কবির পক্ষেই এমত প্রতিজ্ঞা যথেষ্ট নয় যে, ‘আজ আমি একটি কবিতা লিখব।’ বরং একজন কবি বলতে পারেন, ‘আমার মাথায় আজ একটি কবিতার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।’ কবিতা লেখার মৌল শর্ত হলো কবির মনে বিশেষ একটি ভাবনা বা চিন্তার স্বয়ম্ভু স্ফুরণ। অনেক কবিই বলেছেন: কবিতা রচনার ক্ষেত্রে প্রথমত একটি পঙ্ক্তি হঠাৎ করে জন্ম নেয়। জীবনানন্দর ভাষ্যে, ‘কবিতা কোন এক বিশেষ মুহূর্তে কবিমনের সততাপ্রসূত অভিজ্ঞতা ও কল্পানপ্রতিভার দৈব সন্তান।’
কবিতার সংজ্ঞার্থে ‘দৈব সন্তান’ কথাটি অপরিহার্য। দৃশ্যত কবিতা মানুষের অধিগম্য শব্দসমষ্টির বিন্যাসমাত্র, কার্যত গভীর সৌন্দর্যানুভূতির উৎস। কবিতা শব্দের সমষ্টি হলেও মানুষের অনুভূতিতে সৃষ্টি করে বিশেষ একটি রস, সঞ্চারিত করে বিশেষ একটি আবেগ, যা মানুষের উপলব্ধিতে জাগিয়ে তুলতে পারে অনন্যসাধারণ আনন্দানুভূতি। কবিতার কল্পনা পাঠকের হৃদয়ে সুপ্ত গূঢ়ৈষার প্রক্ষেপিত রংধনু, যা পাঠে পাঠক অনুভব করে আবিষ্কারের পুলক। কিন্তু কবিতা সবার জন্য নয়, অনেকের জন্যও নয়, কবিতা কেবল তাদেরই জন্য, যারা শব্দের নিরেট কাঠামোতে আবেগ ও চিন্তানুভূতির স্পন্দন পেতে উৎসুক ও সক্ষম; তারাই কবিতার গ্রাহক, কবিতারসিক, কবিতাবোদ্ধা। জীবনানন্দ নিঃসংশয়ে মনে করেন: শ্রেষ্ঠ কবিতা হলেই তা গণমানুষের কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে উঠবে তা নয়; কবিতা যেকোনো মানুষেরই উপলব্ধিতে জাগিয়ে তুলবে আনন্দানুভব তা নয়।
জীবনানন্দর মতে, ‘কবিতা’ ও ‘পদ্য’ অভিন্ন নয়। ‘পদ্য’—যার ভেতর সমাজ-শিক্ষা, লোকশিক্ষা ও মতবাদের অধিষ্ঠানই মুখ্য—কবিতা থেকে পৃথক; পদ্যের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, তা পাঠককে কোনো অনির্বচনীয় আনন্দানুভূতি দিতে পারে না, ‘পাঠক বড়জোর নিম্নস্তরের তৃপ্তি বোধ করতে পারেন।’ সাংবাদিকী ও প্রচারধর্মী রচনার সঙ্গে কবিতার পার্থক্য এই যে প্রথমোক্ত জিনিসগুলোর ভেতর অভিজ্ঞতাবিশোধিত ভাবনা-প্রতিভার মুক্তি, শুদ্ধি ও সংহতি কিছুই নেই; কবিতায় তা আছে।
এরিস্টেফেনিসের নাটকে ইস্কিলাসের প্রশ্ন ছিল:
‘টেল মি দেন, হোয়াট আর দ্য প্রিন্সিপাল মেরিটস
এনটাইটলিং আ পোয়েট টু প্রেইজ অ্যান্ড রিনাউন?’
পাঠক জানেন,ইউরিপিদিসের উত্তর ছিল:
‘দ্য ইমপ্রুভমেন্ট অব মোরালস, দ দ্য প্রগ্রেস অব মাইন্ড
হোয়েন আ পোয়েট, বাই স্কিল অ্যান্ড ইনভেনশন
ক্যান রেন্ডার হিস ভার্চুয়াস অ্যান্ড ওয়াইজ’
জীবনানন্দ দাশ কাব্যের এবম্বিধ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অভিন্নমত পোষণ করেননি আদৌ। বিলেতের কবি শেলিও করেননি। তিনি অকাতরে জানিয়েছেন, ‘ডাইডেকটিক পোয়েট্রি ইজ মাই অ্যাবহোরেন্স।’ একই চিন্তাপ্রবাহে জীবনানন্দর নিষ্করুণ উক্তি:
টি এস এলিয়টের ‘দ্য লাভ সঙ অব আলফ্রেড প্রুফ্রক’ পড়ে যদি তরুণ-তরুণীরা মনে করেন মানবপ্রেমের নব-সংস্কারের বাণী নিয়ে এসেছেন কবি, এসেছেন একজন সমাজ-সংস্কারক—এসো, আমরা আমাদের জীবনে তাঁর প্রেমের সংস্কারকে প্রতিষ্ঠিত করে ক্রমে-ক্রমে ‘হলো ম্যান’ এবং ‘হলো ওম্যান’ হয়ে যাই, তাহলে বুঝতে হবে এলিয়টের ছেঁড়া-ছেঁড়া সৌন্দর্য-কুয়াশাকে ধরতে না পেরে হাড় নিয়ে খটখট করছে তারা।
কবিতা সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশ নানা লেখায় নানামুখী মত জ্ঞাপন করেছেন। কোথাও কবির স্টাইল বা প্রকাশভঙ্গির গুরুত্ব প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করেছেন; কোথাও সৎ ও মহৎ কবিতা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা উচ্চারণ করেছেন, কোথাও–বা কবিতার আধুনিকত্ব নিয়ে আলোকপাত করেছেন। অধিকন্তু কবিতার আলোচনার ক্ষেত্রে সমালোচকের দায়দায়িত্ব নিয়ে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছেন জীবনানন্দ।
সচরাচর জীবনানন্দ তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন সংক্ষেপে, নিরেট পরিসরে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তিনি পাশ্চাত্যের উদাহরণ টেনে তাঁর বক্তব্যকে ঋদ্ধ করেছেন। তুলনামূলক সাহিত্য বিচারে জীবনানন্দর আস্থা ছিল। এক দিকে তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে তুলনা করেছেন; অন্যদিকে তিনি এক কবির সঙ্গে অন্য কবির এবং একজনের মতের সঙ্গে অন্যজনের তুলনা করেছেন। পূর্বসূরি, সতীর্থ এবং পাশ্চাত্যের কবি ও সমালোচকদের বিষয়ে প্রায়ই তিনি সংক্ষেপে যাকে বলে ‘কনক্লুসিভ’ বা সিদ্ধান্তমূলক মত ব্যক্ত করেছেন, যা তাঁর ব্যাপক ও গভীর পঠনপাঠন–সমর্থিত আত্মবিশ্বাসের স্বাক্ষর বহন করে।
কবির কাজ কবিতা সৃষ্টি করা, কিন্তু কবি ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখে ফেলবেন—বিষয়টি এমন নয়। কেননা জীবনানন্দ বিশ্বাস করেন কবিতা ‘চিন্তার ব্যায়াম’ মাত্র নয়। বস্তুত কবিতার জন্মরহস্য বর্ণনাতীত একটি ঘটনা। কোনো প্রকৃত কবির পক্ষেই এমত প্রতিজ্ঞা যথেষ্ট নয় যে, ‘আজ আমি একটি কবিতা লিখব।
কবি, কবিতা ও কবিতাসৃজন—এই তিনটি বিষয় নিয়েই স্বীয় উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন জীবনানন্দ বিভিন্ন রচনায়। জীবনানন্দ সিদ্ধান্ত করেছেন, ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুই রকম উৎসারণ।’
রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘কবি কখনও আকাশের সপ্তর্ষিকে আলিঙ্গন করবার জন্য উৎসাহে উন্মুখ হ’য়ে ওঠেন—পাতালের অন্ধকারে বিষজর্জর হ’য়ে কখনো তিনি ঘুরতে থাকেন’। এ কথা বলা ন্যায্য হবে না যে জীবনানন্দর কবিতাসম্পর্কীয় অভিমত স্বতঃস্পষ্ট। এ কথাও বলার সুযোগ নেই যে তাঁর কবিতাবিষয়ক মন্তব্যগুলো একটি সংহত ধারণার সৃষ্টি করে। করে না সত্য, তবে নিঃসন্দেহে কবিতা সম্পর্কে, কবিতার চারিত্র্য, কাঠামো ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নবতর চিন্তার সূত্র ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ‘অ-কবিতা’ সম্পর্কে সৃষ্টি করে সচেতনতা, যার অভাব ব্যাপক; সম্ভবত কবিতালেখকদের মধ্যেই। আর সে জন্যই তাঁর মন্তব্যগুলো, যদি আদৌ সেগুলো ভাষার জটিলতা ভেদ করে বোধগম্য হয়ে ওঠে, একজন কবিতালেখকের কাছে, সার্থক কবিতা রচনার বিষয়ে সঠিক প্রণোদনার জন্ম দিতে পারে।
৬.
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জীবনানন্দর চাক্ষুষ পরিচয় হয়নি কখনো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ বারবার ঘুরেফিরে এসেছে জীবনানন্দর বিভিন্ন রচনায়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতার সংখ্যা ছয়। প্রতিটিরই শিরোনাম ‘রবীন্দ্রনাথ’। ‘রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক তাঁর একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক স্বরাজ পত্রিকার ২৪ শ্রাবণ, ১৩৫৪ তারিখের স্বরাজ-সাময়িকীতে। একই শিরোনামে আরও একটি প্রবন্ধের হদিস পাওয়া যায়। এ ছাড়া ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’ এবং ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’ স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথকেন্দ্রিক মূল্যবান দুটি রচনা। বিশেষ লক্ষণীয় যে জীবনানন্দর অন্যান্য রচনায়ও প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্র প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান লাভ করেছে।
কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথের অনুসারী ছিলেন না। তবু রবীন্দ্রনাথকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞান করেননি কখনো, প্রতিপক্ষ তো নয়ই। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর ধারণা কখনো নৈর্ব্যক্তিক, কখনো প্রশসংসাসূচক। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন: ‘বৈষ্ণব যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত—আমাদের শ্রেষ্ঠ কবি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ’ (‘কবিতার কথা’, কবিতা, ১৩৪৫, ১৯৩৮)। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’ শীর্ষক সংক্ষিপ্ত অথচ ঋদ্ধ প্রবন্ধে জীবনানন্দ লিখেছেন:
‘...আমরা অনুভব করি রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষা, সাহিত্য, জীবন দর্শন ও সময়ের ভিতর দিয়ে সময়ান্তরের গরিমার দিকে অগ্রসর হবার পথ যে রকম নিরঙ্কুশভাবে গঠন ক’রে গেছেন পৃথিবীর আদিমকালের মহাকবি ও মহাসুধীরাই তা পারতেন ইদানিং বহুযুগ ধরে পৃথিবীর কোনো দেশই এরকম লোকোত্তর পুরুষকে ধারণ করেনি।’
রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে জীবনান্দর ধারণা ও অনুভব ছিল গভীর ও অচঞ্চল। রবীন্দ্রনাথের কীর্তির মহত্ব ও গভীরতা বিষয়ে তাঁর সন্দেহের লেশমাত্র ছিল না। রবীন্দ্রনাথকে তিনি একজন ‘লোকোত্তর কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছ। জীবনানন্দ লিখেছেন:
‘ক্বচিৎ আমরা আবহমান মানব সভ্যতার ও সংস্কৃতির নানারূপ বিশিষ্ট লক্ষণযুক্ত এক একজন কবি মনীষীর সাক্ষাৎ পাই। মানুষের সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দানগুলি এঁরা যেন অবলীলাক্রমে আয়ত্ত ক’রে নিজেদের কল্পনাপ্রতিভার সাহায্যে সে সব জিনিষকে বিশিষ্টভাবে রূপায়িত ক’রে তোলেন—নিজেদের কাব্যে, সাহিত্যে বা জীবনদার্শনিক নানারূপ রচনা ও উক্তির ভিতরে। শুধু তাই নয়, বর্তমান কাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক মানুষের দৃষ্টি জীবনের যে সব রহস্যভেদ করতে পারে নি, কিংবা সভ্য মানুষের বিকাশের পথে যে জীবন দর্শন আয়ত্ত করতে পারে নি, এই সব লোকোত্তর কবি নিজেদের কল্পনা ও অন্তর্দৃষ্টির বলে সেই আগামী ভবিষ্যতের একটা রূপ আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলেন। জর্ম্মান কবি Goethe এই ধরনের মহীয়ান কবি ছিলেন। আমাদের আধুনিক পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথও নিঃসংশয়ে এরকম লোকোত্তর কবি।’
‘কবিতা, তার আলোচনা’ প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের সহজকবিত্ব ছিল, কিন্তু এ স্বভাবধর্মকে রবীন্দ্রনাথ নিবারণ পণ্ডিতের (আজকাল তাঁর নাম শুনছি, তাঁর সমগ্র কবিতা প’ড়ে দেখবার সুযোগ পাই নি) কিংবা গোবিন্দচন্দ্র’র স্তরে ফেলে রাখেন নি পৃথিবীর ও নিজের জীবনের ক্রমিক অভিজ্ঞতায়, কোন অভিজ্ঞতার কী মূল্য সেই চেতনায়, বিজ্ঞান কী দিতে পারছে, পারবে, জ্ঞান কী দিল—এই সব অন্তঃসারের ভিতর দার্শনিকের মতো অতটা সচেতন ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নয়—কান্টের মতো বা মার্কসের মতো নয়—কিন্তু তবুও সহজ কবিগুণকে তিনি সজাগ ও তপঃশক্তিশীল ভাবে শিক্ষিত ও অনুভূতিঘন ও সুপষ্ট ক’রে চলেছিলেন।’
পরিচয় পত্রিকার কার্তিক ১৩৩৮ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদীশ গুপ্তের লঘু-গুরু গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আলোচনার বিস্তারে রবীন্দ্রনাথ কেবল লঘু-গুরুর মধ্যেই আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, সাহিত্যের মান-মর্যাদা নিয়েও দু-চারটি কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
‘সাহিত্যে সম্মানের অধিকার বহির্নির্দিষ্ট শ্রেণী নিয়ে নয়, অন্তর্নিহিত চরিত্র নিয়ে। অর্থাৎ, পৈতে নিয়ে নয়, গুণ নিয়ে। আধুনিক একদল লেখক পণ করেছেন তাঁরা পুরাতনের অনুবৃত্তি করবেন না। কোনোকালেই অনুবৃত্তি করাটা ভালো নয়, এ কথা মানতেই হবে। নরসংহিতাসম্মত ফোঁটা-তিলকটা, আধুনিকতাও গতানুগতিক হয়ে ওঠে। সেটার অনুবৃত্তিও দুর্বলতা। চন্দনের তিলক যখন চলতি ছিল, তখন অধিকাংশ লেখা চন্দনের তিলকধারী হ’য়ে সাহিত্যে মান পেতে চাইত। পঙ্কের তিলকই যদি সাহিত্যসমাজে চলতি হয়ে ওঠে, তা হলে পঙ্কের বাজারও দেখতে দেখতে চড়ে যায়।’
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তিনি পাশ্চাত্যের উদাহরণ টেনে তাঁর বক্তব্যকে ঋদ্ধ করেছেন। তুলনামূলক সাহিত্য বিচারে জীবনানন্দর আস্থা ছিল। এক দিকে তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে তুলনা করেছেন; অন্যদিকে তিনি এক কবির সঙ্গে অন্য কবির এবং একজনের মতের সঙ্গে অন্যজনের তুলনা করেছেন।
সমকালীন আধুনিক কবিদের পক্ষপাতপুষ্ট রবীন্দ্রবিরোধিতা জীবনানন্দ দাশ অনুমোদন করেননি। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য, কেননা এই শ্রেষ্ঠ কবির কাব্যে তাঁর যুগ অপূর্ব মানবীয় পূর্ণতায় প্রতিফলিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন:
‘...রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে সাহায্য ও ইঙ্গিত পেয়ে আজ যে আধুনিক কাব্যের ঈষৎ সূত্রপাত হয়েছে তার পরিণাম—বাংলা সাহিত্যও রবীন্দ্রনাথের ভিত্তি ভেঙ্গে ফেলে কোনো সম্পূর্ণ অভিনব জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে, সাহিত্যের ইতিহাস এরকম অজ্ঞাতকুলশীল জিনিষ নয়। ইংরেজ কবিরা যেমন যুগে যুগে ঘুরে ফিরে সেক্সপীয়রের কেন্দ্রিকতার থেকে সঞ্চারিত হয়ে বৃত্ত রচনা ক’রে ব্যাপ্ত হয়ে চলেছে, আমাদের কবিরাও রবীন্দ্রনাথকে পরিক্রমা ক’রে তাই করবে—এই ধারণা প্রত্যেক যুগসন্ধির মুখে নিতান্তই বিচারসাপেক্ষ ব’লে বোধ হলেও অনেককাল পর্যন্ত—অমূলক বা অসঙ্গত বলে প্রমাণিত হবে না—এই আমার মনে হয়।’
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এমত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল যে তিনি ঐশ্বর্যশালী লোক এবং সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। আবার এ অভিযোগও অভিশ্রুত হয়েছিল যে তিনি আধ্যাত্মিক সত্যে বিশ্বাসী এবং সেই সঙ্গে বুর্জোয়া সভ্যতার প্রতীক। প্রথম অভিযোগের উত্তরে জীবনানন্দ লিখেছিলেন: ‘রবীন্দ্রসাহিত্য এবং কবিজীবন দেশ ও জাতির মেরুদণ্ড গঠন করতে গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধ’রে যেভাবে নিজেকে ক্ষয়িত করেছে, বাংলা ছাড়া অন্য কোন দেশ হলে হয়তো বা তার অপেক্ষাকৃত সুব্যবহার হতো।’ দ্বিতীয় অভিযোগ খণ্ডন করে জীবনানন্দ লিখেছিলেন: ‘কাব্যকে কবি মনের সততাপ্রসূত অভিজ্ঞতা ও কল্পনাপ্রতিভার সম্মান স্বীকার ক’রে নিলে আধ্যাত্মিক সত্যে বিশ্বাস একজন কবির পক্ষে মারাত্মক দোষ নয়। ... রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া সভ্যতার ভিতর লালিত হলেও সেই সভ্যতার প্রধান ও প্রখর সমালোচক যে তিনিই, তা তাঁর জীবন ও পলিটিকস্, তাঁর সমাজসাম্যবাদ ও সাহিত্য দীর্ঘকাল ধ’রে প্রমাণ ক’রে আসছে।’
জীবনানন্দ রবীন্দ্রকাব্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা করেননি। তবে ‘লোকোত্তর রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে তাঁর কিছু আকর্ষণীয় মন্তব্য পাওয়া যায়। জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘...সোনার তরী’তে তার কাব্য শরীরের যে সৌন্দর্য আমরা দেখি তা সাধারণসুলভ ও সরল হ’লেও ইংরেজীতে যাকে বলে glib, মোটেই তা নয়। ক্ষণিকার সুর তখনকার যুগে হয়তো দুরূহ ও নতুন মনে হয়েছিল—আমাদের কাছে তাঁর কাব্যগতির একটা বিশিষ্ট বাঁক বলে মনে হয়। বলাকায় দেখি দুর্ব্বার স্রোত। কারু কারু মতে ... রবীন্দ্রনাথ বলাকার কবিতাগুলোর চেয়ে শ্রেয়োতর কাব্য আর লেখেননি। গীতাঞ্জলি ও গীতালি এবং গানগুলির সূক্ষ্ম রসানুভূতি ও আপাত সহজ রূপায়ণের বৈচিত্রে একদিন পশ্চিম বিমোহিত হয়েছিল ...’।
৭.
কবি জীবনানন্দ দাশের মধ্যে আমরা এক নির্মোহ সাহিত্য সমালোচকের অস্তিত্ব লক্ষ করি। এই সমালোচকের দৃষ্টি ঈগলের মতো তীক্ষ্ম এবং তাঁর পর্যবেক্ষণ অব্যর্থ। অকাতর তিনি তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নিষ্করুণ ভাষায় দ্বিধাহীন চিত্তে ব্যক্ত করেছেন: ‘রবীন্দ্রনাথের অলঙ্কার বহুল গদ্যসাহিত্য পরিশেষে মনের ভিতরে অবসাদের সৃষ্টি করে।’ অস্কার ওয়াইল্ডের বৈঠকি উক্তির ঔজ্জ্বল্য তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। বাকচাতুর্যের পরাকাষ্ঠা এই সব উক্তির প্রসাদগুণ তিনি উপভোগ করেছিলেন। কিন্তু ওয়াইল্ড তাঁর চোখে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একজন হওয়ার অযোগ্য। জীবনানন্দ দাশের মতে, অস্কার ওয়াইল্ড ‘বিচিত্র সাহিত্যিক ধুরন্ধর’, যার শক্তি ছিল কিন্তু প্রতিভা ছিল না। এ ধরনের মন্তব্য পাঠককে ভাবিত করে, দুশ্চিন্তায় নিপতিত করে। কারণ, অস্কার ওয়াইল্ডের শক্তির প্রাচুযের্র বিপরীতে প্রতিভার অনটন সহসা দৃষ্টিগোচর হয় না।
সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের রচনা সম্পর্কে নিজেকে সম্যক অবহিত রাখতেন জীবনানন্দ দাশ। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ এবং সমর সেনের ‘নাগরিক’ পাঠ করে তাঁর মনে হয়েছে: ‘তাঁরা যা লিখেছেন, সবই প্রায় বক্তব্য হিসেবে মনে রাখবার মতন জিনিস। কিন্তু আমার মতে, প্রথমটিতে পাওয়া যাবে স্মরণীয়তর বাণী এবং দ্বিতীয় কবিতার লাইন কটি স্মরণযোগ্য বাক্যের সমষ্টিমাত্র—জীবন-সমালোচক এখানে হয়তো নিরেট সাংবাদিকতার দেয়াল টপকে যেতে পেরেছেন, কিন্তু প্রজ্ঞাদৃষ্টি দিয়ে ভাবপ্রতিভাকে শুদ্ধ ক’রে নিয়ে তেমন কোনও জীবনদর্শন সৃষ্টি করতে পারেন নি, যাকে কবিতা বলতে পারা যায়’। কাজী নজরুল ইসলামের মূল্যায়নক্রমে লিখেছিলেন, ‘মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন: নিভে যাবার আগে বাংলার সময়পর্য্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ-রকম পরিবেশে হয়তো শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মননপ্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা’ ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার, কিন্তু মানোত্তীর্ণ নয়’। নজরুল কাব্যসাধনায় সার্থকতার মাত্রা সম্পর্কে অবহিত থেকেও, তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, কাব্যের মহৎমান এড়িয়ে গেছে।
ওয়াইল্ড তাঁর চোখে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একজন হওয়ার অযোগ্য। জীবনানন্দ দাশের মতে, অস্কার ওয়াইল্ড ‘বিচিত্র সাহিত্যিক ধুরন্ধর’, যার শক্তি ছিল কিন্তু প্রতিভা ছিল না। এ ধরনের মন্তব্য পাঠককে ভাবিত করে। ...কারণ, অস্কার ওয়াইল্ডের শক্তির প্রাচুযের্র বিপরীতে প্রতিভার অনটন সহসা দৃষ্টিগোচর হয় না।
দ্য জার্নাল অব আন্দ্রে জিদ পড়ে জীবনানন্দর মনে হয়েছে, জিদ খুব বেশি কথা লিখে নিজেকে ব্যাহত করেছেন। কৃষ্ণধরের কাব্য অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন এই, ‘লেখকের ঢের কবিতায় অনেকটা ঠিকঠাক শব্দ যোজনার চেয়ে বেশি কিছু স্বাদ পেলাম না’। হেনরি ফিল্ডিং, লরেন্স স্টার্ন, জেন অস্টেন, চার্লস ডিকেন্স, বালজাক, লিও তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি সবারই উপন্যাস ভালোভাবে পড়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। অনুপুঙ্খভাবে পড়েছিলেন গ্যেটে, এমিল জোলা, কিটস, র্যাঁবো, আনাতোল ফ্রান্স, জর্জ স্যান্ড, জয়েস, ডি. এইচ. লরেন্স, এইচ. জি. ওয়েলস, টি. এস. এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, রিলকে, ম্যাথু আর্নল্ড, থমাস হার্ডি, টমাস মান, ফ্রঁসোয়া মোরিয়াক, সার্ত্রে প্রমুখের লেখা।
ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েই জীবনানন্দ বাংলা কথাসাহিত্যিকদের অবদান মূল্যায়ন করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় তিনি ওয়াল্টার স্কট ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান সাহিত্যিকের প্রতিচ্ছায়া অনুধাবন করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রর দিব্যদৃষ্টি ও প্রতিভা তাঁর স্বীকৃতি লাভ করেছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলো জীবনানন্দর চোখে মৌলিক বলে মনে হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে মার্সেল প্রস্ত বা জেমস জয়েসের মতো কেউ নেই, এ রকম অস্পষ্ট খেদোক্তি পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যের সূত্র ধরেই সেসব উদ্ভাবিত। শরৎচন্দ্রপরবর্তী সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর কাছে বিশিষ্ট মনে হয়েছিল। জীবনানন্দ লক্ষ করেছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসকে একটি চক্রাবর্ত থেকে উদ্ধার করেছেন এবং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করেছেন। পথের পাঁচালী পড়ে জীবনানন্দ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তিমত্তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অন্য দিকে তাঁর মনে হয়েছিল বনফুল ‘ভিকটিম অব প্যাশন’। একজায়গায় লিখেছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি একটি ওজনদার উপন্যাস বটে, কিন্তু মহিমার পরিমাপে জেমস জয়েসের ইউলিসিস, তলস্তয়ের ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, টমাস মানের জোসেফ অ্যান্ড হিজ ব্রাদার্স ইত্যাদির সমতলে উত্তীর্ণ নয়।
৮.
জীবনানন্দর শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যা পাঁচ। দুটির কথা আমরা ওপরে উল্লেখ করেছি। অন্য প্রবন্ধগুলো হলো—(ক) ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’ : প্রথম প্রকাশ মাসিক বসুমতী, কার্তিক সংখ্যা, ১৩৫৪, (খ) ‘শিক্ষা-দীক্ষা’ : দেশ, ২১ ভাদ্র, ১৩৫৯ এবং (গ) ‘শিক্ষা–সাহিত্যে ইংরেজি’ ১৩৫২। শেষোক্তটি অসম্পূর্ণ ও খসড়াস্থানীয় বলে প্রতীয়মান হয়।
দেশে শিক্ষাপদ্ধতির গলদ, শিক্ষকদের নানা সমস্যা ও রাষ্ট্রীয় অবমূল্যায়ন, শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি, লেখাপড়ায় ছাত্রদের অনীহা, নোটবইয়ের আতঙ্কজনক প্রসার, ইংরেজি শিক্ষার মান ও প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর চিন্তা ও দুশ্চিন্তার সংহত ছাপ পাওয়া যায় এসব প্রবন্ধে। সে সময় অর্থাৎ ১৩৫৫ কি ১৩৫৯ সালেই শিক্ষাঙ্গনের এই নবোদ্ভূত সমস্যাগুলো কী অপরিসীম গুরুত্ব দিয়ে তিনি ভেবেছেন, তা বিবেচনা করে অবাক হতে হয়। আজ শিক্ষাক্ষেত্রের সার্বত্রিক অধোগতি অতল স্পর্শ করেছে। কিন্তু যে তীব্র বেদনা ও হতাশাবোধ জীবনানন্দর ওই সব প্রবন্ধের নেপথ্যে উচ্চকিত হয়ে আছে, তার শতাংশের অস্তিত্বও আজ কোনো সাহিত্যিক কেন, কোনো সমাজবিদের মধ্যেও পরিলক্ষণীয় বলে মনে হয় না। প্রতীয়মান হয়, আমরা ‘অদ্ভুত আঁধারে’ ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’ প্রবন্ধে বেসরকারি কলেজের মাস্টারদের নিম্নস্তরের বেতন সম্বন্ধে জীবনানন্দ দাশ বলেছেন:
‘ইস্কুলের মাস্টাররা তো নিশ্চয়ই, বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি কলেজের বেশির ভাগ অধ্যাপকেরাই যা মাইনে পায় তাতে মনে হয়, আমাদের দেশের পরিচালকদের কোনো আস্থা ও শ্রদ্ধা নেই শিক্ষা ও শিক্ষকদের ওপর। অনেক বেসরকারী কলেজের শিক্ষকেরা মোটামুটি গভর্নমেন্ট অফিসের লোয়ার ডিভিশনের কেরানীদের মত মাইনে পায় কিংবা তার চেয়েও কম।’
কলেজের শিক্ষকদের অসহায় অবস্থা সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায় একটি চিঠিতে। আনুমানিক ১০-১৮.৬.১৯৫২ তারিখে বেকার জীবনানন্দ শুভার্থী ড. অমলেন্দু বসুকে চিঠিতে লিখেছিলেন: ‘Agra ও Meerut College–এ দরখাস্ত করেছি। Meerut College এ তো ইংরেজির তিনজন Lecturer নেবে। দুটো কলেজেই Junior Lecturer Post মাইনেও খুবই কম। আমাকে ৩০০ টাকা কি দিতে পারবে? অন্ততঃ ২৫০? যে রকম অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে কম মাইনে পেলেও যেতে হবে tuition ইত্যাদি পাওয়া গেলে চ’লে যাবে একরকম।’
জীবনানন্দর এমত দাবি যে শিক্ষকতাই একমাত্র কাজ যা আজকের পৃথিবীর সব রকম কাজের ভেতরে সবচেয়ে অচল ও স্থির-ধীর মনের অভিনিবেশ দাবি করে, তা বিশেষভাবে ভেবে দেখবার বিষয়। তিনি লিখেছেন:
‘শিক্ষকতাই একমাত্র কাজ—আমার মনে হয়, আজকের পৃথিবীর সবরকম কাজের ভেতরে যা সব চেয়ে অচল ও স্থির ধীর মনের অভিনিবেশ দাবী করে জোর ক’রে নয়, নিজের রুচি ও স্বভাবের মর্যাদার এ দাবী সৎ শিক্ষকেরা মিটিয়ে আসছিলেন অনেকদিন।’
বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি কলেজের বেশির ভাগ অধ্যাপকেরাই যা মাইনে পায় তাতে মনে হয়, আমাদের দেশের পরিচালকদের কোনো আস্থা ও শ্রদ্ধা নেই শিক্ষা ও শিক্ষকদের ওপর। অনেক বেসরকারী কলেজের শিক্ষকেরা মোটামুটি গভর্নমেন্ট অফিসের লোয়ার ডিভিশনের কেরানীদের মত মাইনে পায় কিংবা তার চেয়েও কম।শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ
অনেক শিক্ষা কমিশন এবং তাদের বিশদ পরামর্শ সত্ত্বেও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির পরিবর্তে ক্রম–অধোগতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ বলেছেন:
‘দেশের বড় বড় মনীষী বা শিক্ষা কমিশনগুলো (মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও) যাই ভাবুক বা বলুক না কেন, বেসরকারী ও সরকারী শিক্ষা-কর্তাদের ধারণাই আজ পর্যন্ত আমাদের দেশেই ইস্কুল কলেজের শিক্ষায় একমাত্র প্রাধান্য পেয়ে আসছে।’
জীবনানন্দর গুরুত্ববহ পর্যবেক্ষণ হলো:
‘ছাত্রদের বিশেষ ক’রে কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের নানা কারণেই শিক্ষার ওপর অরুচি বেড়ে গেছে। ঠিকভাবে শিক্ষিত হয়ে ওঠবার শক্তিও কমে গেছে হয়তো।’
১৯৫২ সালে জীবনানন্দ এমত মূল্যায়ন করেছিলেন যে আমাদের দেশে শিক্ষার খুব একটা খারাপ যুগ। খুবই খারাপ সময় যে এখন, সেটা অস্বীকার করা চলে না। এই অভিমতের পর চুয়াত্তর বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই মন্তব্য সংশোধনের কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। বস্তুত ইত্যবসরে শিক্ষালাভে তরুণদের অরুচি ও অনীহা গাঢ়তর হয়েছে। জীবনানন্দ অনুমান করেছেন, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা উক্তরূপ অরুচি ও অনীহার অন্যতম কারণ। তিনি মন্তব্য করেছেন:
‘ইস্কুল–কলেজের শিক্ষায় ইংরেজির ব্যবহার একটা কঠিন সমস্যা সৃষ্টি ক’রে এসেছে। ইংরেজি ভাষা শেখার দিকে বেশি মন দিতে হয় ব’লে জ্ঞানের নানা বিভাগের সঙ্গে পরিচয় মাস্টারের বা বাজারের নোট বইয়ের সাহায্যে তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হয়।’
জীবনানন্দ প্রশ্ন করেছেন, ‘বাংলা ভাষা বাঙালী ছেলেরা ইংরেজির চেয়ে খুব বেশি ভালো ক’রে শিখেছে?’ প্রশ্নের উত্তরে নিজেই লিখেছেন: ‘এ দেশের প্রায় শিক্ষিত লোকেরই ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে তেমন কোনো রুচি নেই, চেতনা নেই, খাঁটি আলোচনা করবার শক্তি নেই বাংলা সাহিত্যের তাদের মনের প্রবেশ প্রায় একই রকম।’
শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে সুচিন্তিত ও বিশ্লেষণী অভিমত ব্যক্ত করেছেন জীবনানন্দ দাশ। তবে বাংলা ভাষার পাঠ্যবইয়ের অলভ্যতা বা বাংলা ভাষায় পাঠ্যবই লেখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো থেকে একজন চিন্তাশীল, দেশপ্রাণ মানুষের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৯.
মৃত্যু যেন স্থির হিম চোখে বলিতেছে :
যাহাকে মরণ বলে তার সাথে অন্ধকারে—পরকীয়া প্রেমে
তোমাদের কর্মীরাও প’ড়ে গেছে—তোমাদের মননশীলেরা
আমি সেই মৃত্যু।
জানি আমি দেবতা সে—তবু পলাতক—ক্রূর নয় তবু
কোনও অনিশ্চিত অন্ধকার ভূমিষ্ঠ বাতাস
সঙ্গে ক’রে নিয়ে আসে রজনীতে
নাবিকেরা মধ্যসমুদ্রের জলে সেই ক্ষোভ ভালোবাসে
পরকীয়া প্রণয়ের জন্ম হয়—গভীর বাতাস আসে গাঢ় রজনীতে
খাবার টেবিল থেকে উঠে গিয়ে চ্যুত হয়ে যায় পৃথিবীর বিষয়ীর মন
তারা প্রেম চায়—হয় তো দেহেরে ভালোবাসে—তবুও মৃত্যুরে সব শেষ
প্রিয় অতিথির মত
(মৃত্যু যেন স্থির হিম, ‘সূর্য-অসূর্যলোক’, পৃষ্ঠা: ৭২)
ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে জীবনানন্দ দাশ—এক গভীর চেতনার কবি, আত্মমগ্ন কবি—নির্জনতার কবি—অন্তর্মুখী কবি। তাঁর কবিতালোক এক গাঢ়, স্বপ্নীল নান্দনিক অনুভূতিতে নিবিড়। কিন্তু উপরোক্ত প্রবন্ধগুলো তাঁর পরিপূর্ণ সমাজমনস্কতার অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর। ১৩৫৪ সালে সোনার বাংলা পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত ‘পৃথিবী ও সময়’ প্রবন্ধে। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি নিয়ে জীবনানন্দ দাশের চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় ১৩৫৯ সালে পূর্বাশা পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় মুদ্রিত ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’ প্রবন্ধটিতেও। জীবনানন্দ দাশ লক্ষ করেছিলেন, আমেরিকা ব্রিটেন সোভিয়েত রাশিয়া—পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই জাতীয়তাবাদী, কেউ কেউ ভারতবর্ষের চেয়ে ঢের বেশি। জীবনানন্দ মনে করতেন, অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদে কবলিত হলে সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারণ, ও রকম অবস্থায় যুক্তি ও কল্যাণের হত্যা সর্বাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তখন গ্লোবালাইজেশনের ধারণা মানুষের মনে উঁকি দিয়ে যায়নি, জীবনানন্দ এই সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছিলেন যে ‘গোটা পৃথিবীর হৃদয় মনকে না বদলাতে পারলে কোনো বিচ্ছিন্ন দেশের মন ও কাজের পদ্ধতি বদলানো প্রায় অসাধ্য ব্যাপার’।
১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত হয়ে জীবনানন্দ দাশ ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ নামে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন:
‘পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কিছু কাল থেকে আলোড়ন চলছে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত লোকই বরাবর বাংলা ব্যবহার ক’রে আসছে। শিক্ষিতেরা ইংরেজি জানেন। কিন্তু ইংরেজি যত মহৎই হোক, বিদেশী ভাষা। রাষ্ট্রের ভাষা দেশী হওয়া দরকার। বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের দেশজ ভাষা। এ ভাষার যে স্বরূপ মুখে ও সাহিত্যে পূর্ব বাংলা এত দিন ধ’রে গ’ড়ে তুলেছে তা’ বিশেষভাবে সেখানকার মুসলিমদের মুখে ও মননে গড়া জিনিস। সমস্ত বাংলাদেশ সেসব উপভাষা ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। আজকের চলতি বাংলার বা সাহিত্যের বাংলার সঙ্গে সে ভাষার পার্থক্য রয়েছে বটে, কিন্তু একই ভাষা নানা অঞ্চল—বিভিন্নতায় যে রকম পৃথক, সেটা এত কম যে ইংরেজির মত একটি বিদেশী ভাষা তো দূরের কথা, হিন্দির বা উর্দুর চেয়েও যে কোনো নিরক্ষর বাংলা উপভাষী অনেক সহজে—প্রায় নিজেরই উপভাষার মত সহজে—সাধু ও চলতি বাংলা বলতে পারবে লক্ষ লক্ষ লোক শত শত বৎসর থেকে ব’লেও আসছে। এ রকম অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান তার দেশজ ভাষা ও সাহিত্য ছেড়ে দিয়ে উর্দু গ্রহণ করা সহজ ও স্বাভাবিক মনে করতে পারবে কিনা—কিংবা উর্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকেও পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে লাভ করতে চাইবে ও পারবে কি না—পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা নিয়ে এই সব সমস্যা দেখা দিয়েছে। মীমাংসা এখনো কিছু হয় নি। কোন পথে হবে বলা কঠিন। কাগজে যে সব খবর পাওয়া যায় তা’ কতদূর সঠিক ও সম্পূর্ণ বলতে পারছি না সংবাদ প’ড়ে মনে হয় খুব সম্ভব বেশি সংখ্যক পাকিস্তানিই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্থিত দেখতে চান। এঁদের ইচ্ছা ও চেষ্টা সফল হ’লে পশ্চিম বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের পক্ষেও খুব বড় লাভ।’
পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত লোকই বরাবর বাংলা ব্যবহার ক’রে আসছে। শিক্ষিতেরা ইংরেজি জানেন। কিন্তু ইংরেজি যত মহৎই হোক, বিদেশী ভাষা। রাষ্ট্রের ভাষা দেশী হওয়া দরকার। বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের দেশজ ভাষা। এ ভাষার যে স্বরূপ মুখে ও সাহিত্যে পূর্ব বাংলা এত দিন ধ’রে গ’ড়ে তুলেছে তা’ বিশেষভাবে সেখানকার মুসলিমদের মুখে ও মননে গড়া জিনিস।বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন সফল হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৪৮ সালে কলকাতয় দৈনিক স্বরাজ পত্রিকায় কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার মতদ্বৈততা হয়েছিল। পত্রিকার অন্যতম স্বত্বাধিকারী রমেশ বসু তাঁকে ডেকে নিয়ে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, ‘জার্নালিজম তো জানেন না আপনি। কিছু জানেন না, শোনেন না। আমার কথার ওপর কথা বলবেন না। এটা সাহিত্য না, প্রফেসরি না।’ সে যা–ই ঘটুক, জীবনানন্দ দাশের বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ পাঠ করে সিদ্ধান্ত করা যায় যে সংবাদপত্রে কাজ করার জন্য যে সমাজসচেতনার প্রয়োজন হয়, জীবনানন্দর তা পূর্ণমাত্রায় ছিল। তাঁর একটি রচনায় আমরা পাঠ করেছি, ‘আমাদের দেশে পলিটিকস্ ও সাহিত্য নিয়ে উদ্যম অহরহ চলছে, তাতে প্রমাণিত হয় যে আমরা জীবন্মৃত হয়ে থাকতে চাই না।’ অন্যত্র তাঁর মন্তব্য এমতরূপ যে ‘বাংলার সমাজে অনেক সময়ই বুদ্ধির বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও বড় সাহিত্যের সচলতায় অনেক দিন পর্যন্ত ছেদ পড়েনি। বিশেষ শক্তি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখকেরা এ দেশে যে অনেক কাল ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তা’ খুব বাংলার খাঁটি স্বভাবের সঙ্গে অযুক্ত ঘটনা মাত্র নয়।’
১০.
লক্ষ করলে দেখা যাবে জীবনানন্দের অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধই ফরমায়েশি বা উপলক্ষীয় রচনা। তবু দায়সারা কোনো কিছু তিনি লেখেননি। যা লিখেছেন ,পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দিয়েছেন তাতে। প্রয়োজনে প্রবন্ধকায় দীর্ঘ চিঠি তিনি অক্লেশে লিখেছেন। লেখালেখির ব্যাপারে তাঁর আত্ম-অঙ্গীকার নিরঙ্কুশ ছিল বলেই মনে হয়। অন্যদিকে তাঁর বিবেচনাবোধ শাণিত। কবিতায় আবেগঘন, স্বপ্নচারী ও অতীন্দ্রিয় লোকের অধিবাসী হলেও তাঁর যুক্তিবাদী মনের অভিজ্ঞান প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে পরিলক্ষণীয়। কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধে তাঁর ভাষা যেমন কিছুটা গুরুগম্ভীর ও আনুষ্ঠানিক, অন্যদিকে সমাজবিষয়ক ও অন্যান্য প্রবন্ধে তিনি যথেষ্ট প্রাঞ্জল ও সুবোধ্য। জীবনানন্দ বলেছেন কম কিন্তু যতটুকু বলেছেন তাঁর মধ্যে দ্বিধা ছিল না, কিংবা ছিল না সংশয় বা উপলব্ধির অনিশ্চয়তা। তাঁর অভিমত তিনি যুক্তির দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন, প্রকাশ করেছেন সমালোচনাধীন লেখক বা কবির প্রতি মুখাপেক্ষিতার চিহ্ন না রেখেই। জীবদ্দশায় প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর কতটুকু পরিচিতি বা খ্যাতি হয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই। প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি খুব ক্যাজুয়ালি, অথচ প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আত্মপ্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছেন আগাগোড়া। কবি হিসেবে যেমন তিনি আধুনিক, তেমনি প্রবন্ধকার হিসেবেও সমকালীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কাব্যভাবনা গভীর ও মৌলিক। বিশেষ করে কবিতার গঠন, নির্মাণ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে তাঁর প্রখর প্রবন্ধগুলো বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। আকস্মিক মৃত্যু না হলে তাঁর নিকট থেকে আমরা পেতাম নিজ কবিতার অনর্গল আলোচনা, যার পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ নিয়তি তাঁকে দেয়নি। কিন্তু যতটুকু আমরা পেয়েছি, তাতে তাঁর শাণিত, গভীর, শক্তিশালী প্রাবন্ধিক সত্তার পরিচয় অব্যর্থভাবে ফুটে ওঠে।