শামসুর রাহমানের মানস-ঔরসে গ্রিক পুরাণের পুনর্নির্মাণ
বহু দশক ধরে শামসুর রাহমানের বাংলা কাব্যজগতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণের মধ্যে অন্যতম হলো শাশ্বত বা চিরন্তন বিষয়বস্তুগুলো নিজের কবিতার মধ্যে যুগোপযোগী করে প্রয়োগ করতে পারা। আর সাধারণত যেসব সাহিত্যকর্মে শাশ্বত কিংবা চিরন্তন বিষয়বস্তুগুলো রয়েছে, সেসব সাহিত্যকর্মগুলো হয়ে উঠেছে কালজয়ী। উদাহরণস্বরূপ নাম নেওয়া যেতে পারে দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ কিংবা ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবলে’, কিংবা শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’।
কিন্তু আমরা আলোচনার সুবিধার্থে ‘ডিভাইন কমেডি’র কালজয়ী হয়ে ওঠার পেছনে অন্তত একটি কারণ ব্যাখ্যা করার অভিপ্রায় করছি। এই মহাকাব্যের শুরুতে একটি চমক রয়েছে: রোমান কবি ভার্জিলের উপস্থিতি। পথহারা দান্তে পথের দিশা পায় যখন স্বয়ং ভার্জিল তার পথপ্রদর্শক হয়। সূর্য-মুকুটিত পাহাড়ে আরোহণের সময় তিনটি শ্বাপদ পথ রোধ করে দাঁড়ালে দান্তের সেই অরণ্যে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না, যেখান থেকে সে পথ হারিয়েছে। এই ফিরতি পথে ছায়ার মতো কে যেন অপেক্ষমাণ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দান্তে সেই ছায়া-সত্তাকে সম্বোধন করে:
‘নিচু যাওয়ার লক্ষ্যে যখন ধসে যাই পুরোদমে,
একজন হল আমার চোখের সমুখে অভ্যুদিত;
স্বরে যেন তার দীর্ঘ মৌনে অস্পষ্টতা জমে।
তাকে দেখে সেই মরুতে, সুবিস্তৃত
—আমাতে করুণা ধরবে,—সরবে কই,
—যা-ই হও তুমি, প্রেতচ্ছায়া, বা মানুষ, স্থিরীকৃত।—’ (আলিগিয়েরি ২৭)
দান্তের জন্ম ভার্জিলের তেরো শ বছর পর। সেহেতু একজন এত বুড়ো প্রেতাত্মার এমনটা মনে হতেই পারে যে তাকে হয়তো আর কেউ চিনতে পারবে না। তাই বাবা-মা, স্থান-কাল, সম্রাট-সংবিধান ইত্যাদির নামধাম বর্ণনা করে শুরু করে নিজের পরিচয় দিতে। সময় তো আর কম হলো না। হয়তো এদের কাউকেই কেউ এখন আর মনে রাখেনি। ভার্জিল গেয়ে ওঠে:
“রই কবি, গাই আঙ্কিসেসের ন্যায়ী তনয়ের গান,
ত্রোইয়ার থেকে আসে যে আগন্তুক,
যখন গরবি ইলিয়ন হল বহ্নিতে অবসান”। (আলিগিয়েরি ২৮)
আঙ্কিসেসের পুত্র হলো ইনিয়াস। আর সেই ট্রয় নগরী থেকে ভাগ্যান্বেষণ এসেছিল এক যুবক, যার চোখে ছিল দীপ্তি; আর হাতে ছিল তরবারি। তাহলে কি এই ভার্জিলই সেই ভার্জিল যে কিনা মহাকাব্য ইনিড লিখেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ দান্তে পরক্ষণেই কৌতূহলী হয়ে ওঠে: ‘--ভির্জিল্যো কি সেই তুমি তবে?.../ হে তুমি মহিমা, এবং আলোক, অন্য কবির যত/ দীর্ঘ যত্নে, সুমহান প্রেমে, পাই যেন আয়োজক,/ তোমার গ্রন্থে রাখে যা আমাকে অনুসন্ধানরত (গঙ্গোপাধ্যায় ২৮)।’
অরণ্য মাঝে সাক্ষাৎ হলো মহাকবি ভার্জিলের সাথে উঠতি মহাকবি দান্তের। দান্তে ভুলে যায়নি ভার্জিলকে। অতঃপর পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন ভার্জিল। অনুসরণ করলেন দান্তে। শুরু হলো মিথের পুনর্নির্মাণ। অতীতের হাত ধরে বর্তমানের পদযাত্রা। এই চলমান পদযাত্রাটিই হলো শাশ্বত-চিরন্তন। আর এই শাশ্বত-চিরন্তন পথের দক্ষ পথিকই হলেন শামসুর রাহমান। গ্রিক পুরাণের এই চলমান পদযাত্রা বাংলা সাহিত্যের পলিমাটিতে যার চাষাবাদে বাংলা কবিতার উর্বরতা খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে, তিনিই সেই কবি। তিনিও ভুলে যাননি সাহিত্যের পৌরাণিক ঐতিহ্য; যেমনটা ভুলে যাননি দান্তে।
বাংলা কাব্যজগতের মাটিতে গ্রিক পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে চারা হিসেবে বপন করলে তারা তো আর গ্রিক থাকে না। কিন্তু তারা কি বাঙালিও থাকে? নিশ্চয়ই না। তারা এক জাতিক থাকে না: না গ্রিক; না বাঙালি। না হয় দ্বিজাতিক। তারা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক। দান্তে যখন ভার্জিলের পথ অনুসরণ করে, তখন তা মোটেও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে না। কারণ, তারা একই দেশের এবং একই ভাষার ভিন্ন সময়ের কবি। মোটরগাড়িতে চড়ে দান্তের বাড়ি থেকে ভার্জিলের বাড়ি পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। অপর পক্ষে শামসুর রাহমান গ্রিক পৌরাণিক চরিত্রগুলোর সৃষ্টিকর্তাদের থেকে শুধু হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত নয়; বরং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, দর্শন এমনকি মূল্যবোধও এতটাই ভিন্ন যে তাদেরকে একে অপরের ভূমিতে বপন-রোপণ করা খুবই দুরূহ। তবে এই দুরূহ কাজটি শামসুর রাহমান করে দেখালেন। হোমার থেকে নিয়ে আনলেন ইথাকার অদম্য রাজা অডেসিয়াস ও রাজপুত্র টেলেমেকাসকে। দায়োদোরাস সিকুলাস ও রোমান ওভিদ থেকে নিয়ে এলেন পিতাপুত্র ডেডেলাস ও ইকারুসকে। এস্কিলাস থেকে আনলেন রাজা আগেমমনন এবং রাজকন্যা ইলেক্ট্রাকে। এমনকি ইতিহাস থেকে নিয়ে আনলেন স্বয়ং হোমারকে। বাদ পড়েনি আফ্রোদিতি, একিলিস কিংবা টাইটান।
এখন আমরা দেখব এই আন্তর্জাতিক চরিত্রগুলো কীভাবে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে গ্রিক পুরাণ পুনর্নির্মাণ করে। এই আলোচনা করার জন্য এক জোড়া চরিত্র বেছে নেব: ইকারুস এবং ডেডেলাস। আর কবিতাও নেব এক জোড়া: ‘ইকারুসের আকাশ’ এবং ‘ডেডেলাস’।
‘ইকারুসের আকাশ’ নামক কাব্যগ্রন্থের ‘ইকারুসের আকাশ’ এবং ‘ডেডেলাস’ কবিতাদ্বয় ড্রামাটিক মনোলগের মাধ্যমে এক আদর্শ শ্রোতার সামনে যে সংলাপ সৃষ্টি করেছে, সে সংলাপ এক প্রাচীন এবং প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক মতবাদ সফ্রোসিনিকে শামসুর রাহমান না শুধু খণ্ডন করেছেন বরং পিতা-পুত্র দুই প্রজন্মের হলেও চিন্তাচেতনায় একরৈখিক করে ছেড়েছেন।
অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব সফ্রোসিনি মানুষকে মধ্যম পন্থার যাপিত জীবনে উৎসাহ প্রদান করে। এই গ্রিক শব্দের আক্ষরিক অর্থ সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পরিমিতিবোধ, আত্মসংযম বা সুস্থ-বিবেচনাবোধ ইত্যাদি। স্পর্শ কিংবা স্বাদজাতীয় ইন্দ্রিয়কে লাগাম টেনে ধরার জন্য প্লেটোর সাধক শিষ্য সফ্রোসিনিকে মানবজীবনের সঠিক মাত্রা সহায়ক মনে করেছেন। ইকারুসও যদি এই সুবর্ণ-মধ্যক তত্ত্ব মেনে নিত, তাহলে কি ঘটত তা শামসুর রাহমান ইকারুসের মুখ দিয়ে এভাবে বলিয়েছে:
‘আমি তো বারণ মেনে বিশ্রুত স্থপতি
ধীমান পিতার
পারতাম জলপাই আর বৃষমাংস খেয়ে,
পান করে চামড়ার থলে থেকে উজ্জ্বল মদিরা
এবং নিভৃত কুঞ্জে তরুণীকে আলিঙ্গনে মোহাবিষ্ট করে
ধারালো ক্ষুরের স্পর্শসুখ নিয়ে প্রত্যহ সকালে
সাধারণ মানুষের মতো গোচারণ, শস্যক্ষেত আর
সন্তান লালন করে কাটাতে সময়।
পারতাম সুহৃদের সঙ্গে প্রীতি বিনিময়ে
খুশি হতে, তৃপ্তি পেতে পাতার মর্মরে,
বনদোয়েলের গানে, তামাটে দুপুরে
পদরেখা লাঞ্ছিত জঙ্গলে
নিজেকে নিযুক্ত করে মধু আহরণে।’ (রাহমান ১৭৫)
এই সাধারণ জীবনযাপনের নামই সফ্রোসিনি বা সুবর্ণ-মধ্যক। নেই কোনো রোমাঞ্চকর কিছু। এই জীবনের খপ্পরে পড়েই গড়ে উঠেছে আমাদের এই সমাজ। যদিও অ্যারিস্টটল ইন্দ্রিয়কে কেন্দ্র করে এই তত্ত্ব চালু করতে চেয়েছিলেন, তবু সময়ের স্রোতে এটি পুরো জীবনব্যবস্থার জন্য প্রয়োগ হতে শুরু করে। ধরা যাক সাহস ভালো গুণ। এই সাহস কমে গেলে তাকে বলে কাপুরুষতা। আর সাহস বেড়ে গেলে তা হয়ে যায় বেপরোয়া। সফ্রোসিনি প্রচার করে কাপুরুষ হওয়া যাবে না; আবার বেপরোয়া হওয়া যাবে না। হতে হবে সাহসী। মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
কিন্তু ধরা যাক একটি রাস্তায় একটি ছোট্ট বাচ্চা খেলছে। আর একটি ট্রাক তার দিকে ছুটে আসছে। এই দৃশ্য দেখে একজন পথচারী জীবন বাজি রেখে ট্রাকের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাটির জীবন রক্ষা করল। এখন যদি সুবর্ণ-মধ্যক পন্থা অবলম্বন করা হতো, তাহলে সেই পথচারী অতিমাত্রায় সাহস দেখাত না। অর্থাৎ কখনো কখনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় দুটির মধ্যে যেকোনো একটি। বাইনারি সব সময় ভুল হয় না। এখানে পথচারীটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বাচ্চাটিকে বাঁচাবে কি বাঁচাবে না। সেহেতু অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বাইনারি সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুরন্ত বালক ইকারুস। সে–ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সূর্যের কাছাকাছি উড়ে যাবে কি যাবে না। ইকারুস চলে গেল সূর্যের কাছাকাছি। ফলে মোমের পাখা গলতে শুরু করল। তারার মতো ছুটে পড়ল আকাশ থেকে। আর এখান থেকেই শুরু হলো যত বিপত্তি। শুরু হলো প্রথাগত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। ইকারুসের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা দূরে থাক, শুরু হলো পিতার অবাধ্য পুত্র ইকারুসের ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ। তৈরি করা হলো ‘The higher they climb, the harder they fall’ কিংবা ‘The sky-high ambition falls in damnation’–এর মতো প্রবাদ। আর এই জাতীয় সার উদ্যাপন করে ছাড়ল অনুর্বর মস্তিষ্কের বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধ মস্তিষ্কের সমাজপতিরা। আর পথভ্রষ্ট অধ্যাপকেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ডক্টর ফস্টাস, ম্যাকবেথ, রাজা লিয়ারের মতো সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলোকে সফ্রোসুনির লেন্সে ব্যাখ্যা করে চললেন।
সাহিত্যের কল্পিত চরিত্রগুলো পর্যন্ত এই ব্যাখ্যাটা খানিকটা মেনে নেওয়া গেলেও বাস্তব জীবনে মেনে নেওয়া বেশ অস্বস্তিকর। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে আছে। কথায় কথায় উচ্ছন্নে যাওয়া যুবকদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাইকেল মধুসূদনের শেষ জীবন পরিণতিকে বারবার টেনে আনা হয়েছে উদাহরণস্বরূপ। এর থেকে নিম্নমানের উদাহরণ বাংলা সাহিত্য আর দ্বিতীয়টি তৈরি করেনি। সেই দিন যদি কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সাগরদাঁড়ির সেই যুবকটি সুবর্ণ-মধ্যক পন্থার অনুসারী হতেন, তাহলে তিনি আর যা–ই হোক মাইকেল মধুসূদন দত্ত হতেন না। বোদলেয়ারের বোদলেয়ার হতেন না। কাজী নজরুল কাজী নজরুল হয়ে উঠতেন না। ইসাডোরা ডানকান ইসাডোরা ডানকান হয়ে উঠতেন না।
অ্যারিস্টটল তো স্বাদ-স্পর্শ জাতীয় ইন্দ্রিয়কে লাগাম টেনে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ যদি অমরত্বের স্বাদ পাবার ইচ্ছা করে, কার সাধ্য আছে তাকে আটকানোর। কেউ যদি সূর্যকে স্পর্শ করে অমর হতে চায়, কার সাধ্য আছে তাকে দমানোর। যে আটকে যাবে কিংবা দমে যাবে, সে তো ইকারুস নয়। যদিও বারবার করে তাকে নিষেধ করা হয়েছে। শামসুর রাহমানের ইকারুস বলেছে:
গোড়াতেই নিষেধের তর্জনী উদ্যত ছিলো, ছিলে
সুপ্রাচীন শকুনের কর্কশ আওয়াজে
নিশ্চিত মুদ্রিত
আমার নিজস্ব পরিণাম। (রাহমান ১৭৫)
ইকারুস তর্জনীর দিকে ইঙ্গিত ছুড়ে দিল শুরুতেই। এই তর্জনীর অর্থ কী? আর এই তর্জনী কার হাতের তর্জনী? কাউকে যখন শাসানো হয়, তখন তর্জনী আপনি আপনি উঠে যায়। সে হিসেবে তর্জনীর সরলার্থ নিষেধ করা। আর মিথ অনুসারে এই নিষেধ ইকারুসের পিতা ডেডেলাসের হওয়ার কথা। যদিও এখানে নিশ্চিত করে বলা কঠিন শামসুর রাহমান কার মিথ অনুসরণ করেছেন: এথেন্সের এপোলোদোরাস, দায়োদোরাস সিকুলাস নাকি রোমান ওভিদ। তবু খানিকটা যাচাই করা যেতে পারে। ডেডেলাসের মিথ শুরু করতে গিয়ে এডিথ হ্যামিল্টন বলছেন:
‘ওভিদ এবং এপোলোদোরাস উভয়েই এই কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন। এপোলোদোরাস সম্ভবত ওভিদের এক শ বছরেরও বেশি পরে জীবিত ছিলেন। তিনি বেশ সাধারণ মানের লেখক। আর ওভিদ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমি এপোলোদোরাসের বর্ণনাই অনুসরণ করেছি। কারণ, ওভিদের বর্ণনায় তাঁর লেখকসত্তার সবচেয়ে দুর্বল দিকটি প্রকাশ পেয়েছে: অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা ও বিস্ময়সূচক উচ্ছ্বাস।’ (হ্যামিল্টন ১৯২)
হ্যামিল্টন সাহেব ওভিদকে খারিজ করার জন্য একটি অহেতুক খোঁড়া যুক্তি দিলেন। কারণ ওভিদের লেখকসত্তাই হলো কবিসত্তা। অপরপক্ষে এথেন্সের এপোলোদোরাস একজন ঐতিহাসিক। সেহেতু দুইজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে যোজন যোজন ফারাক থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া ‘আবেগপ্রবণতা ও বিস্ময়সূচক উচ্ছ্বাস’ই তো কবিতার অন্যতম হাতিয়ার। কেউ যদি জীবনানন্দের ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ পড়ে বলে এটি অতিরঞ্জনে ভরপুর বলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এমনটা হলে খুব হাস্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কারণ কাব্য-সত্যতা সম্পূর্ণরূপে ইতিহাস-সত্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন। হ্যামিল্টন আরেকটি অমার্জনীয় ভুল করেছেন। তিনি মিথের মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যতা খোঁজার প্রয়াস করেছেন।
আরেকজন রয়েছেন দায়োদোরাস সিকুলাস। সিসিলিভিত্তিক গ্রিক ঐতিহাসিক। তিনি ইকারুসের মোমের পাখায় উড়ে যাওয়ার মতো অলৌকিক ঘটনাটাই খারিজ করে দিয়েছেন। কিন্তু শামসুর রাহমানের কবি হিসেবে ওভিদের কাব্যিক বয়ানের ওপরই নিজের মঞ্চ তৈরি করেছেন। ফলে ডেডেলাস পুত্র ইকারুস মোমের তৈরি পাখার ওপর ভর করে সূর্যের কাছাকাছি চলে যাবে, মোম গলবে এবং শূন্য থেকে ছুটে পড়বে: এই বয়ানটির ওপর খুঁটি করেই শামসুর রাহমানের কবিতা দুটি দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথম কবিতাটিতে ইকারুস একজন থ্যানাটোলজিক্যাল ন্যারেটর অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির বয়ান। আর দ্বিতীয় কবিতাটিতে জীবন্মৃত পিতা ডেডেলাসের বয়ান। মৃত ইকারুসের থেকে জীবিত ডেডেলাসের সংকট অনেক বেশি। কারণ, সে বেঁচে আছে। আর বেঁচে আছে বলেই তার রয়েছে দ্বৈত ভূমিকা: প্রথমটি পিতা হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি শিল্পী হিসেবে। এই একই ব্যক্তির দুই সত্তার দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্যারাডক্স বা কূটাভাসিক পরিস্থিতি। কবিতায় যখন ডেডেলাস বলে ‘না, আমি বিলাপ করবো না তার জন্যে, স্মৃতি যার/ মোমের মতন গলে আমার সত্তায়, চেতনায় (রাহমান ১৮৬)” তখন কবিতা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। এই সংকট হল এক শোকবিহ্বল পিতা এবং একজন সফল শিল্পীর। একজন শিল্পী কিংবা যে কোনো সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব আবেগকে শরীর ও মনের ওপর ভারী হতে না দিয়ে তাকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করবে। এই জায়গাতেই একজন শিল্পী চরম নিষ্ঠুর।
এই নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য জাপানের সাহিত্যিক রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার শরণাপন্ন হচ্ছি। তার ‘নরক-চিত্র’ নামক গল্পের প্রধান চরিত্র ইয়োশিহিদ, একজন জাপানের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী। বিভিন্ন শিল্পকর্মের জন্য লর্ড হোরিকাওয়ার মাঝেমধ্যেই তাকে নিয়োগ দেয়। অন্দরমহলে কানাঘুষা আছে চাকরি দেওয়ার নামে ইয়োশিহিদের মেয়েকেও লর্ড হোরিকাওয়া রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছে। লর্ড একদিন ইয়োশিহিদকে এক বিশাল পর্দায় নরকের চিত্র আঁকার নির্দেশ দেয়। কিন্তু মুশকিল হলো ইয়োশিহিদ সেটুকুই আঁকতে পারে, যতটুকু সে দেখেছে। ইতিমধ্যে এই নরকের চিত্র আঁকার জন্য সে তার শিষ্যদের ওপর নারকীয় অত্যাচার চালিয়ে ফেলেছে। এখন শুধু শেষ দৃশ্যটা আঁকার জন্য সে লর্ড হোরিকাওয়াকে অনুরোধ করে যেন একটি তরুণীকে জ্বলন্ত পুড়িয়ে মারতে হবে। হোরিকাওয়া সম্মতি জ্ঞাপন করে। একটি রথের ভেতর পুড়িয়ে মারা হয় এক তরুণীকে। ভাগ্যের পরিহাস! সে তরুণী আর কেউ নয়; ইয়োশিহিদের সেই মেয়ে। নিজের মেয়েকে পুড়তে দেখে সে একই সঙ্গে কষ্ট ও আনন্দ পেতে থাকে। এটিই হলো সেই প্যারাডক্স, যেটির দেখা পেয়েছে ডেডেলাস। শামসুর রাহমানের কবিতায় ডেডেলাস বলে:
পিতা আমি, তাই সন্তানের আসন্ন বিলয় জেনে
শোকবিদ্ধ, অগ্নিদগ্ধ পাখির মতন দিশাহারা;
শিল্পী আমি, তাই তরুণের সাহসের ভস্ম আজ
মৃত্যুঞ্জয় নান্দনিক সঞ্চয় আমার। (রাহমান ১৮৭)
ডেডেলাস একই সঙ্গে দ্বৈত ভূমিকায় অবতীর্ণ এই কবিতায়। প্রথমটি হলো পিতা হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি শিল্পী হিসেবে। পিতা হিসেবে সে ইকারুসের জন্য বিলাপ করে। কিন্তু শিল্পী হিসেবে সে বুঝতে পারে ইকারুস মৃত্যুর পরেই হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়। তাই সে তার এই বলিদানকে উদ্যাপন করে।
তাহলে আমরা দেখতে পাই শামসুর রাহমানের মানস-ঔরসে একজোড়া গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র কীভাবে সংলাপধর্মী হয়ে উঠেছে। মৃত ইকারুস কীভাবে থ্যানাটোলজিক্যাল ন্যারেটর হিসেবে জানান দেয় অ্যারিস্টটলের সুবর্ণ-মধ্যক জীবনের মায়াজাল ছিঁড়ে বের হওয়ার গল্প। শোকবিহ্বল ডেডেলাস কীভাবে মৃত্যুঞ্জয় পুত্রের শোককে উদ্যাপন করে। গ্রিক পুরাণের এই পুনর্নির্মাণটুকু সম্পূর্ণ শামসুর রাহমানের নিজের।
সহায়ক গ্রন্থ
অ্যারিস্টটল. দ্য নিকোমেকিয়ান এথিকস অব অ্যারিস্টটল, অনুবাদে ডি পি চেস, দ্য টেম্পল প্রেস, ১৯১১
রাহমান, শামসুর. শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, অষ্টম সংস্করণ., মফিদুল হক, সাহিত্যপ্রকাশ, ২০০৯
আলিগিয়েরি, দান্তে, দিব্যাভিসার, অনুবাদে শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, দ্বিতীয় সংস্করণ., নতুন দিল্লি, সাহিত্য আকাদেমি, ২০১৭
হ্যামিল্টন, এডিথ, মিথলজি, প্রথম সংস্করণ, ব্যাক বে বুকস, ১৯৯৮
আজাদ, হুমায়ুন, শামসুর রাহমান/ নিঃসঙ্গ শেরপা, দ্বিতীয় সংস্করণ., আগামী প্রকাশনী, ২০০৮
সায়ীদ, আব্দুল্লাহ আবু, সম্পাদক, বিশ্বসাহিত্যের সেরা বড় গল্প, অনুবাদে মুস্তাফিজুর রহমান, খণ্ড, প্রথম, ঢাকা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, আহমাদ মাযহার ১৯৮৯