প্রকাশের শতবর্ষ
‘পথের দাবী’: কতটুকু বিপ্লবী, কতটুকু অহিংস
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী উপন্যাসে বিপ্লববাদী আন্দোলনের প্রসঙ্গ থাকায় প্রকাশের পরপরই এটি বাজেয়াপ্ত হয়। তবে উপন্যাসে অহিংস আন্দোলনের প্রতি লেখকের সমর্থনও দেখা যায়। শরৎচন্দ্র কি উপন্যাসে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশ করতে চেয়েছেন, নাকি সে সময়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শ তুলে ধরতে চেয়েছেন—পথের দাবী প্রকাশের শতবর্ষ উপলক্ষে এ লেখায় সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয়েছে। লিখেছেন তারিক মনজুর
ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় বিশ শতকের শুরুতে বিপ্লবী ও অহিংস—এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবের পর সূচনা হয় স্বদেশি আন্দোলনের। সেখানেও ছিল দুটি ধারা—রাজনৈতিক চরমপন্থা ও দেশগঠনের প্রচেষ্টা। বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদ’, মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ, কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শ দেশের মানুষকে স্বাধীনতা–আকাঙ্ক্ষী করে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেসব চিন্তা ও আদর্শ সম্পর্কে যে পরিষ্কার ধারণা রাখতেন, পথের দাবী উপন্যাস তার সাক্ষ্য বহন করে।
পথের দাবী ১৯২৬ সালের আগস্টে বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর আগে বঙ্গবাণী মাসিকপত্রে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন-চৈত্র সংখ্যা থেকে অনিয়মিতভাবে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ পর্যন্ত এটি প্রকাশিত হয়। বাজেয়াপ্ত ঘোষণায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মর্মাহত হন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গিয়ে ধরেন, ‘আপনি যদি একটা প্রতিবাদ করেন তো কাজ হয়; পৃথিবীর লোক জানতে পারে যে গভর্নমেন্ট সাহিত্যের প্রতি কী রকম অবিচার করছে!’
রবীন্দ্রজীবনী রচয়িতা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় শরৎচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের এই সাক্ষাৎকারের স্বীকৃতি দিচ্ছেন; কিন্তু সেটি ঠিক কেমন ছিল, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। বোধ হয় এই আলাপের পরেই রবীন্দ্রনাথ পথের দাবী প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্রকে একটি পত্র লেখেন। পত্রের বক্তব্য এ রকম—লেখকেরা উত্তেজক গ্রন্থ লিখবেন, অথচ সেই সঙ্গে তাঁরা এই আশাও করবেন যে ইংরেজ-সরকার তাঁদের শাস্তি দেবে না, এ রকম মনোভাব ঠিক নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে, লেখকের কর্তব্যের হিসাবে সেটা দোষের না হতে পারে—কেননা, লেখক কোনো শাসনকে গর্হিত মনে করলে সেই বিষয়ে চুপ থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করা চাই। তিনি আরও বলেন, সব দেশেই শাস্তি স্বীকার করেই কলম চালাতে হচ্ছে, যেকোনো দেশেই রাজশক্তিতে-প্রজাশক্তিতে সত্যিকার বিরোধ ঘটেছে—রাজ-বিরুদ্ধতা আরামে নিরাপদে থাকতে পারে না, এই কথা নিশ্চিতভাবে জেনেই চলেছে।
তিরিশের দশকের রাজনৈতিক চিন্তার নানা স্রোতের সঙ্গে, বিপ্লবীদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তিনি অনেক দিন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন, প্রায় নিয়মিতই খদ্দর পরতেন এবং একটি রিভলভার বহুদিন তাঁর কাছে ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, শরৎচন্দ্র নিছক কল্পনা থেকে পথের দাবী লেখেননি। কংগ্রেসের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক।
শরৎচন্দ্রকে লেখা রবীন্দ্রনাথের মূল চিঠি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রসদনে আছে। এই পত্রে শরৎচন্দ্র বিশেষ খুশি হতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সমালোচকদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যকে কবির ‘ইংরেজপ্রীতি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা যে পুরোপুরি ঠিক নয়, সেটা শরৎবাবুকে লেখার কয়েক দিন আগে দৈনিক ফরোয়ার্ড-এ প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের একটা ‘খোলাচিঠি’ থেকে প্রমাণ করা যায়। ইংরেজ সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ সেখানে বলেছিলেন, ‘শারীরিক বলে দুর্বলদের ওপর যে শাসকগোষ্ঠীর শাসন করার দুর্ভাগ্য ঘটেছে, তাদের মন দিনে দিনে দুর্নীতির গভীর অতলে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে।...আমাদের একমাত্র দাবি মানবতার দাবি; তা যদি অগ্রাহ্য হয়, তবে তা তাদেরই গোপনে আঘাত করবে।’
প্রকাশের পরপরই পথের দাবী অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায়। কেনো কোনো সূত্র বলে, এই বইয়ের পাঁচ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল; আর তা ফুরিয়ে যেতে সাত দিনও লাগেনি। তিন টাকা দামের বই দোকানদারেরা ১০ টাকাতে বিক্রি করেছেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পর উপন্যাসটির কপি না থাকার দরুন অনেকে হাতে লিখেও নকল করে নিয়েছিলেন। গোপন সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনকে ঘিরে তখন রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। কারও কারও মতে, বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রের মডেল।
তিরিশের দশকের রাজনৈতিক চিন্তার নানা স্রোতের সঙ্গে, বিপ্লবীদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তিনি অনেক দিন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন, প্রায় নিয়মিতই খদ্দর পরতেন এবং একটি রিভলভার বহুদিন তাঁর কাছে ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, শরৎচন্দ্র নিছক কল্পনা থেকে পথের দাবী লেখেননি। কংগ্রেসের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক। দেশবন্ধুকে তিনি কী চোখে দেখতেন তার পরিচয় আছে চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর লেখা ‘স্মৃতিকথা’ প্রবন্ধে, যা মাসিক বসুমতীর ১৩৩২ আষাঢ় দেশবন্ধু স্মৃতিসংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং পরে স্বদেশ ও সাহিত্য গ্রন্থে সংকলিত হয়।
শিল্পের দাবি আর রাজনীতির চাহিদা—এ দুইয়ের সামঞ্জস্য করা সহজ নয়। পথের দাবী সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রটি ‘অস্বাভাবিকভাবে’ গড়ে উঠেছে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিযোগ করেন, উপন্যাসের মূলধন হিসেবে ‘ইংরেজ-বিদ্বেষের ব্যবহার’ হয়েছে।
রক্তাক্ত বিপ্লবের পথেই স্বাধীনতা আসবে—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পথের দাবী উপন্যাসে এমনটি সব্যসাচীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। আবার ১৯২৯ সালে রংপুরের এক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে প্রায় একই রকম কথা তিনি বলেছিলেন। তবে জীবনের বৃহত্তর প্রয়োজন ও আদর্শ সম্পর্কেও শরৎচন্দ্র ওয়াকিবহাল ছিলেন। ১৯২৪ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শের প্রকাশ হিসেবে এই ভাষণ এবং পথের দাবী উপন্যাসটিকে বিবেচনায় নেওয়া যায়।
ভাষণে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা শুধু একটা নামমাত্র নয়। দাতার দক্ষিণ হস্তের দানে একে ভিক্ষার মতো পাওয়া যায় না—এর জন্য মূল্য দিতে হয়। ...কিন্তু একটা কথা তোমরা ভুলো না যে কখনো কোনো দেশেই শুধু বিপ্লবের জন্যই বিপ্লব আনা যায় না। অর্থহীন অকারণ বিপ্লবের চেষ্টায় কেবল রক্তপাতই ঘটে, আর কোনো ফল লাভ হয় না।’ আবার উপন্যাসে ভারতীকে সব্যসাচী বলছে, ‘স্বাধীনতা ছাড়া আমার নিজের আর দ্বিতীয় লক্ষ্য নেই, কিন্তু মানবজীবনে এর চেয়ে বৃহত্তর কাম্য আর নেই—এমন ভুলও আমার কোনো দিন হয়নি। স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ কথা নয়। ধর্ম, শান্তি, কাব্য, আনন্দ—এরা আরও বড়। এদের একান্ত বিকাশের জন্যই তো স্বাধীনতা, নইলে এর মূল্য ছিল কোথা?’
শিল্পের দাবি আর রাজনীতির চাহিদা—এ দুইয়ের সামঞ্জস্য করা সহজ নয়। পথের দাবী সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রটি ‘অস্বাভাবিকভাবে’ গড়ে উঠেছে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিযোগ করেন, উপন্যাসের মূলধন হিসেবে ‘ইংরেজ-বিদ্বেষের ব্যবহার’ হয়েছে। সব্যসাচীর কর্মকাণ্ড রোমাঞ্চকর, তাতে সন্দেহ নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত তার কর্মক্ষেত্র। ভারতীর কাছে সব্যসাচী তার ভবিষ্যৎ কর্মসূচির আভাসমাত্র দিয়েছে। তা থেকে জানা যায়, সব্যসাচী বর্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে হাঁটাপথে দক্ষিণ চীনের ক্যানটনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাবে, উত্তর ও পূর্বের দেশগুলোর বিপ্লবকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করবে। সব্যসাচী বলে, ক্যানটনের এক গুপ্ত সভায় ১৯১০ সালে সুন-ইয়াৎ-সেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। এই বিবরণ পাঠকের রোমান্সজাত কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে। আবার শাসক ইংরেজের প্রতি সব্যসাচীর বিদ্বেষের সীমা নেই। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সে ভারতীকে বলে, ‘আমার দেশ গেছে বলেই আমি এদের শত্রু নই। একদিন মুসলমানের হাতেও এ দেশ গিয়েছিল। কিন্তু সমস্ত মনুষ্যত্বের এত বড় পরম শত্রু জগতে আর নেই। স্বার্থের দায়ে ধীরে ধীরে মানুষকে অমানুষ করে তোলাই এদের মজ্জাগত সংস্কার।’
অপূর্ব-ভারতী প্রেম প্রসঙ্গের এখানে ইতি টেনে শরৎচন্দ্র তাঁর পাঠকসমাজকে হতাশ করতে পারতেন। কিন্তু অপূর্ব বর্মা থেকে আবার ফিরে আসে ভারতীর কাছে। অনুতপ্ত অপূর্ব জানায়, সে দেশের কাজে দশের কাজে আত্মনিয়োগ করবে। সব্যসাচী এটা শুনে বলে, ‘সাধু প্রস্তাব।’ লেখক যদি ‘সন্ত্রাসবাদ’কেই একমাত্র সমাধান মনে করতেন, তবে সব্যসাচীর মুখ দিয়ে এমনটি বলাতেন না। অপূর্ব-ভারতীর মিলনের অপেক্ষা হয়তো সব্যসাচীও করছিল; কিংবা লেখক শরৎচন্দ্র উপন্যাসের সমাপ্তির প্রয়োজনে নিজেই করছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের পত্রের জবাবে শরৎচন্দ্র চার-পাঁচ দিন পর একটি চিঠি লেখেন, যদিও তিনি ‘বন্ধুদের অনুরোধে’ সেটি আর পাঠাননি। সেই চিঠিতে শরৎচন্দ্র বলেন, ‘গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি, এবং তৎসত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয়, তো করতেই হবে—তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি। কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়? প্রতিবাদেরও দণ্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ হওয়া আবশ্যক।... আমার প্রশ্ন, ইংরাজ-রাজশক্তির এ বই বাজেয়াপ্ত করার জাস্টিফিকেশন যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে প্রোটেস্ট করার জাস্টিফিকেশনও তেমনি আছে।’
কিন্তু বিপ্লব কাদের জন্য? অধিকারহারা মানুষের জন্যই তো। ‘সাহিত্যের আর্ট ও দুর্নীতি’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, ‘এই অভিশপ্ত, অশেষ দুঃখের দেশে নিজের অভিমান বিসর্জন দিয়ে রুশ সাহিত্যের মতো যেদিন সে আরও সমাজের নিচের স্তরে নেমে গিয়ে তাদের সুখ, দুঃখ, বেদনার মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে, সেদিন এই সাহিত্যসাধনা কেবল স্বদেশে নয়, বিশ্বসাহিত্যেও আপনার স্থান করে নিতে পারবে।’ পথের দাবীতেও নিচুতলার মানুষের প্রতি সমবেদনা আছে। কারখানার মালিক ইংরেজের শোষণের নগ্ন রূপ লেখক দেখিয়েছেন পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে। এই পরিচ্ছেদে বাঙালি, বিহারি, ওড়িয়া, মাদ্রাজি পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের নরকতুল্য জীবনের ছবি পাওয়া যায়। পরের দুই অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন অসংঘবদ্ধ শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যর্থতা। ফয়ার মাঠের জনসভায় উপস্থিত বিশাল জনতাকে হটিয়ে দিতে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাউন্টেড পুলিশের লাঠিপেটাই
যথেষ্ট ছিল।
শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মতো এখানেও নারীর প্রেম গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। নারীর ভালোবাসা বিচার-বিবেচনা মানে না, ভালোবাসার বদলে অপমান পেয়েও সে ভালোবেসে যায়—এই হলো শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের ভালোবাসার ধরন। অপূর্ব চাকরি করতে বর্মায় গিয়েছিল। মাঝখানে কদিনের জন্য ভারতীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অপূর্ব নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ছেলে; তার দেশ আছে, সমাজ আছে, আত্মীয়স্বজন-বাড়িঘর আছে। আর ‘অস্পৃশ্য’ খ্রিষ্টানের মেয়ে ভারতী; তার দেশ নেই, ঘর নেই, মা-বাবা নেই, আপনার বলতে কেউ নেই। অপূর্বর সঙ্গে পরিচয়টুকুর মধ্যেই যদি সব শেষ হয়ে যায়, তাতে কষ্ট পাওয়ার কী আছে—এটা ভেবে ভারতী নিজের মনকে প্রবোধ দিতে চেয়েছে; কিন্তু তার মন মানতে চায় না, দুই চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে।
অপূর্ব-ভারতী প্রেম প্রসঙ্গের এখানে ইতি টেনে শরৎচন্দ্র তাঁর পাঠকসমাজকে হতাশ করতে পারতেন। কিন্তু অপূর্ব বর্মা থেকে আবার ফিরে আসে ভারতীর কাছে। অনুতপ্ত অপূর্ব জানায়, সে দেশের কাজে দশের কাজে আত্মনিয়োগ করবে। সব্যসাচী এটা শুনে বলে, ‘সাধু প্রস্তাব।’ লেখক যদি ‘সন্ত্রাসবাদ’কেই একমাত্র সমাধান মনে করতেন, তবে সব্যসাচীর মুখ দিয়ে এমনটি বলাতেন না। অপূর্ব-ভারতীর মিলনের অপেক্ষা হয়তো সব্যসাচীও করছিল; কিংবা লেখক শরৎচন্দ্র উপন্যাসের সমাপ্তির প্রয়োজনে নিজেই করছিলেন। কারণ, তার পরপরই দুর্যোগের রাতে সব্যসাচী নিরুদ্দেশের পথে চলে যায়—বিপ্লবকে অসম্পূর্ণ রেখেই, তবে সম্ভাবনাকে মেরে ফেলে নয়।
এটি রাজনৈতিক উপন্যাস; এখানে বিপ্লবী ও অহিংস দুই ধারার রাজনৈতিক চিন্তাই জায়গা পেয়েছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যতটা না নিজের বক্তব্য যুক্ত করতে চেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শই তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা হয়তো ইংরেজ সরকারকেই ভীত করে তোলে।
ভারতী বরাবরই সব্যসাচীর সহিংস বিপ্লবের বিরোধিতা করেছে। ভারতীর মধ্যে গান্ধীবাদী অহিংস আদর্শের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সব্যসাচীর সঙ্গে ভারতীর মূল বিতর্ক স্বাধীনতা নিয়ে নয়, বরং স্বাধীনতা লাভের উপায় নিয়ে। অবশ্য শ্রমিক আন্দোলনের বিষয়েও মতের ভিন্নতা রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রেই ভারতী হিংসা ও সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারে না। তার প্রশ্ন—‘রক্তপাতের জবাবে যদি রক্তপাতই হয়, তাহলে তারও তো জবাব রক্তপাত। এবং তারও তো জবাবে এই একই রক্তপাত ছাড়া আর কিছু মেলে না। এ প্রশ্নোত্তর সেই আদিম কাল থেকে হয়ে আসচে। তবে কি মানবের সভ্যতা এর চেয়ে বড় উত্তর কোনো দিন দিতে পারবে না?’
পথের দাবী উপন্যাসের শেষেও দেখা যায়, ভারতী তার অহিংসা, শান্তি আর ধর্মের মন্ত্র নিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে, সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছে। সে অপূর্বর মতোই দরিদ্র মানুষের সেবা করবে। আর সব্যসাচী তার বিপ্লবের পথেই থাকে। তবে উপন্যাসের শেষে সব্যসাচীর বিপ্লবী সংগঠনে ভাঙন দেখা যায়। কর্মীরা হতাশ, সুমিত্রার মতো অনেকেই দল ছেড়ে চলে যায়, ব্রজেশ্বর চলে আসে বর্মা থেকে, অন্য একটি গুপ্ত সমিতি পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। এগুলো ব্রজেশ্বরেরই বিশ্বাসঘাতকতার ফল বলে সব্যসাচী ধারণা করে; কিন্তু তাতে সে উদ্যম হারায় না, নতুন উৎসাহে নিজেকে প্রস্তুত করে। সব্যসাচী বিশ্বাস করে, পরাজয়টাই সত্য নয়—‘বুক জুড়ে যে বিষ উপচে উছলে উঠছে’, সে শক্তিই সত্য। এটা শরৎচন্দ্রের নিজেরও মনোভাব।
পথের দাবী উপন্যাসটি মাসিকপত্রে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, প্রকাশকেরা বই আকারে ছাপার আগে তার কিছু অংশ বাদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লেখক তাতে বাদ সাধেন। ফলে প্রকাশক বা প্রেসমালিক খুঁজে পেতেও শরৎচন্দ্রকে বেগ পেতে হয়েছে। এটি রাজনৈতিক উপন্যাস; এখানে বিপ্লবী ও অহিংস দুই ধারার রাজনৈতিক চিন্তাই জায়গা পেয়েছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যতটা না নিজের বক্তব্য যুক্ত করতে চেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শই তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা হয়তো ইংরেজ সরকারকেই ভীত করে তোলে।
তারিক মনজুর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়