মহাফেজখানা থেকে
বিনয় সরকারের নজরুল–ভাবনা
যতীন সরকারের প্রবন্ধ ‘বিনয় সরকারের নজরুল–ভাবনা’ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম আলোর সাময়িকীতে। এটি এত দিন শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে ছিল। আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুল ধরা হলো।
আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলভাবে জনগণনন্দিত হয়েছিলেন যে কবি, তাঁরই নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তখনো মধ্যাহ্নসূর্যের দীপ্তি নিয়ে বাংলার সাহিত্যাকাশে দীপ্যমান কবি—সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ। অথচ কী আশ্চর্য, সেই সময় সেই আকাশেই অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর ‘ধূমকেতু’ হয়ে দেখা দিলেন যে মধ্যাহ্নের প্রখর রবির আলোও এর উজ্জ্বল উপস্থিতিকে আড়াল করতে পারল না। শুধু তা–ই নয়, মধ্যাহ্নরবির স্নেহ-আশীর্বাদ ও উষ্ণ অভিনন্দনে ধন্য হলো ‘স্রষ্টার শনি’ এই ‘মহাকাল ধূমকেতু’টি।
অভিনন্দন এল আরও বিভিন্ন মহল থেকে। আমজনতার কাছ থেকে, বিদগ্ধজনের কাছ থেকেও। বাঘা বাঘা সাহিত্যশাস্ত্রীদেরও কেউ কেউ নজরুলের কবিতার মৌলিকত্বে চমত্কৃত হলেন। যেমন মোহিতলাল মজুমদার। কিন্তু অতি অল্প দিনের ব্যবধানেই মোহিতলাল নিতান্ত ব্যক্তিগত কারণে নজরুলের ওপর রেগে লাল হয়ে গেলেন, নিমেষেই উবে গেল তাঁর নজরুল-গুণগ্রাহিতা। তরুণ বুদ্ধদেব বসুকেও নজরুলের কবিতা চমত্কৃত করেছিল, কুণ্ঠাহীন ভাষায় তাঁর নজরুল-মুগ্ধতার কথা তিনি প্রচারও করেছিলেন। কিন্তু বুদ্ধদেব যতই প্রবীণ হতে লাগলেন, নজরুলের ছিদ্রান্বেষণও তাঁর ততই প্রবল হতে থাকল। নজরুলকে তাঁর মনে হলো একজন ‘প্রতিভাবান বালক’মাত্র। নজরুলের কবিতা জীবনানন্দকেও যথেষ্ট আনন্দিত ও আলোড়িত করেছিল, এমনকি নজরুলের অনুকরণেও তিনি প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। অথচ সেই জীবনানন্দও অচিরেই নজরুলের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য পথে গন্তব্যের সন্ধান করলেন। নজরুলের প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিয়েও তাঁকে খুব বড় ও মহৎ কবি বলে মেনে নেওয়া জীবনানন্দের পক্ষে সম্ভব হলো না। তিরিশের অন্যান্য বিদগ্ধ কবি ও তাঁদের গুণগ্রাহীদের প্রায় সবাই নজরুল সম্পর্কে নীরব থাকাই বিজ্ঞজনোচিত আচরণ বলে মনে করলেন।
আবার নজরুলের গুণগ্রাহী হয়েছেন কিংবা তাঁর অবদানের মূল্যায়নে প্রবৃত্ত হয়েছেন যাঁরা, তাঁদেরও অনেকেই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত নানা বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছেন। কখনো কারও কাছে নজরুল হয়েছেন সাচ্চা মুসলমান, কারও কাছে কাফের; আবার কেউবা তাঁর কাফেরত্ব ঘোচানোর জন্য নজরুলের রচনায় মূর্খের মতো কাঁচি চালিয়েছেন, তাঁর মুসলমানীকরণের প্রয়াস পেয়েছেন। শ্যামাসংগীত রচনার জন্য নজরুলের প্রতি প্রীত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরাই আবার ‘ফারসি শব্দে’ কবিতা লেখার জন্য ‘পাঁত নেড়ে’ বলে তাঁকে গালিও দিয়েছেন। ‘প্রগতিশীল’ বলে যেমন তিনি অভিনন্দিত হয়েছেন, তেমনই তাঁকে সোজাসুজি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে নিন্দা করার মতো ‘বিদগ্ধ’ মানুষও আছে বাঙালি সমাজেই। সাহিত্যিক বা সাহিত্যশাস্ত্রীদের মতোই রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট মানুষজনও নজরুলকে নিয়ে জল ঘোলা কম করেননি; অসুস্থ রাজনীতির আবর্তে পড়ে নজরুলের অবদান খণ্ড-বিখণ্ড ও বিকৃত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
অথচ অবাক হয়ে যেতে হয় সাহিত্যশাস্ত্রী, ধর্মধ্বজী ও রাজনীতিকদের নজরুল-খণ্ডায়ন ও বিকৃতীকরণের ডামাডোলের মধ্যে নজরুলের অবদান সম্পর্কে অধ্যাপক বিনয় সরকারের (১৮৮৭-১৯৪৯) অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা ও প্রখরতার পরিচয় পেয়ে। প্রচলিত অর্থে যাকে সাহিত্যশাস্ত্রী বা সাহিত্যসমালোচক বলে, বিনয় সরকার তা ছিলেন না। তবু সাহিত্যশাস্ত্রে তাঁর অধিকার ছিল অপরিমেয়, সাহিত্যের মূল মর্ম অনুধাবনে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি। আসলে তিনি ছিলেন বহু বিদ্যার সাধক, মনীষার কোনো ক্ষেত্রই তাঁর অনধিগম্য ছিল না। তাই সাহিত্যাঙ্গনে নজরুলের আবির্ভাবের সূচনালগ্নেই এই মহাপ্রতিভার স্বরূপ মনীষী বিনয় সরকারের চেতনায় স্ফটিক স্বচ্ছ হয়ে ধরা পড়েছিল।
না, নজরুলের কবি-প্রতিভা বিশ্লেষণ করে কোনো ঢাউস প্রবন্ধ বা বই লেখেননি তিনি। বিনয় সরকার যত বড় লেখক ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বড় ছিলেন ‘কথক’। তাঁর কথকতার কোনো তুলনা মেলে না। তাঁর সেই কথক রূপটিরই স্পষ্ট পরিচয় বিধৃত হয়ে আছে দুই খণ্ডে প্রকাশিত বিনয় সরকারের ‘বৈঠকে’ শীর্ষক সুবৃহৎ পুস্তকটিতে। পুস্তকটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে এবং দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৪৫ সালে। ৫৮ বছর পর ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে এর তৃতীয় সংস্করণ। ছয়জন গুণগ্রাহীর সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে রচিত ও শ্রীহরিদাস মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত এই বই পড়লে বিনয় সরকারের মনীষার প্রতি আপনাআপনিই অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। মানবিক ও সামাজিক বিদ্যার এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে বিনয় সরকার একান্ত মৌলিক চিন্তাভাবনা করেননি। সেসবের ফাঁকে ফাঁকেই নজরুল-প্রতিভা সম্পর্কেও তাঁর অসাধারণ মর্মগ্রাহিতা ও বাক্বিভূতির প্রকাশ দেখে চমত্কৃত না হয়ে পারা যায় না।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ যখন প্রথম ছাপার অক্ষরে বেরোয়, বিনয় সরকার তখন বার্লিনপ্রবাসী। সেই প্রবাসে থেকেই ‘বিদ্রোহী’ পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং উচ্ছ্বসিত ভাষায় সেই মুগ্ধতার প্রকাশও ঘটান। সেই ১৯২২ সালেই তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: ‘নজরুল আধুনিক বাংলাকাব্যের যুগ-প্রবতর্ক’। এর অনেক পরে, ১৯৪৩ সালে, তাঁর ‘বৈঠকে’ নজরুলকে নিয়ে তিনি দীর্ঘ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। তাঁর নিজস্ব বিশেষ ভাষাভঙ্গিতে তিনি বলেন—
‘নজরুল-কাব্যের প্রথম মুদ্দা বিপ্লব, আর দ্বিতীয় মুদ্দা ভালোবাসা।...নজরুল ভালোবাসার সাহিত্যে বাঙালি কবিদের ভেতর খুবই উঁচু। এই কবি খোলাখুলি ভালোবাসার গান লিখে আর গেয়ে যেতে পারে। এই কথাটা বঙ্গসাহিত্যে যারপরনাই মূল্যবান।...ভালোবাসাটা যে শারীরিক চিজ, এ কথা কবিতায়, নাটকে, নভেলে লিখতে বাঙালির হাত কাঁপে, মুখ শুকিয়ে আসে। বুক ফেটে যায়। যদিবা দু-একজন লিখল—তার সমালোচকরা এই মামুলি রক্তমাংসের স্বধর্মটাকে নিঙড়ে-শুকিয়ে একটা তথাকথিত আধ্যাত্মিক তত্ত্বের কেঠো তক্তায় নিয়ে ঠেকাবেই ঠেকাবে।...বাঙালি জাতের আবহাওয়ায় নজরুলের পক্ষে ভালোবাসার কবি হওয়া খুবই বাহাদুরির কাজ। অতিমাত্রায় বেহায়া আর ঠোঁটকাটা না হলে নজরুলের পক্ষে অনেক কবিতাই প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। এই হিসেবে নজরুল বিপ্লবী। নজরুলকে দেখে হয়তো অনেক বাঙালির ভয় ভেঙেছে বা ভাঙছে। নজরুলের প্রেম-সাহিত্যকে বঙ্গকাব্যে মানবিকতা বা মানবনিষ্ঠার পথপ্রদর্শক বলতে পারি।’ অর্থাৎ নজরুলকে বিনয় সরকার ‘বিপ্লবী’ বলছেন শুধু তার বিদ্রোহধর্মী কবিতার জন্যই নয়, তাঁর ‘ভালোবাসার কবিতা’র জন্যও। কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষা ও ছন্দ—এই তিন দিক থেকেই তিনি নজরুলের ভেতর যুগপ্রবর্তক বিপ্লবী সত্তাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। নজরুলের কবিতায় তিনি দেখেছেন ‘নৃত্য-পাগল-ছন্দ’, আর নজরুলের ভাষার ক্ষেত্রে ‘সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে দেশী-বিদেশী আর আটপৌরে ও প্রাকৃত শব্দের মেল-মেশ’।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ বিনয় সরকারের মতে তা ‘হুইটম্যানের আমি’। তিনি বলেন—
‘এই আমিতে একমাত্র লেখক-কবিকে বুঝতে হবে না। বুঝতে হবে যে কোন লোক পড়ছে তাকে, প্রত্যেক পাঠককে। এককথায় মানুষ মাত্রকে। “বিদ্রোহী” হলো ব্যক্তির উপনিষদ। ব্যক্তিত্ব এই কবিতার বেদান্ত।...নজরুলের কবিতায় রক্তমাংসের গড়া প্রত্যেক ব্যক্তি বিদ্রোহী। এই দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদর্শন বাংলা কবিতায় ১৯২১ সালের আগে খুব বেশি ছিল না। থাকলেও তা প্রত্যক্ষ, পরিষ্কার ও প্রবল আকারে পাওয়া যেত না।...উত্তম পুরুষের এক বচনের আওতায় মানবমাত্রের এই বিদ্রোহী মূর্তি বাংলাকাব্যে আত্মপ্রকাশ করেনি। এইখানেই নজরুলের যুগ-প্রবর্তক পদবী।’
তবু নজরুলের ভেতর যতই ‘হুইটম্যানের আমি’র দেখা পাওয়া যাক না কেন, নজরুলের কবিতার দেশজ রূপ-রসকে চিনে নিতে বিনয় সরকার ভুল করেননি। নজরুল যে আবহমান বাংলা কবিতার লোকায়ত ঐতিহ্যের ধারক—এটি বোধ হয় বিনয় সরকারের আগে কেউই একান্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়—
‘নজরুল বাংলাদেশের আবেষ্টনকে জনসাধারণের চোখে দেখতে সুপটু। মেঠো ভাষায় চলতি শব্দে পাড়াগেঁয়ে হসন্ত ধ্বনির সাহায্যে পল্লীদৃশ্যগুলো আঁকবার ক্ষমতা তাঁর জবরদস্ত। লোকটা খাঁটি বাঙালি।...নজরুল অনেকটা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের (রাঢ় অঞ্চলের) গ্রাম্য কবি। অতি তাজা ও প্রাকৃত তাঁর বোলচাল ও ভাবভঙ্গি। সেকালের মতি রায়, নীলকণ্ঠ আর রসিক চক্রবর্তীর যাত্রার দল ছিল।...তাঁদের গানের শব্দগুলো যেন নজরুলের রপ্ত হয়ে গেছে।...এমনকি তাঁদের পূর্ববর্তী দাশরথি রায়ের পাঁচালিতে মেঠো-মিঠে সোজা শব্দের গাঁথনি দেখা যায়। তা–ও যেন নজরুলের হাতের পাঁচ।’
বিনয় সরকার যে সময়ে এসব কথা বলেছেন, সে সময়ও নজরুলের কোনো জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তাঁর বাল্যজীবনের ঘটনাবলি কিংবা তাঁর মানস গঠনের পারিপার্শ্বিক উপাদান ও সূত্রাবলি তখনো সুধীজনের কাছে প্রায় অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। তবু নজরুলের কবিতার ভাষা, বিষয় ও ছন্দ দেখেই প্রাজ্ঞ বিনয় সরকার অনুমান করে নিতে পেরেছেন যে ‘নজরুল ছেলেবেলায় বোধ হয় যাত্রা-পাঁচালির গান শুনে থাকবে। শুধু কানে নয়, তার মরমে গিয়ে এসব খুব গভীরভাবে বসেছিল মনে হচ্ছে। আমি নজরুলকে এই হিসাবে বাঙালি নর-নারীর অতি ঘরোয়া কবি সমিঝতে অভ্যস্ত। বঙ্গসংস্কৃতির সেকেলে ধারা বিংশ শতাব্দীর জনসাধারণের ভেতর নতুন গড়নে ছড়িয়ে পড়েছে। গানের কবি নজরুল ভাষা হিসাবে খানিকটা পাঁচালি-যাত্রাকারদের সন্তান ও উত্তরাধিকারী।’
বিনয় সরকার লক্ষ করেছেন, নজরুলের গানের বই ‘বুলবুল’ ‘আগাগোড়াই ঠিক যেন দাশুরায়-নীলকণ্ঠের সুললিত শব্দের আধুনিক ফুলঝুরি’। তবু এসব সত্ত্বেও নজরুলের স্বকীয়তা ও মৌলিকতা সম্পর্কে বিনয় সরকারের নির্দ্বিধ অভিমত:
‘গানের কথাবস্তু, ছন্দ আর সুর সম্বন্ধে নজরুল অনেকটা স্বরাজী। সেকেলে বাঙলার ছাপ ওইসবের ওপর পরিমাণে অল্প। সুরস্রষ্টা নজরুল স্বদেশী বিপ্লবের দ্বিতীয় যুগের (১৯১৯-২৯) পল্লীপ্রাণ, বঙ্গনিষ্ঠ গায়ক কবি। দাশু নীলকণ্ঠর স্রোত রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহে মিশবার পর শুরু হয়েছে নজরুলি সুর-শব্দ-ছন্দের ধারা। নজরুলের মতন ষোলআনা বাঙালির বাচ্চা বাঙলা সাহিত্যের গৌরব।’
অর্থাৎ একজন ‘খাঁটি বাঙালি’ কবি হিসেবেই যে নজরুলের প্রকৃত মৌলিকত্ব, বিনয় সরকার সে সত্যকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। বাঙালিত্বের স্বরূপ প্রসঙ্গেও বিনয় সরকারের নিজস্ব ভাবনা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। সেই ভাবনার পরিচয় পেতে হলে তাঁর ‘নয়া বাঙ্গলার গোড়াপত্তন’ ও ‘বাড়তির পথে বাঙালী’—এই দুটো বই অবশ্যই পাঠ করতে হবে। অন্তত বিনয় সরকারের বৈঠকের দুই খণ্ড তো পাঠ না করলেই নয়। বিনয় সরকার বাঙালিদের ভেতর কোনো খাঁটি হিন্দু, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি মুসলমান বা খাঁটি খ্রিষ্টানের সন্ধান পাননি। তাঁর মতে, বাঙালি হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রিষ্টান সবার আসল ধর্ম হচ্ছে ‘বাঙালি ধর্ম’। এই বাঙালি ধর্মেরই পরিচয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কবি নজরুলের মধ্যেও। নজরুলের রচনায় যে হিন্দু-মুসলিম পৌরাণিক ঐতিহ্যের অনায়াস ও ঐকত্রিক উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়, সেটি বাঙালি ধর্মেরই অনুসৃতির পরিচায়ক। আবহমানকালের প্রাকৃতজনের এই বাঙালি ধর্মকে স্বীকার করে নিতে কুণ্ঠিত হন একালের নাগরিক মধ্যবিত্ত হিন্দু-মুসলমানদের অনেকেই। তাঁদের মনমানস একধরনের কৃত্রিম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বোধে আচ্ছন্ন। এই আচ্ছন্নতার দরুনই নজরুল-অনুসৃত বাঙালি ধর্মের স্বরূপ অনুধাবনে তাঁরা অসমর্থ। সে কারণেই তাঁদের নজরুল-মূল্যায়নও হয় একান্তই খণ্ডিত। মনীষী বিনয় সরকার একালীন নাগরিক মধ্যবিত্ত বাঙালির এ রকম খণ্ডিত চেতনার অনেক ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর নজরুল-মূল্যায়নে কোনো খণ্ডতা বা মানস প্রতিবন্ধ নেই।
শুধু ‘বাঙালি ধর্ম’ নয়, নজরুলের মধ্যে একধরনের ‘অধর্ম’কেও তিনি শনাক্ত করেছেন এবং এই ‘অধর্ম’ই তাঁর মতে সব মানুষের প্রকৃত ধর্ম। এই অধর্ম প্রসঙ্গেই নজরুলের সর্বহারা কাব্যের ‘ঈশ্বর’ কবিতার কয়েকটি ছত্র স্মরণ করেছেন—
‘সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো—আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে।
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি।
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!’
এরপরই বিনয় সরকারের মন্তব্য, ‘এর ভেতর না আছে পুরাণ, না আছে কোরআন, আর না আছে বাইবেল। অতএব পুরুত-মোল্লা-“বাবা”দের ফতোয়ায় এ চিজ বিলকুল অধর্ম। আমি বলব এই হচ্ছে মানুষমাত্রের আসল ধর্ম। বাঙলাদেশে মানুষ গ’ড়ে উঠবে।’
বিনয় সরকার নজরুলের রচনায় মানুষ গড়ার প্রভূত উপাদান খুঁজে পেয়েছেন, নজরুলকে ‘বিপ্লবী’ ও ‘যুগপ্রবর্তক’ কবি বলেও চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু তাঁকে ‘সাম্যবাদী কবি’ বলতে রাজি হননি। কারণ, তাঁর মতে, ‘পুঁজিশাহীর ঠাঁইয়ে মজুরশাহী কায়েম করতে লাগে যে-সাহিত্য সেই সাহিত্য সাম্যবাদী। পুঁজিপতি আর মহাজনদের ধ্বংস করে সমাজের ভেতর মজুর-কেরানীর আধিপত্য গড়বার শল্লা দেয় যে-সাহিত্য সেই সাহিত্য সাম্যবাদী।’
নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছেও বিনয় সরকার এ রকম সাম্যবাদ খুঁজে পাননি, এগুলোতে তিনি কেবলই দেখেছেন ‘সর্বজনিক মানব-নিষ্ঠা’। তাই নজরুলকে তিনি ‘সাম্যবাদী কবি’ বলার বিরুদ্ধে। আবার নজরুলের কবি-প্রতিভার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেও নজরুলের অগ্নিবীণা ও সর্বহারাকে তিনি ‘বাণী-প্রচারের কাব্য’মাত্র বলে চিহ্নিত করেছেন। বলেছেন যে এগুলো ‘উচ্চতম শ্রেণীর কাব্য’ নয়। সত্যেন দত্ত ও নজরুল ইসলাম—দুজনের কেউই, তাঁর মতে, ‘উচ্চতম শ্রেণীর কবি নন। কারণ, কবিতায় এঁরা চরিত্র খাড়া করতে পারেননি, ঘটনা সৃষ্টি করতে পারেননি, অবস্থা জমিয়ে তুলতে পারেননি। যতখানি পেরেছেন, তাতে উচ্চতম শ্রেণীর কবি হওয়া সম্ভব নয়।’
বিনয় সরকারের এসব বক্তব্য আমরা মানতেও পারি, না-ও মানতে পারি। তাঁর সঙ্গে চুলচেরা তর্কেও নেমে পড়তে পারি। বিনয় সরকারের সব কথা মানা বা না-মানা কিংবা তাঁর সঙ্গে তর্ক করার অধিকার আমাদের আছে অবশ্যই, তবু তাঁকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, তাঁকে উপেক্ষা করা হবে একান্তই আত্মঘাতী। তাঁর নজরুল-ভাবনার আলো দিয়ে আমরা অনেক অনেক আলো জ্বেলে নিতে পারি। সেসব আলোতে আমাদের চিত্তের অনেক অন্ধকার দূর হয়ে যাবে নিশ্চয়। শুধু নজরুল-মূল্যায়নে নয়, একুশ শতকের বাঙালি বিশ শতকের এই মনীষীর কাছ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই চলার পথের দিশা পেতে পারে। অথচ কী দুঃখ, অতি অল্পদিনের ব্যবধানেই এই মনীষীকে আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছি। যত দ্রুত এই বিস্মৃতির হাত থেকে মুক্ত হওয়া যায় ততই মঙ্গল।