কবি আতুকেই ওকাই ঘানার আক্রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালের ১৫ মার্চ। ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর আফ্রিকা এবং আফ্রিকার বাইরের নানা দেশে তাঁর কবিতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং তাঁর কবিতার শক্তিমত্তাকে তুলে ধরা হয়। আফ্রিকান মৌখিক কবিতা (ওরাল পোয়েট্রি) ও পারফরম্যান্স পোয়েট্রির বিকাশে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তিনি ইংরেজি ভাষার বাক্য গঠন ও গতানুগতিক ব্যাকরণ ভেঙে নতুন শব্দ, ধ্বনি এবং নতুন ছন্দ নির্মাণে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা ও নাট্যচর্চায় নিবিষ্ট ছিলেন। আফ্রিকান পরিচয়, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং উপনিবেশবাদের সমালোচনা তাঁর কবিতার উপজীব্য বিষয়। সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার বিষয়গুলোও তাঁর কবিতাকে গতিশীল করেছে। তাঁর পরে যারা কবিতা লিখতে এসেছে, প্রায় সবাই তাঁর কবিতা দ্বারা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
কালো মানুষদের ওপর সাদা মানুষদের নগ্ন অত্যাচার, লুণ্ঠন আর নিষ্ঠুরতার কাহিনি অনেক লেখকের ফিকশন বা নন-ফিকশনে উঠে এসেছে। অ্যালেক্স হেলির ‘রুটস’ থেকে আমরা আফ্রিকার ক্রীতদাসদের নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশা ও নির্যাতনের কথা যেমন জানতে পারি, তেমনি মানবেতিহাসের অসংখ্য পৃষ্ঠাজুড়ে রয়েছে এই কালো মানুষদের রক্ত ও চোখের জল। সাম্রাজ্যবাদীরা ক্রীতদাসদের যেভাবে জাহাজে করে তাদের দেশে নিয়ে যেত, তা ছিল তাদের নিষ্ঠুরতম আচরণের বহিঃপ্রকাশ। জাহাজের পাটাতনে হাত-পা বেঁধে তাদের ফেলে রাখা হতো। রোদবৃষ্টিতে পাটাতনেই পড়ে থাকত অর্ধাহারে-অনাহারে। অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হতো না। বেশি অসুস্থ হলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো।
কলোনিয়াল শাসকেরা বিশাল সমৃদ্ধ আফ্রিকার ধনসম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি তাদের ভাষা, মিথ, লোককাহিনি এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সবকিছুকে নগ্নভাবে পঙ্গু করে রেখেছিল দীর্ঘদিন, বলতে গেলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। ফলে আফ্রিকান সাহিত্য বলতে মৌখিক সাহিত্যকেই বোঝানো হতো। ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ফরাসি শাসকেরা নির্দয়ভাবে তাদের শাসন করেছে এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে। উনিশ শতকে এসে তাদের সাহিত্যের লেখ্যরূপ শুরু হয় এবং বিশ শতকে এই প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হতে থাকে। তবে তখন আফ্রিকায় ইংরেজি ভাষা অনেকেই শিখে ফেলেছে এবং ইংরেজিতে তারা লেখালেখি চালিয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের আগপর্যন্ত সোমালি সাহিত্যের কোনো লেখ্যরূপ ছিল না। আফ্রিকার অনেক দেশে মৌখিক সাহিত্যের ট্র্যাডিশনটা ছিল খুবই উন্নত এবং এখনো সেই ধারাটি অনেকটা ক্ষীণ হলেও বহমান রয়েছে। সোমালিয়ার সর্বাধিক সম্মানিত কবি মোহাম্মদ ইব্রাহিম ওয়ারসেম হাদরাউইকে (১৯৪৩-২০২২) অনেকেই ‘সোমালিয়ার শেক্সপিয়ার’ বলে থাকেন। যিনি সাধারণত হাদরাউই নামে পরিচিত। তাঁর কবিতা সোমালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। সোমালিয়াকে কবিদের দেশ বলা হয়। সোমালিয়ার লেখক মুসা গালাল (১৯২০-১৯৮০) দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে অজস্র মৌখিক সাহিত্য টেপ রেকর্ডারে ধারণ করেছিলেন, যখন তাদের সাহিত্যের লেখ্যরূপ ছিল না।
আফ্রিকায় মূলত যা হয়েছিল তা হলো, অধিকাংশ ভাষা লিপিবিহীন থাকায় উপনিবেশবাদীদের ভাষা খুব সহজেই আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল। সোমালিয়া সরকার ১৯৭২ সালে লাতিন বর্ণমালার অনুকরণে সোমালি লিপি অনুমোদন করে। এরপর থেকে স্কুল-কলেজ, সরকারি অফিস, সংবাদমাধ্যম এবং সাহিত্যচর্চায় ব্যাপকভাবে সরকারস্বীকৃত এই ভাষার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। সোমালিয়ার বিখ্যাত লেখক নুরউদ্দিন ফারাহ (জ. ১৯৪৫) অবশ্য ইংরেজিতে লেখালেখি করেন। ইংরেজিতে কেন তাঁরা লেখেন, এ প্রশ্নের উত্তরে চিনুয়া আচেবেসহ অনেক লেখকই বলেছিলেন, তাঁরা সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষায় লিখে তাঁদের জানান দিতে চান, কী নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণ তাঁরা করেছিলেন আফ্রিকায়, কীভাবে তাঁরা তাদের (আফ্রিকানদের) নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে পঙ্গু করে ফেলেছিল। এ ছাড়া তিনি তাঁর প্রবন্ধ ‘দ্য আফ্রিকান রাইটার অ্যান্ড দ্য ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ’-এ বলেছেন, আফ্রিকার মানুষের চিন্তাভাবনা ও মানসজগৎকে ইংরেজি ভাষাই কেবল ধারণ করতে পারে। ইংরেজি ভাষায় লেখালেখির পক্ষে চিনুয়া আচেবের যুক্তিগুলো নগুগির পছন্দ ছিল না। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড: দ্য পলিটিকস অব ল্যাংগুয়েজ ইন আফ্রিকান লিটারেচার-এ লিখেছেন—‘ইন মাই ভিউ, ল্যাংগুয়েজ ওয়াজ দ্য মোস্ট ইমপর্ট্যান্ট ভেহিকল থ্রু হুইচ দ্যাট পাওয়ার ফ্যাচিনেটেড অ্যান্ড হেল্ড দ্য সৌল প্রিজোনার’। অর্থাৎ ‘আমার মতে, ভাষাই ছিল সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন, যার মাধ্যমে সেই শক্তি মানুষের আত্মাকে মুগ্ধ করত এবং বন্দী করে রাখত।’ নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ইংরেজিতে লিখতেন, পরে অবশ্য তিনি তাঁর নিজের মাতৃভাষা ‘গিকুয়ু’-তে ফিরে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, আফ্রিকান লেখকদের তাঁদের নিজের ভাষায় লেখালেখি করা উচিত। তার পরও আফ্রিকার লেখকেরা ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
আফ্রিকান কবিতার চিত্রকল্প জটিল প্রতীকের হাত ধরে এগিয়েছে, কেবল সহজতর বোধগম্য বর্ণনার ব্যাপার আফ্রিকান আধুনিক কবিতায় প্রায়ই অনুপস্থিত, বলা যায় দ্রাষ্টান্তিক নয়, প্রতীকী। তবে এ কথা ঠিক যে আফ্রিকায় অন্য ধরনের পপুলার কবিতারও অবস্থান রয়েছে পাশাপাশি যেখানে উপমার পর উপমা সাজিয়ে কোনো সুন্দর বস্তু অথবা রমণীকে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব কবিতারও প্রচুর পাঠক রয়েছে এবং সেসব পাঠকের ধারণা কবিতা সৌন্দর্যের পূজারি।
আফ্রিকার কবিতা এখন সারা পৃথিবীর কবিতাপ্রেমীদের কাছে অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি আফ্রিকার তরুণ কবিরাও এত উঁচুমানের কবিতা লিখছে এখন যে আমরা অভিভূত না হয়ে পারি না। আধুনিক আফ্রিকান কবিতার জগতে আতুকেই ওকাই (আতুকেই জন ওকাই) একটি উজ্জ্বলতর নাম। আফ্রিকান কবিতা সব সময়ই আফ্রিকান ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে সাবলীলভাবে। একালের কবি সেই ঐতিহ্যকে আরও স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছেন, বহুমাত্রিক পথে বিকশিত করেছেন, যা ইউরো-আমেরিকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আফ্রিকার কবিতার উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর শক্তিশালী বিট। বিভিন্ন নাচ, শস্যভাঙার শব্দ, বইঠা-দাঁড়ের শব্দ অথবা মাছ ধরার জালের সমন্বিত শব্দের মতো প্র্যাকটিক্যাল বিষয় জায়গা পেয়েছে কবিতার ছন্দে। সাধারণ মানুষের কাছে আধুনিক আফ্রিকান কবিতার একটি জোরালো আবেদন সব সময়ই রয়েছে। নৃত্য ও সংগীত থেকে বিচ্ছিন্ন লিরিক্যাল কবিতা আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় খুব কমই দেখা যায়। আর এ ক্ষেত্রে আধুনিক আফ্রিকান কবিতার মূল সুরটা ওকাইয়ের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। আফ্রিকান আধুনিক কবিতার প্রাণপুরুষ সেনেগালের কবি লিওপোল্ড সেডার সেংগোরের ( ১৯০৬-২০০১)-এর ভাষায়—‘নেগ্রিটুড আন্দোলন এবং তার বিবর্তিত রূপই ওকাইয়ের কবিতার মৌল দিগন্তকে প্রসারিত করেছে।’ লিওপোল্ড সেডার সেংগোর ১৯৩০ সালে প্যারিসে বসে এইমে সেজায়ারের সঙ্গে ‘নেগ্রিটুড আন্দোলন’ শুরু করেছিলেন। এর ফলে আফ্রিকান কবিতায় একটি বড় রকমের পরিবর্তনের ঢেউ আসে। আফ্রিকান কবিতা একটা নিজস্ব রাস্তা পেয়ে যায়। একটি স্বতন্ত্র ও সাবলীল আফ্রিকাকেই মূর্ত করেছেন ওকাই তাঁর কবিতায়, আর যে কারণে তিনি আজ সমকালীন আফ্রিকান কবিদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম।
পুরো ইউরোপে আধুনিক কবিতার আন্দোলনের শুরুটা মোড় নিয়েছিল বুদ্ধিমত্তার দিকে, যা ছিল ‘মোর ইন্টেলেকচুয়াল দ্যান ইমোশনাল’, আমরা এলিয়টের কথা যদি ধরি তাহলে দেখা যাবে যে একজন সাধারণ পাঠক তার বৌদ্ধিক যুক্তিকে বুঝতে কতখানি অক্ষম। অনেক পাঠকই তার তীক্ষ্ণ হিউমার-আইরনি, ক্ল্যাসিক্যাল মিথ, প্রাচীন কাব্য-সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলোয় বরাবরই হোঁচট খেয়েছে। সেই সময়ের ইউরোপের যে কাব্যান্দোলন তাঁর লক্ষ্য ছিল জীবনের একটি ফিলোসফি তৈরি এবং অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি বুদ্ধিগত ব্যাখ্যা, একটি বিষয়কে অন্য একটি বিষয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে তার স্বরূপ উদ্ঘাটন। তাই এসব কবির পাঠকদের ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় যে, এরা সবাই-ই শিল্পরুচিতে বোদ্ধা ও অগ্রসর। এসব কবির কবিতা সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি আবেদন সৃষ্টি করেনি। তারপরও বলতে হয় সেই কবিরাই বিশ্বকবিতার আধুনিক পর্বের বাতাবরণ তৈরি করেছিলেন, যদিও তারা বহুলপঠিত বা পাঠকনন্দিত ছিলেন না বরং অবস্কিউরিটির অনন্য দ্যুতির মধ্যেই আধুনিকতার মূল সুরটি বেজে উঠেছিল।
আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় গোত্র বা সম্প্রদায়ভিত্তিক মানসচেতনা কাজ করেছে সাবলীলভাবে। ইউরোপিয়ান কবিতা যতটা বৈশ্বিক, আফ্রিকান কবিতা ততটাই সম্প্রদায়গত। আফ্রিকান কবিতার কবি কোনো নিঃসঙ্গ ব্যক্তি নন অথবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নও নন। আফ্রিকান কবিতা সব সময়েই তার নিজস্ব ইতিহ্যে ভর করে এগিয়ে চলেছে। বিচ্ছিন্নতার চেয়ে বরং সম্প্রদায়গত ঐক্যের বাণী আফ্রিকান কবিতাকে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর করেছে, পূর্বপুরুষদের সঙ্গে বর্তমান জীবিত গোষ্ঠীর সম্পর্ক ও ঐশ্বর্যকে সম্পর্কিত করেছে। আফ্রিকান কবিতার একধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এর গতি ও শক্তি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য কবিতাকে অতিক্রম করেছে। আর এই গতি ও শক্তির আধার হলো শাণিত চিত্রকল্প ও প্রতীক।
আফ্রিকান কবিতার চিত্রকল্প জটিল প্রতীকের হাত ধরে এগিয়েছে, কেবল সহজতর বোধগম্য বর্ণনার ব্যাপার আফ্রিকান আধুনিক কবিতায় প্রায়ই অনুপস্থিত, বলা যায় দ্রাষ্টান্তিক নয়, প্রতীকী। তবে এ কথা ঠিক যে আফ্রিকায় অন্য ধরনের পপুলার কবিতারও অবস্থান রয়েছে পাশাপাশি যেখানে উপমার পর উপমা সাজিয়ে কোনো সুন্দর বস্তু অথবা রমণীকে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব কবিতারও প্রচুর পাঠক রয়েছে এবং সেসব পাঠকের ধারণা কবিতা সৌন্দর্যের পূজারি। এসব কবিতায় বস্তুর অন্তরাত্মায় আলো পড়ে না, কেবল বাহ্যিকতাকেই উচ্চকিত করা হয় আর ইংরেজিতে লেখা ঘানার অনেক কবিতায়-ই সেই সস্তা কাজটি করা হয়েছে। আতুকেই ওকাইয়ের অবস্থান সেই সস্তা পপুলার কবিতার বিপরীতে বলেই তিনি আফ্রিকান কবিতার অন্যতম আধুনিক রূপকার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
সেংগোরের ভাষায় আফ্রিকান কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার পাশ্চাত্যের মতো নয়। ‘দ্য ইমেজ শুড বি বোথ সেনসুয়াস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট, আর্কিটাইপাল অ্যান্ড স্পেসিফিক অ্যান্ড অ্যাবাভ অল সুররিয়ালিস্টিক।’ অর্থাৎ ‘চিত্রটি এমন হতে হবে, যা একই সঙ্গে ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করে এবং বুদ্ধিকে উসকে দেয়; যা একদিকে আদিরূপের প্রতিধ্বনি বহন করে, অন্যদিকে থাকে সুনির্দিষ্ট; আর সর্বোপরি, তা হবে পরাবাস্তববাদী।’ গতানুগতিক উপমার ব্যবহার আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় একেবারেই নেই বললেই চলে। ‘অ্যাজ ফেয়ার অ্যাজ লিলি’ বা ‘লিলি ফুলের মতো নির্মল সৌন্দর্যময়’—এ রকম কাব্যিক উপমার কদাচিৎই দেখা মিলে, বলা যায়। উপমা ও প্রতীকের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান কবিতা থেকে আফ্রিকান কবিতা আলাদা ও স্বতন্ত্র।
ওকাইয়ের কবিতার আরও উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তা সাদৃশ্য বহন করে আমাদের ফেটিশ ধর্মযাজক এবং গতানুগতিক ধর্মীয় আলেমদের সঙ্গে। উপাস্যের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এই সব যাজক একধরনের মোহান্ধাবস্থায় নিজেদের নিয়ে যান। এসব আচার তাঁরা শুরু করেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে কখনো অবোধ্য ভাষায় অথবা ইঙ্গিতে। ওকাই তাঁর কবিতায় একই ধরনের ব্যাপার ঘটান। যখন তিনি স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থায় কথা বলেন, তখন ভাষা হয়ে ওঠে গভীর মেজাজি এবং চিত্রকল্প হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে একের পর এক।
ঘানার কবিতার ক্ষেত্রে ওকাইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ওকাই আফ্রিকান কবিতার ঐতিহ্যিক গতিকে পরিপূর্ণভাবে যে শুধু বোঝেন তাই-ই নয়, এর স্বতন্ত্র বাক্যবিন্যাস ও কাব্যময়তার উৎকর্ষের ব্যাপারেও সজাগ। তাঁর কবিতার উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কবিতা নিয়ে তাঁর উপলব্ধি। তার মতে, কবিতা বাহ্যিক দিকের চেয়ে মননজাত প্রক্রিয়াকে আলোকিত করে। তাঁর কবিতার কোথাও দেখা যাবে না যে তিনি নিছক বস্তুর বাহ্যিক বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তার কাছে বস্তু নয়, মুখ্য হলো বস্তুর পেছনের ধারণা।
আতুকেই ওকাই তাঁর কবিতায় নিজের জন্য একটি জুতসই মতবাদ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, যার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাবলির ব্যাখ্যা সম্ভব। তবে এ দাবি নিশ্চিত অযৌক্তিক হবে যে তিনি কোনো র্যাশনাল থিওরি দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে ওকাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো বরং নৈরাশ্যবাদী। আর এই নৈরাশ্যবাদের আবহ আমরা লক্ষ করি তাঁর ‘আদিকালদো তাফ্লাতমি’, ‘চেইন গ্যাং’, ‘সোল অটোপসি’ ইত্যাদি কবিতায়। কবি মনে করেন, সমাজ এতটাই অনৈতিক যে পুণ্যের পুরস্কারের চেয়ে তা ধ্বংসে সে উদ্গ্রীব। সর্বত্র তিনি দেখতে পান নিরর্থক ধ্বংসের লীলাখেলা।
ওকাইয়ের কবিতার আরও উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তা সাদৃশ্য বহন করে আমাদের ফেটিশ ধর্মযাজক এবং গতানুগতিক ধর্মীয় আলেমদের সঙ্গে। উপাস্যের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এই সব যাজক একধরনের মোহান্ধাবস্থায় নিজেদের নিয়ে যান। এসব আচার তাঁরা শুরু করেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে কখনো অবোধ্য ভাষায় অথবা ইঙ্গিতে। ওকাই তাঁর কবিতায় একই ধরনের ব্যাপার ঘটান। যখন তিনি স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থায় কথা বলেন, তখন ভাষা হয়ে ওঠে গভীর মেজাজি এবং চিত্রকল্প হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে একের পর এক।
তাঁর কবিতা নিয়ে জোরালো আপত্তি হলো যে তা কখনো কখনো কোনো অর্থ করে না। অবশ্য কবিতার ক্ষেত্রে অর্থই যে অনর্থের মূল, সেটা আমরা জ্যঁ পল সার্ত্রের কাছ থেকে আগেই জেনেছি। প্রকৃত কবিতা আড়াল চায় কবিতার নৈঃশব্দ্যে লুকিয়ে থাকে অপার রহস্য আর এই রহস্যই কবিতার সৌন্দর্য, তাই হয়তো মালার্মে বলেছেন: মিস্ট্রি অ্যান্ড অবস্কিউরিটি আর দ্য প্রোটেকশন অব পোয়েট্রি ফ্রম দ্য আইডল কিউরিওসিটি অব দ্য মাসেস।’ তবে এসবের বাইরেও বলা যায় যে যা অর্থ করে না তার অনেক রকম অর্থই হতে পারে। আর আমরা এ-ও জানি যে কবিতা বোঝার আগে তা প্রাণিত করবে। ওকাইয়ের সব কবিতাই যে জটিল কিংবা দুর্বোধ্য, সেটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না। সহজে মুগ্ধ করার মতোও তাঁর অনেক কবিতা রয়েছে। ওকাইয়ের কবিতার কৃতিত্ব লক্ষ করি আমরা তাঁর ব্যবহৃত শব্দের ধ্বনিবৈচিত্র্যের অপূর্ব সৃষ্টিযোজনায়। তাঁর ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁর কবিতার অন্তর্মুদ্রাবাদী শব্দ ব্যবহারের নৈপুণ্য ও কৌশল কবিতাকে যেমন সংযত করেছে, তেমনি কবিতার স্থায়ী চমৎকারত্বের কার্যকারণকে বিবর্তিত করেছে সময়ের মাত্রায়। তাঁর কবিতায় কখনো কখনো দেখা যায় যে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই, এই সম্পর্ক রক্ষিত হয় শুধু ধ্বনিপ্রবাহ এবং কখনো কখনো অন্তর্মিলের মধ্যে। ‘স্পোকেন ওয়ার্ড’ শৈলীর একটি সুন্দর, খুব পরিচিত ও বিখ্যাত কবিতা লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস থেকে একটি উদাহরণ—
‘সরসারার্স ডেথ মাস্ক... রেইন মেকার্স ক্লথস/ ফ্লাইহিস্ক...
বুমেরাং... এলিফ্যান্ট টাস্ক/ টোল ব্রিজ... সাসপেনশন ব্রিজ...
টো প্রিন্টস.../ প্রিমরোজেজ... পুসি উইলোজ...
ক্যাটকিনস... ব্লু স্কাই... হোয়াইট ক্লাউডস... মাউন্টেন ডাউন...’
কবিতাটি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—
‘জাদুকরের মৃত্যুমুখোশ... বৃষ্টি-ডাকনেওয়ার পোশাক/ চামর...
বুমেরাং... গজদন্ত/ টোল সেতু... ঝুলন্ত সেতু...
পায়ের আঙুলের ছাপ.../ প্রিমরোজ...পুসি উইলো...
ক্যাটকিন...নীল আকাশ... সাদা মেঘ...পাহাড় বেয়ে নেমে আসা...’
কবিতাটি আফ্রিকান সাংস্কৃতিক উপাদানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সরসারার্স ডেথ মাস্ক, এলিফ্যান্ট টাস্ক, ব্লু স্কাই, হোয়াইট ক্লাউডস, টোল ব্রিজ, সাসপেনশন ব্রিজ ইত্যাদি শব্দবন্ধের মধ্য দিয়ে চিত্রিত হয়েছে আফ্রিকার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবয়ব। ছন্দ-শব্দের খেলা ও চিত্রকল্পের নানামাত্রিক বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব ওকাইয়ের কবিতাকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। এ ধরনের কবিতা যতটা পাঠের জন্য, তার চেয়ে বেশি শ্রবণের সহায়ক। যখন তিনি এ ধরনের কবিতা নিজে কোনো মঞ্চে আবৃত্তি করতেন, তখন তাঁর শরীরী ভাষা, ছন্দ ও উচ্চারণ মিলে এক অভিনব ঐন্দ্রজালিক অবস্থা তৈরি হতো। ওকাই তাঁর কবিতায় মৌখিক ঐতিহ্য, লোকজ উপাদান এবং আধুনিক কবিতার ছন্দ ও লিখনকৌশল মিলিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন ধারার কবিতা লেখার পথ তৈরি করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ওকাই শুধু শব্দের পর শব্দ বসিয়েছেন উদ্দেশ্যবিহীন। তিনি মূলত জুতসই শব্দ ধ্বনির সমন্বয়ে ছবি এঁকেছেন অবিরাম, যা কবিতার কাব্যসত্তার লজিক্যাল সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করেছে। তিনি মূলত চিত্রের মাধ্যমে কথা বলতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে যে তিনি আফ্রিকার আধুনিক সেসব কবির থেকে ভিন্ন নন, যাদের কবিতা যতটা বুদ্ধিজাত তার চেয়ে বেশি চিত্ররূপময়।
আফ্রিকান কবিতাকে তার প্রাগৈতিহাসিক উৎস—তালবাদ্যের স্পন্দন ও ছন্দে ফিরিয়ে আনতে প্রথম সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেন ওকাই। সে উদ্দেশ্যে তিনি সচেতনভাবে ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠিত বাক্যরীতি ও শব্দভান্ডার ভেঙে দেন এবং বিস্ময়কর ধ্বনিগত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেন এক স্বতন্ত্র কাব্যছন্দ, যা তাঁর কবিতাকে অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করে। (ভূমিকা, লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস, ঘানা পাবলিশিং করপোরেশন, ১৯৭৪)
তাঁর কবিতার অন্তঃশক্তি মূলত নৃত্যবৈচিত্র্যের সমধর্মিতায় আচ্ছন্ন। কবিতা লেখার সময়ে ওকাই সেসব শব্দই খোঁজেন, যা একটি পরিপূর্ণ সাংগীতিক আবহের সৃষ্টি করে, যতক্ষণ তা না হয়, ততক্ষণ চলে তার শব্দযুদ্ধ, নির্মম আচরণে তিনি রক্তাক্ত হন, তবু ধৈর্যের সঙ্গে বসে থাকেন সুবোধ ধীবরের মতো। নৃত্য, সংগীত ও উৎসবের বহুভঙ্গিম কলরবের মধ্যে তিনি খুঁজে ফেরেন শব্দ। এ ধারাটি আসলে সেংগোরের তৈরি এবং যে পথের শিকড়ে-বাকলে বিকশিত আফ্রিকান কবিতার মূলধারা। উভয় কবিই (সেংগোর ও ওকাই) দাবি করেন, তাঁদের কবিতার উৎকর্ষ সংগীত ও ড্রাম পেটানোর সঙ্গে মেলবন্ধনে উদ্গ্রীব। আফ্রিকান কবিতার এই টেকনিকটি নতুন নয়। আফ্রিকান কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো তা একক কোনো ব্যক্তির আবৃত্তির জন্য নয়। আফ্রিকার অধিকাংশ কবিতার আবৃত্তি হয় মিউজিক, ড্রাম, নৃত্য, তালি অথবা এ ধরনের কোনো তালের সঙ্গে মিলিয়ে সমন্বিতভাবে। আফ্রিকান কবিতা দলীয় পারফরম্যান্সের ব্যাপার হয়েও তা ব্যক্তির নিজেকে প্রকাশ করারও জুতসই মাধ্যম। আর এসব কারণে এসব কবিতাকে দ্বৈতপ্রকৃতির কবিতা বলা হয়—ব্যক্তির হয়েও সমষ্টির। আর এই দ্বৈতসাত্তিক কবিতাকে সাংগীতিক প্রক্রিয়ায় আরও উজ্জীবিত করেছেন ওকাই। ওকাই তাঁর কবিতায় কেবল নিজের আবেগকেই নয়, তিনি তাঁর সগোত্রীয় প্রত্যয়কেও প্রাধান্য দিয়েছেন সংযত উচ্ছ্বাসে। নাইজেরিয়ার সাহিত্য সমালোচক প্রফেসর ফেমি ওসোফিসান লিখেছেন—
আফ্রিকান কবিতাকে তার প্রাগৈতিহাসিক উৎস—তালবাদ্যের স্পন্দন ও ছন্দে ফিরিয়ে আনতে প্রথম সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেন ওকাই। সে উদ্দেশ্যে তিনি সচেতনভাবে ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠিত বাক্যরীতি ও শব্দভান্ডার ভেঙে দেন এবং বিস্ময়কর ধ্বনিগত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেন এক স্বতন্ত্র কাব্যছন্দ, যা তাঁর কবিতাকে অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করে। (ভূমিকা, লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস, ঘানা পাবলিশিং করপোরেশন, ১৯৭৪)
খুব সাধারণ পাঠকের পক্ষেও এ অনুধাবন সহজতর যে তিনি প্রচুর আঞ্চলিক (লোকাল) শব্দ ব্যবহার করেছেন কবিতায়। অধিকাংশ আফ্রিকান কবিতাই নিজস্ব গোষ্ঠীর বা অঞ্চলের পরিচিত বস্তু, যন্ত্রাদি যেমন বর্শা-তির-ধনুক ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে ওকাই এক ধাপ এগিয়ে আছেন। তিনি শুধু আঞ্চলিক শব্দই নয় আঞ্চলিক থিমও ব্যবহার করেছেন। এসব আঞ্চলিক নাম ও বিষয় তাঁর কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
১৯৪১ সালের ১৫ মার্চ, ঘানার আক্রায় জন্মগ্রহণ করেন আতুকেই ওকাই। ঘানার বিভিন্ন স্কুল কলেজের লেখাপড়া শেষে রাশিয়ার গোর্কি লিটারেরি ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৬৭ সালে সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ফিরে তিনি ঘানাতেই এক বছর অবস্থান করেছেন এবং ঘানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট বৃত্তি নিয়ে পুনরায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৭১-এ। ১৯৬৮-তে তিনি ইউ কে-এর ‘রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস’-এর ফেলো নির্বাচিত হন। ইংল্যান্ডে থাকাবস্থায় ১৯৬৯ সালে তিনি ‘ঘানা অ্যাসোসিয়েশন অব রাইটার্স’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দেশে ফিরে ১৯৭১ সালে ওই অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে বছরেই তিনি ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা বিভাগে রাশিয়ান ভাষার লেকচারার নিযুক্ত হন। একই সঙ্গে তিনি তখন দ্য ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজ ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স-এ কবিতার ওপর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি নাইজেরিয়ার ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ান সাহিত্যের এক্সটারনাল একজামিনার নিযুক্ত হন। জার্মান ও রুশ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর অনেকগুলো বিখ্যাত জার্নাল ও সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি ঘানা তথা আফ্রিকার একজন শক্তিশালী আধুনিক কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঘানার প্রতিনিধিত্বশালী কবি হিসেবে যুগোস্লাভিয়ায় কবিতা উৎসবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে তিনি প্যান আফ্রিকান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। তিনি ঘানা অ্যাসোসিয়েশন অব রাইটার্সের সভাপতি ছিলেন। ওকাইয়ের প্রথম কবিতার বই ‘ফ্লাওয়ারফল’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে (লন্ডনের রাইটার্স ফোরাম কর্তৃক)। কোনো কোনো সমালোচকের মতে, ‘তাঁর কবিতা রাজনৈতিকভাবে উগ্র ও সামাজিকভাবে সচেতন’। ওকাই মৌখিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেছেন প্রাথমিক জীবনে। প্রথম দিকে তিনি পারফর্মিং কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে তিনি নিজেকে বদলেছেন বারবার এবং অনেক উঁচু মানের কবিতা লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ—
ফ্লাওয়ারফল, রাইটার্স ফোরাম লন্ডন (১৯৬৯), ওথ অব দ্য ফন্টমফ্রম অ্যান্ড আদার পোয়েমস, নিউইয়র্ক: সাইমন অ্যান্ড শুস্টার (১৯৭১), লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস, ঘানা পাবলিশিং করপোরেশন (১৯৭৪), ফ্রিডম সিম্ফনি: সিলেক্টেড অ্যান্ড নিউ লাভ পোয়েমস, ঘানা পাবলিশিং কোম্পানি (২০০৮), মানডেলা দ্য স্পিয়ার অ্যান্ড আদার পোয়েমস, জোহানেসবার্গ: আফ্রিকান পার্সপেকটিভস (২০১৩)।
ঘানা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক কফি আসারী ওপোকো ওকাইয়ের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে একটি প্রসঙ্গ এনেছেন। ষাটের দশকে জনৈক আমেরিকান তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল—‘হুজ হর্স আফ্রিকা উড রাইড: দ্য ইস্টার্ন অর দ্য ওয়েস্টার্ন?’ অর্থাৎ ‘কার ঘোড়ায় আফ্রিকা চড়বে—পূর্বের, না পশ্চিমের?’ তখন পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব বেশ তুঙ্গে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন এভাবে যে প্রশ্নকর্তা জানে না আফ্রিকার নিজস্ব ঘোড়া রয়েছে এবং সে তাতে চড়েই এগিয়ে যাবে সামনে এবং তিনি সেই লেখায় আফ্রিকার তরুণ লেখকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন নিজস্ব ঐতিহ্যের পিঠে সওয়ার হয়ে আফ্রিকার সুদূর মুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে। এ কথা বাংলাদেশের তরুণ লেখকদেরও মনে রাখা দরকার। কবিতার আয়নায় কোনো জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য যেমন প্রতিফলিত হয়, তেমনি প্রতিফলিত হয় তার সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক- রাজনৈতিক বিষয়গুলোও। আমরা অধ্যাপক কফি আসারী ওপোকোর কথার সূত্র ধরে বলতে পারি যে বাঙালিরও নিজস্ব ঘোড়া রয়েছে (হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য), সেই ঘোড়াটার যত্ন নিতে হবে সুচারুভাবে এবং তার পিঠে সওয়ার হয়ে পৌঁছাতে হবে মুক্তির আলোকিত দিগন্তে। তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের ব্যাপক পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে তাদের হয়ে উঠতে হবে কসমোপলিটন। বাঙালির সাহিত্যকে অনেক দূর নিয়ে যেতে হলে বিশ্বসাহিত্যের মৌল দিগন্ত স্পর্শ করা দরকার।
আতুকেই ওকাই ঘানা তথা আফ্রিকান আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রভাবসঞ্চারী কবি। তরুণ কবিদের ওপর তাঁর প্রভাব ছিল যুগান্তকারী। কবিতা নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্কশপে তাঁর বক্তৃতা কবি ও কবিতা পাঠকদের অনেক কাজে এসেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর পরিচিতি তেমন বিস্তৃত না হলেও তিনি একজন আন্তর্জাতিক মানের কবি। ওকাই অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। ‘দ্য লেবেল সেন্টেনারি কমেমোরেটিভ গোল্ড মেডেল’, ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল লোটাস প্রাইজ (অ্যান্ড গোল্ড মেডেল)’, ‘দ্য সি মারকোনি গোল্ড মেডেল’ ছাড়াও তিনি ২০০৭ সালে রাষ্ট্র কর্তৃক ‘দ্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড অব মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ভোল্টা’ পান।