বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বলা বাহুল্য, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনায় প্রথম ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রতুলতা, ডিভাইসের অভাব, ডেটা প্যাকেজের উচ্চমূল্য এবং আর্থিক সংকটের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে সঠিকভাবে সংযুক্ত হতে পারত না। ফলে একদিকে একাডেমিক সেশনগুলো দীর্ঘায়িত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা; এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে।

এই সমস্যাগুলো, বিশেষত ক্লাসে উপস্থিত না থাকার কারণে এবং শ্রেণি মূল্যায়ন সঠিকভাবে করতে না পারায় শিক্ষার্থীরা ক্রমেই লেখাপড়ায় আগ্রহ হারাতে বসেছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগে অনার্সের চূড়ান্ত বর্ষ (মূলত ৪৫তম ব্যাচ, ২০১৫-১৬ সেশন) অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা একদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ কমাতে সহায়তা করেছিল, অন্যদিকে দেশব্যাপী শিক্ষার্থী-অভিভাবক, গণমাধ্যমসহ সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় এবং সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য যে গাইডলাইন সরবরাহ করে, তা সমন্বয় করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেকনিক্যাল কমিটি প্রণয়ন করে। ওই টেকনিক্যাল কমিটি বিভিন্ন সময়ে ছাত্র, শিক্ষক, পরিচালক ও ডিনস কমিটির পরামর্শমতে বর্তমান সময়ের উপযোগী একটি অনলাইন পরীক্ষাপদ্ধতি উপস্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক উপাচার্য এটিকে আরও অধিকতর যাচাই-বাছাই ও আলোচনা করার জন্য একাডেমিক কাউন্সিলে প্রেরণ করেন।

সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে। এভাবে সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীসহায়ক চমৎকার একটি অনলাইন পরীক্ষাপদ্ধতি এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে; যেখানে শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা, অবস্থান, ডিভাইস সমস্যা, ইন্টারনেট কানেকটিভিটি ইত্যাদি বিবেচনায় ছিল।

নির্দেশনায় আছে, পরীক্ষা কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষার পূর্বে অনলাইন মাধ্যমে মিটিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং পরীক্ষা–সম্পর্কিত নির্দেশনা শিক্ষার্থীদের প্রদান করা। শিক্ষার্থীরা তাদের লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র কীভাবে পিডিএফ ফরম্যাটে রূপান্তর করবে এবং কীভাবে ফাইলের নামকরণ করে অনলাইনে জমা দেবে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পরীক্ষা কমিটি অনলাইনে নমুনা পরীক্ষার (মকটেস্ট) আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ ছাড়া রিভিউ ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা–সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর দেওয়া, পরীক্ষা কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ই-মেইল আইডি ও মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে পরীক্ষকদের প্রদান করবে। কোনো শিক্ষার্থী যদি লিখিত পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র জমা দিতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অবহিত করতে হবে। অনিচ্ছাকৃত দেরিতে জমা হওয়া উত্তরপত্রের ক্ষেত্রে শিক্ষক তার বিচক্ষণতার ব্যবহার করে সহানুভূতির সঙ্গে উত্তরপত্র গ্রহণ বা মূল্যায়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

সব কটি বর্ষের পরীক্ষা একসঙ্গে শুরু হওয়ায় ফলাফল প্রণয়নে পরীক্ষা অফিসের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তে পারে। সেটাকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে চমৎকার ডেটাবেইস সিস্টেম। অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বর জমা হয়ে যাবে পরীক্ষা অফিস কর্তৃক পরিচালিত আইডি দিয়ে। ফলে ট্র্যাক করা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে সহজে। ইউজিসির নির্দেশমতে, নতুন প্রণয়নকৃত এই পরীক্ষাপদ্ধতিতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, কম সময়ে পরীক্ষা নেওয়া এবং ৩০ নম্বরের একটি স্ট্রাকচার্ড মৌখিক পরীক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে; যেখানে তিনটি ধাপ আছে।

সেগুলো হলো (১) লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নের ওপর ৫ নম্বর, (২) ওই প্রশ্ন এবং কোর্স থেকে শিক্ষণের প্রয়োগ/ব্যবহার এবং উপস্থাপনার জন্য ১০ নম্বর এবং (৩) প্রশ্ন/কোর্স-সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রকাশ/উদ্‌ঘাটন ইত্যাদির জন্য ১৫ নম্বর। অর্থাৎ প্রণীত প্রশ্নের উত্তরে যা লিখছে, তার ওপরই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা সে অনুযায়ী উত্তর দিতে চেষ্টা করছে। লিখিত ও অ্যাসাইনমেন্ট পর্বেও এ রকম কতগুলো নির্দেশনা দেওয়া আছে। ফলে সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার্থীদের লার্নিং আউটকাম, কোর্সের অবজেকটিভ, লব্ধ জ্ঞান, এর প্রয়োগ ও ব্যবহার সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণা নিয়েই পরীক্ষা সমাপ্ত হচ্ছে; যা কোনো অংশেই প্রচলিত পরীক্ষার (ফেস টু ফেস) চেয়ে কম মনে হবে না।

পরীক্ষা পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো কারণে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে সংযোগ পেতে কিংবা ফাইল আপলোড করতে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক টেলিফোনে মৌখিক পরীক্ষা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফাইলটি প্রেরণের (ই-মেইলে) ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে পরীক্ষার ফি মওকুফ করা হয়েছে।

এ ছাড়া করোনাভাইরাসের শুরু থেকেই জাবি কর্তৃপক্ষ নিয়েছে নানা কল্যাণমুখী পদক্ষেপ। যেমন বিকাশের মাধ্যমে অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা, স্মার্টফোন ক্রয়ের জন্য ৮ হাজার টাকা করে লোন প্রদান, ল্যাপটপ ক্রয়ে স্বল্প সুদে ৬০ হাজার টাকা করে ঋণ প্রদান, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানীদের পরিচালনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা সমস্যা সমাধানে পরামর্শমূলক ওয়েবিনার পরিচালনা করা। ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী—সবার জন্য গঠন করা হয়েছে শক্তিশালী কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ কমিটি।


দেখা গেছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বারবার পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েও পরীক্ষা নিতে পারছে না। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এনে সশরীর পরীক্ষা শুরু করেও তা শেষ করতে পারেনি করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে। এমনকি পরীক্ষা অসমাপ্ত রেখেই শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন দিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। খুবই ধৈর্য ও সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে এবং চমৎকার শিক্ষার্থীবান্ধব একটি গ্রহণযোগ্য পরীক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন করতে সমর্থ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মডেল অনুসরণ করতে পারে।

এম মেসবাহউদ্দিন সরকার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন