default-image

সম্মান পর্যায়ের সমাজবিজ্ঞান ক্লাসে জেন্ডারবিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অনুশীলন দেওয়া হলো। দুটো তালিকা তৈরি করতে হবে। একটিতে থাকবে সেসব কাজ, যেগুলো কেবল নারী পারে, অপরটিতে সেসব কাজ, যেগুলো কেবল পুরুষ পারে। অল্প কজন ছাড়া প্রায় সবারই পুরুষদের কাজের তালিকাটি বেশ লম্বা হলো।

অনেকের তালিকায় যে কাজটি কমন ছিল, তা হলো পুরুষ বাস-ট্রাক চালাতে পারে (অর্থাৎ বাস-ট্রাক চালানোর কাজটি নারী পারে না) এবং নারী রান্না করতে পারে (অর্থাৎ রান্নার কাজটি পুরুষ পারে না)। তাদের অনুশীলন শেষে আলোচনা পর্বে যখন প্রশ্ন করলাম, নারীর শারীরিক গঠনের মধ্যে এমন কোনো ব্যাপার আছে কি যা বাস-ট্রাক চালানোর ক্ষেত্রে এবং পুরুষের শরীরে এমন কিছু কি আছে, যা তার রান্নার কাজে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ? উত্তরে নিজের বোকামি বুঝতে পেরে কারও চেহারায় সলজ্জ হাসি, কারও–বা সরল স্বীকারোক্তি, ‘না, নেই’। পরবর্তী প্রশ্ন: তাহলে কেন বাস-ট্রাক চালানোকে এককভাবে পুরুষের কাজ মনে করলেন, আর রান্নার কাজ এককভাবে নারীর ভাবলেন? উত্তর: আমাদের দেশে তো বাস-ট্রাকের ড্রাইভার সব পুরুষ আর রান্না তো সব সময় মহিলাদেরই করতে দেখি।

শিক্ষার্থীদের দোষ নেই। কারণ, শৈশব থেকে চোখের সামনে বাস-ট্রাকের ড্রাইভিং সিটে পুরুষদের বসতে দেখে এই সিটটি বাংলাদেশে কেবল পুরুষের জন্য তৈরি বলে তারা ধরে নিয়েছিল। আলোচনার একপর্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী ট্রাক-বাসচালক (যাদের অনেকে মুসলিম) এবং বিশ্বখ্যাত শেফদের (যাদের প্রায় সবাই পুরুষ) এর কিছু ছবি দেখানো হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় তাদের কাছে।

বিজ্ঞাপন

সমাজবিজ্ঞানী বার্জার ও লুকম্যান ১৯৬৬ সালে বাস্তবতার সামাজিক গঠন তত্ত্বে বলেছিলেন, মানুষের ক্রমাগত একই আচরণ, ভাবনা ও অভিজ্ঞতা তার নিত্যকার অভ্যাসে পরিণত হয়, যার প্রতি সে এতটাই অভ্যস্ত ও অনুগত হয়ে পড়ে যে এর বাইরে কিছু তার চিন্তায় আর প্রবেশ করে না। একটা সময় সে ভুলেও যায়, এর বাইরেও আরও কিছু আছে এবং তার অভ্যাস ও আচরণ তার কাছে এতটাই সত্য হয়ে ওঠে যে তার অভ্যাস/অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা থেকে সে গঠন করে তার বাস্তবতা।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞজনেরা যাঁরা ফুলবাড়ী উপজেলার আয়েশা সিদ্দিকাকে বিয়ের নিবন্ধক হিসেবে অনুপযুক্ত মনে করেছেন, তাঁদেরই বা দোষ দিই কীভাবে? কারণ, বাংলাদেশের মানুষের বিয়ে নিবন্ধন করার কাজটি এককভাবে ‘পুরুষের কাজ’ বলেই তাঁরা ভাবতে, বিশ্বাস করতে ও দেখতে অভ্যস্ত হয়েছেন আশৈশব। কখনো চিন্তা করেননি যে নারীর দেহে এমন কিছু নেই, যা একটি বিয়ের নিবন্ধনের কাজে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ। ভূমি বা গাড়ি নিবন্ধনকারী ব্যক্তি নারী হলে ‘মাসের বিশেষ দিনগুলোতে’ তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সে কথা কারও মনে না এলেও বিয়ে নিবন্ধনকারী ব্যক্তি নারী হলে সেই দিনগুলোতে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তাই সে প্রশ্ন পর্যন্ত তোলা হয়েছে।

জীবিকার প্রয়োজনে এবং নিজের শিক্ষা ও বিচার–বুদ্ধিতে নিজেকে যোগ্য বিবেচনা করাটা যে গণ্ডির বাইরে পা রাখা হয়ে যাচ্ছে, সেটা বোঝেননি আয়েশা সিদ্দিকা। তাই তিনি আবেদন করেছিলেন বিয়ে নিবন্ধক পদে। বছরের পর বছর মামলা চালানো বা পত্রিকার শিরোনাম হওয়ার চেয়ে একজন সাধারণ পেশাজীবী হয়ে দিনাতিপাত করাটাই হয়তো তাঁর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের বিজ্ঞজনেরা তাঁর এই সাদামাটা লক্ষ্য নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়লেন। মাঠঘাট পেরিয়ে বর্ষা-বাদল সামলে একজন নারী বিয়ে পড়াতে গিয়ে না জানি কোনো বিপদে পড়ে যান। শেষে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে তাঁকে উদ্ধারের জন্য। নারীর প্রতি এই যে বিশেষ অনুগ্রহ, এই অনুগ্রহটুকু না করলেই যে নারীর মঙ্গল করা হয়, তা শত বছর আগে বেগম রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন বলেই অনুগ্রহ করে অনুগ্রহ না করতে মিনতি জানিয়েছিলেন।

আজ ২০২১ সালেও নারীর প্রতি রাষ্ট্রের এই অযাচিত অনুগ্রহের কারণে কেবল একজন আয়েশা সিদ্দিকা শুধু চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না, পূর্ণ যোগ্যতা থাকার পরও নারীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এমনকি ধর্মীয় বিধানেরও অপব্যাখ্যা ঘটানো হচ্ছে। পথেঘাটে হয়রানি করা, কর্মক্ষেত্রে প্রাপ্য সম্মান না দেওয়া, গৃহকর্মের সব ভার এককভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে নেটফ্লিক্সে বসে থাকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনুগ্রহ করা হলে বরং নারীর উপকার হতো।

আশার কথা, আয়েশা সিদ্দিকার ভাই এবং স্বামীর সমর্থন রয়েছে তাঁদের পরিবারের এই নারী সদস্যটির সিদ্ধান্তে। আর আফসোসের কথা, পুরুষ বিয়ে নিবন্ধকবৃন্দ এ বিষয়ে নীরব। ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন যাঁরা, তাঁরাও নীরব। রাষ্ট্রের বিজ্ঞজনদের ভুল তাহলে কীভাবে ভাঙবে, বিয়ে নিবন্ধকের যেসব যোগ্যতা লাগে, তা নারী-পুরুষ যে কেউ অর্জন করতে পারেন। পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া, মিসর, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও উদাহরণ রয়েছে নারী বিয়ে নিবন্ধকের। অবশ্য ধর্মীয় নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, যদি অন্য মুসলিম দেশে নারী বিয়ে নিবন্ধকের প্রচলন থাকে, তাহলে বাংলাদেশেও ধর্মীয় গাইডলাইনের আলোকে এ সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৪ সালের মুসলিম বিয়ে ও তালাক (নিবন্ধন) আইনের ৪ নম্বর ধারায় যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো ‘ব্যক্তি’, ‘পুরুষ’ নয়। অর্থাৎ যিনি বিয়ে নিবন্ধন করার লাইসেন্স পাবেন, তিনি একজন ব্যক্তি। নারী না পুরুষ সেই নিবন্ধক হবেন, সে বিষয়ে ১৭ ধারার এ আইনের কোথাও বলা নেই। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষক তার নিবন্ধে (<http://titudah. chuadanga. gov. bd/site/page/ 90038 a 17-9 fb4-4006-b 588-e 26 cb 5 e 661 a1 /%E 0 %A 6 % 95 %E 0 %A 6 %BE%E 0 %A 6 %9 C%E 0 %A 7 % 80 % 20 %E 0 %A 6 % 85 %E 0 %A 6 %AB%E 0 %A 6 %BF%E 0 %A 6 %B8>) উল্লেখ করেছেন, বিয়ে পড়ানো ও বিয়ে নিবন্ধন করা—দুটো দুই কাজ। কিন্তু যে বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে তা হলো, ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিয়ে আসলে ‘পড়ানোর’ কোনো বিষয় নয়। আমাদের দেশে বিয়ে ‘পড়ানো’ হয়, তা-ও আবার কখনো কখনো বিয়ে ‘পড়ানোর’ দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘কাজি’ নিজেই বিয়ে নিবন্ধনের কাজ করেন। দুই কাজ একজনকে করতে দেখেই আমাদের বিজ্ঞজনদের চিন্তায় গোলমাল বেধে গেছে। ১৯৭৪ সালের আইন অনুযায়ী দুই কাজ একজনের করার কথা নয়।

বলা প্রয়োজন, ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী নারী বিয়ে করেন (আমাদের দেশে ভুল করে যেটিকে বলা হয়, মেয়েরা বিয়ে বসেন) যখন একজন পুরুষ তাঁকে প্রস্তাব দেন। এটি দুজন মুসলিম নারী-পুরুষের মাঝে সম্পাদিত একটি চুক্তি, যা প্রাপ্তবয়স্ক দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্র তার সুবিধার্থে বিয়ে নিবন্ধনের আইন করেছে বলে বিয়ে নিবন্ধকের প্রয়োজন হয়েছে, যিনি সরকারি বিধান অনুযায়ী বিয়ের পাত্রপাত্রী ও বিয়েসংক্রান্ত তথ্যাদি সংরক্ষণ করেন। এ কাজের জন্য বিয়ের আয়োজনস্থলেও তাঁর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিজ্ঞজনেরা কী বুঝতে গিয়ে কী বুঝলেন, যার খেসারত হিসেবে তিন সন্তানের জননী আয়েশা সিদ্দিকাকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত সরকারি চাকরির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হলো ২০১২ সাল থেকে।

হাস্যকর বিষয় হলো, স্যানিটারি প্যাডের বিজ্ঞাপনে একজন নারী দ্রুতগতিতে সাইকেল চালিয়ে পাহাড়-পর্বত-জঙ্গল-বন্ধুর পথ পাড়ি দিচ্ছেন দেখলে সেটা আমরা মেনে নিতে পারি। যখন একজন নারী সরকারি কাজে যোগদানের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্যতা নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তখন মাসের ‘বিশেষ দিনগুলো’তে তিনি সে দায়িত্ব সামলাবেন কীভাবে, তা ভেবে বেসামাল হই।

আয়েশা সিদ্দিকা কিন্তু বিয়ে পড়াতে চাননি, বিয়ে নিবন্ধক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বিতর্কের ডামাডোলের মাঝে প্রায় এক দশক আগে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণে তাঁর যে ক্ষতি হয়েছে, সেটি কি আদালত অনুগ্রহ করে দেখবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন? বিজ্ঞজনেরা অজ্ঞতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসুন এবং নারীর প্রতি অযাচিত অনুগ্রহ করা থেকে বিরত থাকুন, সেটিই প্রত্যাশা।

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের কো–অর্ডিনেটর।

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন