
আল্লাহ তাআলা তাঁর গুপ্ত ও রহস্যময় অপার শক্তির কুশলতায় মানবসত্তাকে বিকশিত করেছেন। প্রাণের ও মনের সমন্বিত উপলব্ধির জন্যই মানুষ সৃষ্টির সেরা। বলা হয় ‘প্রাণ থাকলেই প্রাণী, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।’ আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অধ্যাত্ম চেতনা, অন্যদিকে মানবজীবনের মূল মর্ম হলো আত্মশুদ্ধি। তাই মানুষের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক সুগভীর। পৃথিবীতে আগত সব নবী-রাসুল ও আসমানি কিতাব বা ঐশী ধর্মগ্রন্থের একমাত্র মিশন ছিল মানবাত্মার সংশোধন। মানবাত্মা হলো শাসক, আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার প্রজা। যখন শাসক ভালো হয়, তার প্রজারাও ভালো হয়, আর যখন শাসক খারাপ হয়, তার প্রজারাও খারাপ হয়। আত্মার সংশোধন শুধু একজন মানুষের জন্যই নয়; বরং ইহকালীন জীবনের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি এর ওপরই নির্ভর করে। মানুষের অধ্যাত্ম চেতনা ও আত্মশক্তির অনন্য চালিকাশক্তি হলো ‘কাল্ব’ বা অন্তঃকরণ। এর সুস্থতার সঙ্গে দেহ-মনের সুস্থতা সম্পৃক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘সাবধান! নিশ্চয়ই প্রত্যেক দেহে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে। যখন সেটি ঠিক থাকে, তখন দেহের অন্য অঙ্গগুলোও ঠিক হয়ে যায়। আর যদি তা বিনষ্ট হয়, তাহলে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। এর নাম হলো কাল্ব বা মানবাত্মা।’ (বুখারি ও মুসলিম)
মানুষের আত্মাই দেহের নিয়ন্ত্রক। অন্তর যদি নিজে কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে, তবে সারা শরীরের কার্যকলাপও সঠিক থাকবে। পক্ষান্তরে অন্তর যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তবে শরীরের সব ব্যবস্থাপনাও বিনষ্ট হবে। তাই সবার আগে আত্মাকে ঠিক করা দরকার। আত্মার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা ও মলিনতা। লোহা কিছুদিন মাটিতে পড়ে থাকলে যেমন মরিচা ধরে, নষ্ট হয়ে যায়, তদ্রূপ আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন না হলে বা আত্মাকে সঠিকভাবে পরিচালনা না করা হলে লোহার মতোই মরিচাপ্রাপ্ত হয়ে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে অসৎ চিন্তা এবং কুধারণা বাসা বাঁধতে থাকে। একপর্যায়ে তা আর সঠিকভাবে কাজ করে না। এভাবেই মানুষ তার সৎ কর্ম করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নবী করিম (সা.) যথার্থই বলেছেন, ‘লোহার মতো আত্মাও মরিচাপ্রাপ্ত হয়।’ (তিরমিজি)
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার শক্তিই নফস বা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে পারে এবং এর মাধ্যমেই রুহানি চেতনা বিকশিত হয়। মানুষের অধ্যাত্ম চেতনা ও আত্মশুদ্ধি এমনই এক প্রবল প্রখর শক্তি। যুগশ্রেষ্ঠ দার্শনিক হজরত ইমাম গাজ্জালি (র.) বলেছেন, ‘মানুষের আত্মা স্বচ্ছ অসির মতো উজ্জ্বল। আর মন্দ স্বভাব ধূম্র ও অন্ধকারের মতো মলিন। তা ক্রমশ আত্মার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আত্মাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে এবং একটি কালো আবরণ সৃষ্টি করে। যার ফলে সে আল্লাহর দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়। পক্ষান্তরে মানুষের মহৎ গুণ ও সৎ স্বভাব উজ্জ্বল আলোকতুল্য। যা আত্মার অভ্যন্তরে প্রবেশপূর্বক সকল মলিনতা ও পাপ বিদূরিত করে আত্মার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।’ (কিমিয়ায়ে সা’আদত)
অন্তঃকরণ হলো আল্লাহর নূরের অবস্থানস্থল। এর দ্বারা মানুষ প্রকৃত মানুষ হিসেবে পরিচয় লাভ করে এবং দেহের পরিশুদ্ধি লাভ হয়। অন্তরের পরিচ্ছন্নতার জন্য নবী করিম (সা.) সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে পরিষ্কার করে দিন যেমনিভাবে সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়।’ (বুখারি) অন্তরের পরিচ্ছন্নতার জন্যও বিশেষভাবে প্রচেষ্টা করে তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এমন অন্তর থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই, যে অন্তরে বিনয়-নম্রতা নেই।’ (মুসলিম)
যত ইবাদতই মানুষ পালন করুক না কেন, এর লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তরের বিশুদ্ধতা। ইমান ও আমলের যথার্থ সমন্বয়ের পর আত্মার জগতে দীপ্তি, পরিতৃপ্তির মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের উপায় হলো অধ্যাত্ম চেতনা। অন্তর পরিশুদ্ধ হলে অন্য কাজকর্মও সঠিকভাবে আদায় হবে। এ জন্য অন্তরের শুদ্ধকরণ আগে জরুরি। প্রাণিজ সত্তা, আত্মিক শক্তি আর মানবীয় গুণাবলিতে বিকশিত মানুষই পরিপূর্ণ মানুষ বা ‘ইনসানে কামিল’—এখানেই রয়েছে মানব সৃষ্টির রহস্য ও মানুষের কর্মের চেতনা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষায় আত্মার উন্নতি ও আত্মশুদ্ধির প্রেরণা রয়েছে। এ জন্যই বলা হয় ‘যে নিজেকে চিনেছে সেই তার প্রভুকে চিনেছে।’ ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সেই সফলকাম হয়েছে—যে নিজের নফস বা আত্মাকে কলুষতা থেকে মুক্ত করেছে। আর সে অকৃতকার্য হয়েছে যে নফসকে কলুষিত করেছে।’ (সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৯-১০)
প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধ ও বুদ্ধির মানুষ জাগতিক জীবনে হয় সফল ও অনুসরণীয়। অস্বচ্ছ ময়লাযুক্ত অন্তর নিয়ে কখনো আল্লাহকে পাওয়া যায় না বা ভালো কিছু করা যায় না। তাই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে হলে এবং বৃহত্তর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হলে আত্মশুদ্ধি অবশ্যই জরুরি। আত্মিক পরিশুদ্ধতা ও অধ্যাত্ম শক্তি ছাড়া মানবজীবন ব্যর্থ ও বিফল। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে।’ (সূরা শোআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯)
প্রকৃত মানুষ ও মনুষ্যত্ব পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যার অপর নাম বিবেক। এরই অভাবে মানুষ হয় পশু ও অধম। এ জন্যই দেখা যায়, শিশু জন্মালে দোয়া চাওয়া হয় যেন মানুষ হয়, ‘নব দম্পতির প্রতি আশীর্বাদ ও শুভাশিস ‘যেন মানুষ হয়’, তবে কি এরা মানুষ নয়? মূলত এখানে প্রত্যাশা হলো প্রকৃত মনুষ্যত্ব, রুহানি শক্তি যে মানুষের চেতনা, সেই মানুষ। আবার মানুষের মৃত্যুতে সবাই বলাবলি করে, ‘বড় ভালো লোক ছিল।’ কেননা সবাই চায় দয়াময় আল্লাহর দরবারে সে যেন আদর্শ মানুষ হিসেবে কৃতকার্য হয়; দুনিয়ার প্রতি যে নির্মোহ! তাই মানুষের পার্থিব ধন-সম্পদ ও উন্নতি যতই হোক না কেন, মানবাত্মার পরিশুদ্ধির উৎকর্ষে মনুষ্যত্বের জাগৃতি বেশি হওয়া দরকার।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: শিক্ষক, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]