কন্যাশিশু এগিয়ে যাবে, পুরুষের পাশাপাশি

ফাইল ছবি

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীটির নাম ‘মানুষ’। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে এতে কোনো বিতর্ক নেই। অথচ শুধু লিঙ্গবৈষম্যের কারণেই এর বিতর্ক চলে আসছে বছরের পরে বছর, যুগের পরে যুগ, এমনকি শতাব্দী পেরিয়ে নতুন শতাব্দীতেও…! একমাত্র মানবজাতির ক্ষেত্রেই এই বিভেদ চলমান। মূলত ক্ষমতার লড়াই আর পেশিশক্তির দম্ভকে পুঁজি করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এ লড়াই কালক্রমে বেগবান হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়েই এই লিঙ্গবৈষম্যের রোষানলে পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় জীবনের অকালমৃত্যু ঘটে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। নির্বাক শ্রোতা-দর্শক কেবল সাক্ষী থাকে আবহমানকাল ধরে।

আদিমকাল থেকে মানবজাতির নানা দিক থেকে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন হয়েছে বৈকি! ‘মানুষ’ যেন দৃঢ়ভাবেই ‘সভ্য’ জাতির তকমা গায়ে লাগাতে পেরেছে সেই কয়েক শতাব্দী আগেই! পক্ষান্তরে কতিপয় মানুষের মধ্যে যখন মানবিকতার লেশমাত্র চোখে পড়ে না, বরং শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে পুঁজি করে অমানবিক, তথা পাশবিক কাজের নেতৃত্ব দেয়, তখন মানবজাতিকে বেজায় লজ্জা পেতে হয়! আজকাল অনুন্নত-উন্নয়নশীল, এমনকি উন্নত দেশেও লিঙ্গবৈষম্যের ব্যাপকতা ছড়াচ্ছে নতুন কায়দায়! আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এ উপমহাদেশে রাজা রামমোহন রায়ের বদৌলতে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী ৩০০ বছরে নারীর প্রতি সুবিচার বা ন্যায্য অধিকার সেই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ, আনুপাতিক হারে সার্বিক উন্নয়ন যতটা ঘটেছে, মানসিকতার পরিবর্তন, এমনকি মানবিকতার উন্নয়ন ততটা ঘটেনি!

প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বরে হলেও এবার ৫ অক্টোবর বাংলাদেশে পালিত হয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। আর আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হয় ১১ অক্টোবর। তবে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন দিনে দিবসটি পালন করে থাকে। অনেকটা ঘটা করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বর্ণাঢ্য স্ট্যাটাস দিয়েই পালন করে থাকে অনেকে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ দেশে প্রথম জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালনের নিয়ম চালু হয়। মূলত জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এ দেশে প্রথম এ উদ্যোগ হাতে নেয়।

ফাইল ছবি

অনেকের মতো, আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, এত এত দিবসের ভিড়ে কেন আবার নতুন করে যুক্ত করা হলো এই কন্যাশিশু দিবস? বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে এই বিশেষ দিবস পালন করার গুরুত্ব আসলে কী? শুধুই কি সারা দেশের কন্যাশিশুদের জন্য কেবল একটি দিন উৎসর্গ করামাত্র? বাস্তবতার নিরিখে এ দিবসের গুরুত্ব কতখানি ব্যাপক, তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। সারা বিশ্বেই অনেকগুলো কারণে কন্যাশিশুরা আজ বেজায় অবহেলিত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা, ভালোবাসা—বলতে গেলে প্রায় সবদিক থেকেই বঞ্চিত তারা। শুধু যে আমাদের দেশের চিত্র এমন, তা কিন্তু নয়। সারা বিশ্বেই কোনো না কোনো জায়গায় প্রতি মুহূর্তে অবহেলার শিকার হচ্ছে আমাদের কোমলমতি কন্যাশিশুরা।

পরিবার ছাড়াও সামাজিকভাবেও তারা হচ্ছে নানাভাবে নির্যাতিত। মূলত মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসাসুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে এ দিবসের সূচনা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম দিবসটি পালন করা হয়। জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো প্রতিবছর দিবসটি পালন করে থাকে। সারা দেশে, তথা বিশ্বব্যাপী কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার সঠিক চিত্র বলা খুবই দুরূহ ব্যাপার! বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কন্যাশিশু নানা ধরনের অবহেলার শিকার হয়। সুন্দর শিক্ষাজীবনকে গলা টিপে হত্যা করে গ্রামগঞ্জে নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য করার শেষ পরিণাম হলো বর্ণনাতীত পারিবারিক সহিংসতা! নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ওই কোমলমতি কন্যাশিশুটিকে ‘মা’ হতে বাধ্য করা হয়! এটি নিশ্চয়ই একটি ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন! পত্রিকা খুললেই আধুনিক কায়দায় নারীকে কেন্দ্র করে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করার চিত্র চোখে পড়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরুষশাসিত এই সমাজব্যবস্থায় নারী, তথা কন্যাশিশুকে মাদকাসক্তি, মাদকের ব্যবসা, এমনি যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়। এ যেন অলিখিত এক বৈধ শাসনব্যবস্থা! এসব নেতিবাচক ঘটনার নেপথ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে অনেকেই একমত পোষণ করবেন। যেমন: গণসচেতনতার অভাব, দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরূপ প্রভাব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, পারিবারিক ও সমাজিক মূল্যবোধের অভাব—সর্বোপরি নারীকে ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার নোংরা মানসিকতা, এমনকি প্রকৃত শিক্ষা ও বাস্তবায়নের অভাব ইত্যাদি! অতীতের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

এ ছাড়া, তথ্যপ্রযুক্তিতেও মোটামুটি ঈর্ষাজাগানিয়া অবস্থায় রয়েছে আমাদের দেশ। এখন প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা অর্জন ও তার বাস্তবায়ন। প্রথমে পরিবার থেকেই এর বীজ বপন করতে হবে। পর্যায়ক্রমে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষাদানের পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। সামাজিক কুপ্রথাকে অচিরেই নিপাট করে একটি সুস্থ-সুন্দর আবাসভূমি গড়তে সবার ঐকান্তিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করতে গিয়ে সরকারের পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো সমমনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আজকের এ জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আপামর জনতার প্রতি এই হোক উদাত্ত আহ্বান, আর যেন একটি কন্যাশিশুও নতুন করে বৈষম্যের শিকার না হয়, নির্যাতনের শিকার না হয়, সারা বিশ্বের সব নারীকে আমরা যাতে ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিই; অন্তর থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা! এমনি করেই প্রতিবছর এই দিবস ফিরে আসবে, আর নারীরা জেগে উঠবে নব উদ্যমে, দুর্বার গতিতে! তবেই তো জাতীয় উন্নয়নের অগ্রণী পথিক হয়ে নারী, তথা কন্যাশিশু সমানতালে এগিয়ে যাবে, মানুষ হয়ে পুরুষের পাশাপাশি!

*লেখক: মো. তানজিমুল ইসলাম, কো-অর্ডিনেটর, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।