বিজ্ঞাপন

সিডিসি যেসব ধরনকে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন ঘোষণা করেছে, সেগুলোর মধ্যে একটি সাউথ আফ্রিকান ধরনকে বাংলাদেশে গত মার্চ মাস থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবি এবং যবিপ্রবির গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সাউথ আফ্রিকান ধরনটিই দেশে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ সৃষ্টি করছে। এই ধরনটি সংক্রমণ ক্ষমতা শতকরা ৫০ ভাগ বাড়াতে পারে, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি এই ধরনের বিরুদ্ধে কম কার্যকর, এমনকি টিকাও হয়তো সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তবে, এ কথা বলে রাখা ভালো যে এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, টিকা গ্রহণ করলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই এ কথা বলা না গেলেও, টিকা গ্রহণ করলে বিভিন্ন ধরন দ্বারা সংক্রমণের ঝুঁকি কমে এবং আক্রান্ত হলেও রোগের তীব্রতা কমতে পারে। সুতরাং নতুন ধরন সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি টিকা গ্রহণ করাও জরুরি।

সাউথ আফ্রিকান ধরনের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই করোনার ভারতীয় ধরন আমাদের জন্য নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় ধরনের মধ্যে কেবল বি ১.১৬৭.২ নামক ধরনটি পাওয়া গেছে, যাকে ইতিমধ্যেই ইউকে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন এবং সিডিসি ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যে এই ধরনটি নিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ভ্যারিয়েন্টটিও সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের মহারাষ্ট্রে উচ্চ সংক্রমণের জন্য দায়ী ভারতীয় ধরন বি ১.১৬৭ পাওয়া যায়নি। এই ধরনটিকে ডাবল মিউটেন্ট ধরন বলা হয়; কেননা এর স্পাইক প্রোটিনে এল ৪৫২ আর এবং ই৪৮৪ কিউ নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন বিদ্যমান, যে দুটি মিউটেশন ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম। এল ৪৫২ আর মিউটেশনটি ভারতীয় ধরন ছাড়াও নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার ধরন পাওয়া যায়, আবার ই৪৮৪ কিউ মিউটেশনটি সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ধরনের মধ্যেও থাকে। বাংলাদেশে ডাবল মিউটেন্ট এখন পর্যন্ত না পাওয়া গেলেও উভয় মিউটেশনই বাংলাদেশে সংক্রমণশীল ধরনগুলোর মধ্যে পৃথকভাবে রয়েছে।

বাংলাদেশে ভারতীয় অন্য ধরনগুলো আছে কি না, কোন ধরনের ভ্যারিয়েন্টগুলো দিয়ে বাংলাদেশে সংক্রমণ বেশি হচ্ছে, কিংবা বাংলাদেশেই নতুন কোনো ধরনের উৎপত্তি হচ্ছে কি না, তা জানতে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং করা একটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। প্রতিটি ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের নমুনা থেকে ধরনগুলো শনাক্ত করে তার ডেটাবেইস তৈরি করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা কঠিন বৈকি। তাই প্রাথমিকভাবে করোনার ধরনগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য কম খরচে বিকল্প পদ্ধতির সন্ধান করা জরুরি।

এ কথা ঠিক যে ভাইরাসের ধরনগুলো বেশ কিছু মিউটেশন দ্বারা নির্ধারিত হয়। সব সময়ে এই মিউটেশনগুলো কেবল স্পাইক প্রোটিনে থাকে এমন নয়, তবে বর্তমানে সঞ্চরণশীল ধরনগুলোর মধ্যে স্পাইক প্রোটিনে এমন কিছু ‘সিগনেচার মিউটেশন’ আছে, যা শনাক্ত করতে পারলে ধরনগুলো সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। ভাইরাল জিনোমের আংশিক সিকোয়েন্স করে গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন শনাক্ত করার সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা আমাদের গবেষকেরা গত বছরের জুনে একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত প্রকাশনায় উল্লেখ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, স্পাইক প্রোটিনে উল্লিখিত ডাবল মিউটেশন (এল ৪৫২ আর এবং ই৪৮৪ কিউ) শনাক্ত করা গেলে বলা যেতে পারে, তা ভারতীয় বি ১.১৬৭ ধরন। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স না করেই স্যাঙ্গার সিকোয়েন্সিং পদ্ধতিতে স্পাইক প্রোটিনের পারশিয়াল সিকোয়েন্স করেই প্রাথমিকভাবে এই ধরন নির্ধারণ করা সম্ভব। পারশিয়াল সিকোয়েন্সিংয়ের খরচ পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সের তুলনায় অত্যন্ত কম (মাত্র ১০০০ টাকার মতো) এবং সময়ও কম দরকার হয়।

বাংলাদেশে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী করোনার ধরন নির্ণয় এবং কোন ধরনের কারণে কোন অঞ্চলে করোনার প্রাদুর্ভাব কেমন হচ্ছে, তা নির্ধারণের জন্য নিয়মিতভাবে করোনার স্পাইক প্রোটিনের পারশিয়াল সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। কিন্তু স্পাইক প্রোটিনটি বড় হওয়ায় পুরো স্পাইক প্রোটিনের পারশিয়াল সিকোয়েন্স একবারে করা কঠিন। যেহেতু স্পাইক প্রোটিনের এস ২ সাবইউনিটে ‘সিগনেচার মিউটেশন’ বিরল, তাই এস ১ সাবইউনিটের সিকোয়েন্স করলেই আমরা ধরন নির্ধারণকারী মিউটেশনগুলো পেতে পারি। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, পারশিয়াল সিকোয়েন্স করতে গেলে নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্সের যে অংশটির সিকোয়েন্স করা হবে, তাকে এমপ্লিফাই করা প্রয়োজন। সেই অংশ এমপ্লিফাই করতে দরকার প্রাইমার। যে অংশটুকুকে আমরা সিকোয়েন্স করতে চাই, সে অনুযায়ী প্রাইমার ডিজাইন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব।

প্রয়োজন হলে একাধিক প্রাইমার সেট দিয়ে স্পাইক প্রোটিনের সংকেত বহনকারী নিউক্লিওটাইডের একাধিক অংশ এমপ্লিফাই করে স্পাইক প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ সিকোয়েন্স আমরা পেতে পারি। সে ক্ষেত্রেও খরচ ও সময় পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সের তুলনায় নগণ্য হবে। আরেকটি বিষয় বলে রাখা ভালো, স্পাইক প্রোটিনের যে অংশ (আরবিডি-রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন) মানুষের কোষের রিসেপ্টরে যুক্ত হয়, গুরুত্বপূর্ণ সেই অংশের সিকোয়েন্স করলেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারি। ইতিমধ্যেই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টারে স্পাইক প্রোটিনের বিভিন্ন অংশ সিকোয়েন্স করার মতো প্রাইমার সেট ডিজাইন করা হয়েছে এবং তা ল্যাবে আছে, যা দিয়ে পারশিয়াল সিকোয়েন্স করা হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যেমন ‘আরডিআরপি’, ‘এন’ প্রোটিন এবং ‘ই’ প্রোটিনের পারশিয়াল সিকোয়েন্স করার মতো প্রাইমারও যবিপ্রবিতে রয়েছে।

আরেকটি বিষয় বলে রাখা দরকার। প্রয়োজনবোধে সিকোয়েন্সিং ছাড়াও করোনার ধরন নির্ণয়ে ‘স্মার্ট কিট’ তৈরি করে পিসিআর-এর মাধ্যমেও করোনার ভ্যারিয়েন্টের ধরন নির্ণয় করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসার আগে, সার্স কোভি-২-এর বিভিন্ন প্রকরণ বা ক্ল্যাড নির্ধারণকারী গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন শনাক্তের উপযোগী এআরএমএস পদ্ধতি যবিপ্রবির গবেষক দল প্রয়োগ করে দেখিয়েছে। এই গবেষণা একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিতও হয়েছে। একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করার উপায়ও বের করা সম্ভব এবং ‘স্মার্ট কিট’ বাংলাদেশেই তৈরি করা সম্ভব। উপযুক্ত সহায়তা পেলে বাংলাদেশের গবেষকেরাই তা করতে সক্ষম।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, ধরন শনাক্ত যেমন আমাদের করতে হবে, তেমনি প্রাথমিকভাবে সারা দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের কাজটিও বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক কালে যবিপ্রবির গবেষক দল সাইবারগ্রিন পদ্ধতিতে কম খরচে (১৪০ টাকা) মাত্র ৯০ মিনিটে নমুনা থেকে করোনা সফলভাবে শনাক্ত করে দেখিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের জন্য রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের গবেষণাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে যদি বাংলাদেশে এ পদ্ধতিতে করোনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে শনাক্তের জন্য খরচ কমে আসবে এবং অন্যান্য গবেষণায় সেই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে।

মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট নির্ধারণের জন্য কিংবা এর পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং করার প্রয়োজন আছে। পারশিয়াল সিকোয়েন্সিং বা স্মার্ট কিটের মাধ্যমে করোনার ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও বিস্তারিত তথ্য পেতে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করা জরুরি। তবে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতি বাংলাদেশে বড় আকারে ভ্যারিয়েন্ট সার্ভেইল্যান্সের জন্য ব্যবহার করা কঠিন। সে ক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতির দিকেও আমাদের এগোনো দরকার। কম খরচে এবং সহজে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি পরিমাণে নমুনা পরীক্ষা করে পারশিয়াল সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা প্রাথমিকভাবে ধরন শনাক্ত করতে পারি। পারশিয়াল সিকোয়েন্সের মাধ্যমে প্রাপ্ত আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে কিংবা আক্রান্ত রোগীর রোগ-লক্ষণ ও ভ্রমণবৃত্তান্ত বিবেচনায় নিয়ে যদি তা থেকে কিছু পরিমাণ নমুনার পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে করোনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আমরা ভালো ধারণা লাভ করতে পারব এবং খরচও সীমিত করতে পারব। যে পদ্ধতিতেই হোক, কোভিড নিয়ন্ত্রণ ও লকডাউন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে বড় আকারে ভ্যারিয়েন্ট সার্ভেইল্যান্স প্রয়োজন। এ ব্যাপারে উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মলিকুলার বায়োলজিস্টসহ বিশেষজ্ঞ গবেষকদের নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা এখন সময়ের দাবি।

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম সহকারী অধ্যাপক অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ ও গবেষক, জিনোম সেন্টার, যবিপ্রবি
এস. এম. রুবাইয়াত-উল-আলম সহকারী অধ্যাপক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ ও গবেষক, জিনোম সেন্টার, যবিপ্রবি
ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ অধ্যাপক ও সহযোগী পরিচালক, জিনোম সেন্টার, যবিপ্রবি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, জিনোম সেন্টার, যবিপ্রবি

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন