অগ্রহায়ণের শেষ দিকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জেঁকে বসেছে শীত। ১৪ ডিসেম্বর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় শ্রীমঙ্গলে, ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বলতে গেলে এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহ তৈরি হয়েছে। পঞ্চগড়, রংপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে ঠান্ডার তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি। তিন দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। কোনো এলাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে শৈত্যপ্রবাহ বলা যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করবে। আর শনিবার থেকে দেশের কয়েকটি এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতে পারে। শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলে তা ৭ থেকে ৮ ডিগ্রিতে নেমে যেতে পারে। তখন সেটা আর উত্তরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও সিলেট বিভাগেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। শীতে ঠান্ডা ছাড়াও আরেক উটকো ঝামেলা বায়ুদূষণ। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বায়ুর মান ক্রমে অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। ১৩ থেকে ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার বায়ুর মানের সূচক ২০০-এর নিচে ছিল। ১৫ ডিসেম্বর সেটা ২১৪-তে উঠে যায়। বায়ুর মানের দিক দিয়ে বিশ্বের অস্বাস্থ্যকর প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ওই দিন সারা দিনই এক থেকে তিনের মধ্যে ওঠানামা করে। এই অবস্থা দিল্লির থেকেও খারাপ।
সাধারণভাবে শীতের সময় আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় রোগীর চাপ কম থাকলেও ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগের একটা বাড়তি ভিড় থাকে। ইতিমধ্যে উত্তরের জেলাগুলোয় ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ১৪ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে বেড়েছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গাইবান্ধা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শীতের কারণে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়েও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে অনেকে।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪ থেকে ১৫ ডিসেম্বর রংপুর জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ১৩ জন এবং শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমা রোগে (এআরআই) আক্রান্ত হয়েছে পাঁচজন এবং অন্যান্য ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে আরও পাঁচজন। এ ছাড়া ১৫ নভেম্বর থেকে প্রায় এক মাসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ২২৫ জন, এআরআই রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৭১ জন এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৯৮ জন।
বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম প্রভৃতি জেলার ছবি প্রায় একই রকম। শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে বয়স্করাও ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় আগের চেয়ে বেশি হারে আসছেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকেরা মনে করছেন। কোভিডের চাপে ওপর এই চাপ কত দিন সহনীয় পর্যায়ে থাকবে, তা বলা মুশকিল। তা ছাড়া ঠান্ডাজনিত অনেক রোগের লক্ষণের সঙ্গে কোভিডে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণের সঙ্গে মিল থাকায় জটিল পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সব শ্বাসকষ্ট যে কোভিডের আলামত নয়, সেটা বোঝার ঝুঁকি যখন ঢাকায় কেউ নিতে রাজি নয়, তখন অন্য শহর-উপশহরে কে নেবে। শ্বাসকষ্টের রোগী নিয়ে আত্মীয়স্বজন হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে শেষে লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার একাধিক ঘটনা খোদ ঢাকাতেই ঘটেছে ঘটছে।
আমাদের দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। দেশে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ বছরের কম বয়সী তিনটি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে নিউমোনিয়ায়। আর বছরে এই রোগে গড়ে মারা যায় ২৪ হাজার ৩০০ শিশু। শিশু নিউমোনিয়া বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক রুহুল আমিন সম্প্রতি আবারও বলেছেন, নিউমোনিয়ার উপসর্গ থাকলে শিশুকে যেন বাড়িতে না রেখে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়, সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে করোনাকালে তা কতটা বাস্তবসম্মত উপাচার হবে, সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণাপ্রধান সঠিকভাবেই বলেছেন, কোভিড-১৯ ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ একই রকম হওয়ায় এটি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। এ ব্যাপারে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় একটি বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা পাঠানো প্রয়োজন। প্রয়োজন কোভিডকালে নিউমোনিয়া ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ নজরদারির।
শীতকালে নিউমোনিয়ার পাশাপাশি শিশুরা রোটা ভাইরাসে সংক্রমিত ডায়রিয়ার খপ্পরে পড়ে মারা যায়। শীতকালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগই রোটা ভাইরাসের সংক্রমণে অসুস্থ হয়। সাধারণত কোনো শিশু রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার দুই দিনের মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এই রোগে প্রথমে জ্বর আসে, বমি শুরু হয় এবং তারপর পেট ব্যথা করে। এরপর ধীরে ধীরে পাতলা পায়খানা শুরু হয়। এটি পাঁচ থেকে সাত দিন থাকতে পারে। জ্বরের সঙ্গে পাতলা পায়খানা এখন করোনারও অন্যতম লক্ষণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ কারণে নিউমোনিয়ার মতো রোটা ডায়রিয়াকেও কোভিডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি আছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের ডায়রিয়ার জন্য দায়ী প্রধান চারটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে রোটা ভাইরাস। আক্রান্ত শিশুদের উপসর্গ হিসেবে প্রথমে শুরু হয় বমি। এরপর আস্তে আস্তে পানির মতো পাতলা পায়খানা। খুব কম সময়ের মধ্যে ডায়রিয়া তীব্র আকার ধারণ করে এবং পানিশূন্যতা এত বেশি হয় যে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া না গেলে প্রাণহানির আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে।
রোটা ভাইরাস প্রতিরোধের ভ্যাকসিন থাকলেও কোনো এক অজানা (?) কারণে এটা আমাদের রোল মডেল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পিছিয়ে থাকা ভারত ২০১৬ থেকে তাদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় রোটা ভ্যাকসিন নিয়ে নিয়েছে। শিশুর জন্মের ছয় সপ্তাহের পর এই ভ্যাকসিন দিতে হয়। প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পার হলেই পরবর্তী ডোজ দেওয়া যায়। তবে শিশুর বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই ভ্যাকসিনের ডোজ সম্পন্ন করতে হবে। সরকার না দিলেও খোলা বাজারে এটা অনেক দামে মেলে। রোটা টেকের মূল্য প্রতি ডোজ ১ হাজার ৬০০ টাকা, এটি তিন ডোজ নিতে হয়। রোটা রিক্সের প্রতি ডোজের মূল্য ১ হাজার ৮০০ টাকা। এটি দুবারে নিতে হয়। এত দামের ওষুধ নিয়ে ২০১৯ সালে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারির গল্প সবার জানা। ভারত এই ভ্যাকসিন পেয়েছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমুনাইজেশনের (গাভি) কাছ থেকে। আমরাও নাকি পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম কি? সে তর্ক পরে করা যাবে। তবে এখন এসব নাজুক শিশুকে রক্ষা করার জন্য ছয় মাসের কম বয়সী সব শিশুকে রোটা ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসাটা খুব জরুরি।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
ই-মেইল: nayeem 5508 @mail. com