default-image
১১ জুলাই ২০২০ জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো ও পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) আয়োজনে এবং ঢাকাস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাস ও ইউনাইট ফর বডি রাইটসের (ইউবিআর) সহযোগিতায় ‘কোভিড-১৯: নারী ও কিশোরী স্বাস্থ্য অধিকার সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল আয়োজন করা হয়। সেই গোলটেবিল বৈঠকের নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হলো।

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

সাহান আরা বানু, এনডিসি
মহাপরিচালক (গ্রেড-১), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
অসা বৃত্তা টরকেলসন
ঢাকাস্থ ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি
মোহাম্মদ শরীফ
পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য), লাইন ডিরেকটর (এমসিআরএএইচ), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
মাশফিকা জামান সাটিয়ার
সিনিয়র অ্যাডভাইসার, এসআরএইচআর অ্যান্ড জেন্ডার, ঢাকাস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাস
নূর মোহাম্মদ
নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) –সেশন সভাপতি
ওবায়দুর রব
কান্ট্রি ডিরেকটর, পপুলেশন কাউন্সিল
রোকেয়া কবির
নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ
মোহাম্মদ বিল্‌লাল হোসেন
অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রিয়াদ মাহমুদ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউএসএআইডি
অনিতা শরীফ চৌধুরী
টিম লিডার, ইউবিআর-পিএসইউ
কানিজ গোফরানী কোরায়শী
কমপোনেন্ট ম্যানেজোর, জেন্ডার অ্যান্ড গভরনেন্স, পিএসটিসি
নীলিমা নাসরিন
ইয়াং প্রফেশনাল, পিএসটিসি
মো.জাহিদুল ইসলাম
যুব প্রতিনিধি, গাজীপুর
সামিয়া আফরিন
যুব প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

সূচনা বক্তব্য
আব্দুল কাইয়ুম: সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা
ফিরোজ চৌধুরী: সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা 

আব্দুল কাইয়ুম

নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই আজকের আলোচনার মূল বিষয়। আমরা বাল্যবিবাহ অনেকটা কমিয়ে আনতে পেরেছিলাম। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এটা আবার বেড়ে যাচ্ছে। কোভিডের জন্য বাসায় নারীদের ওপর আরও বেশি চাপ পড়ছে। গর্ভবতী মায়েদের জন্য সমস্যা আরও বেশি। নাগরিক সচেতনতার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন বলে আশা করি। 

default-image

নূর মোহাম্মদ
আজকের আলোচনার প্রধান বিষয় হচ্ছে কোভিড পরিস্থিতিতে কীভাবে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়া যায়। বিশ্বে নারী ও কিশোরীদের কোভিড সংক্রমণের কিছু তথ্য তুলে ধরব।

কোভিড পরিস্থিতিতে নারী ও কিশোরীদের ওপর কাজের চাপ বেশি পড়েছে। শিশুদের সেবা, বড়দের সেবা—সবই নারীদের করতে হচ্ছে। সারা দিনের গৃহস্থালী কাজও নারীকেই করতে হচ্ছে। এই মহামারি পরিস্থিতিতে অনিরাপদ গর্ভধারণ বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। কোভিডের জন্য সারা বিশ্বে মা, নবজাতক ও শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকর্মী এখন কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত।

ইউএনএফপিএর এক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ১১৪টি মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ ব্যবহার করতে পারবে না। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা আরো ৬ মাস যদি প্রলম্বিত হয় তবে আরো ৭০ লাখ অনিরাপদ গর্ভধারণ হবে। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছেই। করোনা যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে বাল্যবিবাহের পরিমাণ বাড়বে। সামনের বছরগুলোতে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি বাল্যবিবাহ হতে পারে। এমন একটি অবস্থায় কী করণীয়, সেটি আজকের আলোচনার অন্যতম বিষয়।

সবার কাছে একটা বড় প্রশ্ন, কোভিড মহামারির এই অবস্থায় কীভাবে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। এই অবস্থায় আমাদের পরামর্শ ও করণীয় কী হবে, সেটাও আজকের আলোচনার বিষয়। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় এসেছে, শুধু এ বছরের এপ্রিল মাসে ৪ হাজার ৭০৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৬ জন তাঁদের জীবনে প্রথম সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মে মাসে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৯৯৪টি ঘটেছে। এর মধে্য ৪ হাজার ১৬০ জন আগে কখনো সহিংসতার শিকার হননি। 

করোনার সময় ব্র্যাক ১১টি বিভাগে বাল্যবিবাহ নিয়ে গবেষণা করেছে। সেখানে ১৩ শতাংশ মানুষ বলেছে যে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কোভিডের সময় কুড়িগ্রাম জেলায় ৪০টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। আবার সেখানে ১৪টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। 

সবাইকে অনুরোধ করব এই পরিস্থিতিতে সবার করণীয় কী, সেটা যেন আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। এসব পরামর্শ থেকে কার্যকর উদ্যোগ আমাদেরকে নিতে হবে। আমদের আলোচনাটা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

default-image

মাশফিকা জামান সাটিয়ার
নূর মোহাম্মদের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা থেকে বর্তমান অবস্থার একট ধারণা পাওয়া গেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে অনেক বেশি পারিবারিক সহিংসতা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ হচ্ছে। এত দিন এটা আমরা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। কোভিড–১৯–এর জন্য বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে এটা বেড়েছে। কোভিডের জন্য সবাই বাসায় থাকায় নারীদের ওপর অনেক বেশি কাজের চাপ পড়েছে। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষেরা সহযোগিতা করছেন। কিন্তু সার্বিকভাবে নারীর ওপর কাজের চাপ বাড়ছে।

কিশোর-কিশোরীরাও যে ভালো আছে, তা কিন্তু নয়। তারা স্কুলে যেত, পড়োশোনা করত। খেলাধুলা করত। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। তাদের মনে একধরনের আনন্দ ছিল। দীর্ঘদিন ঘরে থেকে তাদের মানসিকতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তারা হয়তো অনলাইনে পড়াশোনা করছে, কিন্তু সবাই তা পারছে না। ইতিমধ্যে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন; অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থেকে অনেক পুরুষের মধ্যে সহিংসতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আজ জনসংখ্যা দিবস। আমরা জনমিতিক সুবিধা ভোগ করছি। জনসংখ্যাকে মানবসম্পদ করতে হলে অবশ্যই নারী ও কিশোরীদের কথা ভাবতে হবে। কারণ, জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। নারীর উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন হবে না। আমরা শুনছি, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যেও সহিংসতা বাড়ছে।

নেদার‌ল্যান্ডস দূতাবাস নারীর সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ রোধে ভূমিকা রেখে চলেছে। আমরা আপনাদের কাছ থেকে শুনতে চাই, কোভিড পরিস্থিতিতে নারী ও কিশোরীদের জন্য কী করণীয়। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সহযোগিতা করবে।

default-image

অসা বৃত্তা টরকেলসন
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কোভিড পরিস্থিতিতে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে এটা আলোচনায় এসেছে। বিশ্বব্যাপী এই মহামারিতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রায় সব উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের সংগ্রামটা অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা বেড়েছে।

এর মধ্যে কুসংস্কার একটি বড় কারণ। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন করার জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই কোভিডে কীভাবে মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন থাকবে, সেটাও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ জানতে পারছে। মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়া, গ্লাভস পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা—এসব বিষয়ে মানুষকে আরও বেশি সচেতন করা প্রয়োজন। কোভিড পরিস্থিতিতেও তথ্য–উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, জেন্ডার বেইজড সহিংসতা বেড়েছে। বাংলাদেশেও এটা অনেক বেড়েছে।

কোভিড–১৯–এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। লকডাউনের জন্য কিশোরীসহ সব শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। কোভিডের সময় নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যের প্রতি সবাইকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেশি করে বিনিয়োগ করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সবাইকে আরও বেশি সৃজনশীল হতে হবে। কোভিডের মধ্যে সব ক্ষেত্রে মাতৃস্বাস্থ্য, নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার যেন সুযোগ থাকে।

এই মহামারিতে সামনে থেকে যেসব স্বাস্থ্যসেবী কাজ করছেন, তাঁদের জন্য, তাঁদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য মানসিক পরামর্শ সহায়তা দরকার। ইউএনএফপিএ নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য যেন ঠিক থাকে, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকারকে সহযোগিতা করছে। আমরা মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যেন তাঁরা নারী ও কিশোরীদের ভালো সেবা দিতে পারেন। আমরা টেলিমেডিসিন সেবার উদ্যোগ নিয়েছি। কমিউনিটি সাপোর্ট টিমের ব্যবস্থা করেছি।

আসুন, এই বৈশ্বিক মহামারিতে সবাই নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করি। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করলে নারী–পুরুষের মধ্যে সমতা আনতে পারব। সহিংসতা বন্ধ করতে পারব। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু শূন্যের ঘরে নিয়ে আসতে পারব। 

default-image

ওবায়দুর রব
একটা বিষয় জোর দিয়ে বলতে চাই। আমরা এমন কিছু করব না, যাতে মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হয়। মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি কাজ। কী করলে মানুষ সচেতন হবে, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হবে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষ যখন নিজ থেকে অনুভব করবে, বাল্যবিবাহ ভীষণ ক্ষতি, তখনই এটা কমানো সম্ভব। প্রায় ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছরের আগে। আর তাদের একটা বড় অংশ ১৮ বছরের আগেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে।

প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ নবজাতকের জন্ম হয়। কোভিডের আগে ৪৮ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ছিল। কোভিডের জন্য সেটা হয়তো আরও কমে যাবে। কোভিডের কারণে অনেক মায়ের বাড়িতে সন্তান প্রসব হচ্ছে। সে হিসাব আমাদের কাছে নেই।

জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ নিয়ে বলা হচ্ছে, মানুষ এগুলো কম ব্যবহার করছে। সবার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে প্রতিদিন দুই কোটি দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ ব্যবহার করে। এই দুই কোটির মধ্যে এক কোটি নারী প্রতিদিন জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য খাওয়ার বড়ি খাচ্ছে। এ বড়ির অর্ধেক সরকার সরবরাহ করে। বাকি অর্ধেক ব্যক্তি খাত সরবরাহ করে। 

হয়তো এপ্রিল–মে মাসে সরকারের খাওয়ার বড়ি কম চলেছে। কিন্তু নারীদের কাছে এটা আছে। একেবারে যে নেই, তা নয়। এসএমসির জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। 

গত দুই মাসের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। কারণ, এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে। সবাইকে অনুরোধ করব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে যখন আমরা কথা বলি, তখন যেন যাচাই–বাছাই করে কথা বলি।

নারী ও কিশোরীদের সেবা দেওয়ার জন্য উপজেলা ও জেলা হাসপাতালের সমন্বয়ে একটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। 

default-image

রোকেয়া কবির
সাধারণত পুরুষেরা মনে করেন, নারীরা ঘরে থাকেন। টুকটাক কাজ ছাড়া আর কী করেন। নারীরা প্রায় সারা জীবন ঘরের মধ্যে লকডাউনে থাকেন। এই করোনাকালে পুরুষেরা যেন অনুভব করেন, ঘরে থাকা কত কষ্টকর। পুরুষদের অনুরোধ করব, আপনারা ঘরের কাজ শেখার চেষ্টা করবেন। আলোচনায় এসেছে, কোভিড পরিস্থিতিতে সহিংসতা বেড়েছে। বাল্যবিবাহ বেড়েছে। এখন স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়বে। বিভিন্ন পেশা থেকে নারী–পুরুষেরা চাকরি হারাবেন। পোশাকশিল্পে যেসব নারী কাজ করেন, তাঁদের অভিভাবকেরা বিয়ে দিতে চান না। কারণ, তাদের বিয়ে দিলে অভিভাবকদের আয় হারানোর ভয় থাকে। ক্ষুদ্রঋণ খাতে যেসব নারী কাজ করেন, তাঁদেরও অবস্থা একই। কিন্তু তাঁদের কারও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই।

কোভিডের সময় কিছু বাক্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের বাস্তবতায় এসব যায় না। কোয়ারেন্টিন, সোশ্যাল ডিসট্যান্স, এত মিটার দূরত্ব—দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এসব বোঝা কষ্টকর। এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ! অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ এক রুমে গাদাগাদি করে থাকে। একটা বাথরুম। একটা রান্নাঘর। কীভাবে তারা এত দূরত্ব বজায় রাখবে? 

১৫ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। একজন নারীর শুধু সন্তান জন্ম দিতে দিতে সময়টা পার হতে পারে না। তাহলে তিনি দেশ ও নিজের জন্য তেমন কিছু করতে পারবেন না। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি কয়টা সন্তান জন্ম দেবেন। কোভিডের সময় এনজিওগুলো বিভিন্ন কাজ করছে। তাদের কোনো প্লাটফর্ম না থাকার জন্য এনজিওদের কাজটা সামনে আসছে না। কোভিড দেখিয়ে দিয়েছে, উপজেলা পর্যন্ত আমাদের স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

default-image

মোহাম্মদ শরীফ
আমরা কোভিডের মধ্যে অনেক কাজ করছি। রোগীদের সেবা দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের তেমন প্রচার নেই। আমাদের অনেক ডাক্তার আইসিইউতে কাজ করছেন। আমাদের ডাক্তার, বিভিন্ন পর্যয়ের কর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমি বলেছিলাম, শুধু কোভিড রোগীদের নিয়ে ভাবলে হবে না, নন-কোভিড রোগীদের নিয়েও ভাবতে হবে। শুরু থেকেই সবাইকে পিপিই দেওয়ার কথা বলেছিলাম। প্রথম দিকে পিপিই পাইনি। মাস্ক ব্যবহার করেই কাজ করেছি।

আমরা পরিবারকল্যাণ অধিদপ্তরের জাতীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত কর্মীরা কোভিড নিয়ে কাজ করছি। অনেকে বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব কম হচ্ছে। এ জন্য গণমাধ্যমসহ আমরা যাঁরা এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আছি, সবাই মিলে এ নিয়ে প্রচার–প্রচারণা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়ানোর জন্য ইউনিয়ন হেলথ সেন্টার খোলা রেখেছি। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব করানোর সুযোগ আছে। মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রেও প্রসব হচ্ছে। আমরা যেমন কোভিড কমাব, তেমনি মাতৃ ও শিশুমৃত্যুও কমাব। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়াব। এসব লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

default-image

সাহান আরা বানু
দেশে ও বিদেশে যাঁরা কোভিড-১৯–এ মারা গেছেন, তাঁদের প্রতি গ্রভীর শ্রদ্ধা। ‍যাঁরা আক্রান্ত ও চিকিৎসাধীন, সবার জন্য আমার সমবেদনা।
আজ জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, ‘মহামারি কোভিডকে প্রতিরোধ করি, নারী ও কিশোরীদের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি।’

কোভিডের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে। অনেক মানুষ ঘরবন্দী। শিক্ষার্থীদের স্কুল–কলেজ বন্ধ। আমি মনে করি, আজ যারা ক্ষতিগ্রস্ত, কেবল তারাই তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এর জন্য পারিবারিক, সামাজিক ও বৈশ্বিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারে যেসব নারী ও কিশোরী সদস্য রয়েছে, তাদের জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

সরকারের ন্যাশনাল পলিসি অন অ্যাডেলোসেন্ট হেলথ অনুসারে কিছু স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। কোভিড পরিস্থিতিতেও আমাদের ইউনিয়ন ও জেলা পর্যায়ে ৬০৩টি স্বাস্থ্য–পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র থেকে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখান থেকে তারা স্বাস্থ্য উপরকণসহ সব ধরনের সেবা পাচ্ছে। আমাদের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে ১৬৭৬৭ নম্বরে ‘সুখী পরিবার’ কল সেন্টার রয়েছে। এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা প্রসবসংক্রান্ত যাবতীয় সেবাসহ সব ধরনের সেবা প্রদান করা হয়। 

ইউনিয়ন পর্যায়ে ২ হাজার ৮৫৩টি পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছে। করোনাকালেও এই সেবা চলমান রয়েছে। ৯৬টি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র থেকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীতে দুটি কেন্দ্র রয়েছে। মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি ও আজিমপুর ম্যাটার্নিটি কেন্দ্র থেকেও সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য সময় থেকে আমাদের সেবা গ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে।

মিরপুর লালকুঠি শিশু কল্যাণকেন্দ্রটি এখন ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে আমাদের চিকিৎসকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বস্তরে আমাদের সেবা কার্যক্রম চালু আছে। বিশেষ ব্যবস্থায় দুর্গম এলাকায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ কিশোর–কিশোরী। যেকোনো মূল্যে তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। 

বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য প্রথম দরকার পরিবার থেকে উদ্যোগ ও গণসচেতনতা। সর্বোপরি যার বাল্যবিবাহ হচ্ছে, তাকেও সচেতন হতে হবে। সারা বাংলাদেশে আমাদের কার্যক্রম প্রচার করছি। এটা একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো। সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। সার্বক্ষণিক আমরা সবকিছু তদারক করছি। সবার সমন্বিত উদ্যোগে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটা উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব।

default-image

রিয়াদ মাহমুদ
কোভিডের এই সময়ে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা একসঙ্গে কাজ করছে। ইউএসএআইডি করোনা পরীক্ষা, সার্ভিলেন্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কোভিড-১৯–এর বিপদ সম্পর্কে মানুষকে জানানো ও সচেতন করার কাজ করছে। আমরা সরকারের সাপ্লাই চেইনে কাজ করছি অর্থাৎ কোথায় কী পরিমাণ স্বাস্থ্য উপকরণ লাগবে এবং কতটুকু সংকট আছে, সেটা নিয়ে কাজ করছি। সরকারের বিভিন্ন গাইডলাইন তৈরির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছি।

জাতিসংঘের সব কটি প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করছে। উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশ প্রিপেয়ারনেস অ্যান্ড রেসপন্ড প্ল্যান অন কোভিড (বিপিআরপি) পরিকল্পনায় সহযোগিতা দিচ্ছে। এর দুটি দিক আছে। এক. দ্রুত সময়ে কোভিড–১৯কে প্রতিরোধ করা। দুই. স্বাস্থ্যসেবার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা।

বাংলাদেশে চারটি প্রসব–পূর্ব সেবা কমে গেছে ২৫ শতাংশ। প্রসূতি মায়েদের সেবা নেওয়ার সংখ্যা কমে গেছে ২৭ শতাংশ। কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। টাঙ্গাইলে ২০১৯ সালে চার হাজার কিশোর–কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছিল। আর এপ্রিল ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫২৭ জন। কোভিডের কারণে প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক সেবার পরিমাণ কমে গেছে।

মাতৃমৃত্যু কামানোর জন্য সেবাকেন্দ্রগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু আছে। কিন্তু এখানে ঠিকভাবে সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।

কোভিড পরিস্থিতিতে মায়েদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার একটি গাইডলাইন করেছে। বর্তমান অবস্থায় প্রসূতি মায়েদের ফোন করে সেবা দিতে হবে। সারা দেশে এটি পৌঁছে দিতে হবে। কিশোর-কিশোরীদেরও টেলিফোনের মাধ্যমে সেবা দিতে পারি। মা–বাবার এখন সন্তানদের বেশি সময় দিতে হবে। এটা একটা সুযোগ। নারী ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

default-image

মোহাম্মদ বিল্‌লাল হোসেন
কোভিডে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কোনো সিন্ধান্ত নিতে হলে যে তথ্যের প্রয়োজন, আমাদের সেটা নেই। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধিান্ত না নিতে পারলে কখনোই ভালো ফল পাওয়া যাবে না। সেবা দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিতি তথ্যভান্ডার দরকার। তথ্যের ওপর অনেক গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) অঞ্চলভেদে সেবা বোঝা যায়। সেখান থেকে শহর-গ্রামের সেবার সার্বিক চিত্র পাওয়া যায় না। তা ছাড়া ডিজিএফপির তথ্য আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া উচিত। অনেক তথ্য তাদের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) পাওয়া যায় না। তাদের তথ্য আরও বেশি হালনাগাদ হওয়া উচিত। যদি কোভিড পরিস্থিতেতেও তথ্যে এত পিছিয়ে থাকি, তাহলে হবে না। কোভিডের এই দুঃসময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কথাই সামনে আসছে। পরিবার পরকিল্পনা অধিদপ্তর নিয়ে কারও কোনো কথা নেই। এই অধিদপ্তর তাদের প্রধান হাসপাতালটি কোভিড চিকিৎসায় দিয়েছে। এর বিকল্প কিছু করা যেত। প্রধান হাসপাতালটি কোভিডে যাওয়ায় নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

default-image

নীলিমা নাসরিন
নারীদের সম্পর্কে আমাদের যে ধ্যানধারণা, সেটা বদলাতে হবে। বড়রা মনে করেন, আমাদের ভালোমন্দ শুধু তারাই বোঝেন। আমাদের চিন্তাভাবনার কোনো গুরুত্ব তারা দেন না। আমি কী বিষয়ে পড়াশোনা করব, কখন বিয়ে করব, কখন সন্তান নেব, তারা সবকিছুই নির্ধারণ করে দেন। আমাদের ভালো কোনো চিন্তা থাকতে পারে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা সেটা শুনতে চান না।

এ দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন তরুণ–তরুণী। তাদের জন্য রাষ্ট্র কী পরিকল্পনা করছে? তরুণদের নিয়ে কোনো কিছু করার সময় তরুণদের মতামত নিতে হবে। আমাদের জন্য যা কিছু করা হোক, সেখানে আমাদের অংশীদারত্ব থাকা খুবই জরুরি। আমাদের উন্নয়নে আমাদের ভাবনার প্রতিফলন হলে সেটা অনেক ভালো হবে।

default-image

অনিতা শরীফ চৌধুরী
ইউনাইট ফর বডি রাইটস (ইউবিআর) নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের আর্থিক সহযোগিতায় ইউবিআর এ কাজটি করছে। নয়টি প্রতিষ্ঠান ইউবিআরের সঙ্গে যু্ক্ত আছে, ১২টি উপজেলায় কাজ করছি। ১০ থেকে ২৪ বছরের শিশু, কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের জন্য সরকার এবং দাতা সংস্থার সহায়তায় একটা উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছি। ইউবিআর সরকারের স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ করছে। 

ইউবিআর ১২টি উপজেলায় সরকারি ২৮টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে যুববান্ধব সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর সঙ্গে ইউবিআর মানসিক স্বাস্থ্যের পরামর্শ সহায়তা দিয়ে থাকে। আমরা তরুণ-তরুণীদের নিয়ে কমিউনিটিতে একটা স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করেছি। এরা নিজ এলাকায় বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধসহ বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক কাজ করছে।

স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইমিউনাইজেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কলেরা প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা আছে। কোভিড-১৯–এ সেভাবে স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। এখনো সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। যেকোনো সমস্যায় তখনই সফলতা আসে, যখন স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ থাকে। তাই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই কোভিড সময়ে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

default-image

মো. জাহিদুল ইসলাম
নারী-পুরুষ সবারই যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার। মা–বোনদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়ে আমরাদেরও ভাবতে হবে। মেয়েদের যখন পিরিয়ড হয় এ বিষয়টি ছেলেদেরও জানা দরকার। এ সময়ে তাদের স্বাস্থ্য যেন সুরক্ষিত থাকে, সে ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করতে পারি। দেশে এখন করোনাকাল চলছে। আমরা যদি আমাদের কাজগুলো নিজেরা করি, নিজেদের পোশাক নিজেরা ধুই, আমাদের বাড়ির নারী ও কিশোরীদের ওপর চাপ কিছুটা কম পড়বে। তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

default-image

সামিয়া আফরিন
আমাদের এলাকায় বাল্যবিবাহের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এখানে যুবসমাজ বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছে। আমাদের এখানে একটা বাল্যবিবাহ হচ্ছিল। কয়েকজন তরুণ ৯৯৯ নম্বরে কল করে। তখন পুলিশ এসে ওই বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেয়। অধিকাংশ জায়গায় তরুণদের সুযোগ দেওয়া হয় না। তরুণদের সুযোগ দিলে তারা সমাজের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের মাধ্যমে সমাজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তরুণেরা একটি বড় শক্তি। তাদের একত্র করে যেকোনো দায়িত্ব দিলে সেটা তারা ভালোভাবে পালন করতে পারে।

default-image

কানিজ গোফরানী কোরায়শী
পিএসটিসি দীর্ঘদিন ধরে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে। আমরা একই সঙ্গে জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স প্রতিরোধে বাংলাদেশের বিভিন্নি জায়গায় কাজ করছি। আমাদের কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। এই কোভিড পরিস্থিতিতে স্বল্প পরিসরে হলেও আমরা সেগুলো চালু রেখেছি। এখন আমরা কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিচ্ছি। আমরা অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। এর মাধ্যমে তাদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করেছি। উপজেলা পর্যায়ে আমরা স্বাস্থ্য কর্মশালার আয়োজন করছি। এ কাজে আমরা শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি। যেন শিক্ষকেরা তাঁদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। অনেক সময় নারী স্বাভাবিক সময় ঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা পায় না। আর কোভিড পরিস্থিতিতে সেটা আরও অনেক পিছিয়ে গেছে। তাই মাঠপর্যায় কাজ করার জন্য ‍সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। 

আমরা যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের একটি মডিউল তৈরি করেছি, যেটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা ইয়ুথ কর্নারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই। কোভিডের সময়ে যারা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

নূর মোহাম্মদ

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক সুবিধার মধ্যে আছে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। নারীদের বাদ দিয়ে আমরা এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোসহ কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না। জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স রোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এই মহামারি আমাদের যেন থামিয়ে না দেয়। আমাদের আরও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে, কোনোভাবে যেন অন্যদের জন্য ভীতি সৃষ্টি না করি। আমাদের কাজকর্ম যেন তথ্যভিত্তিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক হয়। আমাদের অনেক নারী প্রায় সারা জীবনই একধরনের লকডাউনের মধ্যে থাকেন।

কোভিড রোগীদের জন্য নন-কোভিড রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সেবা পাচ্ছেন না।

সমাজে যাঁদের সমস্যা, তাঁরা একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। এ সমস্যা সমাধানে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কোভিড–১৯ সন্তান ও মা–বাবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বড় ধরনের সুযোগ করে দিয়েছে। ‍প্রত্যেক মা–বাবার উচিত সন্তানদের কার্যকর সময় দেওয়া। তরুণ-তরুণী ও বড়দের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা একা কোনো সফলতা অর্জন করতে পারব না। তরুণদের সঙ্গে নিয়েই সব করতে হবে।

যেকোনো সমস্যা সমাধানে স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কোভিড–১৯–এ স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ তেমন হয়নি।

কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক ভাবে বেড়ে উঠবার প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো খোলামেলাভাবে আলোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কিশোররা কিশোরীদের সহযোগিতা করতে হবে। সব ক্ষেত্রে কিশোর–কিশোরীদের সুযোগ বাড়াতে হবে। সমাজের কাজে কিশোর–কিশোরীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

ফিরোজ চৌধুরী 

সেশন সভাপতি নূর মোহাম্মদকে ধন্যবাদ। জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে কোভিড-১৯ সময়ে নারী ও কিশোরী স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে আজকের
এই ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হলো। আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0