বিজ্ঞাপন

বহুদলীয় রাজনীতি এবং উন্মুক্ত অর্থনীতিতে যে তিন ধরনের গণমাধ্যম থাকে: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং রাজনৈতিক দলের মালিকানাধীন বা পরোক্ষ সমর্থনপুষ্ট—বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনা থেকেই সেগুলো ছিল। তবে ১৯৯৭ সালে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল এবং ১৯৯৮ সালে কমিউনিটি রেডিও চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যম বলতে কেবল মুদ্রিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীই ছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে সরকারি এক হিসাবে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল ৩০, অর্ধ সাপ্তাহিকের সংখ্যা ৩ এবং সাপ্তাহিকের সংখ্যা ১৫১। ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করে জানুয়ারি মাসে জাতীয় দৈনিকের সংখ্যা চারটিতে নামিয়ে আনা হয় এবং তা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়। এই ব্যবস্থা ছিল স্বল্পমেয়াদি। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমের মধ্যে টেলিভিশন এবং রেডিও থাকলেও এবং সেগুলোর একচেটিয়া উপস্থিতি সত্ত্বেও এগুলো কখনোই সংবাদমাধ্যম হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো কোনো দৈনিক ও সাপ্তাহিকের জনপ্রিয়তা ছিল, সীমিত আকারে হলেও সেগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল। একদলীয়ভাবে পরিচালিত দেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও দলীয়ভাবে প্রকাশিত বা সমর্থনপুষ্ট গণমাধ্যম সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কারণে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের সময় নাগরিকেরা বিদেশি গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখেন।

গণমাধ্যমের সংখ্যা বৃদ্ধির রাজনৈতিক অর্থনীতি

১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিভিশনকে ‘সাহেব-বিবির বাক্স’ বলেই অভিহিত করা হতো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যম মাত্রই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে থাকবে, তা নয়। ব্রিটেনে বিবিসি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত পাবলিক ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের আওতায় রেডিও এবং টেলিভিশন দুই-ই আছে; সেগুলো সাহেব-বিবির বাক্স নয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো সাংবাদিকতার নীতিমালা দিয়ে পরিচালিত। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের সময় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি ছিল, অন্ততপক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন বিবিসির আদলে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু অবস্থার আরও অবনতিই হয়েছে।

তবে ১৯৯০ সালের পর ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের ব্যক্তিমালিকানার সূচনা হয়েছে; প্রথমে টেলিভিশন এবং পরে রেডিও চালু হয়েছে; সংখ্যা বেড়েছে। একটি হিসাবে দেশে মোট টেলিভিশন চ্যানেল ৪৫টি, ২৮টি এফএম এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও, ১ হাজার ২৪৮টি দৈনিক পত্রিকা এবং কমপক্ষে ১০০টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। ১৯৯০ সালের পর গণমাধ্যমের সংখ্যার এই বৃদ্ধির রাজনৈতিক অর্থনীতি, বিশেষ করে এগুলোর মালিকানার দিক বোঝার জন্য এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং শাসনের কয়েকটি দিক উল্লেখ করা দরকার।

অর্থনীতির প্রাসঙ্গিক দিকটি হচ্ছে, এই সময়ে বাংলাদেশ এক নতুন ধনিক শ্রেণির বিস্তার ঘটেছে; এর সূচনা হয়েছিল সেনাশাসনের আওতায় ১৯৮০-এর দশক থেকেই। কিন্তু তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে ১৯৯০-এর পরে। রাষ্ট্রীয় পরিপোষণে এই শ্রেণি বেড়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ যথার্থই বলেছেন যে গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশে তিন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এক লুটেরা শ্রেণি, ‘লুম্পেন কোটিপতি’ শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে। ‘প্রথম পর্বে ছিল লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানি, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা, সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যাংকঋণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ।’ তৃতীয় পর্বে, ‘পুরো ব্যাংক খেয়ে ফেলা, ...এমনকি সর্বজনের সব সম্পদই এখন বাংলাদেশে এই শ্রেণির কামনা-বাসনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে’ (‘লুম্পেন কোটিপতিদের উত্থানপর্ব’, প্রথম আলো ২৮ মার্চ ২০১৮)। এই শ্রেণির মানুষেরাই গণমাধ্যম খাতে বিনিয়োগ করেছেন। এই শ্রেণি একসময় রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে গড়ে উঠলেও অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান মনে করেন, তাঁদের বিকাশের ধারা এমন হয়েছে যে তাঁরা এখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের জায়গায় পৌঁছেছেন; তাঁর ভাষায়, ‘ফ্রম ডিপেনডেন্স অন স্টেট টু স্টেট ক্যাপচার’ (দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১)।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তাকে অর্থনীতিবিদ মির্জা হাসান বর্ণনা করেছেন পার্টিয়ার্কি বলে (পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট ডাইনামিকস ইন অ্যা লিমিটেড এক্সেস অর্ডার-দ্য কেইস অব বাংলাদেশ, ২০১৩); সহজ ভাষায় যাকে আমরা সর্বভুক দলবাজি বলেই চিহ্নিত করতে পারি। কেবল সরকারি প্রশাসনের ক্ষেত্রেই তা ঘটছে তা নয়, এমনকি সিভিল সোসাইটির ভেতরে তা বিষের মতো ঢুকে পড়েছে। পরিণতি হয়েছে সিভিল সোসাইটির সংগঠন, এমনকি সাংবাদিক ইউনিয়ন পর্যন্ত দলের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র উল্টো পথে যাত্রা করেছে। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে যে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুষ্ঠু প্রক্রিয়া হিসেবে নির্বাচনী ব্যবস্থা দাঁড়ায়নি, তা কমবেশি সবাই স্বীকার করেন। সম্প্রতি রেহমান সোবহানও বলেছেন যে ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচন হয়নি, যাকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলে স্বীকার করা যায় (প্রথম আলো, ৪ মার্চ, ২০২১)। অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে একটি জবাবদিহিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

গণমাধ্যমের মালিকানা

এই দুই প্রেক্ষাপটে কারা গণমাধ্যমের মালিক হয়েছেন, তা সহজেই অনুমেয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এন্ডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির অর্থানুকূল্যে সিজিএসের পৃষ্ঠপোষকতায় আমি এবং মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান অক্টোবর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত একটি সমীক্ষা চালিয়েছি। ২০২১ সালে জানুয়ারি মাসে ‘হু ওউনস দ্য মিডিয়া ইন বাংলাদেশ’ নামে তা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে করা গবেষণায় আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ না হয়ে গণমাধ্যমের, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সালে বিভিন্ন সরকারের সময়ে দেওয়া টেলিভিশন চ্যানেলের অনাপত্তিপত্রের হিসাবেই তা স্পষ্ট। ১৯৯৬-২০০১ সালে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে ৪টি, ২০০১ থেকে ২০০৮ সালে দেওয়া হয়েছে ৫টি, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে দেওয়া হয়েছে ২৯টি এবং ২০১৪-২০১৮ সালে দেওয়া হয়েছে ৭টি। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা যতই জবাবদিহিহীন হয়েছে, লাইসেন্স দেওয়ার হার ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের অক্টোবরে ১০টি লাইসেন্সের অনুমোদনের ঘটনাও ঘটেছে।

আমাদের এই গবেষণায় আমরা ৪৮টি গণমাধ্যম আউটলেট, অর্থাৎ সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং ওয়েব পোর্টালের মালিকানা বিশ্লেষণ করে যে তিনটি প্রধান প্রবণতা লক্ষ করেছি, তার একটি হচ্ছে মালিকদের ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টতা। এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণেই প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বদল হয়েছে ক্ষমতা বদলের পর। গত ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই যে এখন গণমাধ্যমের এক বড় অংশের মালিক তা সহজেই দৃশ্যমান হয়েছে। এসবের মালিক হচ্ছে ৩২টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। আমাদের গবেষণার দ্বিতীয় দিক হচ্ছে, দেখা গেছে যে এসব গণমাধ্যমের পরিচালকদের এক বড় অংশই হচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা; অর্থাৎ একই পরিবারের সদস্যরা একই গণমাধ্যমের পরিচালক বোর্ডের সদস্য; মালিকানার এক বৃত্তচক্র। যেকোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা স্বাভাবিক হলেও গণমাধ্যমের দায়দায়িত্ব বিবেচনায় তা কতটা এমন প্রতিষ্ঠানের নিজস্বতা বজায়ের জন্য অনুকূল, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। আমরা এ-ও দেখতে পাই যে যৌথ মূলধনি কোম্পানিতে যেসব তথ্য নিয়মিতভাবে দেওয়ার কথা এবং যা সহজেই জনগণের কাছে লভ্য হওয়ার কথা, সেগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি আছে, নিয়মিতভাবে না দেওয়ার ঘটনাও আছে। এগুলো অস্বচ্ছতার লক্ষণ।

আমরা যে তৃতীয় বিষয়টি লক্ষ করেছি তা হচ্ছে, এসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং মালিকেরা অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এটা মোটেই বিস্ময়কর বা উদ্বেগের বিষয় হতো না যদি এসব ব্যবসাক্ষেত্র গত এক দশকে বড় রকমের বিতর্কের সম্মুখীন হতো।

এই প্রবণতাগুলো থেকে মোটা দাগে যে কথাটি বলা যায়, সাংবাদিকতার একটি অন্যতম মৌলিক শর্ত পালনে এসব গণমাধ্যম ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাংবাদিকতাকে পেশা ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং সাংবাদিককে ব্যক্তি হিসেবে যাঁদের বিষয়ে সংবাদ বা সম্পাদকীয় প্রকাশ করবে, তাঁদের থেকে স্বাধীন থাকতে হবে; কেবল তবেই গণমাধ্যম ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করতে পারবে। যাঁদের ওপরে নজরদারি করার কথা, সেই ক্ষমতাসীনদের অংশ হয়ে কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় শরিক হয়ে নজরদারি করা অসম্ভব। বরং এটাই স্বাভাবিক যে এই গণমাধ্যমগুলো সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে মালিকদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্বার্থের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে এটা বোঝা দুরূহ নয়, কেন দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব গণমাধ্যমই তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। এ জন্য কেবল কে মালিক সেটা দেখাই যথেষ্ট নয়, নজর দিতে হবে লুটেরা অর্থনীতির বিকাশের নীতি এবং জবাবদিহিহীন রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার দিকে যেগুলো এ ধরনের গণমাধ্যমব্যবস্থা তৈরি করেছে।

আগামী পর্ব: স্বাধীন সাংবাদিকতার বাধা কে

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন