default-image

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের নতুন নিয়োগ নিয়ে আলোচনা সম্ভবত কখনো শেষ হবে না। বিশেষ করে এক ব্যক্তির জন্য আইন বদল করার এই উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য বিরল উদাহরণ না হলেও ব্যতিক্রম তো বটেই। এ নিয়ে প্রথম আলোয় একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম গত ২৭ জুলাই। সেই উপসম্পাদকীয়র প্রতিক্রিয়া নিয়েই এই লেখা। আগের লেখাটির নিচে লেখকের ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া ছিল। তাতে কিছু প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অনলাইনে পাঠকেরা তাৎক্ষণিক কিছু মন্তব্য করেছেন। তবে আমার লেখার বিষয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাওয়া দুটি টেলিফোন।

প্রথম টেলিফোনটি করেছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক। তিনি নিজেই একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ গভর্নর ও সবচেয়ে ভদ্রলোক গভর্নর নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু মতামত আছে। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্যেই তিনি পুরোনো একটি ঘটনার কথা বললেন। সেটি এখানে বলা যাক।

ফখরুদ্দীন আহমদ তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা করার দায়ে তিনি ১০ জন সিবিএ নেতাকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। চাকরিচ্যুত ব্যক্তিরা সবাই ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মী। আবদুল মান্নান ভূঁইয়া তখন বিএনপির মহাসচিব। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি হলো। কিন্তু গভর্নর অবিচল, তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। গল্পের শেষটা হলো: একদিন ফখরুদ্দীন আহমদকে ডাকলেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বললেন, রাজনীতি করতে হয় সবাইকে নিয়ে। দলের মত মানতে হয়। তিনি যেন চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের কিছু লঘু শাস্তি দিয়ে আবার স্বপদে বহাল করেন। তখন ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, তাঁর কথা অনুযায়ী সবাই যাঁর যাঁর পদে চাকরি ফিরে পাবেন। অফিসে ফিরে আজই আদেশ জারি করবেন, তবে তিনি নিজে আর পরের দিন থেকে আসবেন না। এ কথার পরে প্রধানমন্ত্রী আর কিছু বলেননি। ফখরুদ্দীন আহমদ মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত গভর্নর পদে বহাল ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

গল্পের প্রথম অংশ নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। কারণ, ঘটনাটি সে সময় যথেষ্ট প্রচার পেয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা ও গভর্নরের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে তৎকালীন বিএনপি-সমর্থিত অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সিবিএর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয় ৩০ অক্টোবর। তাঁরা আর চাকরি ফিরে পাননি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্বের সত্যতা বলতে পারবেন একমাত্র তাঁরাই। তবে এই গল্প এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রচলিত আছে।

দ্বিতীয় ফোনটি পাই লেখা ছাপা হওয়ার পরের দিন। এবারের ফোনদাতা একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। সাবেক ও প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সচিবালয়ে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর বলা ঘটনাটি ফখরুদ্দীন আহমদকে নিয়েই। তার আগে বলে রাখি, গভর্নরের মেয়াদ বাড়ছে—এই তথ্য নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই কাজ করছিলেন প্রথম আলোয় আমার সহকর্মী ফখরুল ইসলাম। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে জানতে পারেন, এম সাইফুর রহমানও তাঁর সময়ের গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলামের মেয়াদ বাড়াতে মন্ত্রিপরিষদে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা সেই অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু টেলিফোনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই সাবেক কর্মকর্তাটি জানালেন ভিন্ন একটি তথ্য। তিনি বললেন, এম সাইফুর রহমান ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা উত্থাপন করেননি, প্রস্তাবটি ফিরিয়ে আনেন।

কেন ফিরিয়ে আনেন? প্রথম ঘটনাটির সঙ্গে এর কিছুটা সংশ্লিষ্টতা আছে। সিবিএ নেতাদের চাকরিচ্যুতির ঘটনায় দলের মধ্যে একটি অংশ বিক্ষুব্ধ ছিল। নতুন করে বিরোধিতায় নামেন ব্যাংকের মালিকানা আছে, মন্ত্রিসভার এমন কয়েকজন সদস্য। এর মধ্যে তিনি বিশেষ করে বললেন এম মোরশেদ খান ও মির্জা আব্বাসের কথা। তাঁরা এর বিরোধিতা করে পাল্টা লবি শুরু করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কথায় এম সাইফুর রহমান মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ থেকে প্রত্যাহার করে নেন। নইলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।

সিনেমায় গল্প বলার নানান রীতি আছে। একসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা এগিয়ে যায়, শেষটি এক বিন্দুতে মিলে যায়। শুরুতে পরস্পর সম্পর্কহীন মনে হলেও শেষে দেখা যায় সব ঘটনাই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এর নাম হচ্ছে হাইপার লিংক সিনেমা। হাইপার লিংক সিনেমার রীতি প্রথম দেখা গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমায়। তবে এ জন্য বেশি বিখ্যাত মেক্সিকান পরিচালক আলেজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু। তাঁর ‘ডেথ ট্রিলজি’: ‘অ্যামোরেস পেররোস’, ‘২১ গ্রামস’ ও ‘বাবেল’ হাইপার লিংক সিনেমার সেরা উদাহরণ।

ওপরে বলা দুটি ঘটনার একটি হাইপার লিংক কিন্তু আছে। এর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিতর্কটি জড়ানো যায়। বিএনপির নেতৃত্বের একটি অংশ ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে আপত্তি করলেও বিচারপতিদের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ করার প্রস্তাবে কোনো আপত্তি দেখেননি। এ জন্য সংবিধানের সংশোধনী আনতে হয়েছিল, যা সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী নামে পরিচিত।

‘বিএনপি: সময়-অসময়’ গ্রন্থে মহিউদ্দিন আহমদ এ নিয়ে লিখেছেন, ‘পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, এ নিয়ে বিএনপি ছক কষছিল। বিএনপি সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর নেওয়ার বয়সসীমা ৬৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে যে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার মতলবেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিচারপতি কে এম হাসানকে বিএনপির পছন্দের লোক হিসেবে প্রচার করে। এই প্রচারের সত্যতা ছিল। বিচারপতি হাসান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এর আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সরকার তাঁকে ইরাকের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিল। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য একবার তিনি বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন।’

বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর প্রবক্তা হিসেবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদকে মনে করা হয়। ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৬’ গ্রন্থে মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘বয়স বাড়ানোর এই প্রস্তাব কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিবেচনাধীন বিষয় ছিল না। কারণ, কোনো বিচারপতি কীভাবে পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য সর্বশেষ বিচারপতি হিসেবে কত দিন বেঁচে থাকবেন, তা কারও জানার কথা নয়। পুরোপুরিভাবে জাতীয় স্বার্থে বিচার বিভাগকে জোরদার করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কার্যকরভাবে কর্মসম্পাদনের জন্য যোগ্যতর নেতৃত্ব, মেধা ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।’

যে যা–ই যুক্তি দিক না কেন, বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর ফল মোটেই ভালো হয়নি। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, ফলাফলও ছিল খারাপ এবং বিএনপির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। তবে আজকের আলোচনা অন্য বিষয় নিয়ে। কে এম হাসান অপারগতা প্রকাশের পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা হস্তক্ষেপে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে এই পদ ছেড়ে দিতে হলে সেই ফখরুদ্দীন আহমদই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন, যাঁর মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের মত ছিল না। আমরা সবাই জানি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি কিন্তু প্রথম পছন্দ ছিলেন না। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অপারগতা জানালে ফখরুদ্দীন আহমদ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন।

আবারও আমরা সেই হাইপার লিংক সিনেমার গল্প বলার রীতিতে ফিরে যাই। গভর্নর হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমদ মেয়াদ শেষ করেন ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল। এম সাইফুর রহমান বয়স বাড়িয়ে মেয়াদ বৃদ্ধিতে সফল হলে ফখরুদ্দীন আহমদ ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এই পদে থাকতেন। তাহলে কি একজন কর্মরত গভর্নর হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর নামটি বিবেচনায় আসত? সম্ভাবনা খুবই কম।

দুই বছর বয়স বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিতে গ্রহণ এবং আরেকটি প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি না ঘটলে ইতিহাস কি অন্য রকম হতে পারত? এমন এক প্রশ্নের আসলে যার উত্তর নেই। যে যাঁর মতো উপসংহারে যেতে পারেন অবশ্য।

শওকত হোসেন: সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন