বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রকৃতপক্ষে নাগরিকদের সামনে পরিষ্কারভাবে দুটো বিকল্প নীতি থেকে একটা বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রথাগত জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকদের অভিযোগ হচ্ছে, সব কটি ‘মূলধারা’র দল এক। তারা সবাই জনগণের ক্ষতি করার একই নীতিতে চলে। তাদের সে নীতি আবার অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষা করে। এ নির্বাচনে যদি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) এবং বিদায়ী চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) মধ্যে বড় জোট গঠিত হতো, তাহলে সেটা উগ্রপন্থীদের জন্য একটা প্ররোচনার বিষয় হতো। এর পরিবর্তে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্টত একটা বামপন্থী মোড় নিয়েছে।

করোনা মহামারি মোকাবিলায় যে জন–অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নাগরিকদের অনেকেই এএফডিকে ভোট দেবেন। কেননা তারাই একমাত্র দল, যারা এ ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে গেছে। জার্মানির ফেডারেল ব্যবস্থায় এএফডি আবার একমাত্র দল, যারা কোথাও ক্ষমতায় নেই। দেশটির ১৬টি প্রদেশে ৯টি ভিন্ন দলের জোট ক্ষমতা ভাগাভাগি করছে। এটা হয়নি, এর পেছনে দুটি কারণ আছে। প্রথমত, জার্মানির অনেক নাগরিকের কাছে এএফডি এমন একটি দল, ঐতিহাসিকভাবে যাদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীলতার সংস্রব রয়েছে। অনেক কট্টরপন্থী রক্ষণশীলও এ কারণে কোভিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির গৃহীত পদক্ষেপে চরমভাবে হতাশ থাকার পরও নয়া নাৎসিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এএফডির সঙ্গে যুক্ত হননি।

অসন্তুষ্ট ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে পারেনি এএফডি। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হলো, সম্ভ্রান্ত ও মৌলবাদী—দুই ধরনের ভোটার টানার কৌশল কাজে আসেনি। আরেকটি কারণে এএফডি আরও বেশি ভোটারের সমর্থন পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানদের মতো তারাও অতিমারির সময়ে নাগরিকের ‘স্বাধীনতা’র জন্য একচেটিয়াভাবে আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু এই প্রচেষ্টা জার্মান উদারনীতিকেরা বানচাল করে দিয়েছেন। আইনসভার অনেকগুলো উচ্চপর্যায়ের বিতর্কে ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টি (এফডিপি) এএফডির বিপরীতে ভিন্ন বিকল্প হাজির করেছিল। অতিমারির সময়ে জার্মানিতে যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে এফডিপি কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দাঁড় করায়নি। সরকারের নীতি সমালোচনা করতে গিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ তারা করেনি। এতে করে বিরোধী দল হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

সবশেষে এসপিডি, সিডিইউ—দুটি দল ইউরোপের একটি প্রধান প্রবণতা প্রতিহত করতে পেরেছে। তারা অতি ডানদের নীতি ও বক্তব্য আত্মস্থ করে তাদের মূলধারায় নিয়ে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় অতি ডানদের প্রচারণা তারা ব্যর্থ করে দিয়েছে। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের প্রার্থীরা আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখল নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘২০১৫ (জার্মানি সে সময় লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল) সালের পুনরাবৃত্তি আর হবে না।’ যদিও তাদের এ বক্তব্য শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছে কট্টর বলে মনে হয়নি। আবার এ দলের প্রার্থী যাঁরা ‘এএফডি’র প্রতি নমনীয়তা দেখিয়েছেন, তাঁরা বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

এখনই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললে সেটা হবে ভুল। এই একটা নির্বাচন থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন এখনো ভুল করে চলেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ফলের পর দল থেকে অতি ডানপন্থীদের চলে যাওয়ার পথ খোলা রাখার
আহ্বান জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ দাবি আরও জোরালো হবে। পূর্ব জার্মানির কিছু অঞ্চলে অতি ডানদের শক্ত ভিত্তি আছে। কিন্তু জার্মানির বাকি অংশে তাদের তেমন কোনো সমর্থন নেই। এখন সিডিইউর সিদ্ধান্তে অতি ডানপন্থীদের উগ্রপন্থী অংশ উৎসাহিত হবে। তবে সবকিছুর পরে, নির্বাচনের ফলাফল অন্তত একটা শীতল স্বস্তি হিসেবে এসেছে। অনেকে যেমনটা ভয় করেছিল, তত খারাপ কিছু ঘটেনি।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জান-ওয়েরনার মুলার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন