অলংকরণ
অলংকরণমাসুক হেলাল

জেলা পরিষদ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও আধুনিক স্থানীয় সরকারের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’র সময় থেকে মোগল শাসনকাল পর্যন্ত এ দেশে আধুনিক জেলার প্রতিরূপক একটি প্রশাসনের সদম্ভ উপস্থিতি লক্ষণীয়। কিন্তু ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সমরের পর থেকেই আধুনিক জন-অংশগ্রহণমূলক ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল একটি কাঠামোর উন্মেষ ও বিকাশ শুরু হয়। ১৮৮৫-১৮৯০-এর মধ্যে পূর্ব বাংলার অনেক জেলায় ‘ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড’ গঠিত হয়। শুরুতে ‘ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর’ জেলা পরিষদগুলোর সভাপতি থাকলেও ধীরে ধীরে মনোনীত নন-অফিশিয়াল সদস্যের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যের দায়িত্ব গ্রহণের পথ সুগম হয়।

বিজ্ঞাপন

১৮৮২ সালের লর্ড রিপনের সংস্কার উদ্যোগ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত যে দীর্ঘ সময়, এর মধ্যে যদি কোনো জনসংগঠন জনসেবার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ সক্ষমতায় বিকশিত বলে ধরে নেওয়া যায়, তা নিঃসন্দেহে ‘জেলা বোর্ড’। ব্রিটিশ শাসনামলে জেলা বোর্ড গ্রামীণ সড়ক, প্রাথমিক শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, দাতব্য চিকিৎসালয়, পশুচিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, সুপেয় পানির ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে মুখ্য দায়িত্ব পালন করত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে জেলা পর্যায়ে একটি রাজনৈতিক প্রশাসন কাঠামো তৈরির প্রয়াস শুরু হয়। যেমন ১৯৭৫ সালে ‘জেলা গভর্নর’ পদ্ধতি, বিএনপি আমলে ‘জেলা মন্ত্রী’ এবং জাতীয় পার্টির সময় একজন জাতীয় সংসদ সদস্যকে চেয়ারম্যান এবং মনোনীত সদস্য ও কর্মকর্তা সদস্য নিয়ে একটি জেলা পরিষদ চালু করা হয়, যা ১৯৯১ সালের পর পরিত্যক্ত হয়। এভাবে জেলা পরিষদ ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহায়-সম্পদ প্রভৃতি থাকলেও এটি জনপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল দীর্ঘদিন অকার্যকর ও অবহেলিত। প্রেষণে নিয়োজিত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এটির পাহারাদারির কাজ করে গেছেন এবং ডেপুটি কমিশনার ও জেলার সাংসদেরা এটির ওপর কর্তৃত্ব করেছেন।

২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন জেলা পরিষদ আইন পাস করে। ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর জেলার সিনিয়র রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে ৬১ জন প্রশাসক নিয়োগ করে নতুন আইনে জেলা পরিষদ কাজ করতে শুরু করে। ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন, ২০০০-এর অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্যের জেলা পরিষদ কাজ শুরু করে। ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কাজের যে অভিজ্ঞতা, তা থেকে জেলা পরিষদের কাজের বহু চ্যালেঞ্জ বা সমস্যা দৃষ্টিগোচর হয়, যেগুলোর আশু সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় এ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান গতিশীলতা হারিয়ে অকার্যকর ও স্থবির হয়ে পড়বে।

২০১১ সালের আগের জেলা পরিষদের কথা বাদ দিয়ে এই ৯-১০ বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রায়নের একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো হিসেবে জেলা পরিষদ পুনর্গঠন সময়োপযোগী ও সফল উদ্যোগ। স্থানীয় নেতৃত্বের ক্ষমতাচর্চার এ পরিসরের ১০ বছরের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে যাচাই করার সময় আগত। ২০২১ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনের আগে এখনকার মধ্যবর্তী সময়কে বাংলাদেশের জেলা পরিষদগুলোর একটি যুগসন্ধিক্ষণ বা ক্রান্তিকাল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাই ভবিষ্যতে বিবেচনার জন্য বর্তমান জেলা পরিষদের কিছু সমস্যার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

১. বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থায় যদি কেন্দ্র থেকে প্রান্তে কোনো ধরনের ক্ষমতা বিকেন্দ্রায়নের প্রশ্ন আসে, তার প্রধান একক হবে জেলা। জেলা মাঠ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু দীর্ঘদিন জেলা, বিভাগ ও উপজেলা—এ তিনটি এককের সাধারণ, রেগুলেটরি, উন্নয়ন ও সেবা প্রশাসন ব্যবস্থার কোনো নির্মোহ মূল্যায়ন হয়নি। ১৯৪০ সালের ‘রয়েল কমিশন অন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিসেন্ট্রালাইজেশন’-এর পর পাকিস্তান বা বাংলাদেশে বারবার নির্বাহী আদেশে নানা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকতার বিবেচনায় নিরপেক্ষ ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে কোনো কমিটি/কমিশন কাজ করেনি। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে (১৯৭২-৭৩) গঠিত কমিটির যে সুপারিশ, পরবর্তীকালে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে ডেপুটি কমিশনারকে বাংলায় ‘জেলা প্রশাসক’ বলা হলেও সত্যিকারের ‘জেলা প্রশাসন’ বলে কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। জেলাজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার পৃথক নানা দপ্তর। সেসব দপ্তরের সবাই পৃথক ম্যান্ডেটসহ মন্ত্রণালয়ের অধীনেই কাজ করে থাকে। সরকারের চারটি বিশেষ প্রকৃতির যে দপ্তরগুলো (সাধারণ, রেগুলেটরি, সেবা ও উন্নয়ন) তাদের পারস্পরিক কর্ম-সম্পর্ক এবং সত্যিকারের অনুভূমিক সমন্বয় ও যোগাযোগ খুবই ক্ষীণ। জেলায় সরকারের সব কর্মকাণ্ডের মাঠপর্যায়ে কোনো কেন্দ্রবিন্দু নেই। জেলার নিজস্ব কোনো ভিশন বা পরিকল্পনা নেই। কিছুটা অত্যন্ত শিথিলভাবে ডিসি এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাংসদেরা অথবা জেলার কোনো মন্ত্রী থাকলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো কোনো নির্দেশনা দপ্তরগুলোকে দিয়ে থাকেন। নতুবা প্রতিটি দপ্তর তাদের নিজ নিজ নিয়মেই পরিচালিত হয়। এ রকম একটি অবস্থায় দেশে গঠিত হলো জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদ এই অবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে খুঁজে পায় না। যেন তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সাগরে এক ছোট্ট তরি। একদিকে রাজনৈতিকভাবে এমপি-মন্ত্রী, প্রশাসনিক দিক থেকে ডিসি-এসপিসহ সব সরকারি দপ্তর, নিচে উপজেলা ও ইউনিয়ন। আইনগতভাবে কারও সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক নেই, শুধু জেলার এমপিরা যথারীতি উপজেলা ও জেলা পরিষদের উপদেষ্টা। উপদেষ্টারা একটি কাজই জেলা পরিষদকে দিয়ে করান, তা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ। আইনগতভাবে জেলা পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগ তথা মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সম্পর্ক নেই। মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া জেলা পরিষদ কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না। জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বা উন্নয়ন সমন্বয়ে ডেপুটি কমিশনার কিংবা জেলা পরিষদ কারও কার্যকর ভূমিকা নেই।

২. জেলার অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন ও সেবা দপ্তরের সঙ্গে জেলা পরিষদের কার্যকর আইনি সম্পর্কও ঐচ্ছিক। উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ পৃথক আইনবলে গঠিত এবং জেলা পরিষদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক স্ব-ব্যাখ্যাত নয়।

৩. জেলা পরিষদ নির্বাচনের পরও জেলা পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের সম্পর্কে পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাচিত পরিষদ প্রতিষ্ঠার আগে যা ছিল, তা-ই অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

৪. জেলার ভূমি উন্নয়ন করের ১ শতাংশ অর্থই জেলা পরিষদের স্থানীয় আয়ের মূল উৎস। দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকায় জেলা পরিষদের অনেক সম্পদ বেহাত, অপদখল ও বেদখল হয়ে আছে। এগুলো উদ্ধারের বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন অতিরিক্ত কিছু অর্থ। বেহাত হওয়া সম্পদ উদ্ধার করে ওই সব সম্পদের উন্নয়ন করা গেলে জেলা পরিষদগুলো অনেক বেশি লাভবান হতে পারে।

৫. জেলা পরিষদগুলো অনুন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তার কারণে ভেতর থেকেও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে এটিও উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো ভাগাভাগির সংস্কৃতিতে একাকার হয়ে যাবে। তিনটির (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা) কোনো পরিষদই পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করে না। তিনটি পরিষদ যৌথভাবে বা কোনো একক পরিষদ এককভাবেও কোনো বড় টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করে না। পরিষদের উন্নয়ন তহবিল পূর্বপরিকল্পনার অধীন কোনো প্রকল্পে ব্যয়ের পরিবর্তে তহবিলের প্রাপ্ত অর্থ সদস্যদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করেই তার ভিত্তিতে প্রকল্প রচনা হয়। এটিকে স্থানীয় পরিষদের সদস্যরা তাঁদের অধিকার মনে করেন। এটি একটি বিকৃত উন্নয়ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের ১৩ জন সদস্য, উপজেলা পরিষদ সব ইউপি চেয়ার, দুই ভাইস চেয়ার এবং চেয়ারম্যান মিলে কমবেশি ১৫ জন এবং নির্বাচনের পর থেকে জেলা পরিষদেরও ২১ জনের মধ্যে ভাগাভাগির সেই সংস্কৃতিতে গা ভাসানো শুরু হয়েছে। ফলে ভাগের মা গঙ্গা পাচ্ছে না। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে ব্যাহত। মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন নির্দেশনাও পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে এমপি-মন্ত্রীদের নিজস্ব প্রকল্প।

জেলা পরিষদের দ্বিতীয় নির্বাচনের আগে জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ সম্ভাব্য সংশোধনীগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। প্রয়োজন বিধি ও পরিপত্রগুলোর অনেক সংশোধন। ২১ সদস্যের এ পরিষদের চার বছরের অভিজ্ঞতার কার্যকর মতবিনিময় হোক এবং খোলাখুলি আলোচনার পর আইন, বিধিবিধান, পরিপত্র এবং পরিষদের নিজস্ব চর্চার ক্ষেত্রে কোথায় কী পরিবর্তন দরকার, তা ভালোভাবে চিহ্নিত হোক এবং সময় থাকতে সংশোধিত হওয়ার পর দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক—এটিই প্রত্যাশা এবং সময়ের দাবি।

* ড. তোফায়েল আহমেদ: অধ্যাপক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য করুন