করোনা সংকটের কারণে আমরা একটি অস্বাভাবিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বাজেট হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অস্ত্র। আগামী অর্থবছরে যদি এই অস্ত্রের প্রয়োগ গতানুগতিক হয়, তবে স্বাস্থ্যসংকটে সৃষ্ট প্রয়োজনগুলো মেটানো যাবে না। কারণ, এখন অগ্রাধিকারগুলো বদলে গেছে।
অর্থনীতি সচল রাখতে বর্তমানে অগ্রাধিকারগুলো কী কী? প্রথম অগ্রাধিকার হলো অর্থনীতি সচল রাখতে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। সিংহভাগ জনগোষ্ঠীকে যদি ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত করতে না পারি, তাহলে কাজ হবে না। কখনো অর্থনীতি সচল থাকবে, কখনো অচল হবে।
আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। ১৩-১৪ কোটি মানুষের বাহুতে টিকা পৌঁছাতে না পারলে লাভ হবে না। টিকা কেনার অর্থের সংকট নেই। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থ দিচ্ছে। আবার টিকার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত ভালো। এই মুহূর্তে মূল চ্যালেঞ্জ হলো টিকা সংগ্রহ। আমরা এত টিকা জোগাড় করতে পারব কি না। টিকা জোগাড়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। অর্থায়নের সমস্যা নেই, ব্যবস্থাপনায় সমস্যা নেই। এরপরও যদি মানুষের বাহুতে টিকা পৌঁছানো না যায়, তা হবে দুঃখজনক।
অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেট বক্তৃতায় টিকা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা রোডম্যাপ দেওয়া উচিত। এটাই অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করি। এখন পর্যন্ত কত মানুষ টিকা পেল; আগামী এক বছরে কত লোক টিকা পাবে, কীভাবে মানুষের কাছে টিকা পৌঁছানো হবে, বরাদ্দ কত থাকছে—বাজেট বক্তৃতায় এসব বিষয় স্পষ্ট করা উচিত। বাজেট বক্তৃতায় এ ধরনের রোডম্যাপ থাকলে সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হবে।
এই করোনার সময়ে আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতে আগের মতো বরাদ্দ আছে। এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দ দেখে খাতটির অগ্রাধিকার বোঝা যায় না। বরাদ্দ হলো ইচ্ছের প্রতিফলন। আর বরাদ্দ না বাড়ানোর অর্থ হলো, ইচ্ছার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে না।
অর্থনীতির কোন কোন খাতগুলো নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে পুনরুদ্ধার করতে পারবে না, তা চিহ্নিত করতে হবে। করোনার কারণে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে। তৈরি পোশাকের মতো প্রতিষ্ঠিত খাত সরকারি সহায়তা পাচ্ছে, আবার বিদেশের বাজারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু কুটির শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলো অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানি খাতের সংযোগমুখী শিল্প হিসেবে সম্পৃক্ত আছে। গত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনার টাকা সবার কাছে পৌঁছানো যায় না। মাঝারি প্রতিষ্ঠানের কাছে গেলেও ছোটদের কাছে যায়নি।
করোনায় দেশের বেকার এবং আয় কমে যাওয়া মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত শুনছি, নতুন গরিবদের জন্য তেমন কিছু নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান কর্মসূচির মতো কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কারণ, শহরে কাজ হারিয়ে অনেকে গ্রামে চলে গেছেন।
অর্থনীতি সচল রাখতে হলে করপোরেট কর কমানোর দরকার আছে। আবার লাভ-লোকসান নির্বিশেষে ন্যূনতম কর, আগাম ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন সরবরাহ বাড়বে। এটি করা হলে তা হবে উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর।
আমি কালোটাকা সাদা করার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে। এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হলে সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হয়। অনেকে বৈধ আয়ও ঘোষণা না দিয়ে কম কর দিয়ে সাদা করবেন। এ ধরনের সুযোগ দেওয়া একটি নৈতিকতার ওপর বড় প্রশ্ন তোলে।