default-image

হাটবাজারে বমাল ধরা পড়ার পর চোর যতই নায়ক প্রসেনজিতের মতো গলা কাঁপিয়ে ‘আ. . হ. . মি. . চুরি করিনি মা...’, বলে চেঁচাক, তাতে কাজ হয় না। ‘হাটুরে কিলপর্ব’ শেষে ধরা পড়া লোকের নামের শেষে যুক্ত হয় একটি ছোট বিশেষণ—‘চোরা’। সিঁদকাটার মতো বিলীয়মান হস্তশিল্পে সিদ্ধহস্ত সিঁধেল শিল্পীকে মনোজ বসু যতই আহ্লাদ করে ‘নিশিকুটুম্ব’ বলুন, লোকাল বাংলায় তাকে বলে চোর। তখন তাঁর ‘নালতের মিত্তির বলিয়া গ্রামে আর মুখ দেখাইবার জো’ থাকে না।

কিন্তু অফিসে–আদালতে কাগজ-কলমের মারপ্যাঁচে ঘাপলা বাধিয়ে কোটি টাকা চুরি করলে তখন সেই চুরির আদুরে নাম হয় ‘অনিয়ম’। এসব ‘অনিয়ম’ যাঁরা করেন তাঁদের জাত যায় না, তাঁরা জাতে ওঠেন। তাঁদের দুদক ডাকে। সেগুনবাগিচায় গিয়ে বৈঠক করার পর ক্যামেরার সামনে হাসি হাসিমুখে তাঁরা বেরিয়ে আসেন।

বিজ্ঞাপন

এর বাইরে লেখাপড়া ও গবেষণার বিষয়–আশয়সংক্রান্ত এমন কায়দার এক চুরি আছে, যাকে সরাসরি ‘চুরি’ বললে কেমন ছ্যাঁচড়ামির মতো শোনায়। অন্যের লেখা কিংবা গবেষণাকর্ম কপি পেস্ট করে নিজের নামে চালানোর মতো এই সৃজনশীল সুকুমারবৃত্তিকে হাউস করে বলা হয় ‘চৌর্যবৃত্তি’। হাউসের পরিমাণ বেড়ে গেলে ধ্রুপদি ভাষায় বলা হয় ‘কুম্ভিলকবৃত্তি’। অনেকে আবার ডাঁট করে ইংরেজিতে বলেন ‘প্ল্যাজিয়ারিজম’। পড়ালেখা কম জাননেওয়ালারা এর মহিমা ধরতে না পেরে টুক করে বলেন, ‘আরে ওটা হলো “টুকলি করা”, বুঝলি না? “ঝেড়ে দেওয়া”। ভালো করে হাতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এই ‘টুকলিফাইং’ অর্থাৎ কিনা কুম্ভিলকবৃত্তি আর ‘ভাবের ঘরে চুরি’ প্রায় একই ‘কেলাসের’ জিনিস।

ভাবের ঘরে চুরিতে ‘ভাব’ নামক তেলেসমাতি মাল কমে না। আরও বাড়ে। হলিউডের সাউন্ড অব মিউজিক সিনেমার কাহিনি ধরে আমাদের উত্তম-অপর্ণার জয়জয়ন্তী হয়েছে, তপন সিংহের গল্প হলেও সত্যি থেকে কপি করে হিন্দি ছবি বাবুর্চি বানানো হয়েছে। তাতে সাউন্ড অব মিউজিক কিংবা গল্প হলেও সত্যির ‘ভাব’ কমেছে? ব্রিটিশ ব্যান্ড দল ‘বাগলস’-এর গাওয়া ‘ভিডিও কিলড দ্য রেডিও স্টার’ গান নিয়ে বলিউডের ডিসকো ড্যান্সার ছবির ‘কোই ইঁয়াহা আহা নাচে নাচে’-গেয়েছিলেন উষা উত্থুপ। তাতে বাগলসের কী হয়েছে?

বিদ্যাশিক্ষার ভাব হলো কেরোসিনের বাতির মতো। ওই বাতি থেকে লাখ লাখ বাতি ধরাও, কোনো সমস্যা না। বাতির আগুন আগেও যতটা ছিল, ততটাই থাকবে। কিন্তু বাতিটাই ধরে যদি টান মারো, তখনই ঝামেলা।

খবর বেরিয়েছে, ভাবের ঘরে চুরির মতো গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির শাস্তি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষকের পদাবনমন ঘটেছে, অনেকটা চেয়ারের জায়গায় টুল পেতে দেওয়ার মতো আরকি। এই তিনজনের মধ্যে দুজন হলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমান এবং অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান। ২০১৬ সালে এই দুজনের যৌথভাবে লেখা একটি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে ছাপা হয়েছিল। পরে দেখা গেছে তার কয়েকটা লাইন ছাড়া বাকি সবটাই মিশেল ফুকো আর এডওয়ার্ড সাঈদের লেখা থেকে ‘টুকে নেওয়া’। একটু আগে যে বাতির কথা বললাম, ফুকো আর সাঈদের ‘ভাবের ঘর’ হলো সেই বাতির মতো। সেখান থেকে সামিয়া ও মারজান ‘কুপি ধরাতে’ এসে কুপি ধরেই টান দিতে গেছেন। তাতেই এই আপদ।

এ ছাড়া পিএইচডি থিসিসে একই ধরনের ‘টুকে নেওয়ার’ ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ওমর ফারুকের পদাবনতি হয়েছে এবং তাঁর ডিগ্রিও বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ওমর ফারুকের থিসিসের যিনি তত্ত্বাবধায়ক এবং সামিয়া ও মারজানের গবেষণাপত্র প্রকাশকারী জার্নালের যাঁরা সম্পাদকমণ্ডলী, তাঁদের কিছুই হয়নি। এনলাইটেন্ডদের কুপি আত্মসাৎ করে আলোচ্য শিক্ষকদের ‘আলোকপ্রাপ্ত’ করে তোলার অনবদ্য চেষ্টায় এই তত্ত্বাবধায়ক ও সম্পাদকদেরও যে দায় আছে, তা বুঝতে বিচক্ষণতার দরকার নেই, কাণ্ডজ্ঞান থাকলেই বোঝা সম্ভব।

এর আগে ‘নীলক্ষেতেই মিলছে থিসিস পেপার’ শীর্ষক খবর বেরিয়েছে। ৯৮ শতাংশ হুবহু কপি পেস্ট করে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন বলে পত্রিকায় খবরও বেরিয়েছে। গবেষণাপত্র বানানোর কায়দাকানুন ঘাঁটতে গেলে দেখা যাবে নীতিটিতি সব ‘ভেসে গেল অলকানন্দা জলে’।

এখন বাপ–মায়ের একটাই বৈধ টেনশন। সেটি হলো এই শিক্ষকেরা যখন ক্লাসে যাবেন, পরীক্ষায় গার্ড দেবেন, তখন ছাত্রছাত্রী যদি তাঁদের ‘প্রাতঃস্মরণীয় পরম অনুসরণীয় পরম গুরু’ মনে করে ‘টুকলি’ বের করে তাঁদের সামনেই ‘ঝাড়তে’ শুরু করে দেয়, তখন? কিছু বলতে গেলেই তারা যদি বলে বসে, ‘স্যার, আগেভাগেই থিসিস লেখার জন্য হাত মকশো করছি’, তখন?

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

ই–মেইল: sarfuddin2003@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন