default-image

ত্রাণ বিতরণ ও ত্রাণ ব্যাবস্থাপনা নিয়ে তর্ক–বিতর্ক চিরকালীন। সংবাদমাধ্যমে এখন মুখরোচক খবর, ত্রাণসামগ্রী কে পেল আর কে পেল না। পেলদের চেয়ে ‘না–পেল’দের প্রচার বেশি। এই নিয়ে টক শোতে চুলচেরা আলোচনা চলে। জেলা প্রশাসকেরা ছবি দেখিয়ে বলেন, দিয়েছি, দিচ্ছি, আরও দেব। মন্ত্রী বলছেন, ত্রাণসামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই, যত লাগবে দেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মানুষ পেয়েও বলছে পায়নি। তাদের কথা শতভাগ মিথ্যা নয়। তবে পেয়ে বা কম পেয়ে না পাওয়ার কথা বলাটাকে কিন্তু মিথ্যা বলা নয়। এটা কেবলই আর দুমুঠো চাল সংগ্রহের আকুতি। আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পথিকৃৎ ফ্রেড কুনি এটাকে বরং ইতিবাচক হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমন্বয়হীন, অপরিকল্পিত ও তথ্যহীন ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা থাকলেই দুর্গত এলাকার মানুষ এ রকমটি বলবে। কারণ তারা জানে না, কে কবে আবার কতটা ত্রাণ নিয়ে হাজির হবে। এখন যতটা আছে ততটা দিয়ে তার কত দিন চালাতে হবে। কত দিন এই দুর্গত অবস্থা বিরাজ করবে। আমাদের চলমান বন্যার ক্ষেত্রে দুর্গত মানুষের এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া খুবই সম্ভব।

এবার ভারত থেকে তথ্য না পাওয়া গেলেও আমাদের বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা খুব সঠিকভাবেই বর্ষার ধরন, নদীর গতিবিধি আর বন্যা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আসছিল এবং এখনো দিচ্ছে। সেসব তথ্যের ভিত্তিতেই জুলাইয়ের আগে একটা বন্যার মানচিত্র তৈরি করে, ত্রাণ বিতরণ পরিকল্পনা তৈরি করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া যেত। আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার হকদারদের তালিকাও তৈরি করে বিতরণে গেলে এসব ঝামেলা হয় না। এটা যে আগে কখনো করা হয়নি, তা–ও কিন্তু নয়। আমাদের সে অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু কেন করা হয় না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে হবে। বঙ্গবন্ধু সেখানে সমস্যার গভীরে গিয়ে কথা বলেছেন।

মানুষ কি আসলেই ত্রাণের দিকে তাকিয়ে থাকে?
মানুষ কায়মনোবাক্যে বলতে থাকে ‘আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা’। সে চায় তার ফসলের দামটা যেন সে পায়। তার গবাদি প্রাণী আর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম চায় তারা। জল–হাওয়া আর বাজারের সঠিক খবরও তারা আগাম পেতে চায়। এবার করোনার কারণে আগে থেকেই আঁচ ও অনুমান করা যাচ্ছিল, ঈদের বাজার জমবে না। মানুষ পেলে–পুষে বড় করা গরু–ছাগলের দাম পাবে না। তার মধ্যে বন্ধ হলো অনেকগুলো পাটকল। নিচু এলাকায় মানুষ পাট লাগায়, ভাদ্র আসার আগেই পাট কেটে কিছু বেচে বর্ষা কাটানোর জন্য। এবার সেটারও পথ বন্ধ। পথে বসা কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেকেই স্বউদ্যোগে নিজেদের বুদ্ধিমতো ছুটে গেছেন।

দুর্গত এলাকায় কোরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ
প্রাকৃতিক কৃষির দেলোয়ার ভাই মানিকগঞ্জের ঘিওর দৌলতপুর এলাকায় নৌকায় ঘুরে ঘুরে বানে আটকে পড়া মানুষদের গরু বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শিশু সাহিত্যিক দিপু মাহমুদ মাসখানেক আগে থেকে তাঁর ফেসবুক অনুসারী আর ভক্তদের অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, ভাষা মতিনের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালির গ্রামে তাঁদের কোরবানির টাকাটা পাঠিয়ে দিতে। লক্ষ্য ছিল যেন সেসব গ্রামের মানুষ তাদের পোষা গবাদি পশু নিয়ে বিপদে না পড়ে। যেখানকার গরু সেখানেই কোরবানি করে হতদরিদ্র অভুক্ত শিশুদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেছিলেন। গ্রামে গ্রামে স্কুলশিক্ষকদের নিয়ে কমিটিও করা হয়েছে এসব কাজের ব্যবস্থাপনা আর দেখভাল করার জন্য। বলতে বাধা নেই খুবই সময় উপযোগী আর যথাযথ এসব উদ্যোগের ফলে খুব কমসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবে। চান্দিনার মোশারফ হোসেন ছোটখাটো চাকরি করতেন, তিনি কৃষকের গরু সরাসরি আগ্রহীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নেমেছেন। তবে এসব ব্যক্তিগত আর ছিটেফোঁটা চেষ্টার পরও লাখ লাখ গরু অবিক্রীত থেকে যাবে। হয়ে থাকবে কৃষকের আর গৃহস্থের গলার কাঁটা।

বুধবার জুলাই ২৯ তারিখে রাত ১০টার দিকে কথা হয় দেলোয়ার জাহানের সঙ্গে। তিনি তখনো নৌকায়, তাঁকে ঘিরে ধরেছে অনেকেই তাদের গরুটা নেওয়ার জন্য। দেলোয়ার জাহান জানালেন, বিক্রির জন্য প্রস্তুত গবাদি পশুর অর্ধেকের বেশি অবিক্রীত থেকে যাবে। বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদের আন্দাজও এ রকম। তিনি সপ্তাহ দুয়েক আগে সংবাদমাধ্যমে তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, করোনার কারণে এ বছর কোরবানি ৫০ শতাংশ কম হবে।

অবিক্রীত থেকে যাবে প্রায় ৫০ লাখ গবাদি পশু
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে গড়ে এক থেকে সোয়া কোটি কোরবানিযোগ্য গবাদি পশু বাজারের জন্য তৈরি হয়। গত বছর (২০১৯) দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু বাজারে কেনাবেচা হয়েছিল। এর মধ্যে গরু ৪৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ৭১ লাখ। গত কয়েক দশকে ছোট–বড় অনেক খামার তৈরি হলেও এখন সিংহভাগ কোরবানির পশু আসে গ্রামবাসী গৃহস্থের কাছ থেকে। আগে এটা ছিল গৃহস্থের সম্পূরক আয়ের একটা উৎস। এখন এটা অনেকের টিকে থাকা আর গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার আবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।

এতিমখানাগুলো কীভাবে চলবে?
মানিকগঞ্জের জাফরগঞ্জ বাজারে পাট নিয়ে আসা আব্দুল হালিম চিৎকার করে বলছিলেন, আমার পাট দাম পেলে আমি ১০ জন মানুষকে দুই মাস খাওয়াতে পারি। তিন মণ ধান, দুটো ভেড়া আর একটা খাসি নিয়ে সকাল থেকে তিনি ক্রেতার অপেক্ষায় বসা। সঙ্গে তাঁর দুই এতিম ভাগনে সালাম আর কালাম। টাঙ্গাইলের এক এতিমখানায় থাকত তারা। গত বছর চামড়ার দাম না পাওয়ায় খুঁড়িয়ে চলছিল এতিমখানাগুলো। মার্চের লকডাউনের পর তাদের মামার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কোরবানির সময় এতিমখানা খোলার কথা ছিল। সেটা আর হচ্ছে না। এবারও চামড়ার দাম নেই। সালাম–কালামের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাদের মতোই অন্ধকারে রয়েছে হাজারো এতিমখানার লাখো শিশু। কিন্তু কার ভবিষ্যৎ পরিষ্কার?

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক গবেষক
nayeem5508@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন