বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি মূলত অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করি। মূলধারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গবেষণার কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। চার মাস ধরে আমি টু ইকোনমির বিষয়গুলো নাড়াচাড়া করছি। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নানান আয়োজনের মধ্যে একটি হলো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা। ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. ফকরুল আলম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এ কে আজাদ চৌধুরী প্রমুখের কাছ থেকে আমন্ত্রণ এল ছয় দফা বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কীভাবে ভূমিকা রেখেছেন, সে বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখার। রাজি হয়ে গেলাম।

ছয় দফার ওপর আমার শেষ পড়াশোনা ছিল ১৯৮১ সালে। তখন আমি এমএর ছাত্রী। রেহমান সোবহানের আত্মজীবনী বা কামাল হোসেনের কোয়েস্ট ফর ফ্রিডম পড়তে গিয়ে কয়েক বছর আগে আবার ছয় দফার কিছুটা ছোঁয়া পেয়েছিলাম। ব্যস, এই পর্যন্তই। এই প্রবন্ধ লেখাকে কেন্দ্র করেই শুরু হলো নতুন করে ছয় দফার ওপর পড়াশোনা। যতই ভেতরে ঢুকছি, অনুধাবন করতে শুরু করি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম এবং তাঁর সহকর্মীদের দুই অর্থনীতি তত্ত্বই তো দেখি জুগিয়েছে ছয় দফার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা! অর্থনীতিবিদ আখতার মাহমুদ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংকে কর্মরত ছিলেন এবং আমেরিকার মেরিল্যান্ড শহরে অধ্যাপক ইসলামের কাছের মানুষ, সুযোগটা করে দিলেন। ঠিক ৮টায় শুরু হলো ড. নুরুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা। চলল প্রায় ১০টা ১০ মিনিট পর্যন্ত।

ছিপ ছিপে গড়ন, বয়স ৯৩। ক্ষুরধার দৃষ্টি, হাসিতে ভরা মুখ। প্রথমে একটু ভর্ৎসনা সহ্য করতে হলো। ‘কী পড়াও তোমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে? তোমাদের ছেলেমেয়েরা তো ২১ দফা ৬ দফা এসবের কিছুই জানে না?’ বেশ কয়বার আমারও পরীক্ষা নিলেন। ক্রিপস মিশনে ভারতভাগ সম্পর্কে কী বলা আছে? অথবা লাহোর প্রস্তাবের স্টেটস-এর ‘এস’ কেন উঠে গেল, ইত্যাদি ইত্যাদি। একেবারে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা ছাত্রীর মতো তাঁর পরীক্ষায় পাস করার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। তারপর বললেন, ‘তুমি ৬ দফার ‘এ’ জান। আমি তোমাকে ‘বি’ শেখাব’। তাঁকে দেখে বারবার নিজের বাবার কথা মনে পড়ছিল। কাছাকাছি বয়সই হবেন তাঁরা। পরবর্তী জেনারেশনের কাছে সবটুকু জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার দুরন্ত বাসনা বাবারও খুব প্রবল ছিল। বাধ্য ছাত্রীর মতো নোট নিতে থাকলাম। সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করলেন ড. আখতার মাহমুদ।

‘বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণা এবং তৎপরবর্তী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তি তুমি চারটি পর্বে ফেলে ব্যাখ্যা করতে পারো’ বললেন অধ্যাপক ইসলাম। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি; সে জ্ঞান বিদ্বৎসমাজে ছড়িয়ে দেওয়া; মিডিয়ার মাধ্যমে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ’৬৯ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে দুই অর্থনীতির তত্ত্বকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশে পরিণত করা।

‘১৯৫৬ সালে আমরা অর্থনীতিবিদদের একটি বিশেষ সম্মেলন আয়োজন করি। উদ্দেশ্য, পাকিস্তানের খসড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল্যায়ন ও পরামর্শ প্রদান। সেখানে আমরা ১০ জন অর্থনীতিবিদ এন এন হুদা, মাজহারুল হক, আবদুল্লাহ ফারুক, মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, মোহাম্মদ হোসেন, শফিকুর রহমান প্রমুখ যে প্রবন্ধ রচনা করি তাতে বলি, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে উচ্চ যাতায়াত ব্যয়ের জন্য শ্রমিক চলাচল ঘটছে না। এর ফলে সে দেশের এক অংশের উন্নয়ন অন্য অংশের শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। বিনিয়োগের যৌক্তিকতা যাচাইয়ে শুধু পুঁজির বিকাশ ও লাভ চিন্তা না করে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বেড়েই চলবে। প্রয়োজন পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য দুটি পরিকল্পনা প্রণয়ন। যেখানে প্রবৃদ্ধির টার্গেট ভিন্ন হবে এবং অর্জনের পথও ভিন্ন হবে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সেই অংশেই থাকবে, যেখানে সেটি সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৫৪-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ২১ দফার ১৯ নম্বর দফায় যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয়েছিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল না। আমাদের ‘এক দেশ দুই নীতি তত্ত্ব’ সেই শূন্যতা পূরণ করল। ‘এই সময় আমি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে (পিআইডিই) যোগ দিই। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিল পিআইডিই। আমেরিকার সঙ্গে সদ্ভাবকে নষ্ট করবে বিধায় পিআইডিইকে ঘাঁটত না পাকিস্তান সরকার। আমরা সুযোগ পেয়ে গেলাম বৈষম্যের উপাত্ত সংগ্রহ করার। বুদ্ধি করে বিদেশি অর্থনীতিবিদদের নিয়ে এলাম এবং তাঁদের নামে প্রকাশিত হলো উপাত্ত ও বিশ্লেষণ। নির্মিত হলো নতুন জ্ঞান।’

এরপর তিনি এলেন দ্বিতীয় পর্বে। ‘আমরা শুধু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে ক্ষান্ত হইনি। সেমিনার, সভা-সমিতি করে ছড়িয়ে দিতে থাকলাম আমাদের জ্ঞান সর্বত্র। পত্রপত্রিকায় লেখাও ছাপাচ্ছিলাম। এ ব্যাপারে সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন রেহমান সোবহান। তাঁকে আমি বলতাম পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে বসে জানতে চান, কেন তাঁরা বৈষম্যের কথা বলছেন এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য তাঁরা কী পরামর্শ দেবেন? সব অর্থনীতিবিদের হয়ে আমি লিখলাম সেই বিখ্যাত মেমোরেন্ডাম। বলা হয়েছিল, মেমোরেন্ডামটি গোপন রাখতে হবে। আমরা কৌশলে তা লিক করে দিই।’

অধ্যাপক ইসলাম বললেন, তৃতীয় পর্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যায়ে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ইত্তেফাক-এর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, পাকিস্তান অবজারভার-এর আবদুস সালাম, সংবাদ-এর জহুর হোসেন চৌধুরীসহ আরও অনেক সম্পাদক তাঁদের পত্রিকায় খবর হিসেবে আমাদের বক্তব্যগুলো ছাপতেনই, সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদকীয় হতো অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা নিয়ে। মানিক মিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। মানিক মিয়ার মাধ্যমে বহু তথ্য প্রবাহিত হতো বঙ্গবন্ধুর কাছে। সে সময়ে ইত্তেফাক-এর সাংবাদিক মঈদুল হাসানও উপস্থিত থাকতেন আমাদের সভাগুলোতে। তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনীতির ছাত্র। অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে তথ্যপ্রবাহে তিনি ছিলেন আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ডক্টর নুরুল ইসলামের ভাষায় ‘তুখোড় এই রাজনীতিবিদ ক বললে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বুঝে নিতে জানতেন।’

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন বিখ্যাত ছয় দফা। অধ্যাপক রেহমান সোবহান মনে করেন, ছয় দফা বাঙালির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের ম্যাগনাকার্টা। ‘অর্থনীতিবিদেরা প্রায় এক দশক ধরে বলে আসছিলেন বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা এবং বৈদেশিক সাহায্য হলো পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পদ স্থানান্তরের মূল মাধ্যম। ছয় দফায় বঙ্গবন্ধু সেই মাধ্যমগুলোর ওপরেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরি করেন।’

চতুর্থ পর্যায়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. কামাল হোসেন, ড. আনিসুজ্জামান, ড. খান সারওয়ার মুরশিদ প্রমুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ‘পাকিস্তানের সেন্ট্রাল ব্যাংকে কর্মরত জনাব রশিদ আমাকে জানান যে তোমাকে একটু পূর্ব পাকিস্তানে যেতে হবে। সহযোগিতা করতে হবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে।’ ১৯৬৯-এর মার্চে ড. নুরুল ইসলাম করাচি থেকে একবার ঢাকায় এলেন। ‘বঙ্গবন্ধু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এক গোপন স্থানে। মজার ব্যাপার হলো, সেই গোপন স্থানটি একজন বিহারি সম্প্রদায়ের লোকের বাড়ি। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বঙ্গবন্ধু আমাকে জেরা করলেন। সন্তুষ্ট হওয়ার পরেই তিনি জানালেন পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে সংসদে নতুন সংবিধান প্রস্তাব করবেন। আমাকে ড. কামাল হোসেন, রেহমান সোবহান প্রমুখের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছয় দফাকে সেই নতুন সংবিধানের মূলে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করতে বললেন।

অধ্যাপক নুরুল ইসলামের রসবোধ এখনো বেশ প্রবল। এক দেশ দুই অর্থনীতির গল্প শোনাতে শোনাতে হঠাৎই চলে গেলেন ১৯৬৪ সালে। তিনি যখন পিআইডিইতে যোগ দিতে করাচিতে যান, রেহমান সোবহান তাঁর শাশুড়ির জন্য কোনো উপহার পাঠান। তা দিতে যখন অধ্যাপক সে বাড়িতে যান, রেহমান সোবহানের শাশুড়ি বেগম শায়েস্তা একরামুল্লাহ্ নাকি বলেছিলেন, ‘আমি জানি তুমি দুই অর্থনীতি নিয়ে কথা বলছ। কিন্তু আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি আমার মেয়ের জামাইকে সেই ভুল পথে নিও না।’ অধ্যাপক ইসলাম নাকি প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনার মেয়ের জামাই অলরেডি ভুল পথে চলে গেছে।’

অধ্যাপক ইসলাম আবার আমাকে জেরা করতে শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘একজন বড় নেতার গুণ কী? তুমি পারবে না, আমি বলছি, যেকোনো বিষয়ে একটা সামষ্টিক ধারণা থাকা এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই রকম বড়মাপের নেতা।’ জুম আলাপ শেষ হলো। ছাদে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালাম। ভীষণ ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল।

মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছিলাম ৫১ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব তরুণ শিক্ষক রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ইশতেহার লিখছেন! পাশে থেকে গাইড করছেন বিজ্ঞ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ছয় দফার আলোকে বঙ্গবন্ধু ইলেকশন লড়ছেন এবং বিজয় ছিনিয়ে আনছেন। পরবর্তী ঘটনাপরম্পরায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন দেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপনে এসব গুণী শিক্ষকের চেনাতে চাই নতুন প্রজন্মকে। তাঁদের মেধা, সৃষ্টিশীলতা এবং অঙ্গীকারের আদর্শ সংমিশ্রণ ঘটাতে চাই ভবিষ্যতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। আর সবাই মিলে কামনা করতে চাই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অন্যতম জ্যোতি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম।

তাসনিম সিদ্দিকী অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন