বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে চালু কথা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’। অর্থাৎ বাংলাদেশে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির প্রসার যেভাবে বেড়েছে, তাতে দেশটির উন্নতি করার কথা নয়। তারপরও করছে। এই আপাতবৈপরীত্যকেই বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’।

শান্তা দেবরাজন তাঁর লেখায় অবশ্য পাঁচ ধরনের প্যারাডক্স নিয়ে কথা বলেছেন। ১. দুর্নীতির মধ্যেই প্রবৃদ্ধি। ২. তুলনামূলকভাবে সরকারের সামান্য অবদান সত্ত্বেও মানব উন্নয়নে ভালো ফল পাওয়া। ৩. বাংলাদেশের শিল্পনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে রুল বা নীতি নয়, বরং লেনদেনের (ডিলস) প্রাধান্যই মূল এবং তা মূলত প্রভাবশালীদের দখলে থাকে। ৪. বাংলাদেশের কর-জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাত অত্যন্ত কম, মাত্র ৯ শতাংশ। এত কম আয় নিয়েও ধারাবাহিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ৫. বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আছে অতি উচ্চ খেলাপি ঋণ ও নানা ধরনের ভঙ্গুরতা। আবার বাংলাদেশই ক্ষুদ্রঋণ খাতে অত্যন্ত সফল।

তারপরেও বাংলাদেশ কী করে উন্নতি করল? শান্তা দেবরাজন মনে করেন, দেশটির ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর একটি সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশ মূলত একটি ঘনবসতি দেশ। এর মানুষ সমজাতীয়। ফলে এখানে যেকোনো ধারণা বা আইডিয়া এবং উদ্ভাবন দ্রুত ছড়িয়ে যায়। যেমন ১৯৭০–এর দশকে অল্প কয়েকটি এনজিও সাধারণ মানুষের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি পরিচিত করার কাজ শুরু করার পর সারা দেশই পরিবার পরিকল্পনার ধারণাটি দ্রুত গ্রহণ করে। একই ঘটনা ঘটে যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ–ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। আবার সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউস–সুবিধা চালু করলে উদ্যোক্তারা বিনা শুল্কেই কাঁচামাল আমদানি করে পোশাক রপ্তানির সুযোগ পান। তাতে দাঁড়িয়ে গেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। সবশেষে অনেক কম রাজস্ব আদায় নিয়েও সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছে কারণ, কিছুটা সংশয় রেখে হলেও বাংলাদেশ সব সময়েই এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচি মেনে চলেছে।

অন্যদিকে শক্তিশালী গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ঘাটতির কারণে সরকারে নেওয়া খারাপ নীতিগুলো চোখের আড়ালে থেকে যাবে এবং এর কোনো সংশোধন হবে না। সব মিলিয়ে সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠবে, যা একসময় আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। হ্যারি ব্লেয়ারের শেষ প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম এক পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার চাপে পড়ে কি উদার গণতান্ত্রিক পথে যাবে, নাকি আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হবে? তাহলে তখন কি আর ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ থাকবে?

শান্তা দেবরাজনের উপসংহার হচ্ছে, সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে একটি সরকার মূলত সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। সরকার ঋণ প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। বরং দেখা গেছে বেসরকারি খাত যদি এসব সেবা কার্যকরভাবে দিতে পারে, তাহলেও একটি দেশ উন্নতি করতে পারে, যেমন বাংলাদেশ পেরেছে। শান্তা দেবরাজন একে প্যারাডক্স না বলে বাংলাদেশেরই উন্নয়নের এক অনন্য মডেল হিসেবে দেখছেন।

এসব কথা শান্তা দেবরাজন প্রথম বললেন এমনও নয়। এর আগেও এ নিয়ে অনেক গবেষণা আছে, নিবন্ধ আছে অসংখ্য। সবারই মূল কথা হলো, বাংলাদেশে আসলে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একটি ফলপ্রদ ঘুষব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখানে ঘুষ দিলে কাজ হয়, উদ্যোক্তারা ঘুষকে উৎপাদন ব্যয়ের অংশ হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। অর্থাৎ ঘুষের বিনিময়ে কাজ উদ্ধারের একটি নির্ভরযোগ্য লেনদেন–ব্যবস্থা এখানে তৈরি হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, ভোক্তাদের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, অর্থনীতিতে অর্থ ঢুকছে, প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে।

তবে আলোচনা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম একটি ‘উচ্চ দুর্নীতি-উচ্চ প্রবৃদ্ধি’ ব্যবস্থা কতটা টেকসই? কত দিন তা চলবে। এই প্রশ্নটি নিয়েই কাজ করেছেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ কাউন্সিলের ভিজিটিং ফেলো হ্যারি ডব্লিউ ব্লেয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত জার্নাল অব ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত তঁার লেখার শিরোনামও ‘দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স’। তবে তিনি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বিশ্লেষণ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন তাঁর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিতে ৫০ বছর আগেই (১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর) সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘শেখ মুজিব অ্যান্ড দেজা ভু ইন ইস্ট বেঙ্গল: দ্য ট্র্যাজেডিস অব মার্চ ২৫’।

নতুন নিবন্ধে তিনি শুরুতেই লিখেছেন, ‘গত পাঁচ দশকের বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে এটি এমন একটি স্বাধীন দেশ, যেখানে গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নয়ন ঘটেছে। তবে বাংলাদেশই এর একমাত্র উদাহরণ তা নয়। যেমন গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নতি করেছে চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। এর মধ্যে তাইওয়ান ও কোরিয়া গণতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে এবং উন্নয়নও অব্যাহত আছে।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এসব দেশকে নতুন একটি নাম দিয়েছেন; প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী (কমপিটিটিভ অথরিটারিয়ানিজম) দেশ। প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ নিয়ে গবেষণা করেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কাই। তাঁর সংজ্ঞায় যে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও জালিয়াতি হয়, ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে, নির্বাচনে কারচুপি করে, বিরোধী দলকে জায়গা দেয় না, বিরোধী দলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের হয়রানি করে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, সাংবাদিক, বিরোধী দলের নেতা ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি চালায়, হুমকি দেয়, এমনকি গ্রেপ্তারও করে বা নির্বাসনে পাঠায়—সেসব দেশ গণতান্ত্রিক নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী। অর্থাৎ উন্নতি করে ঠিকই, তবে তারা গণতান্ত্রিক নয়।

হ্যারি ব্লেয়ার বাংলাদেশকে এই দলে ফেলেছেন। তবে তার প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এ রকম এক পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ধরে রাখতে পারবে? তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের জন্য স্বাধীনভাবে নানা সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত গণমাধ্যমের সামান্য নজরদারি, কোথাও প্রকৃত কোনো জবাবদিহি না থাকা এবং অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কারণে সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত সহজে নেয় এবং বাস্তবায়ন করে। এতে উন্নয়ন হলেও তা মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বজায় রাখা সহজ নয়। বরং ক্রমশ পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। কারণ, এই ব্যবস্থায় দুর্নীতি বাড়বেই। আর দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, স্বচ্ছতার যে ঘাটতি, তাতে দুর্নীতি ঠেকানোর পথও নেই। একই সঙ্গে প্রভাবশালীরাও নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে আরও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে শক্তিশালী গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ঘাটতির কারণে সরকারে নেওয়া খারাপ নীতিগুলো চোখের আড়ালে থেকে যাবে এবং এর কোনো সংশোধন হবে না। সব মিলিয়ে সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠবে, যা একসময় আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। হ্যারি ব্লেয়ারের শেষ প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম এক পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার চাপে পড়ে কি উদার গণতান্ত্রিক পথে যাবে, নাকি আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হবে? তাহলে তখন কি আর ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ থাকবে?

শওকত হোসেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন

[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন