নারীর সমতার যাত্রাকে এগিয়ে নিতে দরকার এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণার স্পষ্টতা, যা অনেকের মধ্যে অনুপস্থিত
নারীর সমতার যাত্রাকে এগিয়ে নিতে দরকার এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণার স্পষ্টতা, যা অনেকের মধ্যে অনুপস্থিতছবি: সুমন ইউসুফ

ইক্যুয়াল মেজারস-২০৩০ নামে একটি স্বতন্ত্র নাগরিক সংগঠন ২০১৭ সালে বিশ্বে পাঁচটি দেশের নীতিনির্ধারককে নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপটির উদ্দেশ্য ছিল জেন্ডার সমতা বিষয়ে নীতিনির্ধারকেরা কী ধারণা পোষণ করেন, মূলত সেটি জানা। জরিপটি পরিচালিত হয় ভারত, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও সেনেগালে। এর ফলাফলে দেখা যায়, নীতিনির্ধারকদের অধিকাংশই মনে করেন, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছে; যদিও এ ধারণার পেছনে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত প্রদান করতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। জরিপে উঠে আসা আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নারীর ক্ষমতায়ন মূল্যায়নে নারী ও পুরুষ নীতিনির্ধারকদের অবস্থানগত পার্থক্য। যেখানে অধিকাংশ পুরুষ মনে করেন, এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছে; সেখানে নারীরা মনে করেন, গন্তব্য এখনো বহুদূরে। উল্লেখ করা যেতে পারে, পুরো বিশ্বে নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের এক–চতুর্থাংশ।

কিছুদিন আগে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছিল দেশ। সেই আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। মানুষের আবেগমিশ্রিত নানা স্ট্যাটাস, মন্তব্য আর সংবাদ শেয়ারের বদৌলতে সুযোগ হয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে জানার ও বোঝার। এই শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যেমন সাধারণ ছিলেন, তেমনি ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ অনেকেই। অনেকের মন্তব্য দেখেশুনে কেবলই মনে হয়েছে, কোথাও বড় একটা শূন্যতা বিরাজ করছে আমাদের চিন্তার জগতে। চিন্তার এই দৈন্য আমাকে নতুনভাবে ভাবিয়েছে। উদারপন্থী হিসেবে যাঁদের এত দিন চিনেছি, তাঁদের অনেকের ভেতরের রক্ষণশীলতার পরিচয় পেয়ে স্তম্ভিত হয়েছি। আবার অনেকের আশাপ্রদ চিন্তাভাবনার মধ্যেও খুঁজে পেয়েছি অসংলগ্নতা। সাধারণের মন্তব্য এড়িয়ে গেলেও কিছুতেই এড়াতে পারিনি বিশিষ্টজনদের ভাবনা। আর আইন প্রণয়নকারী, নীতিনির্ধারক কিংবা প্রভাবশালীরা যখন বিভ্রান্তিকর, অসম্পূর্ণ কিংবা একপেশে চিন্তাভাবনাগুলো লালন করেন, তখন সেই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার কারণ আছে বৈকি!

বিজ্ঞাপন

ইদানীং কেবলই মনে হয়, নারীর সমতা, স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন আর অধিকার নিয়ে সর্বত্র ভুলে ভরা এক ধারণাকে লালন করে চলেছি আমরা। আর এই ধারণাগুলো যখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা লালন করেন, তখন আমাদের সামনে থাকে শুধুই অন্ধকার। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এ ক্ষেত্রে রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা, ইচ্ছাশক্তির অভাব এবং এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাব। অথচ বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে সবার আগে প্রয়োজন এই সব নীতিনির্ধারকের মনোজগতের পরিবর্তন।

একটি–দুটি উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম শিক্ষা অধিদপ্তরে। সেখানে একজন অভিজ্ঞ এবং দায়িত্বশীল বড় কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল কারিকুলাম এবং পাঠ্যবই প্রসঙ্গে। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে বেশ ফলপ্রসূ আলোচনাও হলো। কিন্তু নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক কারিকুলাম এবং পাঠ্যবইয়ের প্রসঙ্গটি আসতেই এতক্ষণের প্রাণবন্ত আলোচনায় যেন ভাটা পড়ল। প্রচলিত জেন্ডার রোলের বাইরে নারীকে চিত্রায়ণের গুরুত্ব বিষয়ে কথা বলতেই তাঁর মধ্যে একধরনের অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করলাম। একপর্যায়ে তিনি বলেই ফেললেন, ‘নারী শুধু ঘরের কাজ করলে সমস্যাটা কোথায়?’

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া, শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক মুখ্য কর্মকর্তার নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাভাবনার প্রতিফলন দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। এ ছাড়া নারীর প্রতি আচরণ, এমনকি ভাষার প্রয়োগেও প্রায়ই অনুভব করি অবজ্ঞা, অজ্ঞতা আর উদাসীনতা।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া, শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক মুখ্য কর্মকর্তার নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাভাবনার প্রতিফলন দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। এ ছাড়া নারীর প্রতি আচরণ, এমনকি ভাষার প্রয়োগেও প্রায়ই অনুভব করি অবজ্ঞা, অজ্ঞতা আর উদাসীনতা। এই তো গত বছর একটি ভরা ফোরামে একজন তথাকথিত সুশীলকে অংশগ্রহণকারী এক নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে এমন কিছু প্রশংসাসূচক বাক্য ছুড়ে দিতে শুনেছিলাম, যা সবাইকেই স্তম্ভিত করেছিল। এ রকম হাজারো উদাহরণ আছে। এসব ব্যক্তির কথাবার্তায় আর মন্তব্যে প্রায়ই আপত্তি করার মতো বিষয়বস্তু থাকলেও তাঁদের উচ্চ সামাজিক অবস্থান কিংবা ক্ষমতার কথা ভেবে অপ্রত্যাশিত বক্তব্য ও মন্তব্যগুলো হজম করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। এই মানসিকতা যে শুধু পুরুষেরাই লালন করেন, তা কিন্তু নয়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলে থাকেন। সত্যি কথা বলতে কি, এই মানসিকতার জন্য সম্পূর্ণভাবে তাঁদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। কারণ, তাঁরাও বেড়ে উঠেছেন একই সামাজিক কাঠামোতে, যেখানে তাঁদের চিন্তাচেতনা প্রভাবিত হয়েছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক দর্শন আর চর্চা দ্বারা। তাই তাঁদের পরিবর্তন এক দিনে আসবে, এমন আশা করাও বৃথা।

বিজ্ঞাপন
default-image

সমাজে নারীর অবস্থানের টেকসই পরিবর্তনের জন্য এসব নীতিনির্ধারক আর প্রভাবশালীকে নিয়ে সবার আগে কাজ করা প্রয়োজন। দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন কখনোই এক দিনে আসে না। তবে এ ক্ষেত্রে লেগে থাকাটা জরুরি। বিষয়টির সঙ্গে একাত্মতা আনয়নে সংশ্লিষ্টদের জন্য নিয়মিত বিরতিতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে। তাঁদের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনাতে এ–সংক্রান্ত কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারীবান্ধব নীতিনির্ধারণে এবং তা বাস্তবায়নে সেরাদের স্বীকৃতি প্রদান অনেককেই এ ক্ষেত্রে উৎসাহিত করবে। এ ছাড়া বেরিয়ে আসতে হবে আরও কিছু গৎবাঁধা চিন্তাভাবনা থেকে। যেমন ১. জেন্ডার বিষয় মানেই সেখানে নারী কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন এবং পুরুষেরা এ ক্ষেত্রে নীরব দর্শক হবেন; ২. জেন্ডার মানেই নারীর অধিকার কিংবা ক্ষমতায়নবিষয়ক আলাপ–আলোচনা, যেখানে পুরুষের উপস্থিতি কিংবা অংশগ্রহণ অপরিহার্য নয়; ৩. নারী-পুরুষের সমতা মানেই কেবল সংখ্যাগত সমতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা; ৪. বিশেষ কিছু দিবস পালনকেই জেন্ডার সংবেদনশীলতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা; ৫. জেন্ডার বিষয়টিকে মূলধারায় না এনে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা ইত্যাদি।

নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধে এবং নারীর সমতার যাত্রাকে এগিয়ে নিতে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণার স্পষ্টতা থাকা দরকার। জানতে হবে জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষা এবং তার প্রয়োগ। অসতর্ক শব্দচয়ন যেকোনো ইতিবাচক চিন্তাভানাকেও মুহূর্তেই বিপরীতভাবে উপস্থাপন করতে পারে। সর্বোপরি প্রয়োজন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীর চোখে বিশ্বকে দেখতে পারার প্রবল ইচ্ছাশক্তি।

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক

purba_du@yahoo.com

মন্তব্য পড়ুন 0