নির্বাচনের আচরণবিধি

বর্তমান সংবিধানের আলোকে সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ আইনের দৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার বিবেচনায় এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, সেটা সত্যিই বড় প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধনের যে খসড়া তৈরি করেছে, তাতে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ যে থাকবে না, সেটা স্পষ্ট। এ ধরনের বৈষম্যমূলক অবস্থা যেকোনো নির্বাচনকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদ বহাল রেখে এবং দলীয় সরকারের অধীনে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের খসড়া তৈরি করেছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের যেকোনো সংশোধনী বিবেচনায় নেবে এবং নির্বাচনী আচরণবিধির কোনো অংশ সংশোধিত সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিষয়টিকে এত যান্ত্রিকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। এই বাস্তবতার পাশাপাশি এটাও সত্য যে দেশের প্রধান বিরোধী দল এই সংশোধনী মেনে নেয়নি। তারা নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে সতর্ক করে আসছে। তাদের আশঙ্কা, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা নিরপেক্ষ হবে না এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত ও কারচুপি করার সুযোগ থাকবে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধন করার ফলে যদি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান, তবে তা কোনোভাবেই বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল শর্ত হচ্ছে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর পদে থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলতে যা বোঝায়, তা অবশ্যই নষ্ট হবে। ফলে শুধু সংবিধান বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। সংবিধানের বাইরে আরও যেসব বিষয় ও বাস্তবতা রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনকে এটা বুঝতে হবে যে নির্বাচন একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিশনের সব পদক্ষেপের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। এই অবস্থায় এককভাবে নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে এই প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে আচরণবিধি সংশোধনীতে হাত দেওয়া। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।