আমেরিকান অনলাইন নিউজ কোম্পানি বাজফিড নিউজ অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে তাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমবিষয়ক মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পয়েন্টার ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, আমেরিকায় এ পর্যন্ত ৫০টি সংবাদ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে; সেগুলোর মধ্যে ১০০ বছরের পুরোনো পত্রিকাও আছে বেশ কয়েকটি আর ২০০টি সংবাদ প্রতিষ্ঠান প্রকাশনায় সাময়িক বিরতি ঘোষণা করেছে। সারা পৃথিবীতে অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলোর একটা বড় অংশই সম্ভবত আর কখনো ছাপা সংস্করণে ফিরতে পারবে না।
বাংলাদেশের অবস্থাও ভিন্ন কিছু নয়। সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩ জুলাই প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড–১৯ মহামারিকালে জুন পর্যন্ত ঢাকা ও আট বিভাগীয় শহরসহ সারা দেশে মোট ২৫৪টি সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। জুন মাসেই সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) বলেছে, বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে ছাপা সংবাদপত্র এমনিতেই রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি সংবাদমাধ্যম শিল্পের জন্য আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপন শূন্যের কোঠায় নেমেছে, পত্রিকার গ্রাহক ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে প্রচুর আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি পত্রিকা মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

আয় কমে যাওয়ার একটা ফল সংবাদ প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া; ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে শুধু অনলাইন সংস্করণ চালু রাখার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা; টিকে থাকা মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলোর মুদ্রণসংখ্যা ও পৃষ্ঠাসংখ্যা ভীষণভাবে কমে যাওয়া এবং সর্বোপরি সংবাদকর্মীদের চাকরি হারানো এবং বেতন কমে যাওয়া।


সংবাদমাধ্যম শিল্পের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির কারণ আয় কমে যাওয়া। মারডকের নিউজ করপোরেশন বলেছে, এই মহামারির ছয় মাসে তারা দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে। যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম নিউজপেপার গ্রুপ রিচ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যারা ডেইলি মিরর, ডেইলি এক্সপ্রেসসহ ২৪০টি আঞ্চলিক পত্রিকা প্রকাশ করে তারা বলেছে, করোনাকালে তাদের আয় কমেছে ৩০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, করোনার কারণে তাদের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই কোটি পাউন্ড। আমেরিকার শীর্ষ দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, তাদের বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমেছে ১৫ শতাংশ। করোনাকালে আয় কমেনি এমন কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান হয়তো বিশ্বজুড়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আয় কমে যাওয়ার একটা ফল সংবাদ প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া; ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে শুধু অনলাইন সংস্করণ চালু রাখার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা; টিকে থাকা মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলোর মুদ্রণসংখ্যা ও পৃষ্ঠাসংখ্যা ভীষণভাবে কমে যাওয়া এবং সর্বোপরি সংবাদকর্মীদের চাকরি হারানো এবং বেতন কমে যাওয়া।

প্রকাশনা সংকোচনের তথ্যগুলো যতটা পাওয়া যাচ্ছে, সংবাদকর্মীদের চাকরি হারানো ও বেতন কমার তথ্য সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লোকসানের খবর জানাচ্ছে বটে, তবে কত সংখ্যক সাংবাদিককে ছাঁটাই করছে, কতজনের বেতন-ভাতা কমাচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করছে না। অবশ্য ব্যতিক্রম কিছু আছে; যেমন বিলেতের গার্ডিয়ান বলেছে, তারা ১৮০ জন কর্মীকে বিদায় জানাতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ৭০ জন সাংবাদিক। আমেরিকার ১৬৩ বছরের পুরোনো পত্রিকা দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিন মে মাসে ৬৮ জন কর্মী ছাঁটাই করেছে। কর্মী ছাঁটাই, বিনা বেতনে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দিয়ে দেওয়া ও বেতন–ভাতা কমানোর তালিকায় রয়েছে ভাইস, বাজফিডসহ অজস্র আমেরিকান সংবাদ প্রতিষ্ঠান। ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দি ভাষার শীর্ষ দৈনিক ভাস্করসহ আরও অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠান কোভিড–১৯ মহামারিকালে তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়ে নতুন বেতনকাঠামো তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ছাঁটাই এবং বেতন–ভাতা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের চাকরি হারানো ও বেতন কমার প্রকৃত বা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রের একটা আভাস দিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। মে মাসে তারা একটি প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড–১৯ মহামারির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারিয়েছেন কিংবা বেতন-ভাতা কাট-ছাঁটের শিকার হয়েছেন এমন সংবাদমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার। এই তালিকায় কোনো ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নেই। পয়েন্টার

কোভিড–১৯ মহামারি এসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের প্রায়-সম্পূর্ণভাবে বেকার করে দিয়েছে। সিএনএনের মতো প্রতিষ্ঠান, যারা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে লেখক সম্মানী দিয়ে দিত, তারা ঘোষণা করেছে, এখন ফ্রিল্যান্সাররা লেখক সম্মানী পাবেন লেখা প্রকাশিত হওয়ার ৯০ দিন পর।
লিখেছে পয়েন্টার ইনস্টিউট

ইনস্টিটিউট লিখেছে, কোভিড–১৯ মহামারি এসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের প্রায়-সম্পূর্ণভাবে বেকার করে দিয়েছে। সিএনএনের মতো প্রতিষ্ঠান, যারা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে লেখক সম্মানী দিয়ে দিত, তারা ঘোষণা করেছে, এখন ফ্রিল্যান্সাররা লেখক সম্মানী পাবেন লেখা প্রকাশিত হওয়ার ৯০ দিন পর।
সংবাদমাধ্যম শিল্পের জন্য এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিটা আসলে অদ্ভুত। কারণ, করোনাকালে সংবাদের চাহিদা কমেনি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। তাই হওয়ার কথা ছিল উল্টো: সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা যে ঘটেনি, তার কারণ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধস; ব্যবসা-বাণিজ্যে ভীষণ মন্দা। অর্থনৈতিক বিবেচনায় সংবাদমাধ্যম শিল্পের জন্য আদিতম পরিহাস হলো এই শিল্পের আয়ের প্রধান উৎস এর ভোক্তারা নন, পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা নন। এর ব্যবসায়িক নির্ভরশীলতা বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর। কোভিড মহামারিকালে, বিশেষত লকডাউনের কারণে প্রায় সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিজ্ঞাপনে ধস নেমেছে, সংবাদমাধ্যম শিল্পের নাভিশ্বাস উঠেছে।
অবশ্য এমন নয় যে সংবাদমাধ্যম শিল্পের অবস্থা কোভিডের আগে রমরমা ছিল। না, তা ছিল না। আজ থেকে অন্তত এক দশক আগেই এমন প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে ‘ইজ জার্নালিজম ডাইং?’ কিংবা ‘ক্যান জার্নালিজম সারভাইভ?’


সংবাদমাধ্যম শিল্পের আয়-সংকট শুরু হয়েছে অন্তত এক যুগ আগে, যখন গণযোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রাধান্যের সূচনা ঘটে। তখন থেকেই মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের আয় কমতে শুরু করে। আশা করা হয়েছিল সাংবাদিকতার প্রধান মাধ্যম মুদ্রণ থেকে ডিজিটালে স্থানান্তরিত হলে আয়ও একইভাবে স্থানান্তরিত হবে। যে রাজস্ব মুদ্রিত সংস্করণ থেকে আসত, তা আসবে ডিজিটাল সংস্করণ থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই প্রত্যাশা সত্য হয়নি। সে দুর্ভাগ্যের কারণ নিয়ে এই লেখায় কিছু বলা সম্ভব নয় জায়গার অভাবে। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে।
এখনকার প্রশ্ন হলো সংবাদমাধ্যম শিল্প ও পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য যে সংকট অনেক আগেই শুরু হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি এসে যেটাকে সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘বৃহত্তম অস্তিত্বসংকটে’ পরিণত করেছে, তা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় কি আছে? থাকলে সেগুলো কী?
একটা সম্ভাব্য উপায় হলো সংবাদমাধ্যম শিল্পের আয়-নির্ভরতার স্থানান্তর। ভাবনাটা এমন: এই শিল্প টিকে থাকবে এবং ক্রমে আরও বিকশিত হবে অর্থনৈতিকভাবে বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর নির্ভর করে নয়, এর ভোক্তাদের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, এই শিল্পের রাজস্বের প্রধান জোগানদাতা হবে পাঠক–দর্শক–শ্রোতা। সেটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব গ্রাহকভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলের বিস্তারের মাধ্যমে। এই ক্ষেত্রে চলতি কোভিডকালে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখা গেছে নিউইয়র্ক টাইমস–এর ক্ষেত্রে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই পত্রিকার ডিজিটাল গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ লাখ। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ও দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনসহ আরও অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায়ও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।


যদিও বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ার অনুপাতে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন বা গ্রাহকভিত্তিক আয়ের পরিমাণ এখনো অনেক কম, তবু অন্তত আস্থা অর্জনকারী সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে গ্রাহকভিত্তিক সাংবাদিকতার মডেল। কোভিডকালের ব্যাপক হতাশার মধ্যে এটাকে সংবাদমাধ্যম শিল্পের জন্য একটা আশার আলো হিসেবে দেখা যেতে পারে, তা আপাতত যত ক্ষীণই হোক না কেন।
বলা প্রয়োজন, পেশাদার সাংবাদিকতার টিকে থাকার সব পথ ফুরিয়ে যায়নি। সাংবাদিকতার এই অস্তিত্ব-সংকটই চূড়ান্ত নয়। আর বলাই বাহুল্য যে আধুনিক রাষ্ট্র, সমাজ, এই মানবসভ্যতা সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম ছাড়া চলবে না। সভ্যতা নিজের প্রয়োজনেই সাংবাদিকতার টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবে। এর টিকে থাকার এবং ভবিষ্যতে আরও দক্ষ, কার্যকর, স্বাধীন ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার আরও সম্ভাব্য উপায় এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেসব নিয়ে বলব আগামী লেখায়।


মশিউল আলম : প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন