default-image

শুরুতেই শিরোনামটির ব্যাখ্যা দিয়ে রাখা ভালো।এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত নয় এবং নিকট-ভবিষ্যতে তেমনটি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কেননা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক এক শীর্ষ আমলার বর্ণনায়, কেবল সম্রাটের সঙ্গে তুলনীয়। আর সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীর কোনো জবাবদিহি থাকতে নেই। সুতরাং, প্রজাদের কাছে তাঁর ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। শিরোনামটি যাঁকে ঘিরে, তিনি হলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহিতে বাধ্য প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রচার বিভাগের পরিচালক পদে সাবেক এক সম্পাদককে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে যথাযথ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ ও বিরোধীদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ক্যামেরনকে এই ক্ষমা চাইতে হলো। প্রথমে নিজের অফিসে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে, আর ২৪ ঘণ্টা পর দ্বিতীয়বার হাউস অব কমন্সের অধিবেশনে। তবে, দুবার ক্ষমা চেয়েও তিনি নিস্তার পাননি। প্রথমবারের ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য তাঁকে পেতে হয়েছে আদালতের ভৎ৴সনা, আর দ্বিতীয়বারের জন্য বিরোধী দল ও সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা।
ব্রিটেনের বহুল আলোচিত ফোন হ্যাকিং মামলায় লন্ডনের একটি আদালত প্রধানমন্ত্রীর সাবেক গণসংযোগ পরিচালক অ্যান্ডি কুলসনকে দোষী সাব্যস্ত করার পর প্রধানমন্ত্রীর এই নাকাল দশা। এই মামলার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। তবে, আসামিদের মধ্যে অন্তত তিনজন এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান নিউজ ইন্টারন্যাশনালের মালিক, প্রকাশনাজগতের সম্রাট হিসেবে খ্যাত রুপার্ট মারডকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা এই মামলার প্রতি ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দেয়। অবশ্য, আসামিদের মধ্যে দুজন প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা এবং ব্যক্তিগত বন্ধু রেবেকা ব্রুকস ও তাঁর স্বামী চার্লি ব্রুকসকে জুরিরা নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেন। বিপত্তি ঘটে অ্যান্ডি কুলসনকে ঘিরে, যাঁকে ফোন হ্যাকিংয়ের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন।
কুলসন ছিলেন ব্রিটেনের সর্বাধিক প্রচারিত এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্র নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর সম্পাদক এবং প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের নির্বাচনী সাফল্যের প্রধান কুশীলব। কুলসনের প্রচারকৌশলের সাফল্যেই টোরি পার্টির নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্নপূরণ। স্বভাবতই ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি পদে তাঁর নিযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধা করেননি ক্যামেরন। তবে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর বিরুদ্ধে অন্যের ফোনের রেকর্ড করা বার্তা বেআইনিভাবে শোনার চেষ্টা-সম্পর্কিত অভিযোগগুলো প্রথম যখন ওঠে, তখন তার সম্পাদক ছিলেন কুলসন। সে সময় বিরোধী দলের পক্ষ
থেকে তাই প্রধানমন্ত্রীকে সতর্কও করা হয়। কিন্তু, ক্যামেরন তখন তা মোটেও গায়ে মাখেননি। মামলার রায় ঘোষণার পর তাই বিব্রত প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কুলসনকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন।
কুলসনের বিরুদ্ধে চারটি আলাদা অভিযোগে এই বিচার অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ফোন হ্যাকিংয়ের ষড়যন্ত্র ছড়া সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান এবং বিচার-প্রক্রিয়াকে বিপথে পরিচালিত করার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জুরিরা একমত হতে পারছিলেন না। ফলে বিচারক জুরিদের একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও কিছুটা সময় দেন। কিন্তু বাকি অভিযোগগুলোর বিচার চলার সময়েই প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরা ডেকে নিয়ে ক্ষমা চান। ক্ষুব্ধ বিচারক এরপর প্রধানমন্ত্রীকে ভৎ৴সনা করে চিঠি লিখে স্মরণ করিয়ে দেন যে মামলা চলাকালে তাঁর ওই বিবৃতি আদালত অবমাননার শামিল। সুতরাং, বিচারক কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর তিরস্কৃত হওয়ার বিষয়টি পরদিন প্রধান প্রধান সব পত্রিকার শিরোনামে উঠে আসে।
পরের দিন বুধবার পার্লামেন্টে বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর বিচারবুদ্ধির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা এবং সরকারের অতটা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অতীত ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। সে সময় দ্বিতীয় দফা ক্ষমাপ্রার্থনায়ও রেহাই মেলেনি তাঁর। এমনকি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল যাঁরা, তাঁদের আস্থায়ও

চিড় ধরার আলামত দেখা যায়। টোরি পার্টির প্রতি সহানুভূতিশীল রক্ষণশীল পত্রিকা টেলিগ্রাফ-এ লেখা হয় যে ‘দৃঢ় চরিত্র এবং নির্ভরযোগ্য নৈতিক মানসম্পন্ন মানুষ হিসেবে ক্যামেরনকে আর বিবেচনা করা সম্ভব নয়।’ (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্যামেরনের নাকাল হওয়ার পালায় শুক্রবার যোগ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন প্রশ্নে তাঁর প্রস্তাব ২৬-২ ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার লজ্জা।)

২.
৩০ জুন পার্লামেন্টারিয়ানদের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১২৫তম বার্ষিকী। এই উপলক্ষে আইপিইউর প্রেসিডেন্ট আবদেলওয়াহাদ রাদি বলেছেন যে গণতন্ত্রের বিকাশ চাইলে রাজনীতিকদের তাঁদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা বা অবিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে হবে।তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন হওয়া এবং তাঁদের মোহভঙ্গ জনগণকে আরও প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনীতিতে এই আস্থার ঘাটতি কাটাতেই পশ্চিমা গণতন্ত্রে রাজনীতিকেরা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও নির্দ্বিধায় ক্ষমা চান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব জায়গায় গণতন্ত্রের ভিত কিছুটা মজবুত হয়েছে, সেসব দেশেও রাজনীতিকদের মধ্যে লাজলজ্জা কিছুটা হলেও আছে। কিন্তু আমাদের না আছে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুশীলনের ঐতিহ্য, না আছে হায়া। ফলে পিতার কৃতিত্ব বা অবদানের দোহাইয়ে ‘পুত্রের সাত খুনও মাফ’ (বাগ্ধারা হিসেবে ব্যবহৃত) হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের ওসমান পরিবারের প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা যে নারায়ণগঞ্জে একটি কালোজগতের (আন্ডার ওয়ার্ল্ড) জন্ম দিয়েছে, তা সম্ভবত তাঁরা জানতেও চান না। সেখানে স্কুল-কলেজ, বাজার-ঘাট, পরিবহনব্যবস্থা, বণিক সমিতি, বিভিন্ন ক্লাব, প্রশাসন—সবকিছুই চলে ওই একজন অতিক্ষমতাধরের কথায়। ক্ষমতার প্রকাশ্য প্রয়োগের সময় যিনি সরকারদলীয় সাংসদ, আর অপ্রকাশ্য প্রয়োগের সময় গডফাদার।
দল ক্ষমতায় থাকলে র্যাব-পুলিশকে যিনি ভাসিয়ে দিতে সক্ষম, ক্ষমতাহীন হলে তিনি অবশ্য দেশান্তরে ফেরার এবং জেলার সরকারি তালিকার শীর্ষ সন্ত্রাসী (সূত্র: ‘ওসমান পরিবারের রাজনীতি সংকটে’; প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩)।
উপনির্বাচনের দিন তিনি সাংবাদিকদের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন বলে যে খবর বেরিয়েছে, তা পড়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। গল্পটি হচ্ছে, থানার দারোগা চুরির অপরাধে একটি ইঁচড়ে পাকা ছেলেকে ধরেছেন। তারপর যখন ছেলেটিকে মারা হচ্ছে, তখন সে দারোগার কাছে কাকুতি-মিনতি করে বলতে লাগল, ‘হুজুর, আমারে ছাইড়া দেন। আর করব না। আপনি আমার বাপ লাগেন, হুজুর ছাইড়া দেন, আমরা সব কুত্তার বাচ্চা বইলা এই রকম করছি, আর করমু না।’
প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, নেতা-নেত্রীদের ক্ষমতায় আরোহণ এবং তা ধরে রাখার জন্য লাঠিয়াল হিসেবে এসব গডফাদারের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে উপায় নেই।এসব লাঠিয়াল মাঠে না থাকলে ৫ জানুয়ারির মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন সম্ভব ছিল না। রাজনীতিকে রাজনীতিবিদেরাই দুর্বৃত্তদের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছেন।
কিছু দুর্বৃত্ত সরকার বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দল বদলায়, আর কারও কারও দলীয় আনুগত্য অটুট থাকে। এটি শুধু নারায়ণগঞ্জের বিষয় নয়; ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, যশোরসহ নানা অঞ্চলের। অতীতে বিএনপিও যে এর ব্যতিক্রম ছিল না, তার প্রমাণ সে সময়ের পত্রপত্রিকা খুললেই পাওয়া যাবে।
আমাদের রাজনীতিকেরা সুযোগ পেলেই আইপিইউর সভা-সমিতিতে যোগ দিতে বিদেশে যান। এমনকি ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রহসনে বিনা ভোটের সাংসদদেরও কয়েকজন সম্প্রতি আইপিইউর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিদেশ সফর করে এসেছেন। অন্তত তাঁরা কি এটুকু মেনে নেবেন যে তাঁদের ওপর জন–আস্থায় ঘাটতি আছে এবং সে আস্থা ফিরে পেতে হলে যত দ্রুত সম্ভব ভোটারদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলো বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0