বাঙালি নারীর মুখ

বাঙালি জাতি সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেছি এত দিন, তা চূর্ণ হয়ে গেছে এই জুনের তৃতীয় সপ্তাহে। জাতির জীবনে নেতৃত্বের কারণে শত শত বছর পর পর আসে বড় পরিবর্তন। অতীতের সঙ্গে জাতির আর কোনো যোগ থাকে না। গত পাঁচ শ বছরে বাঙালির যে সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন শ্রীচৈতন্য, রামমোহন রায়, লালন শাহ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, কাজী নজরুল ইসলামরা; জুনের তৃতীয় হপ্তায় এসে তা এক নতুন দিকে মোড় নিল। এই পরিবর্তন এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা হবে অতীতের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই পরিবর্তন কোনো দিন কল্পনাও করিনি।
দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলের লেখা যে গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাতে বাংলা মায়ের মুখের বাণী—বাংলা ভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো’। আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মুখে বাংলা ভাষা এখন এক চরিত্র ধারণ করেছে, যা আর আদৌ সুধার মতো নয়—স্যুয়ারেজের ড্রেনের নোংরার মতো। রবীন্দ্রনাথের বিদেহী আত্মার যদি কথা বলার ক্ষমতা থাকত, তা হলে তিনি শেরেবাংলা নগরের পামগাছগুলোর ছায়ায় দাঁড়িয়ে বলতেন: তোমরা আমার গানটিকে তোমাদের দেশের জাতীয় সংগীত করার অধিকার হারিয়েছ। আমি আমার সোনার বাংলা প্রত্যাহার করে নিলাম। অথবা কোনো উকিলকে দিয়ে ‘কেন গানটি প্রত্যাহার করা যাবে না’—এই মর্মে এক রিট ঠুকে দিতেন।

মহামতি লেনিন বুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের পার্লামেন্টকে বলেছেন ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’; কিন্তু আমরা বলি ‘পবিত্র সংসদ’। লেনিনের কথাটি যেমন সত্য নয়, তেমনি আমাদের কথাটিও ডাহা মিথ্যা। কোনো জায়গা যদি সত্যি সত্যি পবিত্র হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অশ্লীল, কুৎসিত ও মিথ্যা কথা উচ্চারণ করতেই পারেন না। যেমন মন্দির, মসজিদ, বিহার, গির্জায় মানুষ যখন যায়, তখন সে শারীরিক আচরণে ও মুখের ভাষায় থাকে খুবই সংযত। পবিত্র হোক বা না হোক, পার্লামেন্ট হাট-বাজারও নয়। বাঙালির অনেক দোষ আছে, তার স্বভাব-চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ, কিন্তু এই জুন-পূর্ব বাঙালিরা ঘরোয়া আলোচনায় পর্যন্ত কারও জন্মের ৬৮ বা ৮৩ বছর পর তাঁর জন্মের বৈধতা-অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। জন্ম ও মৃত্যু মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা নিয়ে কোনো বেটা বা বেটির মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।

আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে পার্লামেন্টের প্রধান কাজ দুটো: আইন প্রণয়ন করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করা। আমাদের সংবিধানেও বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।’ এ কথা বলা হয়নি যে যারে দুচোখে দেখতে পারি না তার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে নোংরামি করার ক্ষমতা সংসদ-সদস্যগণকে দেওয়া হইল। জনস্বার্থ নিয়ে বিতর্কের সময় বহু পার্লামেন্টেই ফাইল ছোড়াছুড়ি, হাতাহাতি, মারামারি পর্যন্ত হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। কিন্তু জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় সংসদে’ যা হচ্ছে তার তুলনা পৃথিবীর আর কোনো সংসদীয় গণতন্ত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যারা সেক্যুলারিজমের ঝান্ডাবাহী, তাদের মধ্যে ঘোরতর সাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রকাশ ঘটলেও ক্ষতি নেই। যারা ইসলামের নিশানবরদার, তাদের মধ্যে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ঘটলেই বা কী যায়-আসে? কিন্তু বাংলাদেশ আজ এমনই ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামি সাম্য-মৈত্রী-সৌহার্দ্যে সয়লাব যে এক ধর্মের লোক আরেক ধর্মের মানুষের প্রতি চোখ পাকিয়ে না তাকালে পেটের ভাতই হজম হয় না। বৈদিক হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্ম উভয়ই সত্যের ওপর জোর দিয়েছে। যা সত্য শুধু তা-ই গ্রহণীয়। যা অসত্য তা অতি অবশ্য বর্জনীয়। কিন্তু আজ মিথ্যার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম প্রকাশ পাচ্ছে সব ধর্মাবলম্বীর মধ্যে।

এই বাংলায় হজরত শাহজালাল মজররদ, হজরত শাহ মখদুম রুপোস, পীর আবদুল মালেক ইয়ামেনী প্রমুখ সুফি আল্লাহর প্রেম ও মানুষের প্রেমের বাণী ধর্মনির্বিশেষে প্রচার করেছেন। শত শত বছর ধরে সব ধর্মের মানুষ তাদের সমাধিশিলায় শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন পীর ইয়ামেনীর মাজারে গিয়ে আধ্যাত্মিক ও সুফিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন। একসময় হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ সব বাঙালিরই মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব ছিল না। একদিকে সুফিরা, অন্যদিকে হিন্দু সাধকেরা গড়ে তোলেন সমন্বিত সংস্কৃতির বাঙালি জাতি। একদিন শ্রীচৈতন্যের প্রেমবিহ্বল ভক্তিরসে প্লাবিত হয়েছিল বাংলাদেশ। তাঁর প্রচারিত উদার প্রেমধর্মের ভক্তিরসে শুধু হিন্দু বৈষ্ণবেরা নন, মুসলমানরাও আপ্লুত হয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্মের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ তা সব বাঙালির সম্পদ। রাজনীতির স্বার্থে সাম্প্রদায়িক হীন মানসিকতা আজ সব বাঙালিকে তার সমৃদ্ধ ও মহান অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

গত ১৫ জুন পর্যন্ত আমি বাঙালি নারীকে মনে করেছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। মনে করতাম ভারতবর্ষীয় নারী ডাইনির প্রতিমূর্তি নয়। বাঙালি নারী স্নেহময়ী ও কল্যাণী, যাকে ‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান’। তবে ব্যতিক্রম তো থাকেই। জীবনে দু-একবার গ্রাম্য নারীর কাইজা ও চুলাচুলিও দেখেছি। তারা অশিক্ষিত ইতরশ্রেণীর মানুষ। সভ্যতার আলো ওদের পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এখন টিভিতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের যে দৃশ্য ও অঙ্গভঙ্গি দেখি, তার কাছে গ্রাম্য ইতর নারীদের ওই ঝগড়ার দৃশ্য তেমন কিছু নয়।

ছাত্রজীবনে যখন বাসে যাতায়াত করতাম, তখন দেখতাম বাসের গায়ে লেখা থাকত: ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’। অর্থাৎ কার জন্ম কোথায়, কোন অজপাড়াগাঁয়ের আঁতুড়ঘরে, নাকি কোনো প্রাসাদে, সেটা কোনো ব্যাপার নয়। বাস কন্ডাক্টরের সঙ্গে যাত্রীর আচরণই বলে দেবে তার জন্ম-পরিচয়। আচরণ বড়, জন্মস্থান নয়।

মাথার চুল, শরীরের অন্যান্য লোম, ত্বক, মাংস, রক্ত, শিরা, ধমনি, হাড়, নখ প্রভৃতি দিয়ে তৈরি মানুষের যে শারীরিক অবকাঠামো, তা একটি বস্তু। মনে পড়ে, বহুদিন আগে এক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, যেসব উপাদান দিয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীর গঠিত, তা ব্যবচ্ছেদ করে বিক্রি করলে দাম পাওয়া যাবে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। এখন টাকার দাম কমেছে। ১০-১২ হাজার টাকা হতে পারে। একজন অত্যন্ত মাননীয় সংসদ সদস্য তাঁর এলাকা থেকে (আসলে প্রায় সবাই থাকেন ঢাকায়) সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে আসতে ১১ হাজার টাকা টিএ পান, তা তাঁর শরীরের বস্তুগুলোর দামের সমান।

মানুষের শরীরের বাইরে তার আর একটি বস্তুনিরপেক্ষ সত্তা রয়েছে। তার দাম ১১ হাজার টাকা নয়। তার মূল্য একটি পদ্মা সেতু বানাতে যত টাকার প্রয়োজন, তার চেয়ে হাজার বা লক্ষ গুণ বেশি। তার নাম মনুষ্য-আত্মা ও বিবেক। কোনো কোনো মানুষের সেই আত্মাটি যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার দাম এক কানাকড়িও থাকে না। নষ্ট আত্মা ও নর্দমার নোংরার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মানুষের চেহারাটা নয়, তার ভেতরের অবস্তুগত যে সত্তা, সেটাই মানুষের প্রধান সম্পদ।

ষাট ও সত্তরের দশকে সাহিত্য পত্রিকা ও দৈনিকের সাময়িকীর পাতায় কবিতা, গল্প, সাহিত্য সমালোচনা লিখতাম। সম্পাদকীয় পাতায় লেখা শুরু করি আশির দশকের শুরুতে। আজ একটি কথা মনে পড়ছে। জীবনের প্রথম উপসম্পাদকীয় নিবন্ধটির বিষয়বস্তু ছিল সংরক্ষিত মহিলা সদস্যদের নিয়ে। আমার লেখা প্রথম কলাম বা উপসম্পাদকীয় নিবন্ধটি ছাপা হয়নি। রাত আটটায় আমি প্রুফ দেখে দিই। মেকআপ করাও দেখে আসি। রাত সাড়ে ১০টায় মালিক-সম্পাদক লেখাটি না ছাপার নির্দেশ দেন। সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারী সদস্যদের আমি সমালোচনা করেছিলাম। সম্পাদকের এক আত্মীয়া ছিলেন একজন নারী সাংসদ।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্যের ঘরে অনির্বাচিতদের অর্থাৎ মনোনীতদের প্রবেশাধিকার এবং সমান সুযোগসুবিধা লাভ গণতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ১৯৭২-এ মূল সংবিধানে বলা হয়েছিল: ‘এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে দশ বৎসরকাল অতিবাহিত হইবার অব্যবহিত পরবর্তীকালে সংসদ ভাঙ্গিয়া না যাওয়া পর্যন্ত পনরটি আসন কেবল মহিলা-সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাঁহারা আইনানুযায়ী পূর্বোক্ত সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হইবেন’ (৬৫/৩ ধারা)।

১৯৭২ সালে দেশের অবস্থা ছিল আজকের থেকে অন্য রকম। তখন ১০ বছরের জন্য ১৫টি সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন ছিল। নারী তখন পিছিয়ে ছিলেন জীবনের সব ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ১৯৮৩ সালে এই বিধান তুলে দিতেন। আজ জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতায় তাঁর অবস্থান করে নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়ে ও ছেলে সমান। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নারী তাঁর যোগ্যতার বলে বড় বড় পদে কাজ করছেন। সচিব হচ্ছেন যোগ্যতায়। অধ্যাপক হচ্ছেন যোগ্যতায়। রাষ্ট্রদূত হচ্ছেন যোগ্যতায়। নারী গড়ে তুলছেন শিল্প-কারখানা। তাঁরা ব্যবসায়ী চেম্বারের নেতা হচ্ছেন। নারী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার হচ্ছেন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করে। নারী চালাচ্ছেন বিমান। নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন। নারী তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন না কোথায়? বড় বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি নারী। এই অবস্থায় সংরক্ষিত নারী আসন গণতন্ত্রকে অপমান করা ছাড়া কিছু নয়।

যে প্রথা তুলে দেওয়ার কথা, তাকে আরও বাড়ানো হয় এবং পাকাপোক্ত করা হয়। সংবিধান (দশম সংশোধন) আইন, ১৯৯০ (১৯৯০ সালের ৩৮ নম্বর আইন)-এর ২ ধারাবলে (৩) দফায় সংরক্ষিত মহিলা আসন করা হয় ৩০। তারপর আরেক ধাক্কায় ৪৫। এবার মহাজোট আরও পাঁচটি বাড়িয়ে করেছে ৫০। এ ব্যবস্থা করা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অর্থাৎ সরকারি দলের সুবিধার জন্য—দেশের নারী সমাজের সুবিধার জন্য নয়। শুরু থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনের অপব্যবহার করছে সরকারি দল। সংরক্ষিত নারী আসন থাকার ফলেই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯১ সালে জামায়াতকে দুটি নারী আসন উপহার দিতে পারে। তাতে সংসদে জামায়াতের শক্তি বাড়ে। বিএনপি ও তার মিত্ররা অনির্বাচিত নির্দলীয়দের দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করছে। আমাদের নাগরিকদের উচিত, অবিলম্বে সংরক্ষিত নারী আসন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। ক্রমবর্ধমান সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের যে ভূমিকা আমরা দেখছি, তাতে এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশে গণতন্ত্র থাকবে না। ব্যক্তিগতভাবে নারী সাংসদদের সৌভাগ্যে আমরা ঈর্ষান্বিত নই। তাঁদের বাড়ি, গাড়ি, ধনসম্পদ, ব্যাংক-ব্যালান্স বাড়ুক তা আমরা চাই। কিন্তু তাঁদের মুখের কারণে সংসদ কলুষিত হোক, জাতির মুখে চুনকালি পড়ুক, তা চাই না।

যাঁরা শুধু সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাংসদকে দোষারোপ করছেন, তাঁদের সঙ্গে আমি একমত নই। তাঁদের ব্যক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করেছেন তাও নয়। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সরকারি সাংসদ যখন নোংরা ছিটান তখন তা উপভোগ করেন তাঁদের দলের অন্যরা এবং নীরবে উপভোগ নয়, চাপড়ান টেবিল খুশিতে। স্পিকার মন দিয়ে শোনেন, থামান না। বিরোধী দলের সাংসদ যখন তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত পেশ করেন, তখন তা উপভোগ করেন তাঁর দলের সাংসদেরা। এভাবে সংসদকক্ষ হয়ে ওঠে একটি দারুণ ভদ্রলোকের জায়গা। তাঁরা ভুলে যান যে কলকাতা সিভিল কোর্টের কোথাকার কোন এভিডেভিট, উকিল চণ্ডীদাস, তাঁর মেয়ে গৌরীবালা, উকিলের সহকারী অরণ্য কুমার, গৌরীবালার ছেলে দেবদাস চক্রবর্তী, চণ্ডীদাসের মহুরি, জলপাইগুড়ি চা-বাগানের ইহুদি উইলসন, লক্ষ্মীরানী মারমা, তাঁর মেয়ে পুতুলরানী মারমা, উইলসন ও লক্ষ্মীরানীর নাতি প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনার জন্য জনগণ তাঁদের বেতন-ভাতা দেয় না। ধিক ধিক মনুষ্য বিবেক! আগের দিনে দেশীয় সামন্ত রাজা ও জমিদারদের চাকরবাকরেরা অপ্রাসঙ্গিকভাবে তাদের প্রভুদের খুশি করতে যা খুশি তা-ই বলত। তাতে তাদের জীবন-জীবিকা ও সুখশান্তি নিশ্চিত হতো। বাংলার মাটিতে সামন্তবাদের অবসান ঘটেনি।

আমরা নারীর মর্যাদা ও তরুণ নেতৃত্বের জন্য লড়াই করছি বহুদিন। এই কি তার পরিণাম! দুই পক্ষের মাননীয়দের গবেষণায় মুজিব-জিয়া হাসিনা-খালেদার কী ক্ষতি হলো তা বড় ব্যাপার নয়; নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে মানুষের মনে ঘৃণার সৃষ্টি হলো, সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিরূপতা দেখা দিল এবং সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষ অবগত হলো। আর হলো বাঙালি নারীর মুখ সম্পর্কে জনগণের স্পষ্ট ধারণা।

সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামলেখক।