বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: এ দুর্ঘটনার পর নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, লঞ্চটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। একজন কেবিন বয় বলেছেন, ইঞ্জিন রুমের পাশের ক্যানটিনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লাগে। পরে তা ইঞ্জিন রুমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আবার প্রচুর ডিজেল ছিল।

ইমরান উদ্দিন: ইঞ্জিন রুমের পাশে ক্যানটিন হবে কেন, এটাই তো একটা প্রশ্ন। ক্যানটিন ওপরের কোনো একটা জায়গায় হলে সেটি বেশি নিরাপদ হতো। ইঞ্জিন রুম একটি ডেটিকেটেড অঞ্চল। এ দুর্ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর এটি বোঝা যাবে। সেখান থেকে একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।

প্রথম আলো: আপনি এ পর্যন্ত যেসব লঞ্চ পরিদর্শন বা পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কেমন দেখেছেন?

ইমরান উদ্দিন: কিছুদিন আগে পাটুরিয়া ঘাটে যে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটল, তারপর আমরা সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে কিছু লঞ্চ দেখেছি। সেখানে যেসব অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দেখেছি, সেগুলোর প্রায় সবই মেয়াদোত্তীর্ণ।

প্রথম আলো: তাহলে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার ত্রুটি?

ইমরান উদ্দিন: নির্বাপণ যন্ত্র ছাড়াও আরেকটি কথা হলো, তাঁরা যে আগুন নেভাবেন, এর জন্য তো প্রশিক্ষণ লাগবে। হয়তো ১০ বছর আগে একবার প্রশিক্ষণ হয়েছিল, এর কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। প্রশিক্ষণের কোনো পরিকল্পনা আছে বলেও মনে হয় না। এসব বিষয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে না জানালে, প্রশিক্ষণ না দিলে কোনো কাজ হবে না।

প্রথম আলো: এ দায়িত্ব পালন বা সার্বক্ষণিক নজরদারির দায় কার?

ইমরান উদ্দিন: এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের এবং নৌপরিবহনের যাঁরা সার্ভেয়ার আছেন, তাঁদের। তাঁরা নিয়মিতভাবে এগুলোর দেখভাল করবেন এবং হালনাগাদ পরিস্থিতি জানাবেন। আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাধারণত দুর্ঘটনার পর।

প্রথম আলো: অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনার বিষয়টি বোধ হয় খুব একটা প্রাধান্য পায় না?

ইমরান উদ্দিন: না, এখানে অগ্নিকাণ্ডের কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য খুব কম পায়। আপনি এখন অগ্নিকাণ্ডের ফলে দুর্ঘটনার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছেন। যখন যে ধরনের দুর্ঘটনা হয়, তখন সেটা নিয়ে শোরগোল হয়। এরপর আবার সব চুপচাপ হয়ে যায়। এর আগে অনেকবার সুপারিশে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আগের সুপারিশগুলো কেন আজও বাস্তবায়িত হয়নি, তার মূল্যায়ন দরকার।

প্রথম আলো: একটি লঞ্চে অগ্নিনির্বাপণের কী ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার?

ইমরান উদ্দিন: কিছু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকবে, যেগুলো আগুন নেভাতে সহায়তা করবে। কিছু ফায়ার বাকেট থাকবে, যেগুলোতে বালুবাহী বালতি থাকবে। যে বালু নিক্ষেপ করলে আগুন নিভে যায়। আর দরকার ফায়ার সেফটি অ্যালার্ম। এটি পুরো লঞ্চে ছড়াবে। তাতে সতর্ক হবেন যাত্রীরা। মাস্টারের নির্দেশনায় তখন লাইফ জ্যাকেট সংগ্রহ করবেন যাত্রীরা। এগুলো সেফটি ড্রিলের আওতায় পড়ে। এগুলো আমাদের এখানে কখনোই নিয়মিত করা হয় না। কোনো প্রশিক্ষণও হয় না। লঞ্চচালক, কর্মী থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ তো যাত্রীদেরও দরকার। তাঁদের ভিডিওর মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে। প্যাসেঞ্জার শিপ এনডোর্সমেন্ট কোর্স, সেফটি ড্রিল, মাস্টার ড্রিল ইত্যাদি নানা নামে প্রশিক্ষণ আছে। সেসব এখানে প্রায় হয়ই না।

প্রথম আলো: লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে যথেষ্ট উপেক্ষিত

ইমরান উদ্দিন: অন্যান্য দেশে তিন বা ছয় মাস পর এসব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকে। তা না হলে লঞ্চের নিবন্ধন নবায়ন হবে না। আসলে শুধু অগ্নিকাণ্ডনিরোধী নিরাপত্তা বিষয় নয়। পুরো ব্যবস্থাটাই তো ত্রুটিপূর্ণ। ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে সেটা একেক সময় একেকভাবে প্রকাশ পাবে। একসময় লঞ্চ ডুবছে, কখনো দূষণ ছড়াচ্ছে, কখনো অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এগুলো আসলে লক্ষ্মণ। শুধু মাস্টার আর ড্রাইভারদের ধরে জরিমানা করে বা শাস্তি দিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পড়ে থাকে পাশে। আমরা বারবার বলে আসছি, নৌযানের ফিটনেস ঠিক করুন। চালকদের প্রশিক্ষণ দিন। বারবার বলা হচ্ছে, ৮–১০ জন সার্ভেয়ার দিয়ে সাত–আট হাজার নৌযান দেখভাল করা সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ মূল জায়গায় হাত দিচ্ছি না। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন