default-image

ত্রাণের চাল, ঢেউটিন বা অন্য ত্রাণসামগ্রী তছরুপের খবর আমরা গণমাধ্যমে কম-বেশি পেয়েছি। দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তাও যথেচ্ছভাবে লোপাট হয়েছে এবং তার খবরও গণমাধ্যমে একটা সময় হরহামেশাই আসত। আর্থিক বরাদ্দ, বিশেষ করে যখন সেটা নগদ টাকায় বিতরণ করা হয়, তখন সেটা বেহাত করার নানা কৌশল থাকে; থাকে সাজানো সুবিধাভোগী। সে কারণে এটি কম দৃশ্যমান হয়। একই কারণে লুটপাট হলেও নগদ টাকার ত্রাণ বিতরণের লোপাট নিয়ে সেই তুলনায় গণমাধ্যমে খবর কমই হয়।

তবে এবার করোনার কারণে কাজ হারানো ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অর্থ বিতরণে যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত মত। এরপরও গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, ৫০ লাখের মধ্যে অনিয়মের কারণে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আড়াই হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা ১৪ লাখ ৩২ হাজার পরিবারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অঙ্কের হিসাবে গেলে দেখা যাবে, তালিকায় নাম থাকলেও ২৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ পরিবারের হাতে পৌঁছায়নি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সহায়তা।

এভাবে জনপ্রিয় সরলীকরণে না গিয়ে একটু ভিন্নভাবে বিষয়টিকে দেখতে অনুরোধ করা যাক। যদি বলি, আর্থিক খাতের ডিজিটালাইজেশনের কারণেই এত বড় অঙ্কের লোপাট আটকে দেওয়া গেছে, তাহলে বিষয়টি কেমন হয়? প্রকৃত বাস্তবতা এটাই। আর ঘটনাটিকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা দরকার।

বিজ্ঞাপন

একটি ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল অপারেটরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই বলতে চাই, শুরুতে অনেকে হয়তো ধারণা করেছিলেন চুরির ডিজিটালাইজেশনের এক মোক্ষম সুযোগ হবে এটা। এমন চিন্তায় যেসব জনপ্রতিনিধি ভুতুড়ে সব নাম দিয়ে টাকাটা নিজের অ্যাকাউন্টে ঢোকাতে চেয়েছিলেন, প্রথম দফাতেই তাঁরা বাতিল হয়ে গেছেন। আমাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিই তাঁদের আটকে দিয়েছে। আর প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা অপারেটর বিশেষ করে আমরা ‘নগদ’ যে শীর্ষে আছি, সেটা বলে দেওয়ার দরকার পড়ছে না।

‘নগদ’ই প্রথম আর্থিক খাতে ডিজিটাল কেওয়াইসি চালু করে। আর সে কারণে আমাদের নেটওয়ার্ক দিয়ে কোনো অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ লেনদেন হওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র আমাদেরই সব গ্রাহক নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজের মাধ্যমে যাচাইকৃত। এসব কারণেই হয়তো ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৭ লাখের দায়িত্বই আমাদের দেওয়া হয়েছিল। আমরা যে সরকারের আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেছি, তার প্রমাণ ভাতা বিতরণের ক্ষেত্রে আমাদের সফলতাই সবচেয়ে বেশি।

সরকারের দেওয়া ১৭ লাখ নামের মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশ সুবিধাভোগীকে আমরা সফলভাবে ভাতা পৌঁছে দিতে পেরেছি। সেখানে অন্য আরও যে তিনটি এমএফএস অপারেটরকে সরকার এ কাজে যুক্ত করেছিল, তাদের প্রত্যেকের চেয়ে আমাদের সফলতার হার বেশি। সরকার বা অন্যান্য এমএফএস অপারেটরের যাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই জানেন এই তথ্য।

বিজ্ঞাপন

ফিনটেক ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রতিনিধি হিসেবে পুরো বিষয় নিয়ে আমার বক্তব্য হলো, চুরি সে যত ছোট বা বড়ই হোক না কেন, সেখানে যদি প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে থাকে, তাহলে সেটি ধরার ব্যবস্থা কিন্তু থাকেই। এটি হলো একেবারে করোনাভাইরাসের মতো। একবার ছোঁয়া লাগল তো আক্রান্ত হওয়া সারা! বারবার হাত ধুয়ে বা মাস্ক ব্যবহার করে হয়তো ভাইরাসমুক্ত থাকা যাবে কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির মধ্যে এলোমেলো কিছু হলেই তার চিহ্ন থেকেই যাবে। এটি কোনো অবস্থাতেই বদলানো যাবে না, যদি না কেউ ভেতর থেকে প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।

তাই সরকারি তহবিলের তছরুপ ঠেকাতে দরকার কেবল ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ, কৌশলগত কিছু পরিকল্পনা আর কার্যকর কিছু প্রচেষ্টা। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে এবার ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন ব্যবহার করা হয়েছে, তেমনি ইতিবাচক পদক্ষেপ আর প্রচেষ্টা ছিল বলেই আমি দেখেছি। সে কারণেই ১৪ লাখ নাম পাওয়া গেছে, যাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি বা যাঁরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকার সুবিধা পেতে চেয়েছিলেন।

সরকারের কাছ থেকে পাওয়া তালিকা অনুসারে টাকা পাঠাতে গিয়ে প্রথম দিকে আমরাই অনেক অসংগতি লক্ষ করছিলাম। যে মোবাইল নম্বর আমরা তখন পেয়েছিলাম তার অনেকগুলোতেই সিম নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যে গরমিল ছিল। সুতরাং না চাইতেও একটা ফিল্টারিং কিন্তু শুরুতেই হয়ে যায়। যেটা ছিল আসলে স্বচ্ছতা নির্ণয়ের প্রথম ধাপ। সরকারকে সঙ্গে সঙ্গেই সেটি অবহিত করি আমরা। পরে একে একে সেই ধাপ ধরেই বের করা গেছে ১৪ লাখ নম্বরের পরিচয়সংক্রান্ত গরমিল। একবার ভাবেন তো, শুধু এমএফএস চ্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে বলেই ৩৫৮ কোটিরও বেশি টাকা তছরুপের হাত থেকে দেশ বেঁচে গেল!

তা ছাড়া টাকাটা পেতে হতদরিদ্রদেরও যে চেয়ারম্যান-কমিশনারের বাড়িতে ধরনা দিতে হলো না বা ব্যাংকে গিয়ে করোনাভাইরাস বিস্তারে সহায়তা হলো না; সেটাও তো বিবেচনায় আনতে হবে। সময়-শ্রম বাঁচল, একই সঙ্গে কমল ঝুঁকি।

বিজ্ঞাপন

এখানে আমার তো প্রস্তাব, সামনের দিনে সরকারি ভাতা বা ক্যাশ সহায়তার ক্ষেত্রে তালিকা পরিচ্ছন্ন করতে যেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা বিগ ডেটার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ‘নগদ’-এ ইতিমধ্যেই আমরা এমন সব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছি। আমাদের নেটওয়ার্ক এখনই অনেক বড়। সামনের দিনে আমরাই হয়তো বলে দিতে পারব, তালিকায় যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের কতজন সত্যিকার অর্থে দরিদ্রভাতা পাওয়ার যোগ্য কি অযোগ্য! তবে এর জন্য আমাদের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার জন্য সরকারি দপ্তরগুলোরও মানসিক প্রস্তুতি দরকার।

আমার তো প্রস্তাব, স্বচ্ছতা আরও নিশ্চিত করতে ভাতা বিতরণের খসড়া তালিকা করার পর সেটি আমাদের সত্যায়নের সুযোগ দিলে আমরা বলে দিতে পারব এর মধ্যে আর্থিকভাবে সচ্ছল লোক আছেন কি না। আমাদের ডেটাবেজ থেকেই আমরা গ্রাহকের লেনদেনের ধরন ও সংখ্যা দেখে প্রকৃত দুস্থের তালিকা করতে সরকারকে সহায়তা দিতে পারব। এই ডেটাবেজ থেকে আমাদের পক্ষে এমনকি এও বলে দেওয়া সম্ভব যে এই লোকটির পেশা কী? তাঁর আয় কেমন? তাঁর লেনদেনের ধরন কেমন? কোথা থেকে তাঁর টাকা আসে? সামনের দিনে হয়তো বলতে পারব এই গ্রাহকের কোথাও কোনো বিনিয়োগ আছে কি না? আর এসব তথ্য যাচাই করেই আমরা তালিকাকে পরিচ্ছন্ন করতে সরকারকে সহায়তা করতে পারব।

বিজ্ঞাপন

এমএফএস সেবা নিতে গিয়ে একেজন গ্রাহক তাঁর অজান্তেই অসংখ্য তথ্যের জন্ম দিয়ে চলেন। সেটাই হতে পারে তালিকাকে স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন করার প্রধান হাতিয়ার। মোবাইল ফোন অপারেটররাও এখন ‘নগদ’-এর পার্টনার হয়েছে। দেশের কোনো এমএফএস বা ডিএফএসের সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের এমন অংশীদারির উদাহরণ নেই। এই অংশীদারির মাধ্যমেও তালিকাকে আরও পরিচ্ছন্ন করা এবং প্রকৃত ‘দুস্থ’দের বেছে নিতে পারব আমরা। আমার বিশ্বাস, সেটি হলে জনগণের করের টাকার আরও সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

তা ছাড়া ‘নগদ’-এর মতো ডিজিটাল আর্থিক খাতের সেবা ব্যবহার করে যদি সরকারি ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ চাইলে সুবিধামতো সময়ে পুরো প্রক্রিয়ার অডিট করতেও পারবে। দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে তখন সরকার সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলেও সফলতার হার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।

যত দূর জানি, সামাজিক নিরাপত্তার খাতে সরকার বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ক্যাশ ভাতা দুস্থ মানুষকে বিতরণ করে। এবারের এই প্রক্রিয়া সব ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হলে পুরো অঙ্কই স্বচ্ছতার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। আমরা জেনেছি, সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বেশ কিছু ভাতা এমএফএসের মাধ্যমে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য একটি পাইলটিংও শুরু হয়েছে। অমরা এই পুরো প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে বলতে চাই, সরকার চাইলে সহজেই ‘নগদ’-এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা কোম্পানিকে ব্যবহার করতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাঁকনি হিসেবে।

লেখক: ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা ‘নগদ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক

মন্তব্য পড়ুন 0