ভারতের বিঘ্নিত গণতন্ত্র

ভারতীয় পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা
ভারতীয় পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা

ভারতের পঞ্চদশ লোকসভা এ মাসেই অতীতের খাতায় নাম লেখাল। দেশে কার্যকর গণতন্ত্রের ছয় দশকের অভিযাত্রায় পার্লামেন্টের সবচেয়ে কম ফলপ্রসূ পাঁচটি বছর শেষে এল এ মুহূর্তটি। বিরোধী দল কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করার কারণে কয়েকবার গোটা অধিবেশনই মাটি হয়েছে। এ ছাড়া বারবার মুলতবির কারণে আইনপ্রণেতারা আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ পাননি। এসবের জেরে ২০০৯ সালের মে মাসে নির্বাচিত সাংসদেরা আগের যেকোনো পার্লামেন্টের চেয়ে যেমন কম আইন প্রণয়ন করেছেন, তেমনি আলোচনাও করেছেন সবচেয়ে কম। কিন্তু এ-ও যেন যথেষ্ট নয়, শেষ অধিবেশনটি উচ্ছৃঙ্খলতার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করল। মাইক্রোফোন ভাঙা হলো, অধিবেশনকক্ষে চলল তুমুল বাগিবতণ্ডা। এমনকি নিজের অপছন্দের বিল নিয়ে আলোচনায় বাগড়া দিতে একজন আইনপ্রণেতা পেপার স্প্রে পর্যন্ত ছিটালেন। শেষের ঘটনায় দম আটকে আসা স্পিকারকে তাঁর আসন থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। হাঁপানি রোগী তিন সাংসদকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। পেপার স্প্রে প্রয়োগকারীর ব্যাখ্যা—প্রতিপক্ষ তাঁকে ‘সাধারণ ধরনের’ বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় তিনি আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ওই অস্ত্র প্রয়োগ করেন। আমাদের মধ্যে যাঁরা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে সুচিন্তিত বিতর্ক করা এবং দেশ শাসনের আইন নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সাংসদ নির্বাচিত হতে চান, তাঁদের জন্য এ অভিজ্ঞতা খুবই নিরুৎসাহব্যঞ্জক।
চমকপ্রদ জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অগণিত সামাজিক বিভাজন আর বদ্ধমূল দারিদ্র্যে ভরা একটি প্রাচীন দেশকে একুশ শতকের সাফল্যের উদাহরণে পরিণত করার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। একমাত্র গণতন্ত্রের পক্ষেই শাসিতের সম্মতি নিয়ে এ রকম চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব ছিল। শুধু গণতন্ত্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল সবার মধ্যে এ অনুভূতির জন্ম দেওয়া যে দেশের প্রগতিতে সবারই সমান স্বার্থ, আইনের চোখে সবাই সমান এবং নিজের উন্নয়নের জন্য সবার সুযোগ সমান। বৈধভাবে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে একমাত্র গণতন্ত্রই পারে সংঘাতের মাত্রা হ্রাস করতে। ভারত যে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করেছে, তাতে পর্যবেক্ষকদের অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে সত্যি বলতে কী, গণতন্ত্রের বদলে অন্য কোনো পথ ধরলে ভারত টিকে থাকত কি না, সন্দেহ।
কিন্তু এই ‘গণতন্ত্রের মন্দিরকে’ (ভারতীয়রা অনেক দিন ধরেই তাঁদের পার্লামেন্টকে প্রশংসাভরে এই নামে ডাকেন) অপবিত্র করেছেন এর নিজেরই পুরোহিতেরা। এখন এর সংস্কার অতি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। পার্লামেন্টের কার্যক্রম বেশির ভাগ ভারতীয়র কাছে হয়ে
উঠেছে বিব্রতকর বিষয়। আর অনেকের কাছেই চরম নিন্দনীয়। জনগণ টেলিভিশনে তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড দেখে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁরা স্লোগান দিয়ে, প্ল্যাকার্ড নাচিয়ে আর গালমন্দ ছুড়ে অধিবেশন মুলতবি করতে বাধ্য করছেন। যে কাজটি করতে তাঁদের নির্বাচিত করা হয়েছে, তা ছাড়া প্রায় সবই করছেন।
এর পরিণাম হচ্ছে, অধিকাংশ ভারতীয় এখন পার্লামেন্টকে সময় ও অর্থের এক বিপুল অপচয় বলে মনে করছেন। কারণ, পার্লামেন্টের অকার্যকারিতা শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়টিকেই খেলো করে তোলে না, তা জরুরি প্রয়োজনী বিভিন্ন আইন প্রণয়নের কাজকেও বিলম্বিত করে। বিল স্থবির হয়ে থাকে, সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত রূপরেখার কাজ এগোয় না, শাসনকাজ হয়ে পড়ে মন্থর।
দিকভ্রষ্ট সাংসদেরা শুধু তাঁদের ভোটারদের আস্থার প্রতিই অবিচার করছেন না; দেশের প্রতি, কর্তব্যের প্রতিও অবিচার করছেন। আর গণতন্ত্রের বদনামের কারণ ঘটাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা পার্লামেন্টে গোলযোগ সৃষ্টি করাকে যে রকম আত্মপ্রসাদের সঙ্গে মেনে নেন, তাতে এ ইঙ্গিতই মেলে যে অভিজ্ঞ রাজনীতিকেরা পর্যন্ত বিষয়টি বোঝেন না।
সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদের কার্যক্রমে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা সাধারণত আগে থেকেই অনুমান করা যায় বলে ভারতের বিরোধীদলীয় সাংসদেরা (এবং যে সরকারদলীয় সাংসদ বিশেষ কোনো ইস্যুতে মন্ত্রিসভার অবস্থানের সঙ্গে একমত নন) বিতর্কের চেয়ে পার্লামেন্টের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে আগ্রহ বোধ করেন বেশি। উভয় দলের পক্ষ থেকেই একে স্বাভাবিকভাবে স্বাগত জানানো হয়, যেন স্লোগানে স্লোগানে সহকর্মীর বক্তব্য ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা ফেলে দেওয়া, অতিদীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করার কৌশল (ফিলিবাস্টার) বা মুলতবি প্রস্তাবের মতোই আর দশটি স্বীকৃত সংসদীয় কৌশলের মতোই কিছু একটা।
সংসদের একটি অলিখিত কিন্তু অলঙ্ঘনীয় প্রথা হচ্ছে, স্পিকার উচ্ছৃঙ্খল সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত বা বহিষ্কার করতে পারতপক্ষে নিজের কর্তৃত্ব ব্যবহার করেন না। শুধু সরকারি ও বিরোধী দলের মতৈক্য হলে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি হবে অতি বিরল ঘটনা। (পেপার স্প্রে ছিটানো সাংসদকে অবশ্য অধিবেশনের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য বহিষ্কার করা হয়। আত্মতৃপ্তিরও তো সীমা থাকে!)
এ ধরনের আচরণ জনগণের কাছে পার্লামেন্টের ভাবমূর্তির (এবং সেই সূত্রে খোদ গণতন্ত্রের) যে বৃহত্তর ক্ষতিটি করে, রাজনৈতিক মহল তা উপেক্ষা করে যায়। ইউরোপে পার্লামেন্টের ন্যক্কারজনক কার্যক্রম (বিশেষ করে দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী জার্মানি ও ইতালিতে) বিশ শতকের প্রথমার্ধে কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের একটি বড় কারণ। গণতন্ত্রের চর্চাকারীরাই যখন একে কলঙ্কিত করেন, তখন জনগণের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কার্যকর কোনো বিকল্প আঁকড়ে ধরার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে অনেকবারই এটি প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচিত সরকার উৎখাতের ঘটনাকে সেখানকার আমজনতা স্বাগত জানিয়েছে। ভারত এ ধরনের প্রবণতার শিকার হতে পারে, তা কখনোই মনে হয়নি। কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রের দায়িত্বহীন জিম্মাদারদের উচিত হবে না নিয়তিকে প্ররোচিত করা। জওহরলাল নেহরুর মতো ভারত রাষ্ট্রের আন্তরিক গণতন্ত্রী স্থপতিদের দাহ না করা হয়ে থাকলে তাঁরা কবরে পাশ ফিরে শুতেন।
মে মাসের শেষ নাগাদ আগামী সাধারণ নির্বাচন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভোটারদের উচিত জোর দিয়ে এ কথাটা বলা যে যাঁরা পার্লামেন্টে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করতে চান, তাঁদের সেখানে যাওয়া উচিত বিতর্ক ও আলোচনা করতে, বিঘ্ন সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে নয়। তবে এই মুহূর্তে একে এক প্রায়-অসম্ভব প্রত্যাশা বলেই মনে হয়।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
 শশী থারুর: ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর সাম্প্রতিকতম বই হচ্ছে প্যাক্স ইন্ডিকা: ইন্ডিয়া অ্যান্ড দি ওয়ার্ল্ড অব দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি।