জন্মযুদ্ধ-১৯৭১, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আপামর জনতা তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধে, একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন নিয়ে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসররা মেতে উঠেছে ইতিহাসের নৃসংশতম গণহত্যায়। ২৫ মার্চ ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংস গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারে দিশেহারা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তখন দুই সপ্তাহের জন্য আশ্রয় নেন বহুদিনের পরীক্ষিত বন্ধু ডা. তোফাজ্জল হোসেনের ক্লিনিকে। ডা. তোফাজ্জল হোসেন, চিকিৎসাশাস্ত্রে পশ্চিমের সর্বোচ্চ ডিগ্রি (এফআরসিএস) নিয়ে তখন ঢাকার স্বনামধন্য চিকিৎসক, টি হোসেন নামেই তিনি অধিক পরিচিত। সেই রাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তৎকালীন ছয় লাখ টাকা মূল্যমানের ক্লিনিক আর জমানো পসার, শান্তির জীবন ছেড়ে যাবেন যুদ্ধে। ঢাকা ত্যাগ করলেন এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, কিন্তু লক্ষ্য স্থির—স্বাধীন দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ আর অত্যাচারী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত মানুষকে পৌঁছে দিতে হবে স্বাস্থ্যসেবা।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত হলো বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার তথা মুজিব নগর সরকার। কলকাতায় অবস্থিত তৎকালীন পাকিস্তান উপদূতাবাসের বাঙালি অফিসার হোসেন আলী দূতাবাসটিকে স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অফিসে রূপান্তরিত করলে সেটিই মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয়ে পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৭১ সালের ২ মে প্রবাসী সরকারের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে জাতীয়–আন্তর্জাতিক সব পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে লেখা হলো ডা. টি হোসেনকে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা।

default-image

পথচলা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রথম মহাপরিচালক ডা. টি হোসেন দায়িত্ব গ্রহণ করেই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে তিনি সব বাংলাদেশি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীকে দ্রুতই তাঁর অফিসে রিপোর্ট করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে এবং দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত হতে আহ্বান জানাচ্ছেন। যেন আরেক যুদ্ধের ডাক, একদিকে স্বাধীনতাযুদ্ধ অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জীবন বাঁচানোর, সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তার সংগ্রাম।

স্বাস্থ্যসেনারা তো প্রস্তুতই ছিলেন! দেশের স্বাধীনতাকামী চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মী ও মেডিকেল ছাত্ররা দলে দলে সীমান্তে গিয়ে প্রবাসী সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করতে থাকলেন। গড়ে উঠল স্টেনগানের সঙ্গে স্টেথোস্কোপধারী ১ হাজার ৪০০ জীবনরক্ষাকারী সেনার এক নতুন বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেনাদের বাহিনী।

পথচলার চড়াই-উতরাইয়ের এ পর্বে ছিল শুধুই দুর্গম চড়াই। তত দিনে প্রায় ৬০ লাখ শরণার্থী সীমান্তে পৌঁছে গেছে। তাদের মধ্যে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, শত্রুর আঘাত, নির্যাতন, মানসিক অবসাদ আর যুদ্ধে ক্ষতচিহ্ন। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে মহামারি আকারে নানা সংক্রামক রোগ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের এত স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি যুদ্ধে চিকিৎসা সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্ব তখন নবগঠিত এই অধিদপ্তরের কাঁধে। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন ডা. জয়নাল আবেদীন। তাঁর সঙ্গে সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসকদের নামের তালিকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায় এবং এমবিবিএস ডাক্তারদের ১৫ রুপি ও এলএমএফ (বর্তমানে বিলুপ্ত) ডাক্তারদের ১০ রুপি হারে দৈনিক ভাতা নির্ধারণ করে তাঁদের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অনেকে ভারতীয় রেডক্রসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসাকর্মী শরণার্থীশিবিরে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ড্রেসিং স্টেশনে কাজ শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা

১ হাজার ৪০০ স্বাস্থ্যকর্মী ও কিছু স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল-নার্সিং ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে কর্মী বাহিনী তখন কাঁধে তুলে নিয়েছে প্রবাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ। উপর্যুপরি শরণার্থীর চাপ, সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন আসছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কর্মপরিকল্পনা নিলেন ডা. টি হোসেনের নেতৃত্বের বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবীরেরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে আরও জোরদার করতে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিযুক্ত করেন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে।

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’–এ (তৃতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ১৪০) ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ বিভাগের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তৎকালীন মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্যসচিব ডা. টি হোসেন সীমান্তবর্তী প্রায় সব কেন্দ্রই সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং জরুরি ভিত্তিতে রোগী বহনের জন্য পরিবহন (অ্যাম্বুলেন্স), জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয় ও বিতরণ এবং চিকিৎসা পেশাজীবীদের সম্পর্কে নানাবিধ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব নির্দেশনা ও বাস্তবায়ন কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে তত দিনে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার কাজ অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে—এমন ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি প্রয়োজনের ওপর প্রস্তুতকৃত আরেকটি সরকারি প্রতিবেদনে।

যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রদানের জন্য মেডিকেল টিম প্রস্তুত করা, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা করা, জরুরি ওষুধ ও জীবনরক্ষাকারী সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা, সমরক্ষেত্রে চিকিৎসক ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে দায়িত্ব বণ্টনসহ প্রতিটি কাজই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুচারু পদক্ষেপের প্রমাণ মেলে। অধিদপ্তর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ছাড়াও বিভিন্ন ফিল্ড হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এই মহাকর্মযজ্ঞে এরই মধ্যে যুক্ত হন পরিচালক ডা. কে এ জামান, উপপরিচালক ডা. আহমেদ আলী, দুজন সহকারী পরিচালক ডা. মো ফরিদ ও ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, মেডিকেল অফিসার মেসবাহুন নাহার ও তাহেরা খাতুন এবং অধিদপ্তরের বিতরণ কর্মকর্তা হিসেবে নাসিমা রহমান ও অফিস সহকারী হিসেবে আক্তার জাবিন আহমেদ।

সময় এগিয়ে গেছে যত, যুদ্ধের মধ্যে আরেক মহাযুদ্ধ নিয়ে ততই এগিয়ে গেছেন স্বাস্থ্যসেনারা। স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ বিভাগ প্রথম পর্যায়ের কাজ সামলে নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। মহাপরিচালক ডা. টি হোসেন তখন একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি তখন প্রস্তাব করলেন চারটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের।

এক. সেনা মেডিকেল সার্ভিস, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বাত্মক চিকিৎসা সহযোগিতা দেওয়া যাবে।

দুই. বেসামরিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যাদের কাজ হবে বেসামরিক নাগরিক ও শরণার্থী স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা।

তিন. সমাজকল্যাণ, যার অধীনে ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়ন ও ও গবেষণা পরিচালিত হবে।

চার. স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, যার অধীনে পরিচালিত হবে চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রম এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়া ও রণক্ষেত্রে চিকিৎসাকাজে নিয়োজিত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা শিক্ষায় সমন্বয় করা।

এ যেন এক পূর্ণাঙ্গ জয়ের মহাপরিকল্পনা।

৫০ বছরের পথচলা: উৎসর্গ ও অর্জনের উপাখ্যান

শুধু যুদ্ধকালেই নয়, যুদ্ধের শেষেও ছিল আরেক মহাযুদ্ধ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের। কারণ, একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকদের সেবার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা, জনসংখ্যা সমস্যা, পুষ্টি সমস্যাসহ নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া ও সেগুলো বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়ন করা।
এরপর ছিল দেশের চিকিৎসা পরিকাঠামো নির্মাণ ও স্বাস্থ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা। চিকিৎসাসেবার উন্নয়নকল্পে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে নেতৃত্বে চালু করা হয় সাতটি চিকিৎসা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, যা স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে ৩৯টিতে। যেখানে স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এই প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র দুটি। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত আইপিজিএমআর ১৯৯৮ সালে দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে দেশে মোট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪।

এ ছাড়া চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও সেবাদানের জন্য মাত্র ছয়টি মেডিকেল কলেজ ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে, যা আজ সরকারি ৩৬টি ও বেসরকারি পর্যায়ে ৬৯টি মিলিয়ে বর্তমানে ১১১টি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সারা দেশে। স্বাধীনতার আগে মাত্র একটি ডেন্টাল কলেজ নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে মোট তিনটি ডেন্টাল কলেজসহ সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ডেন্টাল ইউনিট মিলিয়ে মোট ৩৫টি প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে সারা দেশে।

বিজ্ঞাপন

এই ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যাসহ নানাবিধ কাজ নিয়ে, হাজারো সমস্যা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে দেশের স্বাস্থ্যসৈনিকেরা। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক দোরগোড়ায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুদক্ষ কর্মী বাহিনীর মাধ্যমে। স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন শাখা সারা দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন নিয়ে কাজ করছে। ডিজিটাল এই তথ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিয়েলটাইম অনলাইন রিপোর্টিং দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে শুরু করে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত চালু আছে। একাধিক হাসপাতালে চালু হয়েছে হসপিটাল অটোমেশন সিস্টেম। এর ফলে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন রোগের পরিসংখ্যান, সেবা ও কর্মকাণ্ডের তথ্য নিমেষেই জানা যাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারিকালে যুক্ত হয়েছে অনলাইন ভেরিফায়েড টেস্ট রিপোর্ট সিস্টেম ও রিয়েলটাইম হসপিটাল ড্যাশবোর্ড, যার মাধ্যমে দেশের কোভিড হাসপাতালগুলোর সাধারণ ও আইসিইউ বেডের সব তথ্য যেকোনো মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবার আধুনিকীকরণ, চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়াসহ নানাভাবে প্রত্যেক নাগরিকের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যার ফলাফল আমরা পেয়েছি শিশু মৃত্যু হ্রাস, মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য সূচকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার প্রাপ্তিসহ বিশ্বের দরবারে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অর্জন উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য অবস্থান করে নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ হয়েছে মাঠপর্যায়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধমূলক সেবায় সারা বিশ্বে অনন্য।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের ১০ লক্ষাধিক অনিবন্ধিত নাগরিকের সেবায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চৌকস কর্মী বাহিনী। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী চলা কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ ও রোগের বিস্তাররোধসহ সব কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুবর্ণজয়ন্তীতে হতে পারত উৎসব, আনন্দের আয়োজন। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির আঘাত বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে এক মুহূর্তেরও বিশ্রাম দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনস্থ সব চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্য কর্মীচারীদের। দিন–রাত ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহে ৭ দিন প্রতিটি মুহূর্তেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে মহামারি রোধে সেই মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের স্বাস্থ্যসেবার মতো একইভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সবাই।

ঠিক ৫০ বছর আগে দেশের জন্মযুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আজ সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে আরেক যুদ্ধে লড়ছে। শতাধিক চিকিৎসক ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, নার্স, প্যারামেডিকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে। এককভাবে কোনো পেশাজীবীদের দেশের মানুষের কল্যাণে এত বড় আত্মোৎসর্গ শুধু বিরলই নয়, শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয়।

তাই আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুবর্ণজয়ন্তীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সব বীর স্বাস্থ্যসেনানী থেকে অদ্যাবধি এই কোভিড–১৯ মহামারিসহ দেশের মানুষের সেবায় আত্মোৎসর্গকারী ও নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব কর্মীকে। আশা করছি, দেশের মানুষ তাঁদের কথা মনে রাখবেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলে মহামারি নিয়ন্ত্রণে অধিদপ্তরকে সহায়তা করবেন। যুদ্ধটা আমরা জিতব সবাই মিলেই।

কৃতজ্ঞতা : শাহাদুজ্জামানখায়রুল ইসলামের প্রতি। প্রথম আলোতে ২০১৯ সালের ৬ মে ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা-সেনারা বিস্মৃতির পথে’ শীর্ষক তাঁদের লেখা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন