default-image
গত ১৯ মার্চ প্রথম আলোর আয়োজনে ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাও, উবার ও সহজের সহযোগিতায় ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭: প্রয়োগ, সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।

আলোচনায় সুপারিশ

*  এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে

* নতুন গাড়িকে এই সেবায় আসার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন

* রাইড শেয়ারিং–সেবায় মূসক পরিহার করা জরুরি

* চালক যেন নিজের ও যাত্রীর নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকেন

* রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন

* চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে

* স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণের জন্য গুগল ও আমাজনের মতো ক্লাউড স্টোরেজ সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

* ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে

* চালকের সহজে কোম্পানি পরিবর্তনের সুযোগ রাখা দরকার

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাইড শেয়ারিং নীতিমালা (২০১৭) গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এ পর্যন্ত ১৬টি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি বিআরটিএ বরাবর সনদের জন্য আবেদন করেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আবেদনগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নীতিমালার কিছু শর্ত প্রতিপালন না হওয়ায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানিকে সনদ দেওয়া হয়নি।

 এই খাতে নিয়োজিত সেবাদানকারী কোম্পানিগুলোর মতে, নীতিমালার বেশির ভাগ শর্তই তারা ইতিমধ্যে পূরণ করেছে। বাকি শর্তগুলো প্রতিপালনের জন্য অন্যান্য সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। এসব বিষয়ই আজকের আলোচনা। এখন এ বিষয়ে আলোচনা করবেন হুসেইন মোহাম্মদ ইলিয়াস

default-image

হুসেইন মোহাম্মদ ইলিয়াস

স্বল্প সময়ে রাইড শেয়ারিং নীতিমালা প্রণয়নের জন্য আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। রাইড শেয়ারিং সেবাটি অল্প দিন হলো এসেছে। আমরা জানি, এর আগে ঢাকা শহরের অবস্থা কেমন ছিল। এখনো প্রতিনিয়ত যানজটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

আমাদের গণপরিবহনব্যবস্থা দুর্বল। বাসের সংখ্যাও কম। একটি শহরে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন। ঢাকায় আছে মাত্র ৭ শতাংশ। এসব কারণে ঢাকা শহর পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির শহরে পরিণত হয়েছে।

সরকার রাইড শেয়ারিং নীতিমালা করেছে। আমরা এই নীতিমালা ইতিবাচকভাবে দেখছি। নীতিমালার কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনী আনার সুযোগ রয়েছে। এতে এমন কিছু নির্দেশনা আছে যা ব্যবহারকারী, চালক ও কোম্পানির জন্য মেনে চলা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

নীতিমালা অনুযায়ী গাড়ি নিবন্ধনের এক বছর অতিবাহিত না হলে কেউ রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত হতে পারবে না। কিন্তু নতুন গাড়ি জ্বালানিসাশ্রয়ী, নিরাপদ ও যাত্রীদের পছন্দ। রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর ভ্যাট যুক্ত করা হয়েছে। এই ভ্যাট যাত্রীদের ওপর বর্তাবে। ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ বাড়বে।

নীতিমালার বাইরেও নতুন নিয়ন্ত্রণের কথা আমাদের জানানো হয়েছে। যেমন রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে যুক্ত গাড়ির সর্বোচ্চ সংখ্যা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে চালকেরা খণ্ডকালীন সেবা দিয়ে থাকেন। তাই এটা বাস্তবায়ন কঠিন। তা ছাড়া যেসব গাড়ি ঢাকায় নিবন্ধিত, কেবল সেগুলো ঢাকায় রাইড শেয়ারিং করতে পারবে বলে বলা হয়েছে। এটি অযৌক্তিক।

প্রতিদিন ঢাকায় প্রচুর মানুষ আসে। আসার সময় তারা তাদের গাড়ি নিয়ে আসে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা মহানগরে গাড়ি কমবে না, বরং রাইড শেয়ারিং সেবায় গাড়ির জোগান কমবে। রাইড শেয়ারিং দেশে একটি নতুন ও প্রতিশ্রুতিশীল বিকাশমান সেবা খাত, তাই আমরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করি। সে জন্য নীতিমালায় উল্লিখিত কতিপয় জনস্বার্থ পরিপন্থী বিষয়ের পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছি।

default-image

জুলকার কাজী ইসলাম
রাইড শেয়ারিং–ব্যবস্থা বিদ্যমান সম্পদের ব্যবহার পুনর্বিবেচনা ও ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প সমাধান দিতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, রাইড শেয়ারিংয়ে বিদ্যমান যানবাহন ব্যবহার করায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমেছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৯৫৯টি, যা ২০১৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২২৭টিতে। আমরা আশা করি, নির্ভরযোগ্য যানবাহনের সহজলভ্যতা থাকলে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।

রাইড শেয়ারিং নীতিমালায় ভাড়া নির্ধারণে একটি বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও বিশ্বের কোথাও এটা করা হয়নি। কারণ এটা বাজারের সম্ভাব্যতার জন্য ক্ষতিকর। রাইড শেয়ারিংয়ে যানবাহনের সরবরাহ ও চাহিদার ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

প্রযুক্তি রাইড শেয়ারিংকে নিরাপদ পরিবহনের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত করেছে, যা ভ্রমণের সময় নতুন ও উদ্ভাবনী উপায়ে নিরাপত্তা বাড়ানোর অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দিয়েছে। আর চালকদের ঝুঁকি কমাতে কাজ করছে পণ্য ও প্রকৌশল দল। এ ছাড়া টেলিম্যাটিকস সেবা সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ করে অনিরাপদ ড্রাইভিং আচরণ পরিমাপ করতে সহায়তা করে (যেমন: হঠাৎ গতি বাড়ানো বা হার্ড ব্রেক করা)।

রাইড শেয়ারিংয়ে সমর্থন থাকায় আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। মূলত মানুষের গতিশীলতা বাড়াতেই রাইড শেয়ারিং নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে যেসব ধারা রাইডার ও ড্রাইভার এবং কোম্পানিগুলোর জন্য ক্ষতিকর, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

default-image

মালিহা কাদির
এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতিমালায় চালকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাঁদের আয় কমে যাবে। পছন্দমতো ট্রিপ পাবেন না। এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতির ফলে চালকেরা কেবল সে প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হবেন, যেটা সবচেয়ে বড়। এতে একচেটিয়া বাজার তৈরি হবে।

অনেকগুলো কোম্পানিতে নিবন্ধন করলে, দুর্ঘটনার সময় কে দায় নেবে? সেই ক্ষেত্রে চালক অথবা যাত্রীর অ্যাপ বলে দেবে সে কোন কোম্পানির রাইডে আছে। বিআরটিএ এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট প্রাপ্তির জন্য পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শর্তগুলোর মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। যেমন পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোতে যানবাহনের অভাব নেই, তারপরও রাইড শেয়ারিং আছে এবং ভালো করছে। মার্কেট অথবা কাস্টমারের চাহিদা থেকে রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরযানের পরিমাণ নির্ধারিত হওয়া উচিত।

default-image

কাজী আমিনুল ইসলাম
আমি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছি। এটা সুযোগ তৈরি করেছে। আমার গাড়ি আছে। ব্যবহার করতে না চাইলে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। সুযোগ থাকাটা হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতাই হলো গণতন্ত্র।

রাইড শেয়ারিং সেবার বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। এই নীতিমালাই তার প্রমাণ। একটা নীতিমালা করতে গেলে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়। নীতিমালার কিছু বিষয় আছে খুবই সংবেদনশীল। যেসব সমস্যা উঠে এসেছে, সেখানে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই।

এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতি হলে চালকের স্বাধীনতা থাকবে না। একচেটিয়া বাজারের সুযোগ তৈরি হবে। আমরা একচেটিয়া বাজার চাই না। প্রতিযোগিতামূলক বাজার চাই। প্রযুক্তি আছে, সমাধানও আছে। এসব বিষয় নিয়ে বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলব।

default-image

কানিজ ফাতেমা
আমার নিজস্ব কোনো পরিবহন নেই। অফিস থেকে বাসায় যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন রাইড শেয়ারিংয়ের সুযোগ নিয়ে সময়মতো কাজে পৌঁছাতে পারছি। ব্যবহারকারী হিসেবে রাইড শেয়ারিংয়ে যথেষ্ট সুবিধা পাচ্ছি।

নারী যাত্রীদের জন্য রাইড শেয়ারিং–সেবা বেশ নিরাপদ। আমি একজন চালকের সঙ্গে যাতায়াত করছি।চালকের তথ্য প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে। ফলে কোনো সমস্যা হলে গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করতে পারছি।

default-image

কাজী এরশাদুল আলম
বাংলাদেশ মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩–তে রাইড শেয়ারিং–সেবার কথা উল্লেখ ছিল না। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়।

আমাদের আইনে সহযোগিতামূলক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কিছু না থাকায় এ সমস্যাটি হয়েছিল। পরবর্তীকালে সরকার নীতিমালা করে তার অবসান ঘটায়।

বাংলাদেশ মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী কেউ যাত্রী পরিবহন করলে তাকে রুট পারমিট ও বিআরটিএর অনুমোদন নিতে হবে। নীতিমালাটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানিকে ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী পরিবহনের অধিকার দিচ্ছে।

২০১৭ সালের রাইড শেয়ারিং নীতিমালার অনুচ্ছেদ চ (৯)–এ এক অ্যাপ এক নীতি একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি করবে। প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ অনুযায়ী কাউকে একচেটিয়া বাজার তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, নিবন্ধনের এক বছর অতিবাহিত না হলে কেউ রাইড শেয়ারিং–সেবায় যুক্ত হতে পারবে না। পুরোনো গাড়ি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়ি আমদানি নিষেধ করা হয়েছে। সরকারের উচিত পুরোনো গাড়ি সরিয়ে নেওয়া। পরিবেশ আইন ও সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নতুন গাড়িকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।

যাত্রী পরিবহনসেবা ভ্যাটের আওতামুক্ত। তাই এ সেবার মাধ্যমও ভ্যাটের আওতামুক্ত থাকা উচিত।

default-image

মো. শাহাদাত হোসেন চৌধুরী
২০১৭ সালে ছাত্রাবস্থায় রাইড শেয়ারিংয়ে যোগ দিই। এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতিতে বলা হয়েছে, কোম্পানি পরিবর্তনের জন্য অন্তত এক মাস আগে নোটিশ দিতে হবে। যেটা ফ্রিল্যান্সিং ধারণার বিপরীত। ফ্রিল্যান্সিংয়ের জনপ্রিয়তার কারণই হলো যে আপনার স্বাধীনতা থাকবে।

যদি এক অ্যাপে নিবন্ধন করি, তবে কোম্পানি সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দিলেও আমার কিছু করার থাকবে না।

ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ি ছাড়া রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হওয়া যাবে না বলা হয়েছে। ঢাকার বাইরের অনেকেই এই সুবিধা নিয়ে পরিবার চালাচ্ছেন। এ নিয়মের ফলে তাঁরা বিপাকে পড়বেন। আমাদের ওপর যে ইনকাম ট্যাক্স আরোপিত হয়েছে, এর প্রত্যাহার চাই।

default-image

আসিফ সালেহ
ব্র্যাক থেকে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে আমরা একটা বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এটা করতে না পারলে এক সময় বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করবে। পূর্ণকালীন চাকরির জনপ্রিয়তা বৈশ্বিকভাবে কমেছে। এখন একজনই সারা দিন বহু ছোট ছোট কাজ করছেন। রাইড শেয়ারিং–সেবায় প্রায় এক লাখ বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই এই সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কোনো নীতিমালা রাখা উচিত নয়।

সম্প্রতি ৬৪ জেলায় একটি জরিপ করা হয়েছে। সেখানে কর্মসংস্থান ও যাতায়াতব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে এসেছে। একজন কৃষকের বছরের সব সময় কাজ থাকে না। তখন তিনি হয়তো শহরে গাড়ি চালাচ্ছেন। সে জন্য পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে এখন বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে। প্রতিবছর ২২ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের প্রত্যেকের চাকরির ব্যবস্থা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এ রকম প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ দিতে হবে। এই নীতিমালার কিছু কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

default-image

মো. লোকমান হোসেন মোল্লা
রাইড শেয়ারিং–সেবা হঠাৎ এসেছে। আমরা দ্রুততম সময়ে কোনো ভিত্তি জরিপ ছাড়াই বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংযুক্ত করে এই নীতিমালা করেছি। ফলে কিছু ভুলভ্রান্তি থাকা স্বাভাবিক।

এখানে যে সমস্যাগুলো এসেছে, তা আমাদের প্রাথমিক খসড়ায় ছিল না। পরবর্তীকালে আন্তমন্ত্রণালয়ে এসব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত আমরা ১৬টি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির নিবন্ধনের আবেদন পেয়েছি। কিছু সমস্যা থাকায় কাউকেই নিবন্ধন দিতে পারিনি।

প্রক্রিয়াটিকে আমরা অনলাইনভিত্তিক করতে চাচ্ছি। এখনো তা সম্ভব হয়নি। ফলে আমরা অফলাইনে কার্যক্রম চালাচ্ছি।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনার জন্য বিআরটিএর কাছে আবেদন করেছে। আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটি বিষয়টি দেখবে।

এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতি করা হয়েছিল মূলত ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে। প্রয়োজনে নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব। যেহেতু বিআরটিএর কোনো কেন্দ্রীয় অ্যাপ নেই। প্রতিটি কোম্পানির আলাদা আলাদা অ্যাপ। তাই এতগুলো কোম্পানির তথ্য ব্যবস্থাপনা করা বিআরটিএর পক্ষে খুবই কঠিন।

নিবন্ধনের এক বছর অতিক্রম না হলে রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হওয়া যাবে না, এই নীতিটি করা হয়েছে যেন রাইড শেয়ারিং করার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে গাড়ি না কেনে।

যে গাড়িগুলো বাজারে আছে, সেগুলোই যেন ব্যবহৃত হয়। এসব নীতিমালা সময়ের চাহিদায় পরিবর্তন সম্ভব।

default-image

মো. জাভেদ ইকবাল

আগে আমরা তিনজন তিনটা গাড়ি ব্যবহার করতাম। রাইড শেয়ারিং আসার কারণে আমরা তিনজন একটা গাড়ি ব্যবহার করছি। ফলে যানজট কমার কথা। কিন্তু কমছে না। ঢাকা মহানগরে উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় যানজট হচ্ছে। রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য নয়। এ সেবার জন্য এখন যেকোনো সময় গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে আর চিন্তা করতে হচ্ছে না।

default-image

মো. রবিউল হক
রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে তরুণদের কর্মসংস্থান হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অবসর সময়ে এ কাজগুলো করছেন। তবে নিরাপত্তার দিকটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

দিনে দিনে মোটরসাইকেল সাশ্রয়ী হচ্ছে। তিন–চার বছর আগে একটি মোটরসাইকেল কিনতে একজনের ২২ মাসের বেতন লাগত। এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে সাত থেকে আট মাসে। এ খরচটা আরও কমবে।

নীতিমালা এমনভাবে করতে হবে, যেন তা উন্নয়নের সহায়ক হয়। এ–সংক্রান্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো করার সুযোগ রাখতে হবে।

default-image

হোসেন মমতাজ
বিআরটিএর কোনো কেন্দ্রীয় অ্যাপ নেই। থাকলে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো তাদের সেবা সেখান থেকে দিতে পারত। এখন প্রত্যেকেই আলাদা অ্যাপ থেকে সেবা দিচ্ছে। তাই আমাদের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা কষ্টসাধ্য। এখন চালক ও গাড়ির আপলোড করা তথ্যগুলো আমাদের নিজস্ব সার্ভার থেকে মিলিয়ে নিতে হয়। পুলিশ সেটা যাচাই করে। তারপর নিবন্ধন দিতে হয়। কেন্দ্রীয় অ্যাপ থাকলে বিষয়টি আমাদের ও পুলিশের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতো।

২০১৭ সালের রাইড শেয়ার নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘চ’–এর ৬ নম্বরে বলা হয়েছে, এ–সম্পর্কিত সব তথ্য দেশের ভেতরে থাকতে হবে।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো যে ধরনের সেবা দিচ্ছে, তা দেওয়ার মতো কোনো সার্ভার বাংলাদেশে নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো গুগল বা আমাজনের মতো ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করে। ভবিষ্যতে যেন গুগল ও আমাজনের সার্ভারের মতো সেবা বাংলাদেশেও পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

default-image

মো. নাজমুল ইসলাম
অ্যাপকেন্দ্রিক কার্যক্রম করার সময় যেন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি টিম থেকে কাউকে রাখা হয়। কারণ এই পদ্ধতিটা মূলত ইন্টারনেটভিত্তিক। অ্যাপসের নিরাপত্তা এবং অ্যাপস ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা দিতে হবে। অ্যাপসগুলোতে গণমানুষের তথ্য রয়েছে। এগুলোর দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেটার নিরাপত্তা দিতে হবে।

এখন বাংলাদেশে তথ্য সংরক্ষণের জন্য তথ্যভান্ডার রয়েছে। আমরা চাইলে সেখানে স্পেস নিতে পারি। তথ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা কথা বলতে পারি। সমাধান করতে পারি। এগুলো পালিত হচ্ছে কি না, তা পুলিশ যাচাই করবে।
২০১৭ সালের রাইড শেয়ার নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘চ’–এর ৭–এ বাংলা ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহারকারী থেকে কোনো তথ্য নেওয়ার আগে অবশ্যই তার অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য চাওয়ার যৌক্তিকতা থাকতে হবে।

এসব তথ্যের অপব্যবহার ও তথ্য ফাঁস হলে সে দায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে নিতে হবে। এ তথ্যের মাধ্যমে আপনাকে হুমকি দেওয়া হতে পারে। এসব ব্যাপারে যা সহযোগিতা লাগে, সাইবার সিকিউরিটি টিম তা করবে।

default-image

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
রাইড শেয়ারিং–সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন অটোমোবাইল কোম্পানি রাইড শেয়ারিং–সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। গত দুই বছরে কার নিবন্ধন কমেছে, কিন্তু মোটরসাইকেল নিবন্ধন বেড়েছে।

২০১৫ সালে মোটরসাইকেল ছিল ১ দশমিক ৫ লাখ। সেটা ২০১৭ সালের শেষে দাঁড়ায় ৪ লাখে। বিক্রির এ অবদান মূলত রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর। শিক্ষার্থীরা তাঁদের পেশাজীবন শুরুর আগে এ ধরনের সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন।

নিরাপত্তার কিছু বিষয় এসেছে। সেগুলো আমাদের ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানির ভাবা উচিত। এ ক্ষেত্রে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো তাদের কাছে থাকা তথ্য দিয়ে বিআরটিএকে সহায়তা করতে পারে। বিআরটিএ সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারবে। আমি এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

default-image

নাঈম আশরাফী
বিআরটিএর অধীন কেন্দ্রীয় অ্যাপের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে বাস্তবতাবহির্ভূত মনে হয়। বিআরটিএর নেতৃত্বে ও কোম্পানিগুলোর সহযোগিতায় এটা সমাধান করা যেতে পারে।

তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একসময় নিয়মই ছিল যে দেশের ভেতর তথ্য রাখা যাবে না। এখন আমরা অল্প আকারে হলেও বেশি পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করতে পারছি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইটটি বাংলাদেশে হোস্ট করা। যেটি বাংলাদেশ সরকারের ওয়েবসাইট। যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি সাইট আছে। লেনদেনের সুবিধাও সেখানে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণের জন্য কিছু সময় বেঁধে দেওয়া উচিত। এর মধ্যে আপনারা প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এরপর স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে হোস্ট করতে পারবেন। আপনারা অল্প করে হলেও সংরক্ষণ করে দেখেন। আমাদের সার্ভারের কার্যক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১০ লাখেরও বেশি।

default-image

হোসেন জিল্লুর রহমান
অন্যান্য দেশে রাইড শেয়ারিং–সেবার নীতিমালা অনেক পরে হয়েছে। অনেক দেশে এখনো হয়নি। সেখানে আমাদের দেশে নীতিমালা করা হয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু যাত্রী ও চালকের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু পথচারীদের নিরাপত্তার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে।

কোম্পানি ও চালকদের মধ্যে রাস্তা ব্যবহার নীতি নিয়ে শিক্ষামূলক কর্মসূচির প্রয়োজন রয়েছে। চালকেরা যেন তাড়াহুড়ো না করেন। তাঁরা যেন নিরাপদে গাড়ি চালান, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। যানজট ও বিশৃঙ্খলার অন্য কিছু নির্ধারক রয়েছে। যেমন রাস্তার নকশার বিষয়, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ আরও অনেক বিষয় আছে।

রাইড শেয়ারিং–সেবায় কর্মসংস্থান তৈরির একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থান ছাড়াও এটা অনেক পণ্যের চাহিদা তৈরি করেছে। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্যান্য খাতও ভালো করতে পারছে। যেমন মোটরসাইকেল তৈরির চাহিদা বাড়বে। সুতরাং এর একটা অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।

ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ি হতে হবে, এটাকেও পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বিআরটিএ ব্যবস্থাপনা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি–সংক্রান্ত জনবল এটা সমাধানে এগিয়ে আসবে আশা করছি। তথ্য স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কেন সংরক্ষণ করতে হবে, সে উদ্দেশ্যটাও পরিষ্কার করা দরকার। এ নিয়ে আরও আলোচনার সুযোগ আছে।

আমি তিনটি বিষয়ে পরামর্শ দিতে চাই। প্রথমত, দুটি নীতিমালা গুরুত্বসহকারে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একটি হলো এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতি। এটি সংশোধন হলে একচেটিয়া বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। অন্যটি হলো এক বছর পুরোনো গাড়ি।

দ্বিতীয়টি হলো বিআরটিএ ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে। এই সেবা খাতের আকার বাড়লে বিআরটিএর ব্যবস্থাপনাপদ্ধতি কেমন হবে।

তথ্যের নিরাপত্তার পাশাপাশি গোপনীয়তাও রক্ষা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাইড শেয়ারিং নীতিমালা ২০১৭–এর অনুচ্ছেদ ‘খ’–এ সেবাদানকারীর দায়-দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে দায় কে নেবে? সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।

এ তিনটি বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে এ সেবার উন্নয়ন যথার্থ মানসম্পন্ন ও টেকসই হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের কেবল সেবা খাত তৈরি করলেই হবে না—এর নেতৃত্বও দিতে হবে।

আব্দুল কাইয়ুম

আলোচনায় রাইড শেয়ারিং–সেবার অনেক বিষয় এসেছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রীরা বিকল্প পরিবহনসুবিধা পাচ্ছে।

এ ছাড়া যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা সমাধান করবেন বলে আশা করি।

আজকের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সে আলোচনার শুরু হলো। আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

যাঁরা অংশ নিলেন

কাজী আমিনুল ইসলাম: নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিআইডিএ)

হোসেন জিল্লুর রহমান: নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)

মো. নাজমুল ইসলাম: অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ইউনিট, ডিএমপি

আসিফ সালেহ: সিনিয়র ডিরেক্টর, স্ট্র্যাটেজি, কমিউনিকেশন অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট, ব্র্যাক          

মো. লোকমান হোসেন মোল্লা: পরিচালক, ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ

হোসেন মমতাজ: প্রোগ্রামার, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ

কাজী এরশাদুল আলম: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

নাঈম আশরাফী: টিম লিডার, স্টার্টাপ বাংলাদেশ

হুসেইন মোহাম্মদ ইলিয়াস: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, পাঠাও লিমিটেড

মালিহা কাদির: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ লিমিটেড

জুলকার কাজী ইসলাম: লিড, উবার বাংলাদেশ

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম: চিফ ফাইন্যান্স অফিসার, রানার গ্রুপ

মো. রবিউল হক: বিজনেস ম্যানেজার, এসিআই, ইয়ামাহা ইউনিট

মো. শাহাদাত হোসেন চৌধুরী: রাইড শেয়ারিং গাড়ির মালিক ও চালক

কানিজ ফাতেমা: রাইড শেয়ারিং যাত্রী

মো. জাভেদ ইকবাল: রাইড শেয়ারিং যাত্রী

সঞ্চালক

আব্দুল কাইয়ুম: সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0